বামাতি চেনার ব্যাকরণ

বামাতি চেনার ব্যাকরণ, কিংবা সিপিবির অনেকের বন্ধু, পিনাকী ভট্টাচার্জ কে নিয়ে লিখতে হবে, তা দুঃস্বপ্নেও ভাবিনি। লিখতে হল, কারণ পিনাকী অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর বিরুদ্ধে একটি সাংস্কৃতিক জ্বিহাদ চালিয়েছে, বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক-মৌলবাদী-জঙ্গিবাদী চাপাতিওয়ালাদের পক্ষ হয়ে। বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িকতা-মৌলবাদ-জঙ্গিবাদ একটি সামাজিক-রাজনৈতিক আন্দোলন। একটি প্রবাহ বা কন্টিনিউম। এই প্রবাহের একপাশে আছে পিনাকীর মত বামাতি, অন্যপাশে আছে মুফতি হান্নানের মত জঙ্গি। মাঝখানে নানা রকম হেফাজতি, খিলাফতি, ওলামালীগ ধরনের চরিত্র।

“বামাতি” অভিধাটি কিন্তু কোন তিরস্কার মূলক শব্দ নয়। বামাতি তারাই যারা মুক্তিযুদ্ধকে, বাঙ্গালী সংস্কৃতিকে, ধর্মনিরপেক্ষতাকে, সমাজতন্ত্রকে, নানা ভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করবে, এমন সব ভাষা প্রয়োগ করে, যা বামপন্থী কর্মীরা ব্যাবহার করে। যেমন, এক বামাতি লিখেছে, “জ্বিহাদ হচ্ছে শ্রেণীসংগ্রাম”। এই বামাতিটি সাম্যবাদী সমাজের জন্য শ্রেণীসংগ্রামকে ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের জ্বিহাদের সহিংসতার সাথে সমান্তরালে এনে দিল। অথবা বলে দিল, শাহবাগ আন্দোলন হেফাজত উত্থানের কারণ। এভাবে তারা সাম্প্রদায়িকতা, মৌলবাদ ও জঙ্গিবাদের নৈতিক বৈধতা দেয়ার রাজনীতি করে। বামাতিরা সেকারণে জঙ্গিদের চেয়েও ভয়ঙ্কর শত্রু। সেকারণে বামাতিদের মুখোশ উন্মোচন খুব জরুরী।

বামাতিরা কিভাবে ভাবে? তাদের চিন্তার পদ্ধতি কি? বামাতিরা কি সত্য কথা বলে? কি ধরণের সত্য? পরিশেষে বামাতিরা চূড়ান্ত বিচারে কোন রাজনীতির সেবা করে? এই প্রশ্নগুলো নিয়ে শুরু করা যাক।

১) মৌলবাদী চিন্তা কাঠামো ও পাঠ পদ্ধতি
মানুষ যে কোন টেক্সট বা লেখা, কারো কথা, কিংবা কোন বার্তা তিন ভাবে পাঠ করতে পারেঃ এক, আক্ষরিক ভাবে। দুই, প্রতীকী অর্থে। তিন, মর্মার্থে।

মৌলবাদীরা কোন টেক্সট আক্ষরিক অর্থে পাঠ করে থাকে। এদের চিন্তাপদ্ধতি কোন বিষয়কে প্রতীকী বা মর্মার্থে বুঝতে পারেনা। (বা বুঝতে চায়না, নানা রকম জৈবিক অস্তিত্ব রক্ষা ও স্বার্থ বোধের কারণে।)

পিনাকীর লেখা অভিযোগ দেখুনঃ
“গতকাল প্রথম আলোতে প্রফেসর সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী “রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতির অগ্রপশ্চাৎ” এই শিরোনামে কলাম লিখেছেন।

পুরো লেখায় মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে মিথ্যাচার আর ইচ্ছাকৃত তথ্য বিকৃতি করেছেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতি, বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, ধর্ম নিরপেক্ষতা আর সমাজতন্ত্রকে জাস্টিফাই করার জন্য তিনি ইতিহাসের উপরে নিজের কল্পনা আরোপ করেছেন।

তিনি লিখেছেন, “শুরুতে, যুদ্ধকালে, মূলনীতি ছিল তিনটি: ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র। এদের কেউই ভুঁইফোড় নয়।” বড়ই আশ্চর্য, শুরুতে মূলনীতি ছিল তিনটা, এটা ঠিক কিন্তু তা কোন মতেই ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র নয়। এই তিনটা ছিল, সাম্য, মানবসত্তার মর্যাদা আর ইনসাফ বা সামাজিক ন্যায়বিচার। কারো সন্দেহ হলে প্রোক্লেমেশন অব ইন্ডিপেন্ডেন্স দেখে নিতে পারেন।”

পিনাকীর ইতিহাস পাঠ পদ্ধতি ও সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর ইতিহাস পাঠ পদ্ধতির পার্থক্য কি? পিনাকী টেক্সটে যা লেখা আছে, তা আক্ষরিক পাঠে উৎসাহী। কেন? কারণ সে প্রমাণ করতে চায় মুক্তিযুদ্ধ ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রের জন্য হয়নি। পিনাকী “সাম্য, মানবসত্তার মর্যাদা আর ইনসাফ বা সামাজিক ন্যায়বিচার” – এই টেক্সটে সীমাবদ্ধ। এই টেক্সট, কখন, কেন, কি কারণে, এর মুল মর্মার্থ কি ছিল, কোন ধরনের ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতির বিপরীতে, – এইসব বোঝার কোন দরকার নেই।

বিপরীতে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী যখন একই টেক্সট পাঠ করেন, তিনি মনে রাখেন কনটেক্সট, ঐ সময়ের রাজনীতি, জনগণের স্লোগান “কেউ খাবে তো কেউ খাবেনা তা হবেনা”। তিনি এই স্লোগানের মর্মার্থ করেন “সমাজতন্ত্র” যা স্বাধীনতা যুদ্ধের বিজয়ের মধ্য দিয়ে আরও সুস্পষ্ট হয়।

(মৌলবাদী জঙ্গিরাও ধর্মের টেক্সট আক্ষরিক ভাবে পাঠ করে। আক্ষরিক ভাবেই বিশ্বাস করে, ৭২ জন হুরী এদের জন্য বেহেস্তে বসে আছে। পর্দা মানে কাপড়ের টুকরা, শালীনতা নয়। আর বামাতিরা এই কাপড়ের টুকরাকে নারীর পছন্দ বলে ঘোষণা করে।)

২) অর্ধসত্যের অভিশাপ
পিনাকীরা, মানে বামাতিরা পুরো সত্য দেখতে পায়না। যেন এক অভিশপ্ত আত্মা, যা ঘটনার বাহ্যিক চেহারাকেই, খণ্ডাংশকেই, সত্য বলে ধরে নিতে বাধ্য। নিচে, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর বিরুদ্ধে পিনাকীর ঔদ্ধত্যপুর্ন জ্বিহাদী বয়ান পড়ুন। পিনাকী লিখেছেঃ

“তিনি মুক্তিযুদ্ধকে দেখাতে চাচ্ছেন ধর্মনিরপেক্ষতার জন্য লড়াই হিসেবে। তিনি লিখেছেন, “একেবারে প্রাথমিক প্রয়োজন ছিল ধর্মনিরপেক্ষতার। বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের শুরুই হয়েছিল দ্বিজাতিতত্ত্বকে প্রত্যাখ্যান করে। দ্বিজাতিতত্ত্বটা ছিল ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদের ওপর নির্ভরশীল। বাঙালিরা সেটাকে প্রত্যাখ্যান করেছে দেখে পাকিস্তানি হানাদারেরা ক্ষিপ্ত হয়ে শেষ পর্যন্ত উন্মাদের মতো ঝাঁপিয়ে পড়েছে। “

এই ভুখণ্ডের মানুষ কবে কীভাবে দ্বিজাতিতত্ত্বকে প্রত্যাখ্যান করে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লড়াই শুরু করলো? বাংলাদেশের লড়াই শুরু হয়েছিল ভাষার দাবীতে লড়াইয়ের মধ্যে দিয়ে ১৯৪৮ থেকে। এরপরে ছয় দফা, উনসত্তরের গণ অভ্যুত্থান, কোথাও আমরা দ্বিজাতিতত্ত্ব নিয়ে কিছু বলিনি। আমাদের দাবী ছিল স্বায়ত্তশাসনের দাবী, আমরা ভোটে জিতে ক্ষমতায় বসতে পারিনি, যেই ভোট হয়েছিল পাকিস্তানের সংবিধান রচনার জন্য। সেই স্বায়ত্তশাসনের লড়াই পরবর্তিতে স্বাধীনতার লড়াইয়ে রুপ নেয়।

এই ইতিহাস সবার জানা, তিনি কোথায় থেকে কীভাবে আবিস্কার করলেন পাকিস্তানি আর্মিরা ক্ষিপ্ত হয়ে ঝাপিয়ে পড়েছে দ্বিজাতিত্তত্ব প্রত্যাখ্যান করার জন্য?

ইতিহাসের উপর নিজের কল্পনা আরোপ করে বিকৃত ইতিহাসের বয়ান ক্ষমাহীন অপরাধ। আর এই ভদ্রলোক বাংলাদেশের বামদের ইন্টেলেকচুয়াল আইকন।”

পিনাকীর জানা নেই, নাকি অভিশপ্ত ভুলে যাওয়া? পিনাকী প্রশ্ন করে, “এই ভুখণ্ডের মানুষ কবে কীভাবে দ্বিজাতিতত্ত্বকে প্রত্যাখ্যান করে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লড়াই শুরু করলো?” ভাষার দাবীর মর্মার্থ, আগেই বলেছি, তা বোঝার প্রয়োজন পিনাকীর নেই। যেটা সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ব্যাখ্যা করেছেন। পিনাকী শোনেইনি বা কোথাও পড়েনি যে দ্বিজাতিতত্ত্ব বলে একটি ব্যাপার নিয়ে তৎকালীন পুর্বপাকিস্তানে আন্দোলন ছিল।

৩) পেইড এজেন্ট কিংবা অসচেতন বিশ্বাসঘাতকঃ ব্যাপারটা একই
সাম্প্রদায়িকতা-মৌলবাদ-জঙ্গিবাদ উৎপাদন ও পুনরুৎপাদনের জন্য সৌদিরা ১০ বিলিয়ন ডলার নাকি বিনিয়োগ করেছে। অনেক ভাড়াটিয়া লোক আছে, বেতন ভাতা পাচ্ছে, যারা এই রাজনীতির সাংগঠনিক, সাংস্কৃতিক ও সামরিক (জঙ্গি) কাজ করছে।

এর বাইরে একদল আছে, যাদের কে বলা হয় “অসচেতন বিশ্বাসঘাতক”। এরা নিজেদের সত্যবাদী ভাবে। এরা মনে করে, এরা যে “সত্য” বুঝেছে, সেটা প্রকাশ করতেই হবে। এই জাতের নির্বোধদের সমস্যা হচ্ছে তিন ধরনের। নিজেরা বুঝেনা যে সব সত্য তার পকেটে নয়, দ্বিতীয়ত, নিজেকে উচ্চতর বিবেকের অধিকারী ভাবা, এবং তৃতীয়ত, তার তথাকথিত সত্য আসলে যা অর্ধসত্য, তা বাস্তব রাজনৈতিক সংগ্রামে কার পক্ষে কি ভূমিকা রাখছে, সে সম্পর্কে অজ্ঞতা।
অসচেতন বিশ্বাস ঘাতকেরা এমন সব বিষয় নিয়ে বিবেকী বার্তা দেয়ার চেষ্টা করে, যা মূলত, আজকের বাংলাদেশ প্রেক্ষিতে সাম্প্রদায়িকতা-মৌলবাদ-জঙ্গিবাদের পক্ষে ওকালতি করে।
এরা আপনাদের বন্ধু হতে পারে। কিন্তু চূড়ান্ত বিচারে এরা প্রতিক্রিয়াশীলদের এজেন্ডা বাস্তবয়নে সহায়তা করা, পেইড এজেন্টদের মতই।

মার্চ ২৮, ২০১৭।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “বামাতি চেনার ব্যাকরণ

  1. পিনাকী, পারভেজ আলমদের মত
    পিনাকী, পারভেজ আলমদের মত বামাতিদের উদ্দেশ্য যা-ই হোক জঙ্গিবাদকে উস্কানীর ক্ষেত্রে তাদের ভুমিকাকে কোনভাবেই ফেলে দেওয়া যাবে না। ধর্মীয় উগ্রবাদকে এরা সুশীলতার আবডালে উস্কে দেওয়ার ক্ষেত্রে এরা ভয়ঙ্করজনক ভুমিকা নিয়েছে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

32 + = 38