মেষপালকের দিনগুলি পর্ব-২

শহরের পুরোনো কোন এক পথ ধরে নেমে আসে বিমর্ষ এক সন্ধ্যা যেমনটা কোনো এক কালে নেমে এসেছিল প্রভাতের প্রথম আলো অথবা যে আলোর দেখা আমরা পাইনি এখনও কিংবা এই বিষণ্ণতায় হারাবার প্রায় সাথে সাথেই আমরাও হারিয়েছি যেসব আমাদের ছিল।

অতঃপর এ শহরে সন্ধ্যা নেমে আসে, বিষণ্ণ, ম্লান, বেদনাতুর এক সুদীর্ঘ সন্ধ্যা। দালানের গায়ে হেলে পরা ছায়াগুলো মিলিয়ে যায় আমাদের হাতের উপরের হাতের মতই। শহরের দেয়াল থেকে দেয়ালে, সিলিং থেকে সিলিং এ ঝুলে পড়ে থাকে আমাদের পূর্ববর্তীদের শোকগাঁথা অথবা বিজয় মিছিল কিংবা হয়তো এসবের কিছুই ছিলনা কখনও যেমনটা আমরা কল্পনায় দেখেছি এই কানাগলিতে ছেয়ে যাওয়া শহরের বুকে। শহরের পুরোনো কোন এক পথ ধরে নেমে আসে বিমর্ষ এক সন্ধ্যা যেমনটা কোনো এক কালে নেমে এসেছিল প্রভাতের প্রথম আলো অথবা যে আলোর দেখা আমরা পাইনি এখনও কিংবা এই বিষণ্ণতায় হারাবার প্রায় সাথে সাথেই আমরাও হারিয়েছি যেসব আমাদের ছিল। তবু শহরের লোকেরা এইসব ভাবে যে জীবন এখনও সুন্দর অথবা প্রেমময় কিংবা প্রেমিকার বাহুতে খুঁজে পাওয়া যায় মুক্তি যদিও আমরা বহুকাল আগেই জেনেছি রবীন্দ্রপরবর্তী সময়ে এ শহরে আর কখনও যেমন প্রেমের দেখা মেলেনি তেমনি দেখা মেলেনি প্রেমিকার। তারপর তাই আবার এ শহরে সন্ধ্যা নেমে আসে, বিষণ্ণ, ম্লান, বেদনাতুর এক সুদীর্ঘ সন্ধ্যা।

বিকেলের শেষ রোদটুকু হাতের মুঠোয় মিলিয়ে যেতে যেতে তাদের অস্থিরতায় শহরের বুক বেয়ে গড়িয়ে পড়া নির্লিপ্ত সমস্ত প্রাণহীন প্রাণ ক্লান্তির চোখ বুজে ফেলবার কথা মনে করে অন্তত আরও একবার এইসব দেখার কথা ভুলে যাবার আগে চোখ মেলে তাকালে অমোঘ কিশোরীর সবুজ আঁচলে ঢেকে যায় শহরের সব পথ-ঘাট তাই ফেরিওলারা পুনরায় ফিরে আসে আঁচলের সীমানা ছুঁয়ে ছুঁয়ে যদিও এইসব আমাদের ছুঁয়ে যায়না কখনও। নির্বাক সকালে যে নিঃসঙ্গ কাক আমাদের ঘুম থেকে ডেকে তোলার আগের কোনো এক রাতেই আমরা হারিয়ে ফেলি শহরের সমস্ত রঙ অথবা রংহীন পিচগলা পথে শুন্যতার শাদা ফুল ফুটে থাকে বুনো কাঁটার মতন কিংবা সেইসব শাদা ফুল অথবা বুনো কাঁটার গল্প আমাদের ভাঙ্গা চায়ের কাপে প্রেমিকার ঠোঁটের ছোঁয়াচের মত জড়িয়ে রাখার নিগূঢ় অভিনয়ে মত্ত হয়ে গেলে আমরা সুপ্রাচীন কালের মত হারিয়ে যাই বিভ্রান্তির অরণ্যে। তখন শহরের সমস্ত ক্রন্দনমাখা পথে বেদনার মত ফুটে ওঠে জীবনের গল্প নয়তো আমরা এইরূপ ভেবে নিতে ভালোবাসি যে কোন এক শিল্পী এইসব এঁকে চলেছে ব্যর্থ প্রলাপের মতন। জরাগ্রস্ত বৃদ্ধ শহরতলীর মোটরযানে আটকে পড়া কুমারীরা তখন নীরবতা ভেঙ্গে আমাদের দিকে তাকালে তাদের সুগভীর নীল রঙ অথবা নীল রঙের আলো নিয়নের রাস্তায় মিটিমিটি জ্বলে উঠলে আমরা আরও একবার মিছিলের স্বপ্ন দেখি এবং মিছিলের উত্তপ্ত শব্দমালাকে আপন করে নিলে আমরা আবিষ্কার করি আমাদের হাত আর হাতের উপরের হাত। তখন সব আলো অচেনা হয়ে গেলে আমরা ফিরে আসি আবার চৈত্রের প্রকট আলোর মাঝে অথবা আমরা দরজায় দাঁড়িয়ে শুন্যে হাত মেলে রাখার কথা ভাবলে সোডিয়ামের আলোতে ধুয়ে যাওয়া কাকেদের দল আমাদের শুন্যতার গান গায়। তখন আমাদের ছেড়ে চলে যায় শহরের সমস্ত গুবরে পোকাদের দল এবং তাদের সমস্ত অনুসঙ্গ, যেভাবে চলে গিয়েছিল আমাদের সমস্ত প্রেমিকারা, কুমারীরা অথবা মরচে ধরা শহরের পথে মেলে থাকা সবুজ রঙের আঁচল। হয়তো তাই এই বিকেলের শেষ রোদটুকু আমরা আকন্ঠ পান করে নেবার আগে ভরে নেই অঞ্জলীতে যেভাবে নিয়েছিলাম আমাদের সমস্ত প্রেমিকাদের যারা আমাদের শহরের বুকে শুনিয়েছিল অপার্থিব প্রেমের গল্প আর আমরাও হয়তো ভালোবেসেছিলাম তাই।

সেদিন শহরের গভীর বর্ষায় ঢেকে যায় এইসব গল্পমাখা ফুটপাথ আর পথচারীদের দল আর কেউ কেউ বসে থাকে জানালায় প্রতিক্ষায় অনাহুত সোডিয়ামের আলোতে পুড়ে যাবার প্রার্থনায় মলিন জোছনা কিংবা হয়তো আর চাঁদ উঁকি দিয়ে তাকাবার অবকাশ পায়না আর মেঘেদের আড়াল থেকে তাই ক্লান্ত প্রতীক্ষার সমস্তকিছু জানালার ওপাশ থেকে পথে নেমে আসলে স্যাঁতস্যাঁতে কাদায় মাখামাখি সড়কের ব্যাস্ত জীবন থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে হেঁটে চলে আলো জ্বেলে জ্বেলে তবু নগরীর বুকে খুঁজে পায়না আর কোন পথিকের নিঃশ্বাস কিংবা বাতাসের শন শন কান্না অথবা কান্নার সমস্ত সুর এবং জীবনের সমস্ত আয়োজন এই আলোতে থেমে গেলে চাঁদ খসে পড়ে ফুটপাথে, পায়ের তলায়, ডাস্টবিনের ভেতরে বাইরে কি নিদারুণ অবহেলায়। তখন আমাদের অনাগত সন্তানেরা ঘুম থেকে জেগে উঠলে ম্রিয়মাণ এইসব চারপাশ আমাদের ভেতর যে অস্ফুষ্ট নীল বেদনার ক্ষত ঢেকেছিল ভালোবাসায় কিংবা ভালোবাসার নিপুণ চতুরতায় সেইসব চাপা পড়ে পুরোনো পুরোনো শত শত প্রশ্নের মাঝে নয়তো আমরা কেবলই খুঁজে বেড়াই তার উত্তর যদিও আমাদের তখনও খুঁজে পাওয়া হয়নি একটিমাত্র প্রশ্ন যার অপেক্ষায় প্রাচীন নগরীর ক্লান্ত সব প্রেমিক বদলে গিয়েছে জীর্ণ ভাস্কর্যে অথবা অন্ধত্ব তাদের বরণ করেছে আর বিভ্রান্তির বিষাদমাখা ডানায় ভর করে হারিয়েছে সমস্ত প্রেমিকারা বেদনাতুর নির্বাক হলুদ পাতাদের মতন আর ঘুমিয়েছে পাতা কুড়ানিদের ছিন্ন মোড়কে অথবা হয়তো এ শহরে কখনও ছিলোনা আমাদের প্রেমিকেরা কিংবা প্রেমিকারা তবু কোন ক্লান্তিতে ডুবে গেলে পেঁচাদের মায়ায় জেগে উঠে এই সন্তানেরা যার উত্তর খুঁজে না পেতে পেতে আমরা কেবলই সন্দিহান হয়ে উঠি এই রাত, রাতের আকাশ, জোছনা আর নক্ষত্রের মত সবকিছু নিয়ে যা কিছু আমাদের গভীর ভালোবাসায় নিষিক্ত করছিল।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

88 − 84 =