প্রভু

প্রভু যখন বেলা দশটা-এগারোটার দিকে পুবমুখো হয়ে ছাদের তারে ভেজা দীর্ঘ ধুতিগুলো মেলে দিতো, তখন ওর শ্যামবর্ণ কপাল আর মুণ্ডিত মাথার সামনের অংশ চকচক করতো রোদ্দুরে; ক্ষণে ক্ষণে বাতাসে দোদুল্যমান ভেজা ধুতির ছায়া পড়তো মুখে-মাথায়, পুনরায় পড়তো রোদ্দুর। ন্যাড়া মাথায় যেদিন তেল দিতো, সেদিন আরো বেশি চকচক করতো। মাথার তেল চুইয়ে মুখমণ্ডলও তেলতেলে হয়ে থাকতো। কোনো সুগন্ধি তেল নয়, খাঁটি অথবা ভেজাল সরিষার তেল হয়তো মাখতো। অল্প অথবা জোর বাতাসে ওর মুণ্ডিত মাথার পিছনের পাঁচ-ছয় ইঞ্চি মতো লম্বা টিকির চুলগুলো ঘাড়ের কাছে মৃদুমন্দ উড়তো অথবা আছাড়ি-পিছাড়ি করতো। আবার কখনও কখনও গিঁট দিয়ে টিকিটা শাসনেও রাখতো। বিশেষত ও যখন বাইরে যেতো, তখন গিঁট দিয়েই রাখতো। বাইরে যাবার সময় কপালে এবং নাকে থাকতো বেশ বলিষ্ঠ তিলক। স্নানের পরই ও হয়তো তিলক কাটতো, যে কারণে প্রায় সারাদিনই তিলক থাকতো ওর কপালে, গলাতেও থাকতো পূর্ণিমার চাঁদের মতো একটা তিলকের ফোঁটা আর তুলসীমালা।

আমি থাকতাম পাঁচতলায় আর প্রভু নিচতলায়! আসতে-যেতে কখনও কখনও প্রভুর সঙ্গে দেখা হতো। কাজের অবসরে অথবা ছাদে ভেজা কাপড় মেলতে এলে প্রভু কখনও কখনও আমার দরজায় কড়া নাড়তো। বিকেলে, সন্ধ্যায়, কিংবা রাতে বিদ্যুৎ চলে গেলে আমি যখন ছাদে হাঁটতাম, তখন প্রায়শই প্রভু ছাদে এসে আমার সাথে আলাপ জমানোর চেষ্টা করতো। আমার একাকীত্বের সময়টুকু প্রনষ্ট হতো বলে প্রথম প্রথম আমি কিছুটা বিরক্ত হতাম কিন্তু প্রকাশ করতাম না। পরের দিকে বিরক্তিভাব উবে গিয়েছিল প্রভুর সরলতা আর ওর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য দেখে।

প্রভু, মানে দেবাশিষ; কৃষ্ণভক্ত দেবাশিষ মণ্ডল। একুশ-বাইশ বছরের তরুণ। ও আমাকে প্রভু এবং আপনি বলে সম্বোধন করতো। আমার চেয়ে বয়সে বেশ ছোট হওয়ায় আমি ওকে প্রভু বলে সম্বোধন করলেও তুমি বলতাম। প্রভু বললে ও খুব খুশি হতো বলে আমি ওকে খুশি থেকে বঞ্চিত করতাম না। ওর জীবনের একমাত্র চাওয়া, জীবনের ধ্যান-জ্ঞান ছিল নদের নিমাই অর্থাৎ শ্রী চৈতন্যের লীলাভূমি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার মায়াপুরের ইস্কন মন্দিরে চলে যাওয়া এবং সেখানেই কৃষ্ণসেবায় বাকি জীবন অতিবাহিত করা।

একদিন ছাদে হাঁটতে হাঁটতে বললাম,‘তুমি মায়াপুরে গিয়ে কী করবে প্রভু?’
‘যা কাজ দেয় তাই করবো। প্রভুদের সেবা করবো। দরকার হলে পায়খানা-প্রসাব পরিষ্কার করবো। মায়াপুর শ্রী চৈতন্যের লীলাভূমি, সে এক স্বপ্নের জায়গা প্রভু!’
প্রভু একদম প্রমিত বাংলায় কথা বলার চেষ্টা করতো। কখনও কখনও দু’চারটে শব্দ এদিক-ওদিক হতো, গোপালগঞ্জ অঞ্চলের টান চলে আসতো। কিন্তু ওর আপ্রাণ চেষ্টা থাকতো একেবারে বইয়ের ভাষায় কথা বলার। ভালভাবে লক্ষ্য করলে বোঝা যেতো ওর এই চর্চার শুরু খুব নিকট অতীতে। ওর মুখে মায়াপুরের কথা শুনে বললাম,‘আমি তো গিয়েছি মায়াপুর।’
‘সত্যি প্রভু!’
ওর চক্ষু স্থির, দৃষ্টিতে অপার বিস্ময়! পা থেমে গেছে, এক কদম এগিয়ে আমিও থেমে ওর দিকে ঘুরে তাকাই।
ও বিস্ময়াবিভূত কণ্ঠে আবার বললো,‘সত্যি প্রভু! আপনি মায়াপুর গিয়েছেন?’
‘হ্যাঁ গিয়েছি। ঘুরে ঘুরে মন্দির দেখেছি। তারপর দুপুরে ওখানে খেয়েছি।’
‘ও মা গো! হায় ঈশ্বর! আপনি আগে বলবেন না প্রভু! আপনি মায়াপুরের প্রসাদ গ্রহণ করেছেন! আপনার চরণ মায়াপুরের পবিত্র ভূমি ছুঁয়ে এসেছে, আপনার চরণ ছুঁয়ে প্রণাম করি!’
ওর উচ্ছ্বাসের প্রাথমিক ধাক্কাটা ছিল আর্তনাদের মতো!

তখন সময়টা গোধূলি। দিনের কোলাহল শেষে সরকারী ডি-টাইপ কোয়ার্টার, বাংলা কলেজের পিছনের কোয়ার্টার, ছাত্রাবাসের আশপাশের গাছগুলোতে ফিরছিল পাখিরা। পুকুরপাড়ের তালগাছ গুলোর আবাসিক বাসিন্দা চামচিকার ঝাঁক শেষবারের মতো আমাদের মাথার ওপর দিয়ে উড়ে উড়ে ডানার জড়তা কাটিয়ে নিচ্ছিলো। তালপাতায় ঝুলন্ত বাবুই পাখির বাসার দুয়ারে উঁকি-ঝুঁকি মারছিল বাবুই দম্পতি। পুকুরের জলের আয়নায় ঝুঁকে পড়ে শেষবারের মতো মুখ দেখে নিচ্ছিলো কয়েক জায়গায় কাঠঠোকরায় গর্ত খোঁড়া শীর্ণ নারকেল গাছটি। কৃষ্ণচূড়া গাছের থোকা থোকা ফুলগুলো যুবতীর কাঁচুলিতে বুক ঢাকার মতো অন্ধকার টেনে নিচ্ছিলো বুকে অথবা কৃষ্ণচূড়ার বুক থেকেই আলোর শেষ আভাটুকুও শুষে নিচ্ছিলো কিছু আগে ডুবে যাওয়া সূর্য।

আমি কিছু বুঝে উঠার আগেই প্রভু হাঁটু মুড়ে বসে আমার পা স্পর্শ করলো দু’হাতে। ওর চোখে মুখে উপচে পড়া বিস্ময়! বিব্রত আমি ওকে হাত ধরে টেনে তুললাম। ওর এই এক বিস্ময় বাতিক! গাছের পাতাটি পড়লেও যেন বিস্মিত হতো, আর শিশুর মতো হাততালি দিয়ে হেসে উঠতো। অবশ্য ওর এই বিস্ময় প্রকাশের মধ্যে কোনো ভণিতা ছিল না, ছিল না আরোপিত কিছু; পুরোটাই ওর স্বভাবের একান্ত নিজস্ব সরলতা। সেদিনই গভীরভাবে উপলব্ধি করলাম, মায়াপুর আমার কাছে যা, প্রভু কিংবা ওর মতো আরো অনেক কৃষ্ণভক্তের কাছে তা নয়। মায়াপুরের ইস্কন মন্দির আমার দৃষ্টিতে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের নেহাতই এক সাধারণ তীর্থস্থান; কিন্তু প্রভুদের কাছে আরো বেশি কিছু, হয়তো পৃথিবীতে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের হেড কোয়ার্টার ধরনের কিছু, যেখানে মেলে স্বর্গের টিকিটের লোভনীয় হাতছানি!

বাসার নিচতলায় ইস্কনের কৃষ্ণভক্ত কিছু ছেলে থাকতো। ওরা লেখাপড়া করতো আর কৃষ্ণনাম প্রচার করে বেড়াতো। হয়তো মিরপুর অঞ্চলে শ্রীকৃষ্ণের মহিমা প্রচারের দায়িত্ব ছিল ওদের ওপর। এর জন্য ইস্কন থেকে আর্থিক সাহায্য পেতো ওরা। মাঝে মাঝে ধর্ম প্রচারের কাজে বিভিন্ন মফস্বল শহর এবং গ্রামে-গঞ্জে যেতো। আবার ইস্কন থেকেও ন্যাড়া মাথার টিকিওয়ালা বেশ রাশভারী প্রভুর দল আসতো ওদের বাসায়। সন্ধ্যাবেলা কীর্তন হতো, ধুপ আর ধূপকাঠির গন্ধে মৌ মৌ করতো গলির শেষ মাথাটা। ধর্ম প্রচারের কাজে ছেলেগুলো ছিল দারুণ প্রশিক্ষিত। খোঁজ করে করে হিন্দু বাসাগুলোতে যেতো এবং তাদেরকে বোঝানোর চেষ্টা করতো-‘শ্রী কৃষ্ণের পথে আসুন প্রভু। তিনি ছাড়া মানবজাতির উদ্ধার নেই। সকল দেবতার উপরে আছেন ঐ একজন, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ।’

এটুকু বলে শ্রীকৃষ্ণের উদ্দেশে ওপর দিকে প্রণাম করতো। সবাইকেই ওরা প্রভু সম্বোধন করতো। ওদের ডান হাতের কব্জি থাকতো থলের ভেতর, আঙুলে জপমালা, কেবল থলের ওপরদিকের ফাঁকা দিয়ে তর্জনীটা থাকতো বাইরে। তারপর আবার বলতে শুরু করতো-‘এতো এতো দেবতাকে ভজনের কোনো দরকার নেই প্রভু। আপনি একবারে শ্রীকৃষ্ণের চরণেই ফুলটি দিন, তিনি-ই আপনার অর্পণ গ্রহণ করবেন। শ্রীকৃষ্ণ দয়াময়, মন থেকে ডাকলে তিনি ভক্তকে নিরাশ করেন না! তাছাড়া আপনি যে দেবতার চরণেই ফুলটি দিন না কেন, সেটা শ্রীকৃষ্ণের চরণেই পড়ে। ধরুন, আপনার সামনে যদি একবারে প্রধানমন্ত্রীর কাছে যাবার সুযোগ থাকে, তবে কেন আপনি সাধারণ পাতি নেতা কিংবা সাংসদ ধরতে যাবেন! আপনার যা বলার, আপনার যা চাওয়ার সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর কাছেই চান না! তেমনি পূজা-পার্বণ করে অন্য দেবতাকে তুষ্ট করতে না চেয়ে আপনি একবারে ভগবান শ্রী কৃষ্ণের চরণে ফুলটি দিন, তিনি-ই আপনাকে দেখবেন!’

তখন আমার চোখে ভাসতো হাড় জিরজিরে ক্ষুধার্ত শিশু, যারা অনরবত মাথা আর গায়ের খুঁজলি চুলকায়, ক্ষুধার জ্বালায় খ্যান খ্যান করে কাঁদে, অথচ তাদের বাবা-মা দিনে অসংখ্যবার শ্রীকৃষ্ণকে ডাকে। আমার চোখে ভাসতো সেইসব শীর্ণ বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, সারাজীবন দারিদ্রের সাথে ঝুঝতে ঝুঝতে যারা কান্ত-অবসন্ন, তবু কৃষ্ণকে ডাকতে ভোলেননি কোনোদিন। কেউ খোলা আকাশের নিচে, কেউ ফাইওভারের নিচে, কেউ অসংখ্য ছিদ্র তাঁবুর নিচে, আবার কেউবা ঝাঁঝড়া টিনের ছাপড়ার নিচে বসে, ময়লা তেলচিটে কাপড় পরে আর আধপেটা খেয়ে এখনও কৃষ্ণনাম জপছেন; কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ কোনোদিন তাদের দ্যাখেনি অথবা দেখার সময় হয়নি তার, এখনও হয় না।

এই কৃষ্ণভক্ত ছেলেদের দু’জন একদিন বাসায় এসেছিল। আমার ঘরে বসে কৃষ্ণের গুণকীর্তন করলো কিছুক্ষণ, শুনলাম। তারপর আমাকে স্বামীবাগ ইস্কন মন্দিরের সদস্য হবার জন্য তোষামোদ করতে শুরু করলো। আমি ভাল কাজ করলে মায়াপুর, ইংল্যান্ড, আমেরিকা, রাশিয়াতেও যেতে পারবো এমন প্রলোভনও আমাকে দেখালো। আমি মনে মনে হাসলাম, আমার ছেড়ে আসা ব্যাংকের মার্কেটিং এর চাকরিটার কথা ভেবে। ওখানেও ভাল কাজ করলে কমিশন আর প্রমোশনের প্রলোভন ছিল। আমি সাকুল্যে নয়দিন করেছিলাম চাকরিটা।

অনেকক্ষণ ওদের কথা শোনার পর আমি শুরু করলাম প্রশ্ন, প্রশ্নের পর প্রশ্ন আর পাল্টা যুক্তি। আমার প্রশ্নবাণে জর্জরিত হয়ে অবশেষে ওরা আহত, রক্তাক্ত হৃদয়ে এই বলে চলে গেল যে, ‘প্রভু, আপনি বুঝবেন, কিন্তু সময় থাকতে বুঝবেন না। যখন বুঝবেন, তখন আর সময় থাকবে না।’

এরপর ওরা নিজেদের মধ্যে প্রায়ই আমার সমালোচনা করতো। আমাকে নাস্তিক, হিন্দু সমাজের কলঙ্ক, কুলাঙ্গার ইত্যাদি বলতো। আমি প্রভু’র কাছ থেকে জেনেছি এসব। ব্যাপারটা সত্য, কেননা প্রভু মিথ্যা বলার ছেলে না। আর ঐ ঘটনার পর থেকে রাস্তায় দেখা হলেও কৃষ্ণভক্ত ছেলেগুলো আমার সাথে কথা বলতো না, আমার ছায়াও মাড়াতো না। অবশ্য ওদের ঐ নির্বোধ সমালোচনায় আমার রাগ হতো না, বরং হাসি পেতো। ওরা নিজেরাই যে নিজেদের মানে না! জগাই-মাধাইয়ের কাছে কলসির কানা’র আঘাত পেয়ে রক্তাক্ত নিত্যানন্দ যে বলেছিলেন,‘মেরেছিস কলসির কানা, তাই বলে কি প্রেম দেব না!’
কলসির কানা দূরে থাক, ওরা আমার যৌক্তিক যুক্তিই সইতে পারলো না!

এই ছেলেদেরই কেউ একজন গ্রাম থেকে নিয়ে এসেছিল প্রভুকে। গ্রামের সহজ-সরল কাদামাটির যুবক প্রভু। গ্রামেও আমি এমন সরল যুবক দেখিনি। আমার সারাজীবনে কোথাও দেখিনি। প্রভু নিচতলার ঐ ছেলেদের জন্য রান্না করতো, ঘর-দোর পরিষ্কার করতো, ওদের কাপড়-চোপড় ধুয়ে দিতো। এর জন্য মাসে তিন হাজার টাকা পেতো সে, টাকাটা পাঠিয়ে দিতো গ্রামে, ওর দরিদ্র পিতার কাছে। নিচতলার কৃষ্ণভক্ত ছেলেরা মাঝে মাঝে ওকে বকাঝকা করতো। বকাঝকা করলে ও ছাদে এসে মন খারাপ করে বসে অথবা হাঁটতে হাঁটতে থলের ভেতরে হাত ঢুকিয়ে মালা জপ করতো।

একদিন ওর বিষন্নতা লক্ষ্য করে বললাম, ‘তোমার মন খারাপ কেন প্রভু?’
ও নিস্পৃহ গলায় বললো, ‘এমনি।’
‘ওরা বকাঝকা করেছে?’
প্রভু হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়লো। আবার জিজ্ঞেস করলাম, ‘কেন বকেছে?’
প্রভু আমাকে অবাক করে দিয়ে বললো, ‘আমি বলদ, এই জন্য!’
‘কে বললো তুমি বলদ?’
‘হায় ঈশ্বর! প্রভু আপনি জানেন না আমি বলদ!’
‘না তো।’
‘সবাই জানে আমি বলদ আর আপনি জানেন না প্রভু! আমি বোকা তো, এই জন্য সবাই আমাকে বলদ বলে। রাগ হলে বাসার প্রভুরা সবাই আমাকে বলদ বলে, আমাদের গ্রামেও সবাই আমাকে বলদ বলতো। হায় ঈশ্বর! আপনি জানেন না প্রভু!’
‘তোমাকে সবাই বলদ বলে, তোমার খারাপ লাগে না?’
‘না।’
‘কেন?’
‘আমি তো সত্যিই বলদ। আজ কি করেছি জানেন প্রভু, নিরামিষে দু’বার লবণ দিয়েছি। খেতে বসে সবাই আমাকে বকা দিয়েছে।’
তবে সবাই প্রভুকে বলদ বললেও প্রভুর বুদ্ধি একটু একটু করে খুলছিল ঢাকা শহরের আলো-হাওয়ায়। মানুষের সঙ্গে মেলামেশার সুযোগ পাচ্ছিল। সপ্তাহে একদিন স্বামীবাগ ইস্কন মন্দিরে যেতো, কখনও কৃষ্ণভক্ত ছেলেদের সাথে আবার কখনও একাই।

এক পূর্ণিমা রাত অথবা রাতটি ছিল পূর্ণিমা রাতের নিকট পড়শি। আকাশে ঝকঝক করছিল চাঁদ। সাদা রঙের বাড়িগুলোর গায়ে, বাংলা কলেজের পিছনের পুকুরের জলে হেসে গড়িয়ে পড়ছিল জ্যোৎস্না । সুযোগ পেয়ে জলের আয়নায় মুখ দেখে নিচ্ছিল পুকুরপাড়ের তালগাছ, নারকেলগাছ, কৃষ্ণচূড়া, আর পোয়াতী সজনে গাছটিও।

বিদ্যুৎ ছিল না। আমি ছাদে বসে ফোনে কথা বলছিলাম। প্রভু হাঁটছিল। আমার কথা বলা শেষ হলে প্রভু আমার কাছে এসে দাঁড়ালো, ওর ছায়া পড়লো আমার গায়ে। প্রভু আমার উদ্দেশে বললো, ‘আকাশে কি সুন্দর চাঁদ, কি সুন্দর চাঁদের আলো! দারুণ আশ্চর্য ব্যাপার, তাই না প্রভু?’
বলেই ও হেসে হাততালি দিল খুশিতে-বিস্ময়ে। তখন ওর হাতে জপমালার থলেটা ছিল না। আমি বললাম, ‘হ্যাঁ, আলোটা সুন্দর, কিন্তু চাঁদের নিজস্ব কোনো আলো নেই।’
‘কি বলছেন প্রভু, এই তো কি সুন্দর চাঁদের আলো!’
‘এই আলো চাঁদের না, সূর্যের আলোর প্রতিফলন।’
‘প্রতিফলন কী প্রভু?’
‘তোমার মোবাইলে লাইট জ্বলে?’
‘হ্যাঁ।’
‘দাও।’
আমি ওর মোবাইলটা আমার ডান হাতে নিয়ে লাইট জ্বাললাম, তারপর বাঁ হাতে রাখা আমার মোবাইলের স্ক্রিনে আলো ফেলে, সেই আলোর প্রতিবিম্ব ফেললাম ওর মুখে। এরপর বললাম, ‘ধরো তোমার মোবাইলের আলোটা সূর্যের আলো, আমার মোবাইলটা চাঁদ, আর তোমার মাথাটা আমাদের এই পৃথিবী। আমার মোবাইলে তোমার মোবাইলের আলো পড়ে যে আলোটা তোমার মুখে লাগছে সেটাই তোমার মোবাইল অর্থাৎ সূর্যের আলোর প্রতিফলন। আমার মোবাইলের কোনো আলো নেই দ্যাখ, তেমনি চাঁদেরও আলো নেই, ওটা সূর্যের আলোর প্রতিফলন।’
‘হায় ইশ্বর! ব্যাপারটা সত্য প্রভু?’
‘হ্যাঁ, সত্য। কেন তুমি বইয়ে পড়োনি?’
‘আমি তো কাস ফাইভে উঠে আর পড়িনি প্রভু। পড়া আমার মাথায় ঢুকতো না। স্যাররা আমাকে শুধু কান ধরে দাঁড় করিয়ে রাখতো আর বেত দিয়ে মারতো।’
ও বিস্ময়ে আবার চাঁদের দিকে তাকালো। কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকার পর বললো, ‘প্রভু এতোদিন জেনেছি এই আলো চাঁদের। তারপর ঐ যে চাঁদের ভেতর কালো কালো দেখা যায়, তিনি নাকি চাঁদের মা বুড়ি। আমার ঠাকুমা বলেছিলেন,
“চাঁদের মা বুড়ি খায় গোটা দুই মুড়ি
ঠ্যাঙের ওপর ঠ্যাঙ তুলে বাজায় গুড়গুড়ি।”
হায় ইশ্বর, সব মিথ্যে!’

আমি যেমন প্রভুকে অবিশ্বাস করি না, তেমনি প্রভুও আমাকে অবিশ্বাস করে না। একদিন আমার ঘরের বুকসেল্ফের বই দেখে প্রভুর চোখ কপালে উঠেছিল! বলেছিল, ‘প্রভু, সব বই আপনার?’
‘হ্যাঁ।’
‘সব বই আপনি পড়েছেন?’
‘হ্যাঁ, পড়েছি।’
‘হায় ঈশ্বর, আপনি তো আমাদের গ্রামের হেডমাস্টারের চেয়েও বেশি জ্ঞানী, ওনার বাড়িতেও এতো বই নেই!’
ওর বলার ধরন দেখে আমি খুব হেসেছিলাম। ওর দেখা পৃথিবীতে জ্ঞানীর সীমা হয়তো ওদের গ্রামের হেডমাস্টার ভদ্রলোক! তারপর থেকেই আমার ওপর ওর আস্থা জন্মেছে।
আমি আবার বললাম, ‘জানো, চাঁদে মানুষ গিয়েছিল?’
‘সত্যি প্রভু!’
‘হ্যাঁ।’
‘চাঁদে মানুষ গিয়েছিল? চাঁদে যাওয়া যায়?’
‘হুম, ১৯৬৯ সাথে সর্বপ্রথম চাঁদের মাটিতে পা রেখেছিলেন নীল আমস্ট্রং। তারপর…’
আমার কথা শেষ না হতেই ওর প্রশ্ন, ‘প্রভু, তিনি কি হিন্দু?’

ওর প্রশ্ন শুনে আমি হাসলাম, কিন্তু অবাক হলাম না। অবাক হলাম না এই জন্য যে, আমাদের এই উপমহাদেশের অধিকাংশ মানুষের মধ্যে অত্যাধিক মাত্রায় জাত-পাতের বাতিক আছে। কেউ কোনো বিষয়ে সাফল্য অর্জন করলে, কিংবা প্রশংসনীয় কিছু করলে আগে জানতে চায় সে হিন্দু না মুসলমান। নিজের জাতের হলে ভীষণ খুশি হয়, অন্য জাতের হলে ত্রুটি খোঁজার চেষ্টা করে এবং ত্রুটি বের করেও ফেলে। প্রভুও ঐ কু-স্বভাবটা নিয়েই বেড়ে উঠেছে। দোষ ওর নয়, দোষ সমাজের।
আমি বললাম,‘না, তিনি মানুষ।’
‘হিন্দু মানুষ, না মুসলমান মানুষ?’
‘তিনি ধর্ম বিশ্বাস করতেন কিনা আমি জানি না। ওনার সঙ্গে আরো দু’জন চাঁদে গিয়েছিলন মাইকেল কলিনস এবং এডুইন ইউজিন অলড্রিন। পরে আরো অনেকেই গেছেন চাঁদে।’
‘তারা কেউ হিন্দু ছিলেন?’
‘না।’

প্রভু বিস্ময়ে চাঁদের দিকে তাকিয়ে রইলো। মনে মনে কি ভাবলো কে জানে! তবে তিন অভিযাত্রী হিন্দু হলে যে ও খুব খুশি হতো, ফুটফুটে জ্যোৎস্নায় ওর মুখের অভিব্যক্তি দেখেও তা বোঝা গেল। আমিও চাঁদের দিকে তাকালাম, ঐ তিনজন সহ আরো অনেকজন অহিন্দু-অমুসলিম অভিযাত্রীর পদস্পর্শ পাওয়া চাঁদের মাটি ছুঁয়ে আসা আলোয় ভেসে যাচ্ছে গোটা পূর্ব পৃথিবীর সকল মন্দির, মসজিদ, গুরুদুয়ারা ইত্যাদি তাবৎ ধর্মীয় উপাসনালয়। অথচ আমার বোনকে এক মুসলমান বাড়িওয়ালা বাড়িভাড়া দেয়নি, কারণ তাদের দোতলার ঘরে কোরান শরীফ আছে, তাই কোরান শরীফের ওপরে চারতলায় কোনো হিন্দু ভাড়া দেওয়া নাকি গুণাহ্!

প্রভু ছাদে এলে কখনও আকাশের দিকে, কখনও বাংলা কলেজের পিছনের গাছপালা, পুকুর অথবা দিগন্তের দিকে তাকিয়ে থাকতো, কি যেন ভাবতো, তারপর আচমকা একেকটি প্রশ্ন ছুড়ে দিতো আমার দিকে। প্রশ্ন করার পর ওর চোখের পলক পড়তো না বেশ কিছুক্ষণ, আর দু-ঠোঁটের ফাঁকে এক-দেড় আঙুল ফাঁকা থাকতো। তেমনি একদিন বিকেলে আমাকে প্রশ্ন করলো, ‘প্রভু, আমাদের এখানে যখন দিন, আমেরিকায় নাকি তখন রাত?’
হয়তো নিচের ছেলেদের কারো মুখে শুনেছিল প্রভু।
আমি বললাম, ‘হ্যাঁ।’
‘কী আশ্চর্য, না প্রভু? ঈশ্বরের কী লীলা! একই পৃথিবী অথচ এক জায়গায় রাত আরেক জায়গায় দিন!’

ব্যাপারটা যে ঈশ্বরের লীলা নয়, তা বোঝাতে আমি একটা লাল ইটের টুকরো কুড়িয়ে ছাদে আমাদের সৌরজগত আঁকলাম। ওকে বোঝালাম কিভাবে সূর্যকে কেন্দ্র করে আমাদের এই পৃথিবী ঘুরছে, কেন একই সময়ে পৃথিবীর একদিকে দিন আরেকদিকে রাত্রি হচ্ছে। বোঝালাম, আমাদের এই সৌরজগতের মতো আরো অনেক সৌরজগত আছে। আমাদের এই পৃথিবীর চেয়ে ছোট-বড় অসংখ্য গ্রহ আছে, অগণিত নক্ষত্র আছে এই মহাবিশ্বে, এর কোনো সীমানা নেই।
ও আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললো, ‘প্রভু আর বলবেন না, আর বলবেন না, আমার মাথা ঘুরায়!’
গালে হাত দিয়ে আবার বললো, ‘হায় ঈশ্বর! এতো বড় মহাবিশ্ব!’
ওর সেই বিকেল মহাবিশ্বের বিস্ময়েই কেটেছিল।

প্রভু আমাকে নিয়ে ওর দুশ্চিন্তার কথা প্রায়ই বলতো, ‘প্রভু, আপনার যে কী হবে! আপনি ভাল মানুষ, আপনার সব কিছুই ভাল, কেবলমাত্র একটি দোষ ছাড়া। আপনি নাস্তিক, ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন না। শুধুমাত্র এই কারণে আপনার জায়গা হবে নরকে। প্রভু, আপনাকে যে কি করে ঐ পথ থেকে ফেরাই!’
একদিন বললাম, ‘প্রভু তুমি বিয়ে করবে না?’
ও প্রথমে জিভ কেটে দুই হাতে কান ঢাকলো, তারপর আকাশের দিকে সাষ্টাঙ্গ প্রণাম করে বললো, ‘ছি, ছি, প্রভু, কী বলছেন! বিয়ে-সংসার এসব আমাদের জন্য নয়। আমি ঈশ্বরের চরণে নিজেকে অর্পণ করেছি। ঈশ্বরের সেবা করেই জীবন কাটিয়ে দেব।’
‘আচ্ছা, একটা কথা বলো তো?’
‘কী কথা?’
‘তোমার কাম জাগে না?’
‘হায় ঈশ্বর! প্রভু আমায় ক্ষমা করুন, এসব বলে আমায় পাপের ভাগী করবেন না।’ বলে হাত জোড় করলো আমার দিকে।
‘আরে তুমি তো আর বিয়ে কিংবা কাম লালসা চরিতার্থ করছো না। আমরা আলোচনা করতেই পারি। শ্রীল প্রভুপাদ কিংবা শ্রী চৈতন্য কি কখনও কাম নিয়ে আলোচনা করেননি বা উপদেশ দেননি ভক্তদের? দিয়েছেন। তাহলে আমরাও আলোচনা করতে পারি।’

শ্রীল প্রভুপাদ আর শ্রীচৈতন্য’র কথা বলায় যে ওর মন গললো তা মুখের অভিব্যক্তি দেখেই আমি বুঝলাম। আবার প্রশ্ন করলাম, ‘তোমার কাম জাগ্রত হয় না?’
‘হায় ইশ্বর! কোন পাগলের পাল্লায় পড়লাম!…কখনও কখনও জাগ্রত হয়।’
‘হয়, তাহলে তুমি বিয়ে-সংসার করেও তো ধর্ম পালন করতে পারো। ধর্ম পালন করার জন্য অবিবাহিত থাকতে হবে এমন তো কোনো কথা নেই।’
‘ইস্কনে বিয়ে করার নিয়ম নেই।’
‘নিয়ম নেই বুঝলাম, কিন্তু ধরো পৃথিবীর সব মানুষ তোমাদের পথ অনুসরণ করলো, কেউ-ই আর বিয়ে করলো না। সবাই তোমাদের মতো অবিবাহিত থেকে ধর্ম পালন করলো, তাহলে তো নতুন কোনো মানব সন্তানের জন্ম হবে না। এভাবে চলতে থাকলে একদিন এই পৃথিবী থেকে মানুষ নিশ্চি‎হ্ন হয়ে যাবে। তখন তোমরা কাদের মাঝে ধর্ম প্রচার করবে? মানুষ বেঁচে না থাকলে তো ধর্মও বেঁচে থাকবে না।’
ও খানিকক্ষণ থম মেরে থাকলো। তারপর বললো, ‘এটা আপনি ঠিক বলেছেন প্রভু।’

তারপর আরো কিছু আলোচনা হয়েছিল। সেই সন্ধ্যায় প্রভুর সাথে আমার শেষ কথা। তারপর আর কোনোদিন কথা হয়নি, দেখাও হয়নি। কিছুদিনের জন্য আমি ঢাকার বাইরে গিয়েছিলাম। ফিরে এসে আর প্রভুকে দেখতে পাইনি।
হঠাৎ একদিন দেখলাম প্রভুর বয়সী নতুন একটি ছেলে ছাদে কাপড় মেলছে, আর গুনগুন করে গাইছে-
‘নন্দদুলাল ব্রজের গোপাল
মা যশোদার নয়নমনি
পড়বে ধরা কোরনা তরা
চুপি চুপি খাও মাখন ননী।’

প্রভুর মতোই ন্যাড়া মাথা, পিছনে টিকি। টিকিটা প্রভুর টিকির চেয়ে একটু ছোট। প্রভুর মতোই মাথার সামনের অংশে আর কপালে চকচক করছে রোদ্দুর। গায়ের রঙ প্রভুর চেয়ে কিছুটা উজ্জ্বল, গালটা একটু বসা। আর শরীরটাও প্রভুর মতো মজবুত নয়, কিছুটা শীর্ণ। ওকে প্রভুর কথা জিজ্ঞেস করলে, আমার দিকে একবার তাকালো, তারপর দৃষ্টি ফিরিয়ে আমাকে পাত্তা না দিয়ে পুনরায় কাপড় মেলতে লাগলো। দ্বিতীয়বার জিজ্ঞাস করলে বললো, ‘ও নেই, চলে গেছে।’
‘কোথায় গেছে?’
‘আমি জানি না।’
আমাকে আর কথা বলার সুযোগ না দিয়ে, আমার দিকে না তাকিয়ে ছাদ থেকে প্লাস্টিকের লাল বালতিটা নিয়ে হনহন করে হেঁটে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে গেল ছেলেটি। ওর চোখ-মুখের বিরক্তিভাব আমার দৃষ্টি এড়ালো না। কিন্তু সেদিকে মনযোগ না দিয়ে ভাবতে লাগলাম প্রভু’র কথা। কোথায় গেল প্রভু? ও কি শ্রীকৃষ্ণের চরণে আরো নিবিড়ভাবে নিজেকে অর্পণ করার জন্য শ্রীচৈতন্যের লীলাভূমি নদীয়ার মায়াপুর চলে গেল, নাকি মানব সভ্যতা টিকিয়ে রাখতে গ্রামে ফিরে গেল জীবনের বীজ বুনতে!

ঢাকা।
মার্চ, ২০১৫

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 44 = 46