মানবীয় দানবকান্ড

আমরা পত্রিকায় চোখ বুলালেই অথবা টেলিভিশনের পর্দায় চোখ রাখলেই নিয়মিত দেখতে পাই নৃশংশতার ঘটনা। মোটা কালির শিরোনাম সম্পর্কে সবাই প্রায় অবগত হই। যেমন, লেখা থাকে অমুক জায়গায় স্কুলছাত্রী ধর্ষিত। আবার অন্যান্য জায়গার অন্যসব দুর্বিষহ সংবাদের নির্যাতিত ঘটনা। এসব খবর আমাদের ভেতরে ঢোকে, আবার বের হয়ে যায়। এক কান দিয়ে শুনে আরেক কান দিয়ে বের করে দেওয়ার মতোই। তবে সবাই এরকম নয়। অনেকেই আছে, যারা এসব নোংরামির চরমতা দেখে নাক সিটকিয়ে ঘৃণা প্রকাশ করতে ভুলে না। অনেকে আবার কিছু পদক্ষেপ নেয়। কিন্তু সেই পদক্ষেপগুলো সদর দরজা পর্যন্ত পৌঁছোবার আগেই মিলিয়ে যায়। স্বেচ্ছাবোধ কাজ করে বলে আর এগোতে পারেনা। হয়তো ভাবে, এসবে নিজেকে জড়িয়ে আর কি লাভ! কোনো পরিবর্তন হবেনা। হচ্ছেওনা কোনো পরিবর্তন কিংবা অগ্রগতি। একাই তো আর দশ লাঠির বোঝা নেওয়া যায়না! তেমন অনেকেই কিছু কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করে। উর্ধতন কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ করে, গণমাধ্যমে ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনের প্রতি সোচ্চার হয়। কিন্তু পরিশেষে একটুর জন্য হলেও থেমে থাকে। সদর দরজা পর্যন্ত আর যাওয়া হয়ে ওঠেনা। গা ছেড়ে দেয় হতাশ হয়ে। ভাবে, একাই এগোলে তো হবেনা। সবাইকে সচেষ্ট হতে হবে। এসব ভেবে অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়ে। এরকম মানুষের সংখ্যা হাতেগোনা। আর পত্রিকার পাতায় চোখ বুলিয়ে কিংবা টেলিভিশনের সংবাদ শুনে সামান্য ঘৃণা প্রকাশ করে এমন মানুষের সংখ্যা অনেক। অনেকেই এসব ঘটনার নির্মম দৃশ্যাবলি সম্পর্কে অবগত হয়ে বলে, “কোথায় যাচ্ছে দেশ? এভাবে কি আর উন্নতি হবে? সুশীল একটা সমাজ গঠন করা যাবে? ছিঃ”। এসব মন্তব্য সাধারণত অভিজ্ঞরাই করে থাকেন। আর এসব নোংরামি সংবাদ সম্পর্কে অবগত হয়েও নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করার মধ্যে রয়েছে অধিকাংশই। যারা অতিশয় নির্লিপ্ত দেশ এবং জাতির উন্নতির ব্যাপারে, সামাজিক স্বাধীনতার ব্যাপারে। এরা শুধু দু’চোখে দেখেই চলে আর দু’কানে শুনেই চলে। কোনো ভূমিকা রাখেনা।

যারা ধর্ষণ করছে, অর্থাৎ কোনো এক সন্ধ্যায় যেই ব্যক্তিটি ধর্ষক উপাধিপ্রাপ্ত হলো, সেই মুহূর্তেই তার অন্তঃসত্ত্বা মরে যাওয়া উচিত ছিলো। অথচ তার অন্তঃসত্ত্বা মরে না। এতোটুকুও অনুতপ্ত হয়না। অনুতপ্ত হয়েও বা কি লাভ? ধর্ষিতার অপবিত্র জীবন যদি ধর্ষকের অনুতপ্ততার বিনিময়ে পুনরায় পবিত্র করা যেতো তাহলে কম করে হলেও পরবর্তীতে কেউ আর ধর্ষণ করতোনা। বরং অনুতপ্ত হয়ে এই জঘন্য কাজ ছেড়ে দিতো। কিন্তু সেটা কোনোভাবেই হয়না। অনুশোচনা করেও মূল্যবান পবিত্র জীবনটি ফিরে পাওয়া যায়না। নোংরামির দাগ পড়ে যায় ধর্ষিতার শরীরে। সে দাগ থাকে সারাজীবন। ধর্ষক তার স্ববহনিত কলঙ্কের বিষ ঢেলে দেয় ধর্ষিতার শরীরেও। অথচ যারা ধর্ষিত হয়েছে তাদের মনে বিন্দুমাত্র কুটিলতা ছিলো না। পরদিন পত্রিকায় মোটা অক্ষরের শিরোনাম থাকে ধর্ষণের, সাথে ধর্ষকের পরিচয়ও থাকে। পুরো দেশ জেনে যায়, অবগত হয় নৃশংশতার চরম পর্যায় সম্পর্কে। পদক্ষেপ গ্রহণ করে, নিন্দা জানায় এবং নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করে জনগণ। তবে প্রায় সবার চোখে কলঙ্কিত হতে দেরী হয়না ধর্ষক উপাধিপ্রাপ্ত ব্যক্তিটির, সাথে ধর্ষিতারও। অকারণে নিজের জীবন বলি দিতে হয় ধর্ষিতার। তবুও অন্তদহন হয়না পাপিষ্ঠ ধর্ষকের। আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তদন্ত করে এবং যথোপযুক্ত প্রমাণাদি ভিত্তিক ধর্ষকের রিমান্ডে এবং অন্যান্য শাস্তির ব্যবস্থা করে। এমন অনেক দেখা গেছে যে, ধর্ষক সাজাপ্রাপ্ত হওয়ার পরও আবার আরেকটি ধর্ষণ করেছে। এতোটুকু অপমানবোধ কিংবা কঠোর শাস্তির আঘাত যদি তার ভেতরে সাড়া ফেলে থাকতো তবে পুনরায় ধর্ষণে উদ্বুদ্ধ হতোনা। এমন ব্যক্তিকে অতিশয় নির্লজ্জ এবং বেহায়া বললেও খুব কম বলা হবে। বিবেকের সামান্যতম বৈশিষ্ট্য তার মাঝে একটুও থেকে থাকলে এমন ঘৃণিত কাজ করতে বুক একবার হলেও কাঁপতো। কিন্তু শোচনার বিষয় এই যে তারা বিবেকহীন এবং বিবেকের পরিবর্তে স্থান দিয়েছে শারীরিক উষ্ঞতাকে। তার শারীরিক চাহিদা মেটাবার জন্য একজন ভদ্রমহিলা কিংবা একটি পবিত্র বালিকার জীবন যে চিরতরে নষ্ট হতে যাচ্ছে একথা একবার চেতনায় আসলে তার বিবেক কিছুটা জাগ্রত হতো। কিন্তু কুকুরের লেজ তো আর সোজা হয়না। বহুকষ্টে কুকুরের লেজ সোজা করা যায় হয়তো, কিন্তু নির্লজ্জ ধর্ষকের সেই বোধটুকুও কাজ করেনা বলে কুকুরের চেয়ে তাকে অধম ধরে নেওয়াই শ্রেয়। তার মতো বিবেকহীন আছে আরো অনেকে। যারা সংবাদপত্রে অথবা টেলিভিশনে এমন ঘটা করে অপমানবোধের বার্তা শুনেও সচেতন হচ্ছেনা। বরং উপযুক্ত প্রমাণাদির অভাবে রেহাই পাচ্ছে এবং বেহায়ার মতো ধর্ষণ করেই যাচ্ছে। আত্মসন্মানবোধের উপরে রেখেছে শারীরিক উষ্ঞতাকে। অথচ তারা আমাদের মতোই সামাজিক প্রাণী, মানুষ। মানুষ হিসেবে যদি শারীরিক চাহিদাই সকল বিষয়বস্তুর উর্ধ্বে হয় তবে মানুষ হিসেবে আমার অনেক আগেই অাত্মহত্যা করা উচিত ছিলো। অসভ্য এবং নির্লজ্জরা শাস্তিপ্রাপ্ত হয়ে কিংবা না হয়েও ক্রমাগত ধর্ষণ করে। তাদের বিরুদ্ধে নেওয়া উপযুক্ত ব্যবস্থাও যেনো হার মেনে যায়। পত্রিকায় ধর্ষকদের নৃশংশতার কথা লেখা হয় কালো কালিতে, রঙিন শিরোনামে। শুধুমাত্র ছাপা কাগজে নয়, ধর্ষিতার শরীরের প্রতিটি অংশে ছাপ ফেলে যায় ধর্ষকের ধারালো নখ। নির্যাতনের করুণতা।

লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে একজন ধর্ষকের চাহিদা মেটানোর মাশুল দিতে হয় ধর্ষিতা এবং তার পুরো পরিবারকে। ধর্ষণের চরম অপমান সাধারণ বিবেকের কাছে হার মেনে যায় বলে আত্মহত্যা করে ধর্ষিতা। বাধ্য হয় আত্মহত্যা করতে। কারণ ধর্ষকের মতো এতোটা নির্লজ্জ সে নয়। তার নিজস্ব একটা সন্মানবোধ আছে। কিন্তু ধর্ষকের তাও নেই। একজন ধর্ষক সবার কাছে লাঞ্ছিত হচ্ছে, শাস্তিপ্রাপ্ত হচ্ছে, এই বিষয়টি সবাই অবলোকন করে। এমনকি অন্যান্য ধর্ষকরাও বিষয়টি সম্পর্কে জানে। কিন্তু শরীরকে আর দমিয়ে রাখতে পারেনা। শিকার করে সকল বয়সী নারীদের শরীর। পরিবার হারায় একটি মূল্যবান জীবন। যেই জীবনকে বাঁচাতে পারলে হয়তো একদিন জনসম্পদে পরিণত হতে পারতো! রাষ্ট্রের কল্যাণ করতে পারতো! অথচ রাষ্ট্রের ভেতরেই ভবিষ্যৎ সন্তানের মায়েরা জীবন ত্যাগ করছে এবং আমরা তখনও নিশ্চুপ। আমাদের গুটিকয়েক ব্যক্তিসমূহের পদক্ষেপ বড় হচ্ছেনা। পিছুটান কাজ করছে। এতোদূর এগিয়েও কেউ কেউ ঝিমিয়ে পড়ছে। নীরব দর্শক আবার অনেকেই। আমাদের নির্লিপ্ততার ভোগান্তি সহ্য করতে হচ্ছে একটি পবিত্র জীবন এবং তার পরিবারকে। এর অবসান হয়তো একদিন হবে। আমাদের আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে তদন্তের প্রতি জোরদার ব্যবস্থা নিতে হবে, নারী নির্যাতন বিষয়ক নতুন এবং উপযুক্ত শাস্তি ও জরিমানা ভিত্তিক সংশোধিত এবং সংবর্ধিত আইন প্রণয়ন করতে হবে। ধর্ষক যাতে পরবর্তীতে পুনরায় ধর্ষণে পা না বাড়ায় সে জন্য কঠিনতম শাস্তি অর্থাৎ যাবজ্জীবন কারাদন্ড প্রদানই বাঞ্ছনীয়। আমরা হাতেগোনা কয়েকজন কিছু পথ অগ্রসর হয়ে আবার আলাদাভাবে পিছিয়ে না পড়ে সবাই যদি সম্মিলিত হয়ে আরেকটু বেশি দূরত্ব নিয়ে পা ফেলি, আরেকটু সচেতন হই ধর্ষণবিরোধী আন্দোলন সম্পর্কে, তাহলে বাকিসব ঘৃণ্য মন্তব্যকারী ব্যক্তিবর্গ এবং অধিকাংশ নিষ্ক্রিয় জনগণও সজাগ হয়ে উঠবে। পায়ের পরে পা ফেলে সদর দরজা পর্যন্ত অগ্রসর হতে তখন আর কোনো শ্রান্তি অথবা স্বেচ্ছাবোধ কাজ করবে না। একধরণের দায়িত্ব হিসেবেই ধর্ষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে শিখবে সবাই। পবিত্র জীবন বাঁচানো তখন অসম্ভব হবেনা এবং ধর্ষকের কালো চোখ তখন বিবেকের জানালা খুলে বাইরের সবটুকু জ্ঞান চেয়ে চেয়ে দেখবে। জানালার বাইরের ফাঁকা রাস্তাটা দিয়ে যেতে যেতে উষ্ঞ রক্ত ততক্ষণে শীতল হয়ে যাবে নিশ্চই!

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

7 + = 14