এসো, শূয়রের বাচ্চাদের দেখে আসি

একটু পরেই ধারেকাছে শুরু হলো গোলাগুলি। আর সে-কী ভয়ংকর শব্দ! কানে তালা লেগে যাওয়ার মতো অবস্থা আরকি!
গোলাগুলির শব্দ শুনে বাবা বললেন, “ওই তো অভিযান মনে হয় শুরু হয়ে গেছে। শূয়র-মারার অভিযান। আর শূয়রদের মারতে হয়তো ঢাকা থেকে র‌্যাবও এসে গেছে।”
মা বাবার সঙ্গে সুরমিলিয়ে বললেন, “শিপু, আজ তুই কোথাও যাবি না। দেখলি তো, তোর বাবা ঠিকই বলেছেন। অনেক শূয়র ঢুকেছে হয়তো শহরে। তাই, সেনাবাহিনী নামানো হয়েছে। এখন বাইরে বের না হওয়াই ভালো। তারচে তুই ঘরে বসে টিভি দ্যাখ, বাবা।”

এসো, শূয়রের বাচ্চাদের দেখে আসি
সাইয়িদ রফিকুল হক

বিকালে মাঠে ক্রিকেট খেলতে যাবো। দুপুরে খাবার শেষ করেই তার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। এমন সময় দেখলাম বাবা বাসায় ফিরেছেন। হঠাৎ এইসময় বাবাকে দেখে একটু অবাক হলাম। আর খুব ঘাবড়ে গেলাম। কারণ, বাবা বাসায় থাকলে বিকালে অহেতুক ক্রিকেট খেলাটাকে পছন্দ নাও করতে পারেন।
তাই, আম্মা বাসার গেট খুলে বাবাকে ভিতরে প্রবেশ করাতেই আমি খুব মনমরা হয়ে গেলাম। আর খুব দুশ্চিন্তার ভিতর দিয়ে নানারকম চিন্তাভাবনা করতে লাগলাম।
আর দেখলাম, আম্মা ডাইনিংটেবিলের একটা চেয়ার টেনে সেখানেই বসে পড়লেন। মা’র দেখাদেখি বাবাও একটা চেয়ার টেনে সেখানে বসে পড়লেন। আর আমিও তাদের পাশে দাঁড়ালাম।

আজ আমার বাবাকে খুব চিন্তিত মনে হচ্ছিলো। আর মনে হচ্ছিলো: তিনি যেন আমাদের জন্য খুব গুরুতর একটা দুঃসংবাদ বয়ে এনেছেন। তার হাবভাব আমাদের তা-ই বলে দিচ্ছিলো। এতে আমি আরও মুষড়ে পড়লাম। আর ভাবলাম: আমার আজকের খেলাটা বুঝি গোল্লায় যাচ্ছে!
বাবা কিছু বলার আগেই আম্মা মোলায়েম-সুরে বাবাকে বললেন, “হঠাৎ এসময় তুমি বাসায় ফিরলে যে! শরীর খারাপ করেনি তো?”
বাবা ফ্যানের বাতাসে ততক্ষণে বেশ সতেজ কিন্তু খুব মনমরা হয়ে বললেন, “আর বোলো না। এতোদিন তো এই শহরে শান্তিতেই ছিলাম। কিন্তু এখানেও নাকি শূয়র ঢুকেছে! কতকগুলো হিংস্রশূয়র মারার জন্য ঢাকা থেকে নাকি র‌্যাব-সেনাবাহিনীর লোকজন আসছে। নইলে এই শূয়রদের নাকি কিছুতেই দমন করা যাবে না। খুব ভয়ংকর শূয়র এরা!”
মা বললেন, “বলো কি! এই শহরে তো আগে কোনো শূয়র ছিল না। আমি নীলি-কে আজ কতদিন হলো স্কুলে নিয়ে যাচ্ছি। কই কোনোদিন তো শূয়র দেখিনি!”
নীলিমা আমার ছোটবোন। মা ও-কে আদর করে ‘নীলি’ বলে ডাকে। ও স্থানীয় গার্লস-স্কুলে ক্লাস সেভেনে পড়ে।
আম্মার কথা শুনে বাবা বললেন, “দেখোনি এখন দেখবে। এগুলো নতুন-জাতের শূয়র। এগুলো সবজায়গায় দেখা যায় না। তবুও আমাদের সাবধানে থাকতে হবে।”
তারপর বাবা আমার দিকে তাকিয়ে স্নেহের সুরে বললেন, “শিপন, তুই আজ আর বাইরে কোথাও যাসনে বাবা। খবরটা শোনার পর থেকে আমি অফিস থেকে ছুটি নিয়ে চলে এসেছি। আমি চাই না তোদের কোনো ক্ষতি হোক।”

একটু পরেই ধারেকাছে শুরু হলো গোলাগুলি। আর সে-কী ভয়ংকর শব্দ! কানে তালা লেগে যাওয়ার মতো অবস্থা আরকি!
গোলাগুলির শব্দ শুনে বাবা বললেন, “ওই তো অভিযান মনে হয় শুরু হয়ে গেছে। শূয়র-মারার অভিযান। আর শূয়রদের মারতে হয়তো ঢাকা থেকে র‌্যাবও এসে গেছে।”
মা, বাবার সঙ্গে সুরমিলিয়ে বললেন, “শিপু, আজ তুই কোথাও যাবি না। দেখলি তো, তোর বাবা ঠিকই বলেছেন। অনেক শূয়র ঢুকেছে হয়তো শহরে। তাই, সেনাবাহিনী নামানো হয়েছে। এখন বাইরে বের না হওয়াই ভালো। তারচে তুই ঘরে বসে টিভি দ্যাখ, বাবা।”
কথা শেষ করে আম্মা নিজেই টিভি অন করলেন। আর তখনই আমরা দেখতে পেলাম বিশেষ সংবাদ-বুলেটিনে বারবার দেখাচ্ছে, শহরের কয়েকটি ভবনে নাকি অজ্ঞাতনামা জঙ্গিরা আশ্রয় নিয়েছে।
খবর দেখেশুনে মা বললেন, “কী সাংঘাতিক! এরাই তাহলে শূয়র!”
এমন সময় বাবা কাছে এসে বললেন, “হ্যাঁ, এরাই তো শূয়র। জঙ্গি-শূয়র। আর নতুন-জাতের শূয়র। আর পৃথিবীতে এরাই সবচেয়ে হিংস্রশূয়র!”
বুঝলাম আজ কিছুতেই আর বাইরে বের হওয়া যাবে না।

অবশ্য একটু পরে বন্ধুদের ফোন পেলাম। ওরা জানালো: শহরে নাকি কোথায় জঙ্গিরা ঘাঁটি গেড়েছে। তাই, আজকের ম্যাচ বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে। এতক্ষণে আমি বুঝতে পারলাম। আমার বাবা কাদের কেন শূয়র বলেছেন। এই শূয়ররা শহরে ঢুকতে-না-ঢুকতেই বিরাট গণ্ডগোল বাঁধিয়েছে।

সন্ধ্যার আগে পরিস্থিতি আরও খানিকটা থমথমে মনে হলো। আমরা সবাই ড্রইংরুমে বসে টিভি দেখছিলাম। এমন সময় বাবা বললেন, “কয়েকটা শূয়রের বাচ্চা নাকি একটু আগে মারা গেছে। তোমরা এসো, শূয়রের বাচ্চাদের দেখে আসি।”

সাইয়িদ রফিকুল হক
মিরপুর, ঢাকা, বাংলাদেশ।
৩০/০৩/২০১৭

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 8 = 2