রেশমা, সৃষ্টিকর্তা এবং আমি, ত্রিমুখী সংঘর্ষ

রেশমা। একটি নাম। একটি মেয়ের নাম। একটি মৃত্যুঞ্জয়ী গল্পের শিরোনাম। একটি মুক্তির পায়রা। এরকম হাজারো উপাধির তুল্য এক বীরাঙ্গনা। সাভারে ভবন ধসের ১৭ দিন পর উদ্ধার পাওয়া একটি ইতিহাস।

দুপুরে খেয়েদেয়ে শুয়েছিলাম। হঠাৎ এক বড়ভাই ফোন করে বলল যে সাভারে নাকি একজনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। প্রথমে মনে হল, ধুর, ব্যাটা নিশ্চয়ই ফাইজলামি করতেছে। পরক্ষনেই তার গলায় উত্তেজনার আভাস পেয়ে কি জানি মনে হল। সাথে সাথে নেট এ বসলাম এবং সময় টিভি সার্চ করলাম। পেয়ে গেলাম এক অভাবনীয় মুহূর্তের দৃশ্য। রেশমা নামক এক নারী শ্রমিক উদ্ধার হয়েছে। ভাবতেও পারি নাই। স্তব্ধ হয়ে দেখলাম। যখন হুঁশ ফিরে এল। সাথে সাথে সবাইকে ফোন করে জানাতে লাগলাম। চোখের জল ধরে রাখতে পারি নাই কিছুক্ষনের জন্য। এতো খুশি লাগছিল যে বলার বাইরে। সত্যি কথা, গতকাল রাজাকার কামারুজ্জামানের ফাঁসির পর যেইভাবে আনন্দ করেছিলাম, ঠিক সেইভাবে আনন্দ করতে লাগলাম। নিচে নেমে, আমি যেই দোকানে আড্ডা দেই, সেখানেও উৎসবমুখর পরিবেশ। আমি ঢুকতেই কয়েকজন আমকে জড়িয়ে ধরে আনন্দ করতে লাগলো। খুশিতে নাচতে শুরু করেছিলাম। খুব আনন্দ হচ্ছিল, বিশ্বাস করেন আর নাই করেন। মৃত্যুকে জয় করে ফিরে আসা এক অকল্পনীয় ব্যাপার।

আনন্দ উৎসব বেশিক্ষণ স্থায়ী হল না। বাসায় এসে নেট খুলে দেখলাম, মুন্নি সাহা নাকি বাল ছাল প্রশ্ন করেছিল। ছাগু পেইজ গুলাতে এই উদ্ধার কাজকে আওয়ামী ষড়যন্ত্র বলে উল্লেখ করা হচ্ছে। মুহূর্তে মাথা গরম হয়ে উঠলো। নেমে পরলাম কিবোর্ড হাতে আরেক যুদ্ধে।

অনেকক্ষণই যুদ্ধ করলাম। কিন্তু গরু ছাগু জাতির মস্তিষ্ক যে গরুর গোবর এর মত, তা দেখে হতাশ হলাম। তাই থেমে গেলাম। একটা বিষয়ই খালি বলব এখন। রেশমা নাকি নামায পড়ার কক্ষে ছিল বিধায় তার কিছু হয় নাই। সত্য ঘটনা হল, যখন ভবন ধসে পরে, তখন কোন দিক যাওয়ার উপায় না দেখে সে নামায কক্ষে ঢুকে পরে। তাহলে দেখা যাচ্ছে, ভবন যখন ধসে পরে, তখন রেশমা আদৌ নামায কক্ষে ছিল না। তাই আল্লাহর গজব তার উপরেও পড়েছিল। তাতে আল্লাহর কোন দোষ নাই। কিন্তু ১৭ দিন পর যখন সে উদ্ধার পেল, তখন সমস্ত ক্রেডিট আল্লাহর।কি নিদারুণ দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের ছাগুগুস্টির!!!

সব কিছু বাদ দিয়ে এবার শুয়ে শুয়ে চিন্তা করতে লাগলাম। সৃষ্টিকর্তার অপার করুণায় ঘুম আসলো না। তখন মনে মনে সৃষ্টিকর্তার সাথে কিছুক্ষন কথা বললাম।

হে অপার করুণাময়, রানা প্লাজায় যখন শ্রমিকেরা পেটের দায়ে কাজ করতে ঢুকেছিল, তখন তোমার কোন বান্দা হয়ত তোমাকে ইনফ্রারেড এর মাধ্যমে খবর পৌঁছিয়েছিল যে, শ্রমিকেরা হরতাল বিরোধী মিছিল করতে জড় হয়েছে। তখনি তুমি তোমার আঙুল দিয়ে দেয়ালে হেলান দিয়ে ভবন ধসায়ে দিয়েছিলে। আহাহা!!! কি শক্তি তোমার!! তুমি এতো করুণাময় যে সহস্রাধিক শ্রমিকের প্রাণ নিতে তোমার কোন দ্বিধা বোধ হয় নাই। তুমি এতোই শক্তিমান যে ধর্মকে রক্ষা করার জন্য মানুষের মনের ভিতর কোন পরিবর্তন না এনে কেবলই প্রাণ সংহার কর। শাবাস প্রভু!!! সহস্রাধিক শ্রমিককে পঙ্গু করে তুমি এই বানী ছড়িয়ে দিলে যে, কেউ যদি ধর্মের বিরোধিতা করে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার চালু না করতে চায়, তাহলে তাকে মরতে হবে। কিন্তু আজ যখন রেশমা নামক তোমার এক মুরতাদ শ্রমিককে উদ্ধার করা হল, তখন তুমি ইমেইল করে জানালে যে এটা তোমারই কীর্তি। হে মহান প্রভু!!! তুমি রেশমাকে উদ্ধার করতে ১৭ দিন লাগিয়েছ। আমার খুব জানতে ইচ্ছে হয়, তোমার ইন্টারনেট স্পীড কি এতোই স্লো যে, একটা ইমেইল করতে ১৭ দিন লাগে??? নাকি ইন্টারনেট বিল পরিশোধ কর নাই বিধায় তোমার লাইন কাইটা দিয়েছিল??? হে মহান অন্তর্যামী!!! তুমি কি একবারও কারো কানে কানে এসে বলতে পার নাই যে রেশমা বেঁচে আছে??? নাকি তুমি চেয়েছিলে রেশমা নরক যন্ত্রণা ভোগ করুক??? যদি তাই চাও, তাহলে এই রেশমার তো কোনদিনও মৃত্যু হবে, তখন কি তুমি তাকে আবারও নরক যন্ত্রণা ভোগ করাবা??? হে মহান ব্যক্তিত্ব!!! রেশমা ১৭ দিন বেঁচে থাকার জন্য যে অকল্পনীয় সাহস দেখিয়েছিল, উদ্ধারের পর তোমাকে সেই ক্রেডিটটুকু দিয়ে রেশমাকে অপমান করলাম। তুমি সত্যিই মহান!!! তুমিই মানবতার প্রকৃত রক্ষক এবং ভক্ষক!!!

পরিশেষে, রেশমার উদ্দেশে বলছি, আজ থেকে তুমিই আমার আদর্শ। তোমাকে সম্মান জানানোর মাঝেই আমার প্রকৃত ঈশ্বরপ্রাপ্তি ঘটেছে। তোমাকে সালাম।
(বি.দ্র.: কেউ যদি মনে করে থাকেন আমি ঈশ্বরবিরোধী, তাহলে ঠিকই ধরেছেন। আমি নাস্তিক। “সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই”।)

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “রেশমা, সৃষ্টিকর্তা এবং আমি, ত্রিমুখী সংঘর্ষ

  1. বোকাদের সাথে তর্ক করতে যেও
    বোকাদের সাথে তর্ক করতে যেও না। তাহলে সে তোমাকে নিজের স্তরে নামিয়ে আনবে এবং নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে তোমাকে হারিয়ে দেবে।

    কে বলেছে ভুলে গেছি। কিন্তু, বর্তমান পরিস্থিতিতে যথার্থ…

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

48 − = 38