মেষপালকের দিনগুলি পর্ব-১

অপেক্ষায় আমাদের শরীরে পচন ধরে, দগদগে ঘা থেকে পুঁজ বেড়িয়ে আসে কিংবা ফিনকির মত রক্তস্রোতধারা এবং আমরা ভাবি প্রত্যাবর্তনের কথা যদিও আমরা জানি এ শহরে তোমার কিংবা তোমাদের প্রত্যাবর্তন কেবল তোমাদের ইচ্ছাতেই হয় যেমনটা হয়েছিল সুপ্রাচীন রূপকথার গল্পে।

আমাদের শহরে বসন্ত নেমে আসে সন্ধ্যার কালো মেঘের মতন অথবা নূহের প্লাবনের মতন কিংবা বসন্ত হয়ত আসেইনা কখনও। তবু আমরা ফুল কিনে বাড়ি ফিরি এবং আমাদের শার্টের হাতায়, বোতামে, শাড়ির আঁচলে বসন্তের রঙ লেগে থাকে আর আমাদের মুখজুড়ে থাকে কেবল বিষাদগ্রস্ত স্বপ্ন। তারপর ৪শতকের শহরের ধূলো চাপা পড়ে, ভিজে যায় কিংবা পরিণত হয় চাপ চাপ কাদায় অথবা এসবের কিছুই হয়না যেটা ভেবে আশ্বস্ত বোধ করে জরাজীর্ণ বিষণ্ণ শহর। কেবল শহরের পুরোনো ঘরগুলোর ভেতরে চাপা পড়ে থাকা কিছু বিভ্রান্ত মানুষ কর্দমাক্ত হৃদয়ে পায়ের ছাপ খুঁজে পায় যা তারা খুঁজে বেড়ায় বহুবছর ধরে কিংবা হয়ত তারাও কিছু পায়না, পায় নাকি?

সেদিনের পর আবারও শহরে চাপ চাপ ধূলো, ধূলোর পরে ধূলো, ধূলোর পরে ধূলো আর পায়ের ছাপ ঢেকে যায় পায়ের ছাপের আড়ালে। পায়ের উপর পা, তার উপরে পা এবং তার উপরে পা। আমাদের পুরোনো শরীরের পুরোনো সব গন্ধ, হাতের স্পর্শ, ঠোঁটের নোনা স্বাদ কিংবা ভালোবাসার মত আর যা কিছু কাছে পাবার ছিল অথবা ছিলনা সবটুকুই ঢাকা পড়ে গেলে এক স্তব্ধতা গ্রাস করে ফেলে শ্যাওলা মোড়ানো শহরের ক্লান্ত-জীর্ণ সব রক্ত মাংসের শরীর অথবা বিষণ্ণ হৃদয়। সন্ধ্যা ডুবে যায় শহরের বুক বিদীর্ণ করে সুপ্রাচীন রূপকথার মতন তবু রাত্রি নামার আগে শহর জুড়ে নেমে আসে শুন্যতা আর শুন্যতার যত আয়োজন। আমরা তখন অপেক্ষায় থাকি আমাদের শরীরে তাদের মৃদু স্পর্শ কিংবা চুলের গন্ধ নিয়ে অথবা আমাদের হাতের মুঠোয় কেবলই অসমাপ্ত গল্পগাঁথা। আমরা অপেক্ষায় থাকি তাদের প্রত্যাবর্তনের অথবা পুনর্জন্মের। অপেক্ষায় আমাদের শরীরে পচন ধরে, দগদগে ঘা থেকে পুঁজ বেড়িয়ে আসে কিংবা ফিনকির মত রক্তস্রোতধারা এবং আমরা ভাবি প্রত্যাবর্তনের কথা যদিও আমরা জানি এ শহরে তোমার কিংবা তোমাদের প্রত্যাবর্তন কেবল তোমাদের ইচ্ছাতেই হয় যেমনটা হয়েছিল সুপ্রাচীন রূপকথার গল্পে।

অবশেষে শেষ বিকেলের রোদ-ধূলো মেখে তাহাদের পুনঃপ্রত্যাবর্তনের পথ ধরে আরও প্রসারিত ধূলিঝড় আর বাতাসের শনশন গল্পের পর আমরা এইসব জানতে পারি যে তাদের ক্ষণিকের আগমন এবং প্রত্যাবর্তন শহরের কোন শরীরে প্রত্যাখ্যাত হয়ে ফেরত যাবার সুযোগ পায়নাই অথবা হয়ত এইসব বুঝে উঠার আগেই প্রত্যাবর্তন কোন অনুভূতির সৃষ্টি করেনাই কিংবা আমরা হয়ত তার পায়ের আওয়াজ শুনতেই পাইনা কখনও। তার এবং আমাদের মধ্যকার সপর্কের টানাপোড়ন কিংবা সমস্ত অসংগতি আমাদের বিভ্রান্তিতে ফেলে এবং আমরা বিপন্ন বোধ করি অথবা শংকায় গ্রাস হওয়ার আগেই আমাদের কেউ কেউ কিংবা হয়ত আমরা সবাই বিল্পবের প্রয়োজন খুঁজে পাই। আমরা তখন তার অস্ত্বিত্ত অস্বীকারে প্রচন্ড হয়ে উঠি, আমাদের শিরায় শিরায়, পেশীতে পেশীতে প্রতিটি রক্তবিন্দু অস্বীকারে প্রচন্ড হয়ে উঠলে আমরা তাকে বিলুপ্ত ঘোষণা করলে তার মৃদু হাসি আমাদের দিকে প্রশ্ন ছুড়ে দেয় এবং আমরা জানতে পারি তিনি আমাদের দিকে তাকিয়ে হাসছেন কারণ আমরা তাকে অস্বীকার করি। আমরা তাকে অস্বীকার করি এবং অস্বীকার করি।
শহরের সমস্ত হৃদয় তার অবিশ্বাস মিছিলে মত্ত হয়ে পড়ে ঠিক যেভাবে এইসমস্ত হৃদয় তার বিশ্বাসে বিশ্বস্ত হয়েছিল এবং আমরা পুনিরায় বিভ্রান্ত হয় এই ভেবে যে তিনি কি কখনও এসেছিলেন, ছুঁয়েছিলেন আমাদের?

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

30 − = 23