নিরপরাধের শাস্তি

চারজন মানুষ, তাদের মাঝে একজন বিবাহিত দম্পতির সন্তান, একজন বৈবাহিক সম্পর্কহীন যুগলের ভালোবাসার ফসল, একজন অসহায় নারীর ধর্ষিতা হওয়ার ফলাফল আরেকজন যৌনকর্মীর সন্তান। প্রথমজন গ্রহণযোগ্যতা পেলে বাকি তিনজন পাবেনা কেন?

চারজন মানুষ, তাদের মাঝে একজন বিবাহিত দম্পতির সন্তান, একজন বৈবাহিক সম্পর্কহীন যুগলের ভালোবাসার ফসল, একজন অসহায় নারীর ধর্ষিতা হওয়ার ফলাফল আরেকজন যৌনকর্মীর সন্তান। প্রথমজন গ্রহণযোগ্যতা পেলে বাকি তিনজন পাবেনা কেন? একজনের কৃতকর্মের ফল অপরজন কেন ভোগ করবে, তার কেন স্বাভাবিক জীবন পাবেনা? সব শিশুই যেমন শুক্রানু ও ডিম্বানুর মিলনের ফলে পৃথিবীতে আসে, তারাও তো ঠিক একই পদ্ধতিতে পৃথিবীতে এসেছে তারপরও কেন তারা নিগৃহীত? তারা তো কিছুই করেনি, কিসের কারনে সে নিগৃহীত?

ধর্ষিতার সন্তান কেন স্বাভাবিক হবে?

-ধর্ষণ খুবই স্পর্শকাতর বিষয়। একজন অসহায় নারীকে জোরপূর্বক যৌন সম্পর্ক স্থাপনে বাধ্য করা, জোরপূর্বক একজন নারীর শরীরে শুক্রানুর সঞ্চালন করা। এক্ষেত্রে দোষটা ধর্ষকের। কিন্তু পাপের কলঙ্ক বয়ে নিতে হয়ে নারীটিকে। ছেলেটি অধিকাংশ ক্ষেত্রে পার পেয়ে যায়। সমাজে কেউ কেউ ধর্ষক হিসেবে তিরস্কার করে, আবার কেউ কেউ বাঘের বাচ্চা বলেও সম্মোধন করে! কিন্তু সকল দোষটা যায় নারীর উপর। কেননা প্রকৃতির নিয়ম অনুযায়ী সন্তান সৃষ্টির প্রক্রিয়াটি নারীর শরীরে অভ্যন্তরে ঘটে। সেই নারী যখন সন্তানের জন্ম দেয় সে শুধু “সন্তান” থাকেনা, সে হয়ে যায় “ধর্ষিতার সন্তান”।

এবার আসুন বিবাহের প্রেক্ষাপট দেখি। অনেক সময় জোরপূর্বক একজন নারীকে বিয়ে দেওয়া হয়। এক্ষেত্রে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে যে যৌন সম্পর্কটা হয় সেটা কিন্তু স্ত্রীর ইচ্ছার বিরুদ্ধেই হয়, যা ধর্ষণের অন্তর্গত। কেননা জোরপূর্বক যৌন সম্পর্ককে ধর্ষণ বলে। এক্ষেত্রে কিন্তু নারীর কোল জুড়ে আসা সন্তানকে বলা হয় “সন্তান”, “ধর্ষিতার সন্তান” কিন্তু না। কেননা এক্ষেত্রে “বিয়ে” জিনিসটা ঢাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

একই পদ্ধতিতে দুইজন “সন্তান” জন্ম নিলো, কিন্তু তারপরও কিভাবে একজন “বৈধ” অপরজন “অবৈধ” হয়? আর যাকে “বৈধ ” “অবৈধ” বলছি সে তো কিছুই করেনি, তারপরও তাকে কেন এরকম সার্টিফিকেট দেওয়া হচ্ছে? এক্ষেত্রে উভয়কে স্বাভাবিক সন্তান হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। তবে এক্ষেত্রে কেউ যদি মনে করেন আমি “ধর্ষণ” কে সাপোর্ট করি তবে সেটা তার নির্বুদ্ধিতার পরিচয় হবে।

বিবাহ সম্পর্ক ব্যতিত উৎপাদিত সন্তান স্বাভাবিক কেন হবে?

-দুইজন মানুষ পরস্পরকে ভালোবাসে। গভীর ভালোবাসায় মগ্ন হয়ে তারা তাদের ভালোবাসার ফল ভূমিষ্ঠ করলো। সেই সন্তানটিকে বলা হচ্ছে “অবৈধ”। কিন্তু সেই সন্তান তো আদৌ জানেনা কি কারনে এমন হলো। সে তো স্বাভাবিকভাবেই এসেছে কিন্তু সমাজ তাকে তার কোন প্রকার অপরাধ ছাড়াই “অবৈধ” সার্টিফিকেট দিচ্ছে। শুধুমাত্র তাদের “বিবাহ” সম্পন্ন হলেই সন্তানটি “স্বাভাবিক” সার্টিফিকেট পেয়ে যেত। “সমাজ” অনুসারে ধরি তারা অপরাধী। কিন্তু এ কারনে তাদের অপরাধের শাস্তি তাদের আগত “সন্তান” কে দেওয়া কতটা যুক্তিযুক্ত? এ ক্ষেত্রে তাকে “স্বাভাবিক” বলা উচিত।

যৌনকর্মীর সন্তান কেন স্বাভাবিক হবে?

-যৌনকর্মী জীবিকা নির্বাহের কারণেই এই পেশায় আসে। কেউ নিজ ইচ্ছায় এই পেশায় আসেনা। পেটের দায়ে তাকে এই পেশায় আসতে হয়। সেই যৌনকর্মী যখন সন্তান ভূমিষ্ঠ করে তখন তার সন্তানকে “অস্বাভাবিক” বলা হয়।

আমাদের গ্রামীন পরিবেশে আজো এক লোকের একসাথে ৩-৪ টা বিয়ে করার প্রথা আছে। এটা নাকি বিলাসিতা। এক্ষেত্রে অবশ্যই নারীদের ভোগপন্য হিসেবে ব্যবহার করা হয়। নারীরা ভোগপন্য এবং তাদের ভোগ করা বিলাসিতা! এক্ষেত্রে দেখা যায় দারিদ্র গোছের মেয়েরা শিকার হয়। তাদের যাবতীয় খরচ বহনের বিনিময়ে তারা তাদের স্বামীর “যৌন ক্ষুধা” মিটায়। “যৌন ক্ষুধা” এজন্যই কেননা একজন পুরুষের এক সাথে তিন-চারজন নারীর সঙ্গ অন্য কোন কারনে লাগতে পারেনা। এক্ষেত্রে বিবাহের কারনে ওই লোকের সন্তান স্বভাবিক হলে একজন যৌনকর্মীর সন্তান কেন স্বাভাবিক হবেনা। এক্ষেত্রে যৌনকর্মীর বহু লোকের সাথে সম্পর্ক স্থাপনটা কি প্রধান কারন? অবশ্যই না। কেননা “যৌন কর্মী” এর সংজ্ঞা হলো যারা যৌনসম্পর্ক স্থাপনের বিনিময়ে জীবিকা নির্বাহ করে। এখানে কোথাও একজন দুজন বা বহুপুরুষ কিছুই উল্লেখ নেই। “বিবাহ” এর কারনে তাদের সন্তান স্বাভাবিক হলে একজন যৌনকর্মীর সন্তানও স্বাভাবিক হবে। এটাই হওয়া উচিত।

এবার আসুন যেই বিবাহ এত সার্টিফিকেট দেয় তার সম্পর্কে কিছু জেনে নেই

অনেক সমাজে বিবাহ এর অর্থ হলো মেয়েকে একজন ছেলের হাতে তুলে দেওয়া। তার সমগ্র দায় ভার, স্বাধীনতা সবকিছু ছেলেটি ও তার পরিবারের হাতে বন্দি। অনেকটা মেয়েকে পরাধীন করে দেওয়া। কিছু কিছু সমাজ আবার মেয়েদেরকে যৌতুক দিয়ে ছেলের হাতে তুলে দেয়, যেটার অর্থ মেয়েকে নিয়ে যাও, মেয়ের সাথে লোভনীয় জিনিসপত্র পাবে! আবার বিবাহের সম্পর্ক বাঁচাতে কাবিন নামক একটা বিষয় আছে যেটা হলো সম্পর্ক ভাঙ্গতে হলে এই অর্থ তোমাকে দিতে হবে। এইটাও অনেকটা ব্যাবসায়িক পণ্যের মতো, নিচ্ছো ভালো কথা, ফেরত দিতে হলে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। যেই সম্পর্কে ব্যবসায়িক দিক ঢুকে যায় সেটা ভালো থাকে কিভাবে? যদিও এই জিনিসটা আনা হয়েছিল সম্পর্কটাকে মজবুদ করতে। “লিভিং ট্যুগেদার” ব্যাপারটা হলো দুইজনের ইচ্ছে অনুযায়ী একসাথে থাকা, যেখানে কোন বানিজ্যিক চিন্তা নেই। কিন্তু তাতেও সমস্যা। অনেকে ভোগ করার জন্য ভালোবাসার সম্পর্কে জড়িয়ে ভোগ করে বের হয়ে আসে।

সবকথার শেষকথা সবকিছুরই ভালো খারাপ আছে। “বিবাহ” তে ভূল থাকলে তারপরও তা অনেক শক্ত একটি সংস্কৃতি। তা না হলে যুগে যুগে টিকে থাকতে পারতোনা, যেমনটি ধর্ম টিকে আছে। তারপরও বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ না হয়ে পৃথিবীতে সন্তান আগমন করালে, এতে সন্তানটির দোষ কোথায়? সন্তানটিকে কেন তথাকথিত “পাপের বোঝা” বইতে হবে?

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

71 − = 64