যে কবিতা ধর্মের অনুভুতিতে আঘাত করে


প্রায় শুনে থাকি মৌলবাদীদের নাকি কোন ধর্ম থাকে না। ব্যাপারটি আসলে ভুল। মৌলবাদীদের অবশ্যই ধর্ম থাকে। সেটা হয় মুসলমান, হিন্দু বা খ্রিষ্টান নয়তো অন্য কোন ধর্ম। বরং বলা উচিৎ ধর্ম ভেদে মৌলবাদীদের আচরণের কোন পার্থক্য নেই। আমারা সারা বিশ্বে মুসলিম মৌলবাদীদের কর্মকাণ্ড দেখতে দেখতে ক্লান্ত। সেই ক্লান্তির মাঝে প্রায় হিন্দু মৌলবাদীদের কর্মকাণ্ড আমাদের আরো ক্লান্ত করে তোলে। বর্ণবাদ, সস্তা ধর্মীয় অনুভূতি, নারী নির্যাতনের মত কর্মকাণ্ড ও আচরণগুলো এখনও হিন্দু সমাজে বেশ ভাল ভাবে চর্চা হচ্ছে।

সমস্যা হল সেই সকল সমস্যা নিয়ে প্রগতিশীলরা কথা বলতে গেলেই হিন্দু মৌলবাদীরা মুসলমান মৌলবাদীদের মত অনলাইনে তেড়ে আসেন। সারা বছর মুসলমান মৌলবাদীদের সমালোচনার পর আপনি যদি শুধু একটি বার হিন্দু ধর্মের সমালোচনা করেন তবে আপনি সাথে সাথে হয়ে যাবে মুমিন মুসলমান! আশ্চর্য হলেও সত্যি যে, সে সকল হিন্দু মানুষ ইসলাম ধর্মের সমালোচনার জন্য কাল পর্যন্ত প্রকাশ্যে বা ইনবক্সে আপনার প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিল, আপনাকে বাহবার বন্যায় ভাসিয়ে দিয়েছিল তারাই হিন্দু ধর্মের সমালোচনার সাথে সাথে আপনাকে পাকিস্থান বা ইসলাম প্রেমী বানিয়ে দেবে। এক মুহূর্তে মধ্যে আপনাকে ইসলাম বা পাকিস্তানের দালাল ট্যাগ লাগিয়ে দেবে। ঠিক যেমন করেন উগ্রবাদী মুসলমানরা। ইসলামের বিরুদ্ধে কথা বলেই হিন্দু ট্যাগ লাগিয়ে দেওয়া হয়।

এছাড়া হিন্দু নাস্তিক বা ছুপা ছাগু নামের কিছু বিশেষণ ব্লগ, ফেসবুক ইত্যাদি মাধ্যমে প্রচলিত আছে। এরা আপনার সাথে মিশবে অবিশ্বাসী বা প্রগতিশীলতার বেশ ধরে। কিন্তু তাদের সেই অবিশ্বাস বা প্রগতি শুধুমাত্র ইসলামের সমালোচনার মাঝে সীমাবদ্ধ। হিন্দু ধর্মের নামে কিছু বলেই তাদের প্রগতি চুকে বুকে যায়। ঝাঁপিয়ে পড়ে ঠিক মুসলিম মৌলবাদীদের মত। মামলা, হামলা। হাঙ্গামা কিছুই বাদ যায় না তখন।

সাম্প্রতি কবি শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায় নামে মামলা ঠুকে দিয়েছে হিন্দু মৌলবাদীরা। তার “অভিশাপ” নামক কবিতা হিন্দুবাদীদের হিন্দুত্ব টেনে নামিয়ে এনেছে। ফলাফল বাংলাদেশের ৫৭ ধারার মত তার বিরুদ্ধে এফআইআর মামলা দায়ের করা হয়েছে। শ্রীজাত কবিতাটি লেখেন মুলত, উত্তরপ্রদেশে বিধানসভা ভোটের ফল এবং যোগী আদিত্যনাথের মুখ্যমন্ত্রী হওয়া প্রসঙ্গে।

যোগী আদিত্যনাথের বিরুদ্ধে ধর্মীয় মৌলবাদের অভিযোগ প্রায় পত্রিকা মারফত আমারা দেখি। কট্টর হিন্দুত্ববাদী অবস্থান এবং মুসলমান বিরোধী মন্তব্যের জন্য পরিচিত।

বিভিন্ন সময় তিনি বিভিন্ন মন্তব্য বিতর্কিত করেছেন মুসলমানদের বিরুদ্ধে। গতবছর জুন মাসেও রামমন্দিরের প্রসঙ্গে বলেছিলেন, “যেখানে অযোধ্যার বিতর্কিত স্থাপনা ভেঙ্গে ফেলার থেকে কেউ আটকাতে পারে নি, তো মন্দির তৈরি করা কে আটকাবে।”

এছারাও বিভিন্ন মন্তব্যের পাশাপাশি সবচেয়ে বিতর্কিত যে মন্তব্যটি করেছিল তা হলো, “যদি অনুমতি পাই তাহলে দেশের প্রত্যেকটা মসজিদে গৌরী-গণেশের মূর্তি স্থাপন করে দেব। আর্যাবর্তে আর্যরা তৈরি হয়েছিলেন, হিন্দুস্তানে আমরা হিন্দু করে দেব। পুরো পৃথিবীতে গেরুয়া ঝাণ্ডা উড়বে।

তখন কিন্তু কোন মামলা হাঙ্গামায় পরেনি বর্তমান উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী।
বরং তাকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত ও মুখ্যমন্ত্রী বানিয়েছে উত্তর প্রদেশের ধর্মান্ধ জনগন।

শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়ের “অভিশাপ” কবিতার শেষ দুটো লাইন ছিল,

“আমাকে ধর্ষণ করবে যদ্দিন কবর থেকে তুলে –
কন্ডোম পরানো থাকবে, তোমার ওই ধর্মের ত্রিশূলে !”

যা হিন্দু ধর্মবাদীদের ধর্মীয় অনুভুতিতে আঘাত করেছে। এছাড়া তিনি তার কবিতায় লিখেছেন,

“সময়ে ওষুধ, নইলে বেড়ে যায় সবরকম রোগই
ভিখ পেতে পেতে তুমি রাজা হয়ে ওঠো, গেঁয়ো যোগী।”

আসলেই তাই, সঠিক সময় ধর্মান্ধতা নামক রোগের বিরুদ্ধে ঔষধ না পড়লে একটি প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী হয়ে ওঠে ধর্মান্ধ যোগীরা।

ধর্মের বিরুদ্ধে আঘাত করাই তো একজন প্রগতিশীল লেখকের লক্ষ্য। শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়ও তাই আঘাত করেছে কট্ট হিন্দুত্ববাদকে। ঠিক যেমন করেছিলেন, অভিজিৎ রায় কে কুপিয়ে হত্যা করার পর। অভিজিৎ রায়কে যখন মুসলমান জঙ্গিরা হত্যা করে তখন শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায় ২৬টি কবিতার ‘অন্ধকার লেখাগুচ্ছ’ নামের একটি সিরিজ লিখেছিলেন। মজার ব্যাপার তখন তার নামে হিন্দু মৌলবাদের সমর্থন খুঁজেছেন একদল মানুষ!
কিন্তু কবিতার মধ্যে ছিল সন্ত্রাস, মৌলবাদ-বিরোধী প্রতিবাদী। এই কবিতার হাত ধরেই পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের বাঙালিরা পরস্পরের হাত ধরেছেন। সেই পোস্টের হাজার হাজার লাইক, শয়ে শয়ে শেয়ার।

সেই সময় শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা যারা প্রশংসা করেছিলেন, বাহবা দিয়েছিলেন, তাদের অনেকেই আজ তার বিরুদ্ধে কথা বলছেন। শুধুমাত্র কারন কবিতাটি গিয়েছে হিন্দুবাদের বিপক্ষে। এরাই আসলে সেই মুখোশধারী ছুপা প্রগতিশীল!

আজ বিশ্ব কবিতা দিবস, আর সেই দিনে শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে মামলার খবরটি আমাদের কাছে আসলো। শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবিতার মত সকল প্রগতিশীল ও অবিশ্বাসী মানুষ প্রতিবাদ করুক ধর্মের বিরুদ্ধে। নিচে শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়ের “অভিশাপ” কবিতাটি দিয়ে শেষ করছি।

অভিশাপ
সময়ে ওষুধ, নইলে বেড়ে যায় সবরকম রোগই
ভিখ পেতে পেতে তুমি রাজা হয়ে ওঠো, গেঁয়ো যোগী।
উঠেই নির্দেশ দাও, ধর্মের তলব দিকে দিকে
মৃগয়ায় খুঁজে ফেরো অন্য কোনও ধর্মের নারীকে।
যে–হরিণ মৃত, তারও মাংসে তুমি চাও অধিকার
এমন রাজত্বে মৃত্যু সহজে তো হবে না তোমার।
বাতাসে হাপর নামে, দেশ জুড়ে অধর্মের ছাই…
প্রতি নির্বাচনে আমরা শতাব্দীপিছনে ফিরে যাই।
যেখানে পুরুষধর্ম ধর্ম-পুরুষের অন্য নাম
আর আমি নারীর মৃত্যু পার করেও শিকার হলাম।
আমাকে ধর্ষণ করবে যদ্দিন কবর থেকে তুলে –
কন্ডোম পরানো থাকবে, তোমার ওই ধর্মের ত্রিশূলে !

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

23 − 16 =