ফাগুনের আগমন

আজো স্কুলে ভর্তি হয়নি। মাস তিন-চারেক হলো বাবা সাগরে মাছ মারতে গিয়েছেন। সাগর থেকে ফিরেই আমাকে স্কুলে ভর্তি করানোর কথা।বাবার ফিরে আসার দিন পেরিয়ে গেল। বাবার সমসাময়িক রওনা দেওয়া অন্যান্য ট্রলারগুলো হাসিমুখে ফিরে এসেছে।কিন্তু বাবার কোনো আলামতই পেলাম না। মায়ের কপালে ভাঁজ পড়েছে। ইদানীং জলদাশ পাড়ার চায়ের দোকানে এটিই আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে উঠেছে।

মা,বাবা আসবেনা?কখন আসবে?বড় বড় মাছ আনবে তো?-এসব নিত্যনৈমিত্তিক প্রশ্ন শুনলে ঝরে পড়া শুষ্ক ফুলের মতো মায়ের চেহারা শুকিয়ে আসে।এসব প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে গিয়ে মা রীতিমত হিমশিম খান।

চৈত্রের প্রহর শেষে আলোয় রাঙা মধ্যাহ্ন। বাড়ির পার্শ্ববর্তী সুপারি বাগানে চটের বস্তা বিছিয়ে কয়েক বন্ধু মিলে খেলা করছি।রেইনট্রি গাছের শেকড়ে বসে মা উপভোগ করছেন।হঠাৎ তড়িৎ গতিতে গোকুলের মা দৌড়ে এসে মাকে বলে গেলেন, রাস্তাঘাটে মানুষেরা বলাবলি করছে;বাবুল নাকি আরেকটা বিয়ে করে নিরুদ্দেশ হয়েছে।আমার কর্ণকুহরে কথাটি পৌঁছলেও আমি না শোনার ভান করে থাকছি।মায়ের অট্টহাসি দেখে অনুমান করা যায় মা তা মোটেও আমলে নেননি।

প্রাতের খাবার খেয়ে বারান্দায় পাটি বিছিয়ে শুয়ে পড়লাম।মা মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে আমতা আমতা করে কী যেন বলতে চেয়ে অশ্রু ছেড়ে দিলেন।সেদিন আর কিছু বলেন নি।এভাবে হাসি কান্নায় আরো মাস ছয়েক গত হলো।

পাড়ায় বাদুড় গণা এসেছে।উৎসুক জনতা চারিদিকে ভিড় করে আছে।একেকজন করে গণছেন।এবার মায়ের পালা।মা দুটি কাঁটি নিয়ে ‘একটিতে স্বামী বেঁচে আছে অন্যটিতে স্বামী মারা গেছেন’ মনে মনে ধরে বাদুড়কে দিলেন।বাদুড় স্বামী মারা যাওয়া মনে মনে ধরা দিত্বীয় কাঁটিটি বারবার তুলছে।সেখানেই মা অজ্ঞান হয়ে গেলেন।হুঁশ ফিরে পাবার পর থেকে কয়েক ঘন্টা মায়ের আঁখিযুগলের শ্রাবণের ধারা বন্ধ হতে দেখিনি।ঘটনা খুলে বলার পর উপস্থিত সবাই অভয় দিল।ওই ঘটনার চাইতে মায়ের অবিরত কান্না দেখে আমার হৃদয় আরো ভারী হয়ে উঠেছে।চোখে গুমোট আকাশ দেখছি।বারো মাসের গন্ডি পেরিয়ে বছরে পদার্পণ করার পর মা আর বাবা ফেরার স্বপ্ন দেখতেন না।মায়ের শরীরে রং বেরঙের শাড়ি এখন শোভা পায় না।সাদা শাড়ি পরা শুরু করলেন।রঙিন শাড়ির তুলনায় সাদা শাড়ি মাকে ভরা পূর্ণিমায় দুগ্ধের অনুরুপ জ্যোৎস্না ঢালার মতো মনে হতো!

স্কুল কলেজের গন্ডি পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছি। শৈশবের স্মৃতি বরাবরই হৃদয়কে আন্দোলিত করে তোলে।গত কিছুদিন আগে বাড়িতে ফেরার পথে আমার পাশে বসা বাবরি এলোমেলো চুলওয়ালা মানুষটিকে দেখে আমার শরীরে এক ধরনের শিহরণ বয়ে গেল।কারণ,লোকটির গালের বড় তিলটার মতো আমার বাবারও গালে তিল ছিলো।তিনি আমার সাথে কথা বলতে আগ্রহ প্রকাশ করলেন।অতঃপর জানতে চাইলেন,

-বাবা, তোমার নাম কি?
-রমেশ
-বাবার নাম?
-বাবুল জলদাশ

উনার চোখের কোটর পূর্ণ হয়ে এসেছে।পুনরায় প্রশ্ন করলেন,

-কি করেন?
-মারা গেছেন

আমাকে জড়িয়ে ধরে কান্নাজড়িত কন্ঠে বলে উঠলেন
বাবা,মারা যায় নি।জলদস্যুদের আক্রমণের শিকার হয়ে মালয়েশিয়ায় ছিলাম।সেখানের জেল থেকে জীবন নিয়ে ফিরেছি।মায়ের শুষ্ক চেহারা বসন্তের গাঁদাফুলের মতো উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে।
মায়ের দেহে সাদা শাড়ি এখন শোভা পায় না।পান চিবিয়ে রাঙা লাল ঠোঁটের মতো টুকটুকে লাল শাড়ি চাই!

.
২৬ মার্চ ২০১৭
চকরিয়া,কক্সবাজার

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

29 − 28 =