বাঙালির জাতীয়তাবাদী ধারার বিবর্তন (প্রথম পর্ব)

মুক্তিযুদ্ধ আমাদেরকে কতটা মুক্তি দিয়েছে বা স্বাধীনতা আমাদেরকে কতখানি স্বাধীন করেছে – এই প্রশ্ন উত্থাপন এবং তার উত্তর অনুসন্ধান আজ খুব জরুরি হয়ে উঠেছে।সেইসাথে আরেকটা প্রাসঙ্গিক প্রশ্নও চলে আসে। মুক্তি বা স্বাধীনতা বলতে আমরা কী বুঝেছিলাম তখন?এই দুই প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধান করতে নেমে আরো অনেক প্রশ্নের ভিড়ে হারিয়ে গেছি বারবার যদিও একটা দিশা ঠিক করে নিয়েছিলাম শুরুতেই। ইতিহাসে একদা বাঙালির স্বদেশের নাম ডাকা হতো বাংলা দেশ। তারপর একসময় ছিল পূর্ব বঙ্গ,অতপর পূর্ব পাকিস্তান, তৎপর পূর্ব বাংলা। এই অঞ্চলের নামকরণ পূর্ব বাংলা যখন করা হয় তখনও কিন্তু রাষ্ট্রটার নাম ছিলো পাকিস্তান। সেই পাকিস্তান রাষ্ট্রটাকে কেন ভেঙে বাংলাভাষী অঞ্চলকে নিয়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্র বানাতে হল সেই প্রশ্নের উত্তরের নিরিখেই বিচার করতে হবে আমরা এখন কতটা স্বাধীন আর মুক্ত। এই দিশাতে চক্ষুস্থির করে যখন একইসাথে পড়া ও লেখা এগিয়ে যাচ্ছি তখন নতুন একটা বিষয় আবিষ্কার করলাম। জাতীয়তাবাদের বিশেষ করে পূর্ববঙ্গের বাঙালি /বাঙালি মুসলমানের জাতীয়তাবাদের ধরণ পাল্টে যাচ্ছে। কতটা স্বাধীন বা মুক্ত হয়েছি সেটা হয়তো শুকনো খড়খড়ে অর্থনৈতিক হিসাব কিতাব এবং পরিসংখ্যান দিয়ে অনেকটা মাপা যাবে। কিন্তুু পরিসংখ্যান এবং অর্থনৈতিক ডেটা ডকুমেন্ট ব্যবহারে আমার ঈর্ষণীয় অপারগতা এবং ক্ষমার অযোগ্য অনীহার দরুণ ওইপথে গেলাম না। তার বদলে যে পথে গেলাম সেইপথেও একটু ভিন্নভাবে প্রবন্ধের শুরুতে উল্লেখিত প্রশ্নদ্বয়ের আংশিক উত্তর পাওয়া সম্ভব বলে মনে করছি।

একটা বিষয় এখানে উল্লেখ করা দরকার।বর্তমানের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতায় অতীতের ঘটনাবলীর বা ইতিহাসের পুনর্মূল্যায়ন এবং পুনর্লেখন হয়। ইতিহাসের ঘটনা বদলানো যায়না কিন্তুু পরবর্তীকালের বাস্তবতা এবং জ্ঞানের আলোকে ইতিহাসের ব্যাখ্যা বদলায়। এ কারনেই ইতিহাস বারবার লেখা হয়। এ কারনেই ইতিহাস বর্তমানের প্রয়োজনের অনুগত। (আহমেদ কামাল :২০০১) সুতরাং ১৭ সালে দাড়িয়ে ৭১ সালকে একটা মানদন্ড হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে একাত্তর পূর্ববর্তী ও পরবর্তী ইতিহাসের ভেতর একটা বিশেষ কিছু অনুসন্ধান করাটা আমার স্পর্ধার প্রকাশ হলেও অপরাধের প্রকাশ বলে গন্য হবেনা আশা করি।

ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাস এবং আমাদের মুক্তিযুদ্ধের উপর লেখা কয়েকহাজার বই নিশ্চয়ই বাজারে আছে। সেসব বইয়ের দু একটা পড়েনি এমন লোক বিরল।এখানে বলে রাখা প্রয়োজন যে ভারতভাগের দায় কার কতটুকু সেই ইতিহাসের বিচার এই নিবন্ধের বিষয় নয়। আমি শুধু বাঙালির জাতীয়তাবাদী ভাবধারার বিবর্তনের সাথে সম্পর্কিত ইস্যুগুলোই বিচার করবো। আমরা প্রায় সবাই জানি যে মুসলমানিত্বের ইমানি যোশে পাকিস্তানের পক্ষে পূর্ব বাংলার নব্বই শতাংশ লোক রায় দিয়ে সাধের পাকিস্তান কায়েম করেছিলো। কায়েম করে ভেবেছিলো, ভারতবর্ষে হিন্দু জমিদার আর ব্রিটিশদের যৌথ ষড়যন্ত্রে মুসলমানেরা যেমন বিপুলভাবে নিগৃহীত ও বঞ্চিত হচ্ছিল, এই পাকিস্তান রাষ্ট্রে সেসবের অবসান হবে এবং বাঙালি মুসলমানেরা বস্তুগত উন্নয়নের সিড়ি বেয়ে তরতর করে সফলতা ও সার্থকতার শীর্ষে পৌঁছে যাবে। আমার মনে হয় ভারতভাগ পর্যায়ে বাঙালি মুসলমান স্বাধীনতা বলতে ভারতীয় হিন্দুদের আধিপত্য এবং সংস্পর্শ থেকে রেহাই পাওয়াকেই বুঝেছিলো।স্বাধীনতা সম্পর্কে তাদের ধারণা ছিলো এমনই সংকীর্ণ। সংকীর্ণ বলছি এই কারনে যে জাতীয়তাবাদের এশিয় প্রকরণ অনুযায়ী বাঙালির(এবং সমগ্র ভারতবর্ষের) জাতীয়তাবাদী চিন্তার মূলস্রোত প্রবাহিত হওয়া উচিত ছিল সাম্রাজ্যবাদ এবং উপনিবেশবাদ বিরোধীতার অভিমুখে । সেই হিসেবে সমগ্র ভারতবর্ষের মধ্যবিত্ত শ্রেণী বা বুর্জোয়া এবং সাধারণ জনসমষ্টির অভিন্ন শত্রু ছিল ঔপনিবেশিক শাসক শ্রেণী অর্থাৎ ব্রিটিশ শাসন। সুতরাং ভারতবর্ষের প্রাথমিক লক্ষ্য হওয়ার কথা ছিল ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্তি অর্জন এবং সেই উদ্দেশ্যে জাতি ধর্ম নির্বিশেষে একটা সর্বভারতীয় জাতীয়তাবাদ গড়ে তোলা। অনেকেই বলবেন যে ভারত এক জাতি নয় ;বহু জাতি।আমি মনে করি তাতে সর্বভারতীয় জাতীয়তাবাদ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সমস্যা হওয়ার কথা নয়। কারণ জাতি জিনিসটা খুব কনক্রিট কিছু নয়। এটা অনেকটা কাল্পনিক : “it(nation) is an imagined political community – – and imagined as both inherently limited and sovereign.” (Benedict Anderson) এবং Nation lives in the minds of the people. জাতীয়তাবাদের শিকড় এক গভীর জীবনধর্মী আবেগে,যা মানুষকে ব্যক্তিগত বা সম্প্রদায়গত ক্ষুদ্রতর স্বার্থবোধের গণ্ডি ছাড়িয়ে এক বৃহত্তর পরিচয়ের অংশীদার করে। মূল্যবোধের দিক থেকে এই উত্তরণ বোধহয় জাতীয়তাবাদের সপক্ষে প্রধান যুক্তি-যতক্ষণ এই বৃহত্তর পরিচয় আগ্রাসী রূপ পরিগ্রহ না করে।(তপন রায়চৌধুরী)

একটা বৃহত্তর জাতীয়তাবাদের ভেতরেই অনেকগুলো উপ-জাতীয়তাবাদ(sub-nationalism) থাকতে পারে। সেইভাবে ভারতবর্ষে অনেকগুলো উপ-জাতীয়তাবাদ এবং একটি সর্বভারতীয় জাতীয়তাবাদ একইসাথে বিরাজমান থাকা তাত্ত্বিকভাবে সম্ভব ছিল, ঠিক যেভাবে আজো ভারত টিকে আছে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে ব্রিটিশদের ডিভাইড এ্যান্ড রুল পলিসি, ভারতের হিন্দু মুসলমান উভয়েই তার সহজ শিকারে পরিণত হওয়া, মুসলমানদের ধর্মীয় বিচ্ছিন্নতাবাদ এবং পরিণতিতে হিন্দুত্ববাদের উত্থান এবং সর্বোপরি আগেভাগেই অভিন্ন শত্রু হিসেবে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদকে চিহ্নিত করতে না পারা ভারতবর্ষকে একত্রিত এবং অখন্ড রাখাকে অসম্ভব করে তোলে। এবং তার দুঃখজনক এবং রক্তক্ষয়ী পরিণতি হলো দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ভারতভাগ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পাঁচ বছরের মধ্যেই এশিয়াতে যে নয়টির মতো স্বাধীন দেশ জন্ম নেয় ভারত ও পাকিস্তান তাদের অন্যতম দুটো দেশ।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 4 = 1