অন সেন্সরশিপ / সালমান রুশদি

খুব কম লেখকই সেন্সরশিপ নিয়ে কথা বলতে আগ্রহী। লেখকরা সৃষ্টি নিয়ে কথা বলতে চান। সেন্সরশিপ সৃষ্টি বিরোধী। নেতিবাচক শক্তি, অসৃষ্টি, অসৃষ্টকে সৃষ্টি করা । Sir Tom Stoppard এর ভাষায় মৃত্যুর উপমাকে ব্যবহার করা যায় – ‘বর্তমানের অনুপস্থিতি’। সেন্সরশিপ হল যা আপনি করতে চান তা করা হতে আপনাকে বিরত রাখা । লেখকরা তারা যা করে তা নিয়ে কথা বলতে চায়, কিন্তু সে বিষয়টা নিয়ে নয় যা তাদেরকে তারা যা চায় তা করা হতে বিরত রাখে। লেখকরা নিজেরা কে কত পেল এ বিষয়ে কথা বলতে চায়, অন্য লেখকদের নিয়ে তারা গল্প করতে পছন্দ করে, তারা কত পেল, সমালোচক ও প্রকাশকদের নিয়ে অভিযোগ তুলে এবং রাজনীতিবিদদের নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে। তারা সে সব বিষয় নিয়ে কথা বলে যা তারা পছন্দ করে, যে সব লেখকদের তারা পছন্দ করে, সে সব গল্প এমনকি বাক্যগুলো যা তাদেরকে কিছু বুঝানোর জন্য ব্যবহার করা হয়েছে। সর্বোপরি তারা তাদের ধারনাগুলি এবং তাদের গল্পগুলি নিয়েই কথা বলতে চায়। তাদের এই বিষয়গুলো বৃটিশ হিউমরিস্ট Paul Jennings তার প্রতিভাদীপ্ত রচনা প্রতিরোধবাদ যা অস্তিত্ববাদের উপর একটা আঘাত, প্রস্তাব করেছিলেন, পৃথিবীটা দুইটা ক্যাটেগরিতে বিভক্ত : ‘বিষয়’ এবং ‘নৈ বিষয়’। তার মতে এ দুইয়ের মধ্যে এক অশেষ যুদ্ধ চলমান। যদি লেখালেখি ‘বিষয়’ হয়, তবে সেন্সরশিপ ‘নৈ বিষয়’। কিং লিয়ার যেমনটি করডেলিয়াকে বলেছিলেন, ‘ শুন্য থেকে শুন্যও হয়না’। অথবা মি. জেনিংস শেক্সপিয়ারকে একটু সংশোধন করতে পারতেন,’ ‘নৈ বিষয়’ হতে ‘নৈ বিষয়ও’ হয়না। বিষয়টি আবার ভেবে দেখা যায়।

যদি ইচ্ছে হয়, আপনি বাতাসের কথা ভাবতে পারেন । এটা আমাদের চার পাশেই আছে, প্রচুর, সহজপ্রাপ্য, জোরে শ্বাস নেয়ার মতো। হ্যাঁ, আমি জানি, এটা পুরোপুরি পরিষ্কার নয়, বিশুদ্ধও নয়। কিন্তু এটা ছাড়া অন্য কিছু নয়, প্রচুর, আমাদের সকলের জন্য অনেক এবং অনেক দেয়ার মতোও। যখন নিশ্বাস নেয়ার মতো বাতাস এত সহজে প্রাপ্য হয় এবং এত বেশি পরিমানে, এটা দাবি করা অনাবশ্যক যে নিশ্বাস নেয়ার মতো বাতাস সবাইকে দেয়া হবে, সবার প্রয়োজন অনুসারে।আপনার যা আছে তা আপনি সহজে দিতে পারেন বা দিতে অস্বীকার করতে পারেন। এটা নিয়ে হৈচৈ করার কিছু নেই। সহজপ্রাপ্য, সহজে গ্রহণযোগ্য বাতাসে আপনি সহজে নিশ্বাস নিতে পারেন এবং আপনার দিনটি শুরু করতে পারেন। এখানে বাতাস কোন বিষয় নয়। এটা এমন কোন বিষয় নয় যা নিয়ে আমরা সকলে আলোচনা করতে চাই।

এখন কল্পনা করুন। আপনি এমন কোথাও আছেন যেখানে রয়েছে দৈত্যাকার সব নল। যে বাতাসে আমরা নিশ্বাস নিই তা এসব নলের মধ্য দিয়েই আসে। গরম বাতাস, ঠান্ডা বাতাস এবং ঈষদুষ্ণ বাতাস। কোন এক স্বর্গীয় মিক্সার ইউনিট থেকে। কল্পনা করুন সেখানে আছেন এমন কেউ, যা আমাদের অজানা অথবা হতে পারে আমাদের খুব চেনা পরিচিত। কোন এক নির্দিষ্ট দিনে তিনি নলগুলো একটার পর একটা বন্ধ করতে শুরু করলেন। ফলে আমরা লক্ষ্য করতে শুরু করলাম; সহজপ্রাপ্য, নিশ্বাস যোগ্য ও বিনামুল্যের বাতাস ক্রমশ ফুরিয়ে আসছে। এমন এক সময় আসলো যখন আমরা ভারী ভারী শ্বাস নিতে শুরু করলাম এবং বাতাসের জন্য হাসফাস করতে লাগলাম । ঠিক এই সময়ে আমাদের অনেকেই প্রতিরোধ আন্দোলন শুরু করে দিয়েছে। বাতাস সাপ্লাইকে দায়ী করছে। সহজপ্রাপ্য, শ্বাসযোগ্য ও বিনামুল্যের বাতাসের জন্য জোরে শোরে যুক্তি তর্ক উপস্থাপন করছে। অভাব, আপনারা হয়তো বলবেন, চাহিদা তৈরী করছে।

স্বাধীনতা আমাদের নিশ্বাসের বাতাস এবং আমরা পৃথিবীর এমন একটা অংশে থাকি যেখানে যোগানটা খুবই অপর্যাপ্ত ও অসম। নুতুবা এটা বিনামুল্যে সহজপ্রাপ্য হত অন্তত আমাদের জন্য যারা মিয়ামীর হুড পরিহিত কাল যুবক নয়। এটা ব্যাপকভাবে শ্বাসযোগ্য হত যদি না অবশ্যই আমরা লাল রাজ্যগুলোর মহিলা হতাম যারা নিজেদের শরীরের জন্য কাউকে মুক্তভাবে পছন্দ করার চেষ্টা করছে। অসম্পূর্ণ মুক্তি, অসম্পূর্ণ শ্বাসযোগ্য বাতাস কিন্ত যখন এটা শ্বাসযোগ্য ও মুক্ত হয় তখন আমাদের গান বাধার কিংবা নাচের প্রয়োজন হয়না। আমরা এটাকে নিশ্চিতভাবে নিই, আমাদের দিন শুরু করি। এবং রাত্রে যখন আমরা ঘুমিয়ে পড়ি, আমরা ভাবি, আমরা আগামীকাল মুক্ত হব কারন আমরা আজ মুক্ত ছিলাম।

সৃষ্টিশীল কাজের কেবলমাত্র স্বাধীনতার প্রয়োজন হয়না, স্বাধীনতা সম্পর্কিত নিজস্ব ধারনারও প্রয়োজন হয় । যদি সৃষ্টিশীল লোকটা খুব চিন্তাগ্রস্ত থাকে যে, সে আগামীকাল মুক্ত হবে,তাহলে সে আজ মুক্ত হবেনা। যদি সে তার পছন্দের ফলাফল নিয়ে ভয়ার্ত থাকে অথবা এটা সম্পর্কে তার পদ্ধতি নিয়ে, তাহলে তার পছন্দটা নির্ধারিত হবে তার প্রতিভা দিয়ে নয়, তার ভয় দিয়ে। যদি আমাদের স্বাধীনতা নিয়ে আমরা আত্নবিশ্বাসী না হই, তবে আমরা কখনই স্বাধীন নই।

এর চেয়ে আরো খারাপ যে বিষয়টা; সেন্সরশিপ যখন শিল্পের ভেতরে অনাহুত প্রবেশ করে। এটাই তখন বিষয় হয়ে যায় এবং শিল্পটা হয়ে যায় ‘সেন্সরড শিল্প’। এভাবেই পৃথিবী এটাকে দেখে এবং বুঝতে চায়। সেন্সর শিল্পটাকে অনৈতিক,ধর্ম বিরোধী, যৌন, বিতর্কিত এসব আখ্যা দেয় এবং এই শব্দগুলি অভিশপ্ত মেরিনারের গলায় মৃত এলব্যট্রস এর মত সেন্সরড শিল্পের গলায় ঝুলে থাকে। শিল্পের উপর এই আঘাত শিল্পকে সংজ্ঞায়িত করার চেয়ে আরো বেশি কিছু করে। মুলত সাধারনের কাছে এটিই শিল্প হয়ে দাঁড়ায়।’ লেডি চ্যাটালিস লাভার’ ‘ট্রপিক অব ক্যপ্রিকন’ এর পাঠকদের মধ্যে , ‘ লাস্ট ট্যাংগো অব প্যারিস’ বা ‘এ ক্লক ওয়ার্ক অরেঞ্জ’ এর দর্শকদের মধ্যে দশ, শত কিংবা হাজার মানুষ আছে যারা মনে করে এই কাজগুলি মারাত্মক নোংরা বা মারাত্মক হিংস্র অথবা উভয়ই।

দোষের অনুমান নির্দোষের অনুমানস্থলে প্রতিস্থাপিত হয় । ভারতীয় মুসলিম শিল্পি হিন্দু দেবিকে কেন বস্ত্রহীন এঁকেছিলেন ? রাশিয়ান লেখক তার নায়ককে কেন যৌন আবেদনময়ী তুরুনীর প্রেমে পড়িয়েছিলেন? তিনি কি আইনগত ভাবে গ্রহণযোগ্য একটি সময় বেচে নিতে পারতেন না ? একজন বৃটিশ নাট্যকার কেন শিখ মন্দির গুরু দুয়ারার মধ্যে একটি যৌন সংঘর্ষকে চিত্রিত করেছিলেন? পবিত্র ভুমি থেকে এই দৃশ্য কি বাদ দেয়া যেতনা? শিল্পিরা কেন এত পীড়াদায়ক? তারা কি আমাদের সুন্দর নৈতিকতা নিদেন পক্ষে ভাল গল্প উপহার দিতে পারেনা ? ‘ আর সব লোকেরা বলে বসে পড়ুন, বসে পড়ুন। আপনি নৌকাকে নাড়াচ্ছেন। শয়তান আপনাকে টেনে নিচে নিয়ে যাবে। এরকম একটা ভারী আত্না নিয়ে আপনি কখনই ভেসে উঠতে পারবেননা । বসে পড়ুন, বসে পড়ুন, বসে পড়ুন, বসে পড়ুন। আপনি নৌকাকে নাড়াচ্ছেন।’ এসব সার্বিক প্রচেষ্টায় শিল্পির সত্যগুলি সেন্সরের মিথ্যা দ্বারা পুনঃস্থাপিত হয়। যা সেন্সর করা হয়েছে, ভাবা হয় যে তা সেন্সর করার উপযুক্ত ছিল। নৌকার নাড়ানির যেন প্রায়শ্চিত্ত হল।

মাঝেমাঝে মহান নিষিদ্ধ কাজগুলি সেন্সরের নির্দেশনা অমান্য করে। পৃথিবীতে নিজেদেরকে নির্ভয়ে প্রকাশ করে। ইউলিসেস, লোলিটা,আরব্য রজনী । মাঝেমাঝে সাহসী শিল্পিরা সেন্সরের নির্দেশ অমান্য করে গোপনে উৎকৃষ্ট সাহিত্য তৈরী করে। সোভিয়েত ইউনিয়নে Samizdat সাহিত্যের ক্ষেত্রে যা হয়েছে। অথবা সুক্ষ্মদর্শী চলচ্চিত্র তৈরী করা যা সেন্সরের চুরির ফলার নিচে ঝিমুতে থাকে। যেমন সমসাময়িক কিছু ইরানী ও চীনা ছবির ক্ষেত্রে যা হয়েছে। আপনি এমনও লোক পাবেন যারা এই যুক্তি দিবে যে সেন্সরশিপ শিল্পিদের জন্য ভাল কারন এটা তার কল্পনাকে প্রতিদ্ধন্ধীতার মুখোমুখি করে। এটা এমনই এক যুক্তি, যেমন আপনি কোন লোকের হাত কেটে ফেললেন তারপর তার প্রশংসা করলেন যখন সে দাতে কলম এটে লিখতে শুরু করল। সেন্সরশিপ শিল্প ও শিল্পী উভয়ের জন্য অধিকতর ক্ষতিকর । AI Weiwei এর কাজগুলু ঠিকে থাকবে ; শিল্পি নিজেরই ছিল এক চলমান কঠিন জীবন। অসন্তুষ্ট হয়ে অগাস্টাস সিজার কবি Ovid কে ব্ল্যাক সি তে নির্বাসনে দিয়েছিলেন। বাকি জীবনটা তাকে টমিস নামক ছোট এক নরক গর্তে কাটাতে হয় । কিন্তু Ovid এর কবিতা রোমান সাম্রাজ্যকে ছাড়িয়ে গেছে। কবি Osip Mandelstam স্ট্যালিনের শ্রম ক্যাম্পে মারা গিয়েছিলেন, কিন্তু তারঁ কবিতা ঠিকে আছে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে গেছে। কবি লোরকাকে ফ্রাঙ্কোর লোকেরা হত্যা করে কিন্তু তার কবিতা ফ্যাসিবাদী ফালাঞ্জকে ছাড়িয়ে গেছে। তাই সম্ভবত আমরা এই যুক্তি দিতে পারি যে, শিল্প সেন্সরের চেয়ও শক্তিশালী এবং যদিও প্রায়শই শিল্পিরা অরক্ষিত।

ইংল্যান্ডে PEN English প্রতিবাদ করে যে লন্ডন বইমেলা আমন্ত্রন জানায় কেবলমাত্র একদল আমলা আর চীন থেকে রাষ্ট্র মনোনীত লেখকদেরকে। যদিও চীনে ৩৫ জন লেখকের কারাবরণের খবর শুনা যায় যার মধ্যে আছে নোবেলবিজয়ী Liu Xiaobo এবং রাজনৈতিক ভিন্নমতাবলম্বী ও কবি Zhu Yufu । তারা এ ব্যাপারে নিশ্চুপ ও নির্লিপ্ত। মার্কিন যুক্তরাস্ট্রে ধর্মীয় উগ্রবাদীরা এতটাই স্পর্ধাপ্রবন যে, তারা Kurt Vonnegut ও J.K. Rowling এর মত সাহসী লেখকদের নিষিদ্ধ করতে চায়। সেখানে চার্লস ডারউইনের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া গুলি এখনও চলমান । আমি একবার লিখেছিলাম এবং এখনও সত্য বলে জানি , মার্কিন যুক্তরাস্ট্রের কিছু কিছু জায়গায় বির্বতন তত্বের ওপর আঘাত তত্বটাকে উলটো প্রমান করতে চায় যে যে প্রাকৃতিক নির্বাচন সব সময় কাজ করেনা অন্তত ‘কানসাসে’ এবং মানবজাতি পেছনে ফিরে যেতে সমর্থ এমনকি হারিয়ে যাওয়া সে সব যোগসুত্রের প্রতি।

‘নৌকা নাড়িওনা’ এই ধারনার ক্রমবর্ধমান গ্রহণযোগ্যতা শিল্পিদেরকে ( যারা এটা নাড়াতে চায়), বুঝাতে চায় যে, সেন্সরশিপ গ্রহণযোগ্য হতে পারে যখন কতিপয় স্বার্থবাদী গ্রুপ, জেন্ডারস বা বিশ্বাস কোন নির্দিষ্ট কাজের মাধ্যমে নিজেদেরকে প্রকাশ করে। মহৎ শিল্প অথবা আরো নমনিয়ভাবে বললে ‘প্রকৃত শিল্প’ কখনোই নিরাপদ মধ্যবর্তী জায়গায় সৃষ্টি হতে পারেনা, সৃষ্টি হয় প্রান্তে। প্রাকৃত খুবই ভয়ংকর, এটা প্রতিদ্ধন্ধিতা করে, প্রশ্ন করে। যে কোন অনুমানকে উলটে দেয়, নৈতিক মুল্যবোধগুলোকে ওলটপালট করে দেয়, পবিত্র গাভীদেরকে অসম্মান করে অথবা অন্য যে কোন সত্বাকে। এটা মর্মান্তিক , কুৎসিত অথবা ট্যাবলয়েড প্রেসের পছন্দনীয় ভাষায় ‘বিতর্কিত’। যদি আমরা স্বাধীনতায় বিশ্বাস করি, যদি আমরা চাই যে বাতাস আমরা গ্রহন করি তা প্রচুর ও শ্বাসযোগ্য হবে, এই সেই শিল্প যার ঠিকে থাকার অধিকারকে আমাদের শুধু রক্ষা করলে হবেনা, উদযাপন করতে হবে। শিল্প কখনওই বিনোদন নয়, এটা তার চুড়ান্ত রুপে একটা বিপ্লব।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

69 − = 60