সুযোগ সন্ধানী জিয়া ছিলেন শেখ মুজিবের স্বাধীনতা ঘোষণার একজন পাঠক মাত্র

১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ছিল একটি গণযুদ্ধ এটি কোন সামরিক যুদ্ধ ছিল না। সুতরাং সামরিক সামরিক অভ্যুত্থানের কোন প্রশ্নই উঠে না।

এ প্রসঙ্গে তৎকালীন ক্যাপ্টেন রফিকের বক্তব্য হলো, “বস্তুতঃ সেদিন আমাদের হাতে কোন বেতার কেন্দ্র না থাকলেও ইতিহাস তার আপন গতিতে চলতো। সমগ্র দেশের বাঙ্গালিরা তখন পাকিস্তানের বিরুদ্ধে লরাই শুরু করেছে। চট্টগ্রামে ২৫ শে মার্চ ৮ টা ৩০ মিনিটে আমরা যুদ্ধ শুরু করি। পাকিস্তানিরা রাত ৮ টা ৪৫ মিনিটে গণহত্যা শুরু করে এবং ২৬ শে মার্চ থেকেই দেশের বাকী অংশে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিরোধ গড়ে উঠে। জনগণের প্রতিরোধ সংগ্রাম শুরু হওয়ার পরই চট্টগ্রাম থেকে বেতার ঘোষণা প্রচার করা হয়”।

মুলত যুদ্ধটি শুরু হয়েছে বেতার ঘোষণার বহু পূর্বেই। বলা চলে বেতারের ঘোষণা শুনে জনগণ যুদ্ধে ঝাপিয়ে পরে বলে যারা বলেন তারা মুলতঃ বাঙ্গালির দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আন্দোলন, বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন সবকিছু অস্বীকার করার অপচেষ্টা থেকে এসব কথা বলে থাকেন।

ইতিহাসের ঘটনাবলী প্রমাণ করে যে, জনগণ ১৯৫২, ১৯৬২, ১৯৬৬, ১৯৬৯ এবং ১৯৭০ সাল পর্যন্ত ধাপে ধাপে বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনায় ১৯৭১ সালের মার্চের প্রথম তারিখ থেকেই স্বাধীনতার জন্য পুরোপুরিভাবে প্রস্তুত ছিল। জাতীয় পতাকা উত্তোলন, স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ, স্বাধীন বাংলার পতকা নিয়ে মিছিল, প্রকাশ্যে ট্রেনিং গ্রহন ইত্যাদি কর্মকাণ্ড জনযুদ্ধকে যুদ্ধের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত করে।

বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণের পর জনগণ তাদের করনীয় নির্ধারণ করে। ২৫ মার্চ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর প্রতিটি ভাষণে পাকিস্তানি হানাদারদের দ্বারা আক্রান্ত হলে কি করতে হবে তার নির্দেশনা পেতে থাকে জনতা। সেই নির্দেশনা অনুযায়ী ২৫ শে মার্চ হানাদারদের আক্রমণের পর সমগ্র বাংলাদেশ একত্রে গর্জে উঠে। গড়ে তুলে সর্বাত্মক প্রতিরোধ, শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ।

বঙ্গবন্ধুর ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর বাসা থেকে প্রেরিত ঘোষণা মগবাজার ওয়ারলেস কেন্দ্রের মাধ্যমে বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে। যেখানে ঘোষণা পৌঁছে নি সেখানকার জনগণ যে বসে ছিল তা নয়। দেশের বিভিন্ন জেলার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে তা স্পষ্ট বেড়িয়ে আসে।

প্রসঙ্গত চট্টগ্রামের ব্যাপারে ভিন্ন ঘটনা ঘটে। ২৫ শে সন্ধ্যা ৭ টায় চট্টগ্রামে বঙ্গবন্ধুর টেলিফোন পেয়ে মেজর রফিক রাত ৮ টা ৩০ মিনিট থেকে হানাদারদের উপর আক্রমন করে ৩০০ শতেরও বেশী হানাদারদের হত্যা করে চট্টগ্রাম শহরের নিয়ন্ত্রন নিয়ে নেন। যুদ্ধের কারনে ক্যাপ্টেন রফিক বেতারে যেতে পারেননি। রাজনৈতিক নেতারা বেতারে ঘোষণা দিয়ে যুদ্ধ সংগঠনে চলে গেছেন। ছাত্ররা বেতারে ঘোষণা দিয়ে যুদ্ধের কাজে চলে গেছেন। বেতারের কর্মীরা বেতারে ছিলেন যা ছিল তাদের দায়িত্ব।

বেতার কর্মীদের কাছে বেতারের দায়িত্ব ছেড়ে না দিয়ে মেজর জিয়া রাজনৈতিক নেতাদের অনুরোধে সেই যে বেতার কেন্দ্রে গেলেন সেখান থেকে আর ফেরত আসতে চাননি। সৈনিক হিসেবে তিনি ও তার সাথীরা শহরের মাথে যুদ্ধ না করে বেতার কেন্দ্রে পড়ে ছিলেন যা ছিল রীতিমত অবাক করার মত একটি বিষয়। যুদ্ধের শুরুতে সেনানিবাসে বঙ্গবন্ধুর নামে শপথ নিয়ে বিদ্রোহ ঘোষণা করে তিনি শহরে হানাদারদের না ঠেকিয়ে চলে গেলেন বোয়ালখালীতে। যুদ্ধের দিক বিবেচনায় একেবারেই গুরুত্বহীন একটি স্থান কালুরঘাটে দুধরষ বেঙ্গল রেজিমেন্টকে বসিয়ে রাখলেন ১১ই এপ্রিল পর্যন্ত।

অথচ তিনি এটা ন করে বেতারকেন্দ্রিক না হয়ে যদি শহরে ক্যাপ্টেন রফিকের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িত হতেন অথবা ক্যান্টনমেন্টে আক্রমন করতেন তাহলে সত্যিকারের মুক্তিযোদ্ধার পরিচয় দিতেন। তিনি তাতো করেনই নি উল্টো কক্সবাজার, রাঙ্গামাটি, বান্দরবন থেকে আসা ইপিআরদের কালুরঘাটে বসিয়ে রেখেছেন এবং কালুরঘাটে যুদ্ধের বহুপূর্বে ৮ এপ্রিল (কালুরঘাটে যুদ্ধ শুরু হয়েছিলো ১১ই এপ্রিল) তিনি ছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তেলিয়াপাড়াতে সামরিক অফিসারদের সঙ্গে বৈঠকে। অথচ বাস্তবতা হচ্ছে ক্যাপ্টেন রকিক ২৫শে মার্চ রাত ৮ টা ৩০ মিনিট থেকে ৯ টার মধ্যেই হানাদারদের উপর আক্রমন শুরু করেছিলেন।

“সমরবিদদের উচিত এ ব্যাপারটি বিচার-বিশ্লেষণ করে তাদের মূল্যবান মতামত দেওয়া। তবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আমি বলতে পারি মেজর জিয়া জেড ফোর্স এর অধিনায়ক হিসেবে কিছু যুদ্ধে নেতৃত্ব দিলেও যুদ্ধের শুরুতে চট্টগ্রামে তিনি কাপুরুষতার পরিচয় দিয়েছেন। বলা চলে যুদ্ধের মাঠ থেকে তিনি পালিয়ে বেড়িয়েছেন এবং সৈনিক হিসেবে দীর্ঘ সময় বেতারে অবস্থান নিয়েছেন যা প্রকৃতপক্ষে উনার কাজ ছিল না। যাই হোক, সর্বস্থরের জনগণ বিশেষ করে সামরিক-বেসামরিক লোকজন যারা দোদুল্যমান ছিল তারা সর্বস্থরের যুদ্ধ শুরুর ব্যাপারে নিশ্চিত হয়েছেন। চট্টগ্রাম বেতারের প্রাথমিক কৃতিত্ব এখানেই”।(সুত্রঃ বীর মুক্তিযোদ্ধা ডাঃ মাহফুজুর রহমান, ধানমণ্ডি থেকে বাংলাদেশ, পৃষ্ঠা ৩২)

যাই হোক, প্রসঙ্গত অল্প কথায় আলোকপাত করতে হয় যে, রাজনীতিবিদদের অনুরোধে সেনা অফিসার হিসেবে ২৭ মার্চ রাত ৭ টায় মেজয় জিয়া বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করেন। ঠিক আড়াই ঘণ্টা পরে রাত ৯তা ৩০ মিনিটে তিনি আবার হঠাৎ বেতারে কেন্দ্রে আসেন তখন মাত্র দুইজন বেতারকর্মী ছিলেন এবং সেই সুযোগে অর্বাচীনের মত নিজেকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে আবার ঘোষণাপত্রটি পাঠ করেন।

পরদিন ২৮ মার্চ স্থানীয় রাজনীতিবিদরা এ বিষয়টি জানাজানির পর তাদের মধ্যে প্রচণ্ড প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। এ প্রসঙ্গে তৎকালীন চট্টগ্রাম জেলার ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সাধারন সম্পাদক সাবের আহমেদ আসগরী বলেন, “জিয়া ২৭ মার্চ ৯ টা ৩০ মিনিটে সুযোগে না বুঝে নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণার পরপরই ২৮ মার্চ এম এ হান্নান সাহেব আমাকে ডেকে নির্দেশ দেন, অনতিবিলম্বে মেজর জিয়ার সাথে যোগাযোগ করতে। মেজর জিয়ার কাছে যাওয়ার পথে কালুরঘাটে একস্থানে তার সাথে দেখা হয় আমি দৃঢ়টার সাথে জানিয়ে দিই অবিলম্বে আপনার গতরাতের আপত্তিকর ঘোষণা বদলাতে হবে। নাহলে আমরা অন্য সেনা অফিসার দিয়ে নতুন করে ঘোষণা পাঠ করাবো। জিয়া খনিক চিন্তা করে বেতারের দিকে চলে যান”।

অষ্টম অধিবেশন-২৮ মার্চ ২ টার পর মেজর জিয়া আবার বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করে বিভ্রান্তির অবসান ঘটান। এ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন, বেলাল মোহাম্মদ, অধ্যাপক তমজিদা বেগম, ওসমান গনি, লে. শমসের মবিন, ক্যাপ্টেন নাসির প্রমুখ। এরপর বেতারে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে জিয়া স্বাধীনতা ঘোষণাপত্রের পাঠ বার বার প্রচারিত করা হয়। সম্ভবত মেজর জিয়া খুব ভালভাবেই অনুধাবন করেছিলেন যে, জন প্রতিনিধিদের বক্তব্য না মানা হলে যুদ্ধের ক্ষতি হবে এবং এ যুদ্ধ হচ্ছে জনযুদ্ধ। সেনাবাহিনীর একার কোন যুদ্ধ নয়। পরবর্তীতে বিদ্রোহ এবং গণযুদ্ধ যে এক নয় তা তিনি বুঝতে পেরেছিলেন।

কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রে স্বাধীনতার কোন ঘোষণা দেওয়া হয়নি, বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণার প্রচার করা হয়েছে মাত্র। এই ঘোষণায় অংশ নিয়েছেন রাজনীতিবিদগণ, বেতার কর্মীরা, ছাত্র ও সেনাবাহিনীর বাঙালি প্রতিনিধিরা যা শুরুতেই প্রমাণ করে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ছিল একটি জনযুদ্ধ।

১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ এবিসি নিউজে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার খবর- https://www.youtube.com/watch?v=0tQk4r0FtmY&feature=share

অবশেষে, সকল বিতর্কের অবসান ঘটিয়ে, তথ্য, উপাত্ত এবং যাবতীয় সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে ২০০৯ সালের ২১ জুন হাই কোর্টের দেওয়া এক রায় অনুযায়ী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক। এ নিয়ে যারা ইতিহাস বিকৃতি করেছে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যাবস্থা নিতে বলা হয়েছে তৎকালীন এই রায়ে। এই ঐতিহাসিক রায় সত্ত্বেও বিএনপি-জামায়াত জোট এখনও দেশে-বিদেশে পুরোদমে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি করার অপপ্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে।

লেখকঃ খোরশেদ আলম, বিশিষ্ট কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিষয়ক গবেষক, বাংলাদেশ প্রেস
ই-মেইলঃ [email protected]

তথ্যসূত্রঃ
১) বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ- দলিল খণ্ডঃ ১৫
২) স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্রঃ অধ্যাপক ডাঃ এম সুলতানুল আলম, ২০১১ সাল
৩) বাঙালি জাতীয়তাবাদী সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রাম। ডাঃ মাহফুজুর রহমান, বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধ গবেষণা কেন্দ্র, চট্টগ্রাম। প্রথম প্রকাশ, মার্চ ১৯৯৩

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

9 + 1 =