আমার একটি গল্প আছে- কিস্তি-০১

পাখির নীড়ের মত চোখ তুলে তাকাবেন না।
আমার মনকেমন হয়ে যায়।

কথা বলবার কী অসামান্য ধরণ! সেদিন স্কুল পালাবার সময় আমার বন্ধু রাজ এই পঙক্তিটি বলেছিল এক বড়-আপুর উদ্দেশে।

আমরা স্কুলের পেছনের প্রাচীর পার হচ্ছিলাম। অনেক বড় সেই প্রাচীর- ইটের দেয়ালের উপর আরো কিছুটা অংশ তাড়কাঁটা দিয়ে উঁচু করে দেয়া। সুতরাং স্কুলের এই মহাপ্রাচীরটি পেরিয়ে যেতে আমাদের যথেষ্ট বেগ পেতে হচ্ছিলো। আর আমাদের এই পুরো পলায়ন প্রক্রিয়াটি প্রাচীরের ওপার থেকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে পর্যবেক্ষণ করছিলেন সেই বড়-আপুটি। যেন আমরা পার হতে পারলেই উনি আমাদের কান ধরে পুনরায় স্কুলের স্যারের হাতে ধরিয়ে দিয়ে আসবেন- এমন একটা ব্যাপার।

আমরা পার হলাম। এরপর যা ভাবচ্ছিলাম- তাই হতে চলেছে। বড়-আপুটি আমাদের পথ আগলে দাঁড়ালেন। আর বললেন-

স্কুল পালালেই রবীন্দ্রনাথ হওয়া যায় না, বাবুরা। যাও স্কুলে ফিরে যাও।

ঠিক তখনই রাজের ওই পঙক্তি-

প্লিজ, পাখির নীড়ের মত চোখ তুলে তাকাবেন না। আমার মন কেমন হয়ে যায়।

আর রাজের এমন অপ্রত্যাশিত সুন্দর কথাটি শুনে যেন নিজের অজান্তেই পথ ছেড়ে দাঁড়ালেন ভয়ঙ্কর অথচ সুন্দরী সেই বড়-আপুটি। সত্যিই তার পাখির নীড়ের মতো চোখ ছিল। যেন কোনো এক পুকুরে নোঙ্গড়া ঘোলা জলের ঠিক মাঝখানে একটি সুন্দর পদ্ম ফুটে আছে। আর সেই ভেজা পদ্মের মতোই দেখাচ্ছিলো তার দুটি চোখ।

রাজের সঙ্গে স্কুল পালানোর এই একটা সুবিধা। মাঝে-মধ্যে যেমন অনেক বিপদ-আপদ কেটে যায় তেমনি অনেক কিছু দেখাও যায়- যেটা আমি আগেও দেখেছি অথচ কিছুই ভাবিনি তা নিয়ে। আর সেজন্যই বুঝি; সে স্কুলবেলাতেই সব স্যারেদের কাছে কবি হিসেবে স্বীকৃতি পেয়ে গেল। অনেকসময় তো এমনও হয়- ক্লাসে আমাদের সবাইকে স্যার অংক করতে দিয়েছেন অথচ রাজকে- আামাদের সেই অংক করা সময়ের মধ্যে একটা কবিতা লিখে শোনাতে বলতেন। শোনাতোও। তাৎক্ষণিক কবিতা বানিয়ে শোনাতো। আর আমরা- অংকের পেছনে মাথা কুটে মরতাম। তবে স্যারদের কাছে কবি হিসেবে যতই আদর-সম্মান পাক, আমাদের বন্ধুদের সবার কাছে অতটা সম্মান সে পেত না। উল্টো কিছুটা অসম্মানই তাকে সহ্য করতে হতো বৈকি। তা না হলে অমন সুন্দর ‘রাজ’ নামটার আগে ‘কবি’ যুক্ত করে- বন্ধুরা তাকে ‘কবিরাজ’ নামটা দিতে পারতো! কবি হওয়ার পর সবাই কেমন কবিরাজ-কবিরাজ বলে ডাকা শুরু করল।

সবাই যখন কবিরাজ বলেই ডাকে, আমিও এবার কবিরাজ দিয়েই শুরু করি। কবিরাজ আর আমি স্কুলের হোস্টেলেই থাকতাম। তবে হোস্টেলে সে আমাকে তেমন একটা সময় দিত না। সে কবি মানুষ- অনেক ভাবতে হতো তাকে। তাই সে বেশিরভাগ সময় হোস্টেলের একটা সিঙ্গেল রুমে থাকত- দরজা বন্ধ করে। তবে মাঝে মাঝে কোথায় যেন একা একা বেরিয়ে পরতো। সেটা আমরা কেউ জানতাম না। কাউকে সে জানাতোও না।

আমার সঙ্গে সে মিশতো না। কিন্তু আমি তার সঙ্গে মিশতাম। স্কুল পালানোর ব্যাপারেও আমিই তাকে উৎসাহ দিতাম। এমনকি ওর ব্যাপারে যত কিছু জানার- আমি নিজে জেনে নিতাম। সে নিজে থেকে কিছু জানাতোনা-আর আামার সম্মন্ধেও কিছু জানতে চাইতোনা। এমনটাই ছিল তার স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য। কিন্তু এই দশম শ্রেণিতে এসে তার একটা ব্যাপার- আমাকে সে প্রথম বারের মতো জানালো। হয়তো তার নিজের কাছে এই ব্যাপারটার কোনো সমাধান ছিল না, তাই বোধহয় আমাকে জানানো। ঢাকা থেকে একটা চিঠি এসেছে তার কাছে। একদিন স্কুল টিফিনের সময় সেই চিঠিটা আমাকে দেখাল। চিঠিটা পাঠিয়েছে ‘চিলড্রেনস ফিল্ম সোসাইটি, ঢাকা’ থেকে। কোন এক সময় সে সেখানে একটা গল্প লিখে পাঠিয়েছিল। সারা দেশের হাজারও গল্পের মাঝে বাঝাই হয়ে সুযোগ পেয়েছে আমার এই কবিরাজ বন্ধুর একটি গল্প। আর সেজন্যই চিঠি দিয়ে তাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে চিলড্রেন্স ফিল্ম সোসাইটির সাত দিন ব্যাপি চলচ্চিত্র নিমার্ণ বিষয়ক কর্মশালায় অংশগ্রহণের জন্য। চিঠিটা পড়ে আমি যেন রীতিমত আনন্দে কেঁদে ফেলি- এমন একটা ব্যাপার। কিন্তু কবিরাজের ব্যাপারটা দাঁড়াল ভিন্ন। সে জানালো- আর কয়েক মাস পরেই তো আামাদের মাধ্যমিক পরীক্ষা- এই অবস্থায় সাত দিনের জন্য ঢাকায় যেতে চাইলেও তো তার বাড়ি থেকে তাকে কিছুতেই যেতে দিবেনা। অনেক সমস্যায় পড়তে হবে তাকে। বাড়িতে জানাতে হবে, আবার বাড়ি থেকে অভিভাবক এনে হোস্টেল সুপারের কাছে সাত দিনের জন্য ছুটি মঞ্জুর করাতে হবে ইত্যাাদি অনেক ঝামেলা আছে।

আমি বললাম- এগুলো তো কোনো সমস্যা না, শুধুমাত্র একটুখানি কষ্ট বৈকি। সবাইকে বুঝিয়ে বুঝিয়ে বলাটাই যা কষ্ট। কিন্তু একবার ভালভাবে বোঝাতে পারলেই- সব কষ্ট অভিভাবকের। আর আামার ধারণা তুই তোর সুন্দর কথা দিয়ে অবশ্যই বোঝাতে পারবি।

সে বলল সেখানে গেলে মাধ্যমিক পরীক্ষায় ভাল ফল সে করতে পারবেনা। আর আমি বললাম- ভাল ফল করার সুযোগ আরো অনেক আসবে কিন্তু এমন ফিল্ম সোসাইটির সুযোগ আর দ্বিতীয়বার আসবে না- এটা নিশ্চিত। এমনকি আমাদের এই মাধ্যমিক পরীক্ষাটাও দ্বিতীয়বার দেয়ার সুযোগ আছে কিন্তু এমন আরেকটা চিঠি পাওয়ার আর কোনো সুযোগ নাই- জীবনে।

স্কুলের ঘন্টা পড়ল। আমরা ক্লাসে ঢুকে গেলাম।

হেস্টেলে এসেও তাকে অনেক বোঝালাম। তার পরের দিনেও বোঝালাম। অনেক বোঝানোর পর, একটা সময় সে বুঝলো এবং সিদ্ধান্ত নিল তার অভিভাবককে বোঝানোর জন্য। তারপর প্রথমে সফলতার সাথে বোঝালো তার মাকে। মা বোঝালো কবিরাজের বাবাকে। আর অবশেষে কবিরাজের বাবা আমাদের হোস্টেলে এসে বোঝালো- হোস্টেল সুপারকে।

কবিরাজ চলে গেল। আমি পড়ায় মন দিলাম। কিন্তু মজার ব্যাপার হল- আমি আামার বইয়ের পাতা ঝাপসা দেখতে শুরু করলাম। যাকে বলে জেগে জেগে স্বপ্ন দেখা। আমি জেগে-জেগে- পড়তে-পড়তে চলে যাচ্ছি কবিরাজের চিলড্রেন্স ফিল্ম সোসাইটির কর্মশালায়। সেখানে রাজ বসেছে আমার পাশে। কর্মশালা করাচ্ছেন বিখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা মোর্শেদুল ইসলাম। আমি দাঁড়িয়ে তাঁকে প্রশ্ন করছি- আপনার ‘দীপু নাম্বার টু’ সিনেমার দীপু সম্পর্কে একটু বলবেন, প্লিজ। আর এই দীপুর সঙ্গে জাফর ইকবাল স্যারের উপন্যাসেরর যে দীপু, সে দীপুর সঙ্গে আপনার সিনেমার দীপু সত্যিই কি পুরোপুরি মিলে গেছে, একেবারে সেইম টু সেইম? জাফর ইকবাল স্যার যা ভেবেছেন- আপনিও কি আপনার সিনেমায় তাই দেখেয়েছেন? তখন রাজ ফিসফিস করে বলে ওঠে- এই বিপু, কি যাতা প্রশ্ন করছিস? বস্ বলছি- বস্।

‘সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মত
সন্ধ্যা আসে; ডানার রৌদ্রের গন্ধ মুছে ফেলে চিল।’

শুনেছি এই পঙক্তিটি জীবনানন্দ দাশের। কবিরাজ লিখে দিয়ে গেছে আমার বাংলা বইয়ের প্রথম পাতায়। সেদিন সমস্ত দিনের শেষে সন্ধ্যা বেলায় হোস্টেলের পড়ার টেবিলে এটাই একটু আবৃত্তি করার চেষ্টা করছিলাম। কবিরাজ বলেছে এই পঙক্তিটি সে আামাকে কখনো বুঝিয়ে দেবে না। আমাকে নিজে নিজেই বুঝে নিতে হবে। তাই একটু একটু করে বোঝবার চেষ্টা করছি। আচ্ছা, কবিরাজ কি তবে শিশিরের শব্দ শোনার জন্য- মাঝে মাঝে হোস্টেল থেকে হারিয়ে যায়? না বোধহয়, আরো ভাবতে হবে। ভাবতে ভাবতে যদি কিছু পেয়ে যাই- কবিরাজ এলে সারপ্রাইজ দেয়া যাবে।

দিনের বেলা- এক ডাকপিয়ন এসে আমাকে ডাকছে। আমি কাছে গেলাম। দেখি- ডাকপিয়ন অনেকগুলো চিল নিয়ে এসেছে। অনেক বড় বড় চিল। ডাকপিয়ন তার পকেট থেকে একটা চিঠি বের করে আমাকে দেয়ার জন্য হাত বারিয়েছে। কিন্তু আমি নিতে চাইতেই চিলগুলো আমাকে ভয়ংকরভাবে কামড়ে নেবার চেষ্টা করছে। আমি কিছুতেই চিঠিটা নিতে পারছি না। ডাকপিয়ন চিলগুলোকে বোঝাবার চেষ্টা করছে, কিন্তু তারা- তারও কথা শুনছে না। কিছুতেই আমাকে দিতে দেবে না চিঠিটা। আমি যতই এগিয়ে যাই চিঠিটা নিতে- চিলগুলো ততই আমাকে বাধা দেয়- আমাকে কামড়ে দেয় তাদের ধারালো ঠোট দিয়ে। আমি অনেক চেষ্টার পরে একসময় চিঠিটা নিতে পারি। চিলগুলো তখন আামাকে ঘিরে রেখেছে। আমি চিঠিটা খুলে দেখি- কবিরাজের মতো হুবহু আরেকটা চিঠি আমার নামেও এসেছে। আমি আনন্দে কেঁদে ফেলি। ঠিক তখনই- আমার মাথার উপর থেকে নতুন আরেকটি চিল এসে চিঠিটা নিয়ে উড়ে চলে যায় আকাশে। আমি আর্তনাথ করি। ডাকপিয়নকে বলি চিলটাকে থামানোর জন্য। কিন্তু ডাকপিয়ন কেমন যেন হাসতে শুরু করে দেয়। তার হাসিতে চিলেরও আনন্দ পায়। আমি মাঠ থেকে মাঠে চিলের উদ্দেশে দৌড়ে বেরাই। চিৎকার করতে পারি না আর। শত চেষ্টা করেও আমার মুখ দিয়ে কোনো কথাই বের হয় না। আমি নির্বাক হয়ে যাই।

হঠাৎ আজানের শব্দে আমার ঘুম ভেঙ্গে যায়। তখন অনেক ভোর। হোস্টেলের টিনের চালে শিশিরের শব্দ শুনতে পাই। তার কিছুক্ষণ পর দরজা খুলে একা একা চলে আসি স্কুলের মাঠে। পায়ের জুতো খুলে ঘাসের ওপর- খালি পায়ে হাঁটতে শুরু করি। ঘাস থেকে শিশির ঝরে পড়ে। শব্দ হয়- শিশিরের শব্দ। যা আগে কখনো শুনিনি।

এরপর সেই সাত দিনে আরো বেশ কয়েকদিন স্কুল পালিয়েছি আমি। একাই পালিয়েছি। সঙ্গে নেইনি কাউকে। মহাপ্রাচীরের ওপারে সেই মেয়েটিকে আবারো দেখেছি। নিষেধ করেনি। কখনোবা পালাতে গিয়ে স্যারের কাছে ধরাও পড়েছে। মার খেয়েছি। তবুও পালিয়েছি। আবারো পালিয়েছি।

সাত দিন পর হোস্টেলে ফিরে এল রাজ। অনেক কথা জমে গেছে। আমি শুধু রাজকে শোনাবো। অবশ্যি সেও আমাকে শোনাবে অনেক কথা। তার সাত দিনের সফরের কথা। সিনেমা বানানোর কথা। আমি শোনাবো আামার স্বপ্নের কথা, শিশিরের শব্দের কথা, স্কুল পালানোর কথা ইত্যাদি হাজারো কথকতা। কিন্তু কবিরাজ ফিরে এল অন্য এক কবিরাজ হয়ে। একটা হ্যাট কিনে এনেছে। সিনেমার পরিচালকেরা মাথায় যেরকম পরে- সেরকম। আরো অনেক কিছুই হয়তো এনেছে, কিন্তু সে নিজে থেকে এখনো আমাকে কিছুই দেখায়নি। হ্যাটটা মাঝে মাঝে মাথায় পরে বের হচ্ছে তাই দেখতে পেয়েছি। আগের চেয়ে অনেক কম কথা বলছে এখন। অবশ্যি আমি তাকে বিরক্ত করছি না, তাই হয়তো আামার এমনটা মনে হচ্ছে। কিন্তু এবার কেন যেন আমার মনে হচ্ছে- আমি আর নিজে থেকে তার ব্যক্তিগত কোনো ব্যাপারে নাক গলাবোনা। এমনকি স্কুল পালানোর কথাও বলবনা। সে যদি নিজে থেকে বলে তবে পালাব- তার আগে না। আমার জমে থাকা কথাগুলো তার- না শোনাই উচিৎ। আমারও উচিৎনা- তার ঢাকা থেকে কষ্ট করে বয়ে নিয়ে আসা কথাগুলো শুনতে চাওয়া। শুধু কি বয়ে নিয়ে আসা? বলতে হবে- অর্জন করে বয়ে নিয়ে আসা কথকতা। যোগ্যতা না থাকলে এমন গল্প লেখা যায় নাকি? আমিও তো চেষ্টা করি। কই, পারি নাতো। আমারও তো চিঠি আসে। কই, নিতে পারি নাতো। আমার চিঠি চিলে নিয়ে যায়। আর আমি শুধু চিলের পিছে ছুটে বেড়াই।

বিকেল বেলা দেখছি রাজের সঙ্গে রনি বেশ কথা বলছে। আগে তো এমনটা ছিল না। আমি কাছে গেলাম।

– হ্যাট কিনছিস?
– হ্যা, দেখতেই তো পাচ্ছিস?
– না, ভাবলাম ওখান থেকে দিয়েছে হয়তো।
– ধুর, ওখান থেকে কেন দিবে?

এরপর আমাকে আর পাত্তা না দিয়ে তারা দু’জনে পূর্বের আলোচনায় ফিরে গেল। আমি আরো কিছুক্ষণ ওদের সঙ্গেই থাকলাম। পাত্তা না দিলেও আমি তো আর হুট করে চলে আসতে পারিনা। নিজের অপমান অন্যকে বুঝতে না দেয়ার স্বভাব অন্যদের আছে কিনা জানিনা- তবে আমার একটু আছে বৈকি। তাই, অপমানিত হইনি- এমন একটা ভান করে আরো অল্প কিছুক্ষণ ওদের সঙ্গে থাকার পর ফিরে আসবো- এমন একটা প্লান করলাম। রনি তখন কবিরাজের সঙ্গে চা খাওয়া নিয়ে কথা বলছে। সাধারণত, চা খাওয়ার ব্যাপারে রনি যার-তার সঙ্গে কথা বলে না। কারণ রনি যার-তার সঙ্গে চা খায়ওনা। চা খায় রাজনৈতিক বড় বড় ভাইয়েদের সাথে। অনেক অনেক বড় ভাই তার পরিচিত। সেই সুবাদে হোস্টেলেও রনির অনেক পাওয়ার। সে ইচ্ছে করলেই যখন-তখন হোস্টেল সুপারের পারমিশন ছাড়াই হোস্টেলের বাইরে যেতে পারে। এমনকি রাত বারোটার পরেও সে বাইরে চা খেতে গিয়েছে- এমন রেকর্ড তার আছে। তার সারাদিনের রুটিনের মধ্যে চা খাওয়ার পাশাপাশি আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো সবরকম বাংলা পত্রিকাগুলো প্রায় মুখস্তই করে ফেলা। যেসব পত্রিকা হোস্টেলে আসে না, সেগুলোও বাইরে থেকে নিয়ে আসে সে। ইচ্ছে তার- একদিন অনেক বড় রানীতিবিদ হবে। সেই রনি চা খাওয়ার অফার করল ঢাকা থেকে ফিরে আসা নতুন এই কবিরাজকে। পড়াশুনা নিয়ে সে ভাবে না। ক্লাসে কখনো অন্যের দেখে অংক করার সুযোগ পেলে করে, এছাড়া নিজে অংক কষতে গিয়ে কোনো রকম রিক্স নেয়না। ইংরেজিও ঠিক একই রকম। এসব অংক-ইংরেজি নিয়ে সে মাথা খাটায় না। তবে ইতিহাস বইয়ের কত পৃষ্ঠায় কী আছে- সেটা তার মুখস্ত। যাই হোক, প্লান ছিল কিছুক্ষণ পর ওদের সঙ্গ ছেড়ে ফিরে যাব নিজের কাজে- তাই যাচ্ছিলাম। কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে রনি আজকে প্রথমবারের মতো আমাকে ডেকে বলল-

– চল তুইও আজকে রাতে, চা খাবি আমাদের সাথে। কল্লোল ভাই ঢাকা থেকে আসবে আজকে।
– কল্লোল ভাই কে?
– সেন্ট্রালে রাজনীতি করে। আমার অনেক কাছের বড় ভাই।
– ও। দেখি। সারের পারমিশন পেলে যাব।
– পারমিশন লাগবে না। আমার কথা বলবি।
– তাও তুই একটু আগে থেকেই বলে রাখলে ভাল হইতো না?
– কিচ্ছু লাগবে না। তারপরেও কোনো সমস্যা করলে বলবি- কল্লোল ভাইয়ের দেখা করতে গেছিলাম।

এরপর যখন রাজ বলল-

– চল্ না, তোর মিতাও তো যাবে। মোট চারজন যাচ্ছি, কোনো সমস্যা নাই।

আমি তখন রাজি হয়ে গেলাম।

এখন রাত সোয়া এগারোটা। চা খাওয়ার পরিকল্পনা মোতাবেক সবাই এসে হাজির হয়েছি রনির রুমে। রনির রুমে এবার অনেক দিন পর আসলাম। আগে অনেক নোংড়া ছিল তার রুম। বিছানাও কখনো গোছাতো না। অবশ্যি আমাদেরও রুম বেশ অগোছালো থাকে অনেক সময়। অনেক সময় স্কুল ইউনিফর্মসহ আরো নানান রকম কাপড় বিছানায় স্তুপ হয়ে থাকে আমাদের অনেকেরই বিছানায়। কিন্তু তবুও আমরা রনির মতো অতটা নোংড়া করে রাখতামনা কোনো কিছুই। কিন্তু হঠাৎ রনির রুমের এই পরিবর্তন দেখে আমি রনিকে বলেই বসলাম-

– কি রে রনি, তোর রুমটা তো বেশ দেখাচ্ছে। ব্যাপার কী, কে করলো তোর এই পরিবর্তন?
– শেখ মুজিব।
– মানে?

এরপর দেয়ালে বঙ্গবন্ধু শেখ বুজিবুরের ছবিটা আমাকে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিল সে।

– ওই দেখ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আমার আদর্শ। আর উনি যখন আমার রুমে- আমি তো
আর. . .
– হু বুঝলাম।
– হ্যা, এবার চল্ যাই। ফিরে এসে আবার- ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ শুরু করতে হবে।
– অসমাপ্ত আত্মজীবনী?

যেতে যেতে জিজ্ঞেস করলাম রনিকে। তখন কবিরাজ উত্তর করল।

– বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনী। পড়িসনি?

আমি ‘না’ বলে ওঠার আগেই আমার মিতার উত্তর।

– বলিস কি? এস. এস. সি পরীক্ষার আগে আত্মজীবনী!

রনি তখন কিছু একটা বলবে কিন্তু হঠাৎ সামনে দেখি হোস্টেল সুপার দাঁড়িয়ে আছে। আমি কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই উল্টো পাশে আমার রুমের উদ্দেশে দিলাম এক দৌড়।

সেরাতে আমার সঙ্গে আর কারো কোনো যোগাযোগ হয়নি। এমনকি হোস্টেল সুপারও আমাকে রুমে এসে কিছু বলেননি। আমি রুমে ফিরে আসার পর কয়েক ঘন্টা খুবই ভয়ে ভয়ে ছিলাম। পরে বুঝলাম রনি হয়তো স্যারকে কিছু একটা বলে দিয়েছে- তাই হয়তো স্যার আমাকে এসে কিছু বলেননি। আর ওরাও হয়তো চা খেতে চলে গিয়েছে। শুধু আমিই বাদ পড়লাম। মাথার উপর রনি থাকা সত্তেও শুধুই শুধু-শুধু আমি একা নাবুঝে উল্টোপাশে দৌড়ি দিয়ে চলে এলাম।

পরদিন মিতার সাথে স্কুলে যেতে যেতে শুনলাম- গতকাল আমি একটা ভিষণ বোকামি করে ফেলেছি। আমি যে হোস্টেল সুপার স্যারকে দেখে দৌড় দিয়েছিলাম- উনি আসলো স্যাারই ছিল না। স্যারের মতো সাদা পাঞ্জাবি পরে আমাদের ভয় দেখিয়েছিল আমাদের আরেক বন্ধু- সোহান।

সোহান ভয় দেখাতে খুবই পটু। এবং সে একজন ভূত বিশেষজ্ঞ হিসেবে আমাদের সবার কাছে পরিচিত। নিজে কখনো ভূত বিশ্বাস করেনা। তাই সবাইকে বিভিন্নভাবে ভয় দেখিয়ে প্রমাণ করে দিতে চায়- পৃথিবীতে ভূত বলে কিছু নেই। মানুষ যে ভয় পায়, তার পিছনে নিশ্চই কারো কোনো দুষ্টোমি লুকিয়ে আছে এবং বৈজ্ঞানিক কিছু কারণও আছে। সে অবশ্যি ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি গবেষণার মাধ্যমে কিছু ভৌতিক কারণের সুন্দর সুন্দর ব্যাখ্যাও বের করেছে এবং এখনো করে যাচ্ছে। ইচ্ছে তার- একদিন বড় হয়ে ভূতের উপর একটি গবেষণামূলক বই বের করবে। বইটির নাম হবে- ‘আমি কেন ভূতে বিশ্বাস করি না’।

আজ স্কুলে গিয়ে রাজের পাশেই বসলাম। আমার গতরাতের বোকামির জন্য এবার রাজও খানিক্ষণ ক্ষেপাল আমাকে। তারপর কল্লোল ভাইয়ের সাথে চা খাওয়ার গল্পটা শুনতে চাইলে সে বলল- বিকেলে একবার তার রুমে যেতে। আমি স্কুল পালানোর জন্য বললাম কিন্তু সে রাজি হলো না।

চা খাওয়ার গল্পটা শোনার জন্য বিকেল অবধি অপেক্ষা করতে হলো না। টিফিন পিরিয়োডে মিতাই সব খুলে বলল।

– জানিসতো কাল রাতে চায়ের হোটেলে একটা কেলেঙ্কারি হয়ে গেল। তুই তো পালিয়ে বেঁচেছিস। আমরা
পড়েছিলাম মহা বিপদে।
– কল্লোল ভাইয়ের দেখা হয়নি?
– আরে তার আগেই তো ঘটনা ঘটে গেল।
– কী ঘটনা- বল্না, শুনি।
– তবে আর বলছি কী? কল্লোল ভায়ের জন্য হোটেলে বসে বসে অপেক্ষা করছিলাম। গল্পও চলতেছিল
ভালই।
– কোনো স্যার দেখে ফেলছিল, না?
– আহ্ আগে শুনবি তো।
– বল্ বল্ ।
– হোটেলের টেবিলে একটা লবণদানিতে লবণ ভর্তি করা থাকে না? ওই লবণটা গল্পের তালে তালে রনি
কী করছে জানিস?
– পানির গ্লাসে ঢেলে দিয়েছে?
– তবে আর বলছি কী? ঢেলে দিয়েছে।
– তারপর?
– তারপর যা হওয়ার তাই হলো। রীতিমতো অপমান হয়ে বের হয়ে আসতে হলো।
– তারমানে কল্লোল ভাইয়ের দেখা করাইতে পারেনি?
– তবে আর বলছি কী? কল্লোল ভাই তো দূরের কথা। আমরা তো চাটাই খেতে পারলামনা!

মনে মনে বললাম- এত বড় নেতা হওয়া সত্তেও সমান্য একটা লবণের ব্যাপার সামলাতে পারলোনা!

তবুও বিকেলবেলা কবিরাজের রুমে গেলাম, যদিও চায়ের গল্পটা আমি স্কুলে আগেই শুনে ফেলেছি। দেখলাম- রুমের দেয়ালে ঢাকা থেকে আনা নতুন হ্যাটটা টাঙ্গিয়ে রেখেছে কবিরাজ। বিছানায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রেখেছে বেশ কয়েকটি পুরনো পত্রিকা। জানিনা, কবিরাজও কেন রনির মতো এত পত্রিকা সংগ্রহ শুরু করেছে।

চায়ের গল্প শুনবি নাকি একটা কবিতা আবৃত্তি শুনবি- বলল কবিরাজ। আমি বললাম- চায়ের গল্প শোনা শেষ। কবিতাই ভাল। তোর লেখা?

মাথা নেড়ে বলল- না। আগে শোন-

তোমাকে পেতেই হবে শতকরা অন্তত নব্বই ( বা নব্বইয়ের বেশি )
তোমাকে হতেই হবে একদম প্রথম
তার বদলে মাত্র পঁচাশি!
পাঁচটা নম্বর কম কেন? কেন কম?
এই জন্য আমি রোজ মুখে রক্ত তুলে খেটে আসি?

এই জন্যে তোমার মা কাক ভোরে উঠে সব কাজকর্ম সেরে
ছোটবেলা থেকে যেতো তোমার ইস্কুলে পৌঁছে দিতে?
এই জন্য কাঠফাটা রোদ্দুরে কি প্যাপপ্যাচে বর্ষায়
সারাদিন বসে থাকতো বাড়ির রোয়াকে কিংবা পার্কের বেঞ্চিতে?

তারপর ছুটি হতে, ভিড় বাঁচাতে মিনিবাস ছেড়ে
অটো-অলাদের ওই খারাপ মেজাজ সহ্য করে
বাড়ি এসে, না হাঁপিয়ে, আবার তোমার পড়া নিয়ে
বসে পড়তো, যতক্ষণ না আমি বাড়ি ফিরে
তোমার হোমটাক্স দেখছি, তারপরে আঁচলে মুখ মুছে
ঢুলতো গিয়ে ভ্যাপসা রান্নাঘরে?

এই জন্যে? এই জন্যে হাড়ভাঙা ওভারটাইম করে
তোমার জন্য আন্টি রাখতাম?
মোটা মাইনে, ভদ্রতার চা-জলখাবার
হপ্তায় তিনদিন, তাতে কত খরচা হয় রে রাস্কেল?
বুদ্ধি আছে সে হিসেব করবার?
শুধু ছোটকালে নয়, এখনো যে টিউটোরিয়ালে
পাঠিয়েছি, জানিস না, কিরকম খরচাপাতি তার?
ওখানে একবার ঢুকলেই সবাই প্রথম হয়। প্রথম, প্রথম!
কারো অধিকার নেই দ্বিতীয় হওয়ার।

রোজ যে যাস, দেখিস না কত সব বড় বড়
বাড়ি ও পাড়ায়
কত সব গাড়ি আসে, কত বড় আড়ি করে
বাবা মা-রা ছেলেমেয়েদের নিতে যায়?

আর ওই গাড়ির পাশে, পাশে না পিছনে-
ওই অন্ধকারটায়
রোজ দাঁড়িয়ে দেখিস না নিজের বাবাকে?
হাতে অফিসের ব্যাগ, গোপন টিফিন বাক্স, ঘেমো জামা,
ভাঙা মুখ-

দেখতে পাসনা? মন কোথায় থাকে?
ওই মেয়েগুলোর দিকে? যারা তোর সঙ্গে পড়তে আসে?
ওরা তোকে পাত্তা দেবে? ভুলেও ভাবিস না!
ওরা কত বড়লোক!

তোকে পাত্তা পেতে হলে থাকতে হবে বিদেশে, ফরেনে
এন আর আই হতে হবে! এন আর আই, এন আর আই!
তবেই ম্যাজিক দেখবি
কবিসাহিত্যিক থেকে মন্ত্রী অবধি এক ডাকে চেনে
আমাদেরও নিয়ে যাবি, তোর মাকে, আমাকে
মাঝে মাঝে রাখবি নিজের কাছে এনে

তার জন্য প্রথম হওয়া দরকার প্রথমে
তাহলেই ছবি ছাপবে খবর কাগজ
আরো দরজা খুলে যাবে, আরো পাঁচ আরো পাঁচ
আরো আরো পাঁচ
পাঁচ পাাঁচ করেই বাড়বে, অন্য দিকে মন দিস না,
বাঁচবি তো বাঁচার মত বাঁচ!

না বাপী না, না না বাপী, আমি মন দিই না কোনো দিকে
না বাপী না, না না আমি তাকাই না মেয়েদের দিকে
ওরা তো পাশেই বসে, কেমন সুগন্ধ আসে, কথা বলে, না
না বাপী পড়ার কথাই
দেখি না, উত্তর দিই, নোট দিই নোট নিই
যেতে আসতে পথে ঘাটে
কত ছেলে মেয়ে গল্প করে
না বাপী না, আমি মেয়েদের সঙ্গে মিশতে যাই না কখনো
যেতে আসতে দেখতে পাই কাদা মেখে কত ছেলে বল খেলছে মাঠে
কত সব দুষ্টু ছেলে পার্কে প্রজাপতি ধরছে
চাকা বা ডাঙ্গুলি খেলছে কত ছোটলোক
না, আমি খেলতে যাই না কখনো
খেলতে যাই নি। না আমার বন্ধু নেই
না বাপী না, একজন আছে, অপু, একক্লাসে পড়ে
ও বলে যে ওর বাবাও বলেছে প্রথম হতে
বলেছে, কাগজে ছবি, ওর বাবা, ওকে . . .
হ্যাঁ বাপী হ্যাঁ, না না বাপী, অপু বলেছে পড়াশোনা হয়নি একদম
বলেছে ও ব্যাক পাবে, ব্যাক পেলে ও বলেছে, বাড়িতে কোথায়
বাথরুম সাফ করার অ্যাসিড আছে ও জানে,
হ্যাঁ বাপী হ্যাঁ, ও বলেছে,
উঠে যাবে কাগজের প্রথম পাতায় . . .

কবিতাটি আবৃত্তি শেষে কবিরাজ বলল-

– এই কবিতাটি কবি জয় গোস্বামীর। আমার নয়। তবে কবিতাটা আমার না হলেও- কবিতার কেন্দ্রিও
চরিত্রটা আমি। আমাকে নিয়েই লিখেছেন জয় গোস্বমী।

কথাটা বলেই মনকেমন হয়ে গেল কবিরাজের। কথাটা বলার আগে- যখন শুধু কবিতাটা আবৃত্তি করছিল- তখন কবিতার চরিত্রগুলো আমার চোখে কেমন যেন ঝাপসা হয়ে ছিল। কিন্তু এবার, আমার চোখে স্পষ্ট ভেসে উঠল কবিতার প্রত্যেকটি দৃশ্য। যে দৃশ্যগুলোর প্রত্যেকটিতে- আমি কবিরাজকেই দেখতে পেলাম এবার। কবিরাজের বাবাকে দেখলাম। দেখলাম তার মাকেও। আর দেখলাম- একটি আটপৌরে পরিবারের জীবনচিত্র। বোধহয় একটু কঠিন করে বলে ফেললাম। একটা কঠিক কিছু দেখে ফেললাম। কিন্তু এসবই শিখেছি আমি- আমার বন্ধু কবিরাজেরই কাছে। একটু একটু করে শুনতে শিখছি। একটু একটু করে বলতে শিখছি। একটু একটু করে দেখতেও শিখছি।

খানিক পরে কবিরাজ তার ট্রাঙ্ক থেকে একটা ম্যাগাজিন বের করে আমার হাতে দিয়ে বলল- এই নে আমার সর্বনাশের ম্যাগাজিন। ভাল করে দ্যাখ, আমার গল্প ছাপা হয়েছে, আমার ছবি ছাপা হয়েছে- কত বড় বড় মাপের বন্ধুদের সাথে! কত বড় বড় মাপের পরিচলকও আছে এর মধ্যে! দ্যাখ ভাল করে- দ্যাখ।

আমি ম্যাগাজিনটা হাতে নিয়ে হতভম্ব হয়ে দেখছি আর ভাবছি- ঢাকা থেকে এত বড় একটা আনন্দের খবর নিয়ে এসে- সে কীভাবে চেপে রেখেছিল এতদিন। বাহ্ কী দারুণ! একটা জায়গায়- একজন মেয়ে পরিচালকও আছে। কিন্তু মেয়েটির ছবির পাশে শুধু গল্পই নয়, গল্পসহ গল্পের উপর বানানো একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের পোস্টারও ছাপিয়ে দেয়া হয়েছে। হয়তো কবিরাজও গল্প না পাঠিয়ে, সরাসরি সিনেমা বানিয়ে পাঠালে- কবিরাজের গল্পের পাশেও একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের পোস্টার দেয়া হতো। আর পোস্টারের উপর লেখা থাকতো- কাহিনি, চিত্রনাট্য ও পরিচালনা: কবিরাজ। না না, কবিরাজ হবে কেন? এটা তো আমাদের দেয়া ক্ষেপানো নাম। তার তো একটা ভাল নাম আছে। ভাবছি, এখন থেকে আর কবিরাজ নামটা ব্যবহার করা চলবে না। একে তো এটা তার আসোল নাম নয়, তাও আবার নামটা ব্যবহার করতে কেমন- হাটে-বাজারে ভেষজ ওষুধ বিক্রি করা কবিরাজদের মতো মনে হচ্ছে। না, সেটা আর সত্যিই ব্যবহার করা চলবে না। ‘রাজ’ নামটাই ব্যবহার করবো। অথবা কবি শব্দটা যদি বলতেই হয় তবে তার নামের শেষে বলব। তাহলে কবিরাজের বদলে রাজকবি হয়ে যাবে। না, রাজকবিও ভাল লাগছে না। শুধু রাজ বলেই ডাকবো। তাপর বলে উঠলাম- রাজ-

– হ্যা, বল্ ?
– বলছি, তুই আমাকে সিনেমা বানানো শিখাবি?
– না। আমি নিজেই তো কখনো বানাবোনা। শুধু কবিতা লিখবো। কবিতা লিখলে তো আর কেউ
আমাকে কিছু বলতে পারবে না। না বাবা। না আমার মা।
– ওহ্ ।

আমি তখন প্রসঙ্গ অন্য দিকে টেনে নিয়ে, রাজের বিছানায় ছরিয়ে ছিটিয়ে থাকা পত্রিকাগুলো দেখিয়ে বললাম- এত পুরনো পত্রিকা কোত্থেকে পেলিরে?
সে তখন বলল- অনেকদিন আগে পত্রিকায় একটা ছোট গল্প পড়েছিলাম। কিন্তু খুঁজে পাচ্ছিলাম না। সেজন্যইতো রনির সঙ্গে খাতির জমিয়েছিলাম। ও তো অনেক পত্রিকা পড়ে, সেজন্য। কিন্তু এখন আর দড়কার নাই। এই তো একটু আগেই- বাবা ফোন করে সিনেমার ভূতটা মাথা থেকে নামিয়ে দিল। এক ফোনেই গল্প খুঁজে সিনেমা বানানো শেষ। এখন শুধু পরীক্ষার পড়া।

সত্যিইতো আর কিছু দিন পরেই তো আমাদের এসএসসি পরীক্ষা। এখন এমন পাগলামি করলে হবে কীকরে? ওরতো পড়াশুনা একদমই হয়নি। আর ওর পড়াশুনার যে ক্ষতি হয়েছে- সেজন্য আমি কি একটুও দায়ি নই? আমিওতো দায়ি। আমিই তো বেশি জোর করেছিলাম ওকে ঢাকা যেতে। সিনেমা বানানো শিখতে। এবস্থায় আমি তাকে কী বোঝাবো- নিজেই বুঝতে পারছিনা। ওকে পড়তে বসতে বলে সেদিনের মতো চলে এলাম ওর রুম থেকে।

রাতের বেলা আমরা ছাত্ররা প্রত্যেকে ঠিকমত পড়ছি কিনা সেজন্য হোস্টেল সুপার স্যার রাত এগারোটার সময় রুম চেকিং শুরু করে। আমার রুমে এসে পৌঁছয় এগারোটা দশের দিকে। আর চেকিং হয়ে গেলেই আমি ঘুমিয়ে পড়ি। আজও যথারীতি চেকিং এর পর বিছানায় শুয়ে পড়লাম। শুয়ে শুয়ে পরীক্ষার কথাই ভাবছি। যেকরেই হোক গোল্ডেন ‘এ প্লাস’ পেতেই হবে। কিন্তু নিজে নিজে প্রশ্নের উত্তর করতে গেলে গোল্ডেন কেন, ফেলও করতে পারি। কীভাবে অন্যের দেখে লেখা যায় সেই কৌশলগুলো বের করতে হবে। কিন্তু পরীক্ষায় গার্ড খুব কড়া হলেতো নিজে নিজেই লিখতে হবে। কারো সাহায্য ছাড়া নিজে নিজে পরীক্ষা দিলে কি সত্যিই ফেল করব? না না, ফেল করব কেন? স্কুলে তো কখনো ফেল করিনি। আমি তো মাঝামাঝি লেভেলের ছাত্র। আমার দশম শ্রেণিতেই তো রোল নম্বর এক’শ দশজন ছেলের মধ্যে পঞ্চান্ন। আমি ফেল করা মানে আমার পেছনে আরো চুয়ান্নজন ছাত্র ফেল করা। না, ফেল আমি করবনা। গার্ড যতই কড়া হোক। এই স্কুলের আমরা সবাই ভাল ছাত্র- একথা সবাই জানে। তবে গার্ড যদি কড়া না হয়- আমি নিজে নিজে লিখতে গিয়ে কোনো রাকম রিক্স নেবনা। সব হোয়াইট ইঞ্জিনেরই দেখে লিখবো।- এভাবেই শুয়ে শুয়ে পরীক্ষার কথা ভাবছিলাম। হোয়াইট ইঞ্জিনের কথা ভাবছিলাম। হোয়াই ইঞ্জিন হলো আমাদের ক্লাসের মধ্যে সবচেয়ে ফর্সা ছেলে। কিছুটা ইউরোপ-আমেরিকানদের মতো। তার আসোল নাম আমরা প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম। সবাই হোয়াইট ইঞ্জিন বলেই ডাকতাম। হোয়াইট ইঞ্জিন দশম শ্রেণিতে এমন পড়াশুনা করেছে যে, স্কুলের টেস্ট পরীক্ষাতেই সে একমাত্র ছাত্র যে ‘‘গোল্ডেন ‘এ’ প্লাস’’ পেছেছে। আর এসএসসি পরীক্ষায় তার সীট পড়বে আমার পেছনের বেঞ্চে। কারণ নবম শ্রেণিতে আমাদের পাশাপাশি রোল নম্বর ছিল। সেই রোল নম্বর অনুযায়ীই বোর্ড পরীক্ষার জন্য জেজিস্ট্রেশন হয়েছে, তাই দশম শ্রেণিতে যতই ফাস্ট হোক, কোনো লাভ নাই। আমার পেছনেই বসতে হবে। কাজেই ওর দেখে না লিখে- নিজে নিজে লিখতে গিয়ে রিক্স নেয়াটা একেবারেই ঠিক হবেনা- এটা আমি আগে থেকেই ভেবে রেখেছিলাম। এরপর ভাবা শুরু করলাম রাজের কথা- ওর তো সামনে-পেছনে হোয়াইট ইঞ্জিনের মতো তোমন কোনো ভাল ছাত্র নেই। প্রশ্নপত্র যদি টেস্ট পরীক্ষার মতো কঠিন হয়- তাহলে তো টেস্ট পরীক্ষার মতোই রেজাল্ট হবে বোর্ড পরীক্ষাতেও।

ভাবতে ভাবতে প্রায় ঘুম চলে এসেছে আমার চোখে। কিন্তু হঠাৎ আমার খাট যেন একটু নড়ে উঠল। ভূমিকম্প নয়তো? ভয়ে আমার বুকটা কেমন যেন কেঁপে ওঠল। ঘুম-ঘুম ভাবটা একটু একটু করে কেটে যাচ্ছিল। আমি তখনো উঠে বসিনি। কিন্তু খানিকপর খাট প্রায় শূন্যে ভেসে বেরাচ্ছে। আমার হার্ট-বিট আরো প্রচন্ড রকম বেড়ে গেল। কী করব- কিছুই বুঝতে পারছিনা। এটা স্বপ্ন নয়তো? স্বপ্ন হবে কী করে! আমি তো জেগেই আছি। স্পষ্ট বুঝতে পারছি, আমার কপাল ঘেমে গেছে। ঘরে জিরো পাওয়ারের নীল আলোর বাতিটা জ্বালানো ছিল। তাই মাথার উপরের ছাদে সবকিছুই নীল দেখছি। একটা মাকড়শা তার জালের মধ্যেখানে কেমন যেন দুলছে। অতি দ্রুত তার জালটাকে বড় বানাচ্ছে। মনে হচ্ছে মাকড়শাটা তার জাল দিয়ে আমাকে ঘিরে ফেলবে। আমি বোধহয় মরে যাব। ক্রমেই জালটা আমার দিকে এগিয়ে আসছে। আমি এববার ‘মা’ বলে চিৎকার করে ওঠলাম। তারপর হঠাৎ একটা প্রচন্ড শব্দ হয়ে স্থির হয়ে গেল আমার খাট।

ভোর বেলা আমি চোখ খুললাম। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার- আমার বিছানার পাশে তখন অঞ্জনা ম্যামকে দেখতে পেলাম- উনি আমাদের স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা। আরেক পাশে হোস্টল সুপার, রাজ, মিতা, রনিসহ আরো অনেকে। সবাই কেমন তাকিয়ে আছে আমার দিকে। কী এমন অপরাধ করেছি যে, এত ভোরে আমাকে শাস্তি দিতে অঞ্জনা ম্যাম পর্যন্ত চলে এসেছেন! কী এমন শাস্তি দেবে যে, সেকথা ভেবেই- অঞ্জনা ম্যামের চোখদুটো জলে টলমল হয়ে উঠছে। আমি অবশ্যি, ভাবছি অন্য কথা- ম্যামের চোখদুটোর কথা। কেমন টলমল করছে জল। বর্ষাকালে আমাদের টাঙন নদের যেমন দশা হয়- ঠিক সেইরকম। ছোট্ট একটা নদ। বর্ষায় অতিরিক্ত জল ধারনের ক্ষমতা তার নেই। কিছু ঘর-বাড়ি তাকে ভাসিয়ে দিতেই হবে। কিচ্ছু করার নাই। অঞ্জনা ম্যামেরও ঠিক একই অবস্থা হবে এখন। কাঁদবে আর আমাকে মারবে। মারুক। আমি তো আর কোন দোষ করি নাই- এটাতো সত্যি। কিন্তু ম্যাম এসব কী করছেন! আমার কপালে হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন! – তুই ভাল হয়ে গেছিস বাবা। কিচ্ছু হয়নি তোর। বাড়িতে জানাসনে যেন, কেমন? তবে যে, আমার স্কুলের অনেক বদনাম হয়ে যাবে রে। আর আমি সোহানকে অনেক শাস্তি দেব। সে সব স্বীকার করেছে। বলেছে- সে তোর খাটের নিচে ঢুকে ওর পিঠ দিয়ে তোর খাট তুলে- ঘরের মধ্যে তোকে ঘুরিয়ে নিয়ে বেরিয়েছে মাত্র- তাতেই তোর এই অবস্থা। এতটুকুতে ভয় পেলে চলে? এরপর না কলেজে যেতে হবে? সামান্য জ্বর এসেছে- সেরে যাবে।

এরপর সকাল অবধি ম্যাম আমার পাশেই ছিলেন। শুধু সকাল অবধি বললে ভুল হবে। আমার জ্বর ছিল তিন দিন। সেই তিন দিনে অঞ্জনা ম্যাম দিন-রাত আসা-যাওয়ার উপরেই ছিলেন। হোস্টেলের খাবার খেতে দিতেন না- নিজে বাড়ি থেকে খাবার রেঁধে নিয়ে আসতেন। আর দিনে একবার করে ডাক্তার নিয়ে আসতেন। আর আমি মনে মনে সোহানের জন্য শুভকামনা করতে থাকতাম। সোহান এমন একটা কা- না করলে তো- এমন একটা দুর্লভ আদর, পাওয়াই হতোনা আমার জীবনে। এমনকি ম্যামকেও সরাসরি বলেছিলাম- এঘটনার জন্য সোহানকে যেন কোনো রকম শাস্তি দেয়া না হয়। ম্যাম অবাক আর রাজি- দু’টোই একসাথে হয়েছিল। কারণ ম্যাম তো আর জানে না যে, সোহান ভূত নিয়ে গবেষণা করছে। বড় হয়ে একদিন ‘আমি কেন ভূতে বিশ্বাস করি না’র মতো একটি দারুণ গবেষণামূলক বই লিখবে।

অঞ্জনা ম্যাম যখন থাকতেন না, তখন রাজ এসে সময় দিত আমাকে। সময় দিতে পারত কারণ এখন আর স্কুল যেতে হয়না, আমাদের বিদায় হয়ে গেছে। কিন্তু পরীক্ষার আর মাত্র এক মাস বাকি আছে। এসময় জ্বর হওয়াটা সবার কাছে একটা চিন্তার বিষয়। দিনের বেলা অবশ্যি জ্বর তেমন একটা থাকে না। জ্বরটা আসে রাতের বেলা। আজ জ্বরের দ্বিতীয় দিন। ম্যাম নেই। রাজ এসেছে।
– একটা কবিতা শুনবি?
– অন্য কবির লেখা?
– না, আমার নিজের লেখা। তবে এটাকে আমি ঠিক কবিতা না বলে ‘অনুকাব্য’ বলতে চাই।
– অনুকাব্য আবার কী?
– ছোট হয় তাই অনুকাব্য বললাম। মাত্র চার লাইনের। তিন লাইনেরও হতে পারে। তবে আামর
ইস্টাইলটাই হবে চার লাইনের।
– ইন্টারেস্টিং!

এতদিন পর এলেন ?
সে তো আর নেই !
যার প্রত্যেকটি পাতা
এখন হয়তো- এক একটি বাদামের ঠোঙ্গা।

নাম রেখেছিস কী?- বললাম আমি। সে বলল- পা-লিপি।

আমি শুধু একবার ‘বাহ্’ বলে চুপ করে ছিলাম। খানিকপর সে বলল- কীভাবে সিনেমা বানাতে হয় শিখবি? শুনবি, আমার সাত দিনের অভিজ্ঞতার গল্পগুলো? যদি কখনো সিনেমা বানাতে চাস-।

একথা শোনার পর আনন্দে আর অভিমানে সংমিশ্রণ হয়ে আমার মনের মধ্যে কেমন যেন একটা তাৎক্ষণিক গল্প শোনার আকাঙ্খা তৈরি হলো। যে গল্প এতদিন শোনায়নি বলে আমি রাজের ওপর অভিমান করে ছিলাম- সে গল্প আজ সে নিজে থেকেই শোনাতে এসেছে। অবশ্যি আমি যে তার ওপর অভিমান করেছি সেটা হয়তো সে বুঝতেই পারেনি। কিন্তু এতদিন পর আজ কেন সে সেই গল্প শোনাতে চায়? আমি তো শুনতেও চাইনি। হয়তো এখন এই গল্পটা শুনলে আমার ভাল লাগবে- এটা সে বুঝতে পারছে। মূল কারণটা বোধহয় আমার জ্বর। আমার জ্বরের জন্যই সবাই আমার ওপর সহানুভূতিশীল হয়ে পড়েছে। মানুষ অসুস্থ হলেই কেবল কোনো কারণ ছাড়াই সবাই তাকে ভাবাবাসে। সবাই তার সঙ্গে ভাল ব্যবহার করে। অনেকে কেঁদেও ফেলে। যেমনটা আমার সঙ্গে এখন ঘটছে।

আমি বললাম- কখনো সিনেমা না বানালেও তোর গল্পগুলো শুনতে আমার ভাল লাগবে, বল্ শুনি।

রাজের কথা

[চলবে]

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

15 + = 18