ঘরের কাছেই দার্জিলিং


শিলিগুড়ি ছেড়ে কচি-কোমল চোখ-জুড়ানো সবুজ চা বাগানের ধার ঘেঁষে কিছু দূর গিয়েই আমাদের জীপ আঁকা-বাঁকা পাহাড়ি রাস্তায় ক্রমশ উঁচু থেকে উঁচুতে আরোহণ করতে থাকলো আর হিমালয়ের হিম-শীতল বাতাস এসে এই মধ্য গ্রীষ্মেও শান্তির শীতল পরশ বুলিয়ে দিলো আমাদের সারা দেহে। দার্জিলিং পৌঁছে আমরা আশ্রয় নিলাম ম্যালের পাশেই হোটেল ভ্যালেন্টিনোর পাঁচ শয্যা বিশিষ্ট সুসজ্জিত এক বিশাল কক্ষে।

বাংলাদেশ নামক যে স্বাধীন সার্বভৌম দেশটিতে আমাদের অবস্থান তা আসলে আয়তনের দিক থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অনেক প্রদেশ এমনকি ভারতের কোনো কোনো অঙ্গরাজ্যের চেয়েও ক্ষুদ্রতর। কিন্তু প্রাকৃতিক সম্পদ আর সেীন্দর্যের কোনো ঘাটতি নেই এ দেশে। পার্বত্য তিনটি জেলার মনোরম অরণ্য-পর্বত, কক্সবাজারের বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত, সুন্দর বনের ম্যানগ্রোভ বনভূমি আর কোরাল দ্বীপ সেন্টমর্টিনস্ এর মতো আকর্ষনীয় পর্যটন কেন্দ্র রয়েছে বাংলাদেশে। এ থেকে মনে হতে পারে বাংলাদেশে সারা বছর ধরেই দেশ-বিদেশের পর্যটকদের ভিড় লেগে থাকে। কিন্তু বাস্তব অবস্থা তা নয়। বাংলাদেশে পর্যটন মন্ত্রণালয় নামে একটি মন্ত্রণালয় আছে কাগজে-পত্রে, কিন্তু এর কাজ-কর্মের কোনো নাম-নিশানা কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না। শুধুমাত্র কক্সবাজারই কিছুটা পর্যটন বান্ধব, এখানে কতকগুলো উন্নতমানের হোটেল রেঁস্টুরেন্ট গড়ে উঠেছে এ কথা সত্যি। কিন্তু অন্যান্য স্থানে মানসম্পন্ন কোনো হোটেল-রেস্টুরেন্ট-অবকাঠামো গড়ে উঠেনি। হরপ্পা-মহেঞ্জুদারুর মতো না হলেও মহাস্থানগড়-ময়নামতিতে অনেক পুরাকীর্তির নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়েছে। তবে এ সব জায়গায় ভালো কোনো হোটেল-রেস্টুরেন্ট তো দূরের কথা প্রকৃতির ডাকে সারা দেবার মতো কোনো সভ্য ব্যাবস্থা পর্যন্ত নেই। তার সাথে যুক্ত হয়েছে দেশের পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে চরম নিরাপত্তাহীনতা আর কাণ্ডজ্ঞানহীন সহিংস রাজনৈতিক অস্থিরতা। এ সব কারণে বিদেশী পর্যটক দূরের কথা বাংলাদেশের মানুষও নিজের দেশের কোথাও নিরাপদে ভ্রমণের কোনো পরিকল্পনা করতে পারে না। অথচ মাথাপিছু আয়ের দিক থেকে এ দেশের মানুষ এতটা স্বচ্ছল নয় যে-পরিবার-পরিজনসহ ঘটা করে বিদেশ ভ্রমনে যাবে।

তবে বাংলাদেশের ভ্রমণ-পিপাসুদের জন্য একটি সুখবর হলো ভারতের শৈলসুন্দরী দার্জিলিংয়ের মতো একটি সৌন্দর্য-মণ্ডিত আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র রয়েছে একেবারে আমাদরে ঘরের কাছেই, বাংলাদেশের বুড়িমারি সীমান্ত থেকে মাত্র শ‘দেড়েক কিলোমিটার দূরে। ঢাকার সঙ্গে দার্জিলিং-এর সরাসরি রেল বা বিমান যোগাযোগ নেই। তবে সড়ক পথে ঢাকা থেকে সহজেই দার্জিলিং গমন করা যায়। এস আর শ্যামলী পরিবহনের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাসে ঢাকা থেকে লালমনিরহাটের বুড়িমারী ও ভারতের সীমান্ত চৌকি চ্যাংরাবান্দা হয়ে শিলিগুড়ি পর্যন্ত যাওয়া যায়। শিলিগুড়ি থেকে জিপ, ট্যাক্সি বা মাইক্রোবাসে করে ২/৩ ঘন্টার মধ্যে পৌঁছানো যায় স্বপ্নের দার্জিলিং। রেলপথে দার্জিলিং যেতে চাইলে প্রথমে লালমনি এক্সপ্রেস বা অন্য কোনো আন্ত:নগর ট্রেনে ঢাকা থেকে লালমনিরহাট এবং সেখান থেকে সড়কপথে বুড়িমারী হয়ে দার্জিলিং যেতে হবে। আর বিমান পথে দার্জিলিং গমনের জন্য যে-কোনো আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে ঢাকা থেকে কলকাতা এবং সেখান থেকে ভারতের ডোমেস্টিক ফ্লাইটে দার্জিলিং যেতে হবে। তবে এ ভাবে কলকাতা হয়ে ঘুরপথে বিমানে দার্জিলিং গমন বেশ ব্যয়বহুল। কাজেই বাংলাদেশের মানুষের জন্য রেলপথে লালমনিরহাট বা সড়ক পথে বুড়িমারী হয়ে দার্জিলিং গমনই উত্তম।

আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজে অধ্যাপনার চাকরী করি তখন। আমার নিজের ভ্রমণের নেশা বরাবরের আর দেশ ভ্রমণের বিষয়ে আগ্রহী কয়েকজন সহকর্মীও পেয়ে গেলাম কলেজে। চিন্তা করছি কোথায় যাওয়া যায়। সহকর্মী আজিজুল হক দার্জিলিং যাওয়ার পরামর্শ দিলেন। তিনি নিজে একবার দার্জিলিং ঘুরে এসেছেন, দার্জিলিং বলতে তিনি অজ্ঞান। তার পরামর্শে শেষ পর্যন্ত দার্জিলিং ভ্রমণের বিষয়েই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হলো।

ভিসা-পাসপোর্টের হ্যাপা
ভ্রমণের প্রস্তুতি নিতে গিয়ে দেখি অনেক সমস্যা। বিদেশ ভ্রমণে গেলে প্রথমে যা প্রয়োজন তা হলো পাসপোর্ট। খোঁজ নিয়ে জানা গেলো দার্জিলিং যেতে যারা আগ্রহী তাদের কারোরই পাসপোর্ট নেই আর আমারটা একবার নবায়নের পরও মেয়াদোত্তীর্ণ। কাজেই সবারই নুতন পাসপোর্ট প্রয়োজন। ঢাকায় এনালগ যুগে নুতন পাসপোর্ট সংগ্রহ ছিলো এভারেস্ট শৃঙ্গ বিজয়ের মতো কঠিন কাজ। হাজার হাজার দালালে গিজগিজ করে পাসপোর্ট অফিস। দালালদের মোটা অঙ্কের টাকা দিলে অবশ্য সহজে পাসপোর্ট মেলে। কিন্তু শিক্ষকসূলভ নৈতিকতাবোধ থেকে আমরা ঠিক করলাম দালাল ধরব না, নিজের চেষ্টাতেই পাসপোর্ট বের করব। শুরু হলো দৌড়-ঝাপ। সকাল-বিকাল পাসপোর্ট অফিসে ঘোরাঘুরি, দীর্ঘ সময় ধরে অবস্থান। সহকর্মী হুমায়ুন কবীরের আবার ব্যাচে ছাত্র পড়ানোর ব্যাপার আছে। পাসপোর্ট অফিসে ঘোরা-ফেরা করতে করতে ব্যাচের সময় চলে যায়, ছাত্ররা ফোন দেয় আর হুমায়ুন কবীরের অস্থিরতা বাড়ে। এক পর্যায়ে আমি বললাম, ছাত্র পড়ানো বাদ দিয়ে পাসপোর্ট অফিসে ঘোরাঘুরি ঠিক না, আপনি বরং চলে যান। শেষ পর্যন্ত বহু কাঠ-খড় পুড়িয়ে, অনেক ঘাম ঝরিয়ে, শরীরের মেদ-ভুঁড়ি কমিয়ে পাসপোর্ট পাওয়া গেলো। এবার ভিসা নেয়ার পালা। এনালগ পাসপোর্টের মতো ভারতীয় ভিসাও তখন এনালগ যুগেই ছিলো, অনলাইনে আবেদন করা যেতো না। স্বশরীরে লাইনে দাঁড়িয়ে ভিসা ফরম জমা দিতে হতো। সবার আগে দাঁড়ানোর জন্য আমরা নির্ধারিত দিনে ভোর ৪ টার মধ্যে গুলশানে ভারতীয় ভিসা অফিসে গিয়ে হাজির হলাম। গিয়ে দেখি আমাদের আগে আরো ৪/৫ শ লোক লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। সীমাহীন ধৈর্যের সাথে ৬/৭ ঘন্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে দুপুর নাগাদ পাসপোর্টসহ ভিসা ফরম জমা দেয়া হলো। পরের দিন পাসপোর্ট সংগ্রহ করতে গিয়ে দেখি নুতন ফ্যাকরা। ৪ জনের ভিসা দিয়েছে, সহকর্মী ফিরোজ হোসেনের ভিসা না দিয়ে সংশ্লিষ্ট অফিসারের সাথে সাক্ষাৎকারের কথা বলা হয়েছে। আমরা সবাই খুব হতাশ। ফিরোজ হোসেনের গ্রামের বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জ যেখানটায় তৎকালীন কুখ্যাত ভয়ঙ্কর জঙ্গী বাংলা ভাইয়ের উত্থান। আমাদের আশংকা ছিলো এ কারনেই হয়তো ভারতীয় দূতাবাস ফিরোজকে ভিসা দেবে না। যা হোক শেষ পর্যন্ত তার ভিসাও হলো।

যাত্রা হল শুরু
এপ্রিলের শেষে গ্রীষ্মের ছুটিতে আমরা পাঁচ জন দার্জিলিংয়ের উদ্দেশ্যে চেপে বসলাম এস আর পরিবহনের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাসে। রাত এগারটায় ঢাকা থেকে ছেড়ে আমাদের বাস পরদিন সকালের দিকে বাংলাদেশের বুড়িমারী সীমান্ত চৌকিতে পৌঁছাল। ভ্রমণ কর প্রদানসহ বাংলাদেশ-ভারত সীমানা পারাপার সংক্রান্ত যাবতীয় কাজের দায়িত্ব বাস কর্তৃপক্ষের। বুড়িমারী বাস কাউন্টারে পৌঁছুতেই আমাদের বুক পকেটের উপর বাস কোম্পানীর লগো সম্বলিত একটি স্টিকার সেঁটে দেয়া হলো। সীমান্ত পারাপারে ক্ষেত্রে স্টিকারটি যেনো এক আশ্চর্য মহৌষধ। দুই পারের ইমিগ্রেশান কর্মকর্তাদের জেরার মুখে পড়তে হলো না, লাগেজ চেক হলো না, বরং ওপারের কুলিরা এসে আমাদের বাক্স-পেটরা বহন করে শিলিগুড়ির নির্ধারিত বাসে রেখে দিলো। আমরা শুধু নো-ম্যানস্-ল্যাণ্ডের ওপারে গিয়ে অপেক্ষমাণ বাসে আসন গ্রহণ করলাম। এমন নির্ঝঞ্ঝাটভাবে, এতটা জামাই আদরে বর্ডার পেরিয়ে যাব আশা করি নি। দুপুরের দিকে শিলিগুড়ি পৌঁছে বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন হোটেলে খাবার সেরে মাহিন্দ্র এণ্ড মাহিন্দ্র জীপে চড়ে আমরা দার্জিলিংয়ের পথে রওয়ানা হলাম।

শিলিগুড়ি থেকে দার্জিলিং গমনের রাস্তার দুপাশের চা বাগান
শিলিগুড়ি ছেড়ে কচি-কোমল চোখ-জুড়ানো সবুজ চা বাগানের ধার ঘেঁষে কিছু দূর গিয়েই আমাদের জীপ আঁকা-বাঁকা পাহাড়ি রাস্তায় ক্রমশ উঁচু থেকে উঁচুতে আরোহণ করতে থাকলো আর হিমালয়ের হিম-শীতল বাতাস এসে এই মধ্য গ্রীষ্মেও শান্তির শীতল পরশ বুলিয়ে দিলো আমাদের সারা দেহে। দার্জিলিং পৌঁছে আমরা আশ্রয় নিলাম ম্যালের পাশেই হোটেল ভ্যালেন্টিনোর পাঁচ শয্যা বিশিষ্ট সুসজ্জিত এক বিশাল কক্ষে।

স্বপ্নের দার্জিলিং
দার্জিলিং নামকরণকে কেন্দ্র করে একাধিক কিংবদন্তি প্রচলিত রয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন সিঙ্গলীলা পর্বতমালার শীর্ষে সুপ্রাচীন কাল থেকে দুর্জয়লিঙ্গ নামে মহাদেবের এক মন্দির ছিলো। অঞ্চলটি তৎকালীন সিকিম রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত থাকায় বিশেষ করে সিকিমের পার্বত্য উপজাতীয়রা এখনে পূজা করতে আসতো। সেই দুর্জয়লিঙ্গ থেকেই এলাকাটি দার্জিলিং নামে পরিচিত হয়। অনেকের মতে দেবরাজ ইন্দ্র ছিলেন সিঙ্গলীলা পার্বত্য অঞ্চলের রাজা। বজ্রধারী দেবরাজ ইন্দ্রের নন্দন কানন ছিলো বলেই এই অঞ্চলটির নামকরণ করা হয় দার্জিলিং বা বজ্রের দেশ। সিঙ্গলীলা পর্বতমালার একটি বিস্তির্ণ অঞ্চল জুড়ে অর্ধবৃত্তাকার শৈল শহর দার্জিলিং গড়ে উঠেছে। শহরটির উচ্চতম স্থান কাটাপাহাড় ও অবর্জাভেটরী হিলের উচ্চতা প্রায় ৮০০০ ফুটের কাছাকছি। শুভ্র-ফেনিল দুগ্ধ বর্ণের তুষারমৌলি হিমালয় পর্বতমালার এক প্রান্তে অবস্থিত কাঞ্চনজঙ্ঘার দেশ হিসাবে পরিচিত দার্জিলিং সারা বিশ্বের পর্যটকদের নিকট একটি আকর্ষণীয় স্থান।

দার্জিলিং কেমন দেশ বলতে গিয়ে মনে পড়ে যায় বাংলা সিনেমার মহাপরাক্রমশালী পরিচালক সত্যজিৎ রায়ের একটি উক্তি। সত্যজিৎ রায় বলেছিলেন- “ যারা দার্জিলিং দেখেছেন তাদের সাথে দার্জিলিংয়ের বিষয়ে বলা নিরর্থক, কারণ তারা নিজেরাই সেটা দেখেছেন। আর যারা দার্জিলিং দেখেন নি তাদের সাথেও দার্জিলিং সম্পর্কে বলা অর্থহীন কারণ দার্জিলিং দেখতে কেমন তা কাউকে বলে বোঝানো সম্ভব নয়”। লেখার মাধ্যমে দার্জিলিংয়ের বর্ণনা দিতে গেলে অরণ্য-পর্বতে আবৃত দার্জিলিংয়ের মনোরম নৈসর্গিক সৌন্দর্যের প্রতি সুবিচার করা সম্ভব নয় বলেই হয়তো সত্যজিৎ রায়ের এই উক্তি।

তবে ভ্রমণ কাহিনী যখন লিখতে বসেছি তখন কিছু না কিছু তো লিখতেই হবে। সংক্ষেপে বলতে গেলে দার্জিলিং বজ্রের দেশ, শুভ্র তুষার আর জমাট-বাঁধা বরফের দেশ, জানা-অজানা পাখির দেশ, বিচিত্র বর্ণের আর বিচিত্র জাতের বৃক্ষের দেশ, জলভরা মেঘের দেশ, গগনচুম্বী পাহাড়ের দেশ, সবুজ-শ্যামল বনানীর দেশ, দুটি-পাতা-একটি-কুঁড়ির দেশ আর ঘন কুয়াশার চাদরে ঢাকা এক রহস্যময় দেশ। এখানে পাহাড়ের গায়ে গায়ে মেঘেরা গাভীর মতো চড়ে বেড়ায়, গাছে গাছে পাখিরা গান গেয়ে মানুষের হৃদয়-মন পরিপূর্ণ করে দেয়, জল-ভরা মেঘ এসে শীতল মধুর পরশ বুলিয়ে দেয় আর উদীয়মান প্রভাতী সূর্যের বর্ণিল আলোক রশ্মি কাঞ্চনজঙ্ঘার বরফ স্তুপের উপর পতিত হয়ে বিচিত্র বর্ণের মেলা বসিয়ে দেয় ।

মোহনীয় নজর-কাড়া দর্শনীয় স্থানের কোনো ঘাটতি নেই রূপসী দর্জিলিংয়ে। সমতলের শিলিগুড়ি ছাড়া সবুজ-শ্যামল পাহাড়-পর্বতে সমৃদ্ধ দার্জিলিং জেলার অন্য তিনটি মহকুমা মংপু,কলিম্পং আর কার্শিয়াং পটে আঁকা ছবির মতো। দার্জিলিংয়ের দর্শনীয় স্থানগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ম্যাল, হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইনস্টিটিউট, লয়েড্স বোটানিকেল গার্ডেন, ধীরধাম মন্দির, স্টেপ এ সাইড ভবন, পদ্মজা নাইডু হিমালয়ান জুলজিকেল পার্ক, হিমালয়ান আর্ট গ্যালারি, দার্জিলিং-রঙ্গিত ভ্যালী প্যাসেঞ্জার রোপওয়ে, লেবং রেস কোর্স, হ্যাপি ভ্যালী টি গার্ডেন, টাইগার হিল, সান্দাকুপ, ফালুট, কাউলে গাঁও, কলিম্পং আর্ট গ্যালারী, জংদং পারলী, চিত্রভানু, কার্শিয়াং, মংপু, কার্শিয়াং ডাউন হিল ভিউ পয়েন্ট, থারপা চোলিং মনাস্ট্রি, কালিঝোরা, ন্যাউড়া ভ্যালী জাতীয় উদ্যান, পাগলাঝোরা জলপ্রপাত, মিরিক লেক, রক গার্ডেন, গঙ্গামায়া পার্ক, টুমলিং ইত্যাদি। মনোরম নৈসর্গিক সৌন্দর্যে ভরপুর এ সব চিত্তাকর্ষক পর্যটন স্পট ঘুরে দেখার জন্য দার্জিলিংয়ের রাস্তায় অপেক্ষমাণ রয়েছে সারি সারি মাহিন্দ্র জীপ, মারুতি ট্যাক্সি ক্যাব, সুমো-টাটা মাইক্রো বাস ইত্যাদি অসংখ্য যান-বাহন। রিজার্ভ বা শেয়ারিং বেসিসে এই সব সড়ক যান ভাড়া করে আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্রগুলি ঘুরে দেখা যায়।

ম্যালের মিলন মেলা
হোটেল ভ্যালেন্টিনোতে লাগেজ রেখে একটু ফ্রেশ হয়েই বেরিয়ে পড়লাম দার্জিলিং শহরটি ঘুরে দেখার জন্য। দার্জিলিং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশের উচ্চতম নৈসর্গিক সৌন্দর্যে ভরপুর অন্যতম শৈল শহর। সমুদ্রপৃষ্ট থেকে এই হিল স্টেশানটির উচ্চতা ২১৩৫ মিটার বা প্রায় ৭০০০ ফুট। তবে পার্বত্য অঞ্চলে অবস্থিত হলেও মেঘালয়ের রাজধানী শিলং যেমনটা সমতল দার্জিলিং তেমনটা নয়। হিমালয় পর্বতমালার বিভিন্ন ধাপের সমন্বয়ে ১২ বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে শহরটি গড়ে উঠেছে। পাহাড়-পর্বত, খাদ-ঝর্ণা আর চিরসবুজ বনানী বেষ্টিত দার্জিলিং শহরে পা দিয়ে প্রথম দর্শনেই মুগ্ধ হতে হয়। হোটেল থেকে বেরিয়ে আমাদের প্রথম গন্তব্য ছিলো ম্যাল। পাহাড়ের ধাপে অনতিবৃহৎ প্রায় একটি সমতলক্ষেত্র এটি। এর একদিকে রয়েছে সবুজ কার্পেটে মোড়ানো নানা জাতের বৃক্ষরাজি সমৃদ্ধ বিস্তির্ণ উপত্যকা আর অন্যদিকে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে আছে শুভ্র বরফের মুকুট মাথায় স্বপ্নের কাঞ্চনজঙ্ঘা। অনুচ্চ লোহার র্যা লিং দিয়ে ঘেরা ম্যালে হোটেল, হলিডে হোম, টুরিস্ট বাংলো, রেস্তোরাঁ, দোকান-পাট, ব্যাংক ইত্যাদি সবকিছুই গড়ে উঠেছে পর্যটকদের সুবিধার্থে। কখনো ঘন কুয়াশা আবার কখনো বা কালো মেঘের আনাগোনায় আলো-আধারির এক রহস্যময় পরিবেশ সৃষ্টি হয়ে থাকে ম্যালে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সারাদিন পর্যটকদের ভিড় লেগে থাকে এখানটাতে।

কুয়শাচ্ছন্ন ম্যালে পর্যটকদের পদচারণা
ম্যালের একপাশে সওয়ারীর অপেক্ষায় সারি সারি টাট্টু ঘোড়া দাঁড়িয়ে আছে। এসব ঘোড়ায় চড়ে পাহাড়ি চড়াই-উৎরাই রাস্তায় হিমালয়ের হিমেল হাওয়ায় খানিকটা চক্কর দিয়ে আসা কম রোমাঞ্চকর নয়। কাঞ্চনজঙ্ঘা আর হিমালয়ের ধাপে ধাপে গড়ে ওঠায় মধ্য গ্রীষ্মেও দার্জিলিংয়ে শীতের প্রকোপ। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামতে না নামতেই হিমালয় থেকে ধেয়ে আসা বরফ-শীতল ঝড়ো হাওয়া গরম কাপড়ের আবরণ ভেদ করে শরীর জমিয়ে তুলতে শুরু করে দিলো। তাই তাড়াতাড়ি রাতের খাবার সেরে হোটেল ভ্যালেন্টিনোতে ফিরে গেলাম।

ভ্রমনেও তাসের আড্ডা
যে কয় দিন দার্জিলিং ছিলাম প্রতি রাতেই তাসের আড্ডা বসতো। সহকর্মী সুন্দর আলী ব্রিজ ভালো বুঝলেও শারীরিক সমস্যার কারণে খেলায় আগ্রহী ছিলো না। বাকি চার জনের মধ্যে পত্নীপরায়ণ হেলাল ভাই হোটেলে ফিরেই কম্বলের নীচে আশ্রয় নিতেন, কারণ রাত জাগার বিষয়ে তার স্ত্রীর নিষেধাজ্ঞা ছিলো। প্রথম দিন আমরা তিন জন তাস হাতে হতাশ হয়ে বসে ছিলাম। তিন জনে ডেমি হ্যান্ড ব্যাবহার করে ব্রিজ খেলা যায় বটে তবে তা তেমন জমে উঠে না। হুমায়ুন কবীর কায়দা করে তাস ক্রস করতেই তাসের পতপত আওয়াজ হলো আর সেই শব্দে হেলাল ভাই লেপ-কম্বল ফেলে এক লাফে তাসের আড্ডায় হাজির। এটি পরে নিত্য-নৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়, হেলাল ভাই হোটেলে ফিরেই কম্বলের নীচে আশ্রয় নেন আর তাস-ক্রসের আওয়াজের সঙ্গে সঙ্গে খেলায় বসে যান। আমি একদিন তাকে বললাম, আপনি তো রোজই লেপ-কম্বল ছেড়ে খেলায় বসে যান, তাহলে হোটেলে ফিরেই কম্বল মুড়ি দেয়ার দরকার কি? উত্তর এলো, আপনার ভাবী রাত জাগতে নিষেধ করেছেন, পারি না পারি চেষ্টা করতে দোষ কি। পত্নীব্রত্যতার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। প্রথম দিনেই গভীর রাত পর্যন্ত খেলা চলে।

দার্জিলিংয়ের পথে-প্রান্তরে
পরদিন সকাল বেলায় আমরা নেপালী ড্রাইভার ভুপেনের গাড়ীতে চড়ে দার্জিলিংয়ের বিভিন্ন পর্যটন কেন্দ্র পরিদর্শনে বেড়িয়ে পড়লাম। আমাদের প্রথম গন্তব্য ছিলো হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইনস্টিটিউট। ম্যাল থেকে দুই কিলোমিটার দূরে জহর পর্বতের গায়ে এটি গড়ে তোলা হয়েছে। পর্বতারোহণের সবধরনের সরঞ্জামাদি প্রদর্শনের ব্যাবস্থা রয়েছে এখানটাতে। পাশেই রয়েছে পদ্মজা নাইডু হিমালয়ান জুলজিকেল পার্ক। জহর পর্বতের বিস্তির্ণ এলাকা জুড়ে পার্কটি গড়ে উঠেছে। জানা-অজানা বিচিত্র বৃক্ষরাজি সমৃদ্ধ পার্কটিতে সাইবেরিয়ান বাঘ, হিমালয়ের অতিকায় কালো ভালুক, তিব্বতের হিংস্রতম নেকড়ে, গন্ডার আর বিচিত্র জাতের অসংখ্য পাখির সমাবেশ ঘটেছে।

দার্জিলিং শহর থেকে ৮/১০ কিলোমিটার দূরে রয়েছে রক গার্ডেন আর গঙ্গা-মায়া পার্ক নামে দুটি আকর্ষণীয় পর্যটন স্পট। দার্জিলিং শহর যে উচ্চতায় অবস্থিত তা থেকে প্রায় ৩০০০ ফুট নীচু একটি উপত্যকা সদৃশ্য স্থানে রক গার্ডেন আর গঙ্গামায়া পার্কের অবস্থান। দার্জিলিংয়ের অন্যতম উচু স্থান ঘুমের কাছাকছি জায়গা থেকে আঁকা-বাঁকা একেবারে খাড়া পাহাড়ি রাস্তায় গাড়ী যখন নেমে যাচ্ছিলো রক গার্ডেনের দিকে তখন ভয়ে আমাদের রক্ত হিম হয়ে যাওয়ার অবস্থা। সঙ্গী দু-এক জন চোখ বন্ধ করে দোয়া-দরূদ পড়া শুরু করে দিলো। গোর্খা হিল কাউন্সিল টুরিজম ডিপার্টমেন্ট কর্তৃক নির্মিত রকগার্ডেন গোর্খা নেতা সুভাস গিসিং উদ্বোধন করেন। পার্শ্ববর্তী পাহাড় থেকে নেমে আসা কয়েকটি প্রাকৃতিক প্রস্রবণকে কেন্দ্র করে পাহাড়ের ধাপে ধাপে দৃষ্টিনন্দন রক গার্ডেনটি গড়ে তোলা হয়েছে। মনোরম নৈসর্গিক পরিবেশে বিশাল বিশাল পস্তর খণ্ডের ফাঁকফোঁকরে প্রবহমাণ ফল্গুধারাকে বেষ্টিত করে চির সবুজ বনানীতে ঢাকা পাহাড়-পর্বত দাঁড়িয়ে আছে দুই দিকে। রক গার্ডেনের । চতুর্দিকে রয়েছে শান-বাঁধানো পায়ে চলার পথ আর র্যা লিং ঘেরা সুউচ্চ সিঁড়ি পথ। গভীর খাদের দুই তীর সংযুক্ত করে কাঠের সেতু নির্মাণ করা হয়েছে পর্যটকদের চলচলের জন্য।

রক গার্ডেন থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দুরে আরো অনেকটা নীচের দিকে গঙ্গামায়া পার্কের অবস্থান। গোর্খা আন্দোলনের সময় পুলিশের গুলিতে নিহত একজন স্থানীয় অধিবাসীর নামে পার্কটির নামকরন করা হয়। একটি মাঝারি জলপ্রপাত ও পাহাড়ের খাদে বৃত্তাকার লেককে কেন্দ্র করে গঙ্গামায়া পার্কটি গড়ে তোলা হয়েছে। লেকের চতুর্দিকে পাহাড়ের গায়ে ফুলে-ফলে সমৃদ্ধ বৃক্ষরাজি ভিড় করে আছে তার সাথে রয়েছে সযত্নে গড়ে তোলা বিচিত্র জাতের ফুলের বাগান। লেকটিতে প্যাডেল বোটে করে স্বল্প পরিসরে নৌভ্রমণেরও ব্যাবস্থা রয়েছে। পর্যটকদের মনোরঞ্জনের জন্য একদল গোর্খা তরুনী গোর্খা লোক সঙ্গীতের তালে তালে নৃত্য পরিবেশন করে পার্কের পরিবেশ উৎসবমুখর করে রাখে সারাক্ষণ।

গঙ্গামায়া পার্কে নৃত্যপটিয়সী গোর্খা তরুণীদের মাঝে লেখক
দার্জিলিংয়ের ম্যাল থেকে ৩ কিলোমিটার দুরে রয়েছে দার্জিলিং-রঙ্গীত ভ্যালী প্যাসেঞ্জার রোপওয়ে। ১৯৬৮ সালে পশ্চিম বঙ্গের ফরেস্ট ডেভেলাপমেন্ট ডিপার্টমেন্ট কতৃক দার্জিলিং-রঙ্গীত ভ্যালী পেসেঞ্জার রোপওয়ের গোড়াপত্তন করা হয়। একটি মাত্র কেবল কার নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও বর্তমানে ১৬ টি কেবল কার দার্জিলিং নর্থপয়েন্ট থেকে রাম্মন নদীর তীরে সীঙ্গলীলা বাজার পর্যন্ত যওয়া-আসা করে থাকে। মাঝখানে একবার প্রাণঘাতি দুর্ঘটনার কারণে রোপওয়েটি কয়েক বছর বন্ধ ছিলো। দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানের জন্য একটি তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়। কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী যথাযথভাবে মেরামতের পর নিরাপত্তা নিশ্চিত হলে রোপওয়েটি পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়।

দার্জিলিং নর্থপয়েন্ট থেকে সীঙ্গলীলা বাজার পর্যন্ত ৮ কিলোমিটার রাস্তা পাড়ি দিতে কেবল কারের সময় লাগে ৪৫ মিনিট। যাত্রার পুরো সময়টাই পর্যটকরা সীঙ্গলীলা উপত্যকার অবর্ণনীয় নৈসর্গিক সৌন্দর্য মন্ত্রমুগ্ধের মতো উপভোগ করে। নর্থপয়েন্ট থেকে কেবল কার ঘন অরণ্য, সবুজ পাহাড়-পর্বত, ঝর্ণা-জলপ্রপাত, খরস্রোতা-প্রবহমান নদী, চা বাগান, সবুজ কার্পেটে মোড়া উপত্যকার উপর দিয়ে যাত্রা করে সীঙ্গলীলা বাজারে পেীঁছালে মনে হয় যেনো একটি স্বপ্নের ভ্রমণ তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে গেলো।

কাঞ্চনজঙ্ঘা আহা কাঞ্চনজঙ্ঘা
শহর থেকে ১০/১২ কিলোমিটার দূরে বরফাবৃত কাঞ্চজঙ্ঘার শুভ্র আঁচলে মাথা উচু করে দাঁড়িয়ে আছে দার্জিলিংয়ের মনোরম ভিউপয়েন্ট শৈলচূড়া টাইগার হিল। টাইগার হিলের উচ্চতা সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে ২৫৫০ মিটার বা প্রায় সাড়ে আট হাজার ফুট। টাইগার হিল থেকে বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বত শৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্টের দূরত্ব ১০৭ কিলোমিটার। টাইগার হিলের ভিউ পয়েন্ট থেকে প্রভাতে সূর্যোদয়ের দৃশ্য দেখার জন্য প্রচণ্ড শীত উপেক্ষা করে দেশ-বিদেশের শত শত পর্যটক শেষ রাত থেকেই টাইগার হিলের দিকে অগ্রসর হয়। তবে ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলেই কেবল টাইগার হিল থেকে সূর্যোদয়ের দৃশ্য দর্শনের সুযোগ পাওয়া যায়। কারণ সকাল বেলা প্রায়শই আকাশ মেঘাচ্ছন্ন বা কুয়াশায় ঢাকা থাকে। সৌভাগ্যক্রমে আমরা যেদিন টাইগার হিল গমন করি সেদিন ছিলো মেঘমুক্ত কুয়াশাবিহীন পরিষ্কার আকাশ। কনকনে ঠাণ্ডা হাওয়ার ছোবল উপেক্ষা করে ৪ ডিগ্রি তাপমাত্রায় আমরা কয়েক শ পর্যটক পূর্ব দিগন্তে দৃষ্টি মেলে দাঁড়িয়ে আছি। হঠৎ দেখলাম একটা জ্বলন্ত অগ্নি পিণ্ড যেন গা ঘেঁষাঘেঁষি করে দাঁড়িয়ে থাকা দুটি পর্বতের চূড়ার মাঝখান থেকে লাফ দিয়ে অনেকটা উপরে উঠে এসেছে। আস্তে আস্তে উদীয়মান সূর্যের সোনালী আলো পার্শবর্তী কাঞ্চনজঙ্ঘার শুভ্র বরফের উপর ছড়িয়ে পড়ছে আর বরফের বর্ণ ক্রমশ সাদা থেকে সোনালী রং ধারণ করছে। বেলা বাড়ার সাথে সাথে প্রহরে প্রহরে কাঞ্চনজঙ্ঘার রং পাল্টে যাচ্ছে দ্রুত। চোখের সামনে কাঞ্চজঙ্ঘার এই রং বদলের খেলা দীর্ঘ সময় ধরে উপভোগ করে দর্শনার্থীরা।

দার্জিলিং শহর থেকে টাইগার হিল যেতে হলে আগের দিন যানবাহন রিজার্ভ করে রাখা ভালো। রিজার্ভ করা থাকলে ভোর রাতের দিকেই চালকেরা এসে হোটেল থেকে পর্যটকদের গাড়ীতে উঠিয়ে নিয়ে টাইগার হিলের দিকে যাত্রা শুরু করে। পর্যটন মওসুমে ভোর রাতে শত শত যানবাহনের গতিপথ যেন একটাই- আর সেটি হলো ঘন অরণ্যের ছায়া ঢাকা টাইগার হিলগামী আঁকাবাঁকা পথ।

‘পথে হল দেরী’ বাতাসিয়া লুপে
টাইগার হিল থেকে ফেরার পথে আমরা বাতাসিয়া লুপে যাত্রা বিরতি করলাম। বাতাসিয়া লোপ চতুর্দিকে উন্মুক্ত ফুলে ফুলে সজ্জিত ৫০,০০০ বর্গফুট আয়তনের একটি মনোরম উদ্যান। দার্জিলিং-শিলিগুড়ির মধ্যে চলাচলকারী টয় ট্রেনকে বাতাসিয়া লোপের কাছে এসে পাহাড়ের খাড়া ঢাল বেয়ে ১০০০ ফুট নীচে নেমে যেতে হয়। টয় ট্রেনের এই খাড়া অবতরণকে নিরাপদ ও মসৃণ করার জন্য উন্নত প্রযুক্তি প্রয়োগ করে বাতাসিয়া লুপে বিশেষ কায়দায় চক্রাকার ট্রেন ট্র্যাক স্থাপন করা হয়েছে। চতুর্দিকে দৃষ্টি মেলে পুর্ব-হিমালয়ের বরফাবৃত চূড়া, অদূরে মাথা উঁচু করে সগর্বে দাঁড়িয়ে থাকা কাঞ্চনজঙ্ঘা, পাহাড়ের ঢালে ঢালে গড়ে ওঠা দার্জিলিং শহরসহ দার্জিলিং জেলার মনোরম নৈসর্গিক সৌন্দর্য একনজরে উপভোগের জন্য বাতাসিয়া লোপের চেয়ে উপযুক্ত স্থান আর নেই। বাতাসিয়া লোপের মাঝখানে বিভিন্ন যুদ্ধে নিহত গোর্খা সৈন্যদের স্মরণে একটি ওয়ার মেমোরিয়াল স্থাপন করা হয়েছে। এখানটায় নির্মিত ইকো গার্ডেনে দার্জিলিংয়ে অরগানিক শষ্য উৎপাদন ও বনায়নের বিষয়ে খোঁজ-খবর পাওয়া যায়। ইকো গার্ডেনটিতে দুর্লভ প্রজাতির অনেক গাছ-পালাও দেখতে পাওয়া যায়। বাতাসিয়া লুপে পা দিয়েই মনের কোণে ভেসে উঠলো উত্তম-সুচিত্রা অভিনীত বিখ্যাত সিনেমা ‘পথে হলো দেরী’র কয়েকটি দৃশ্য যে-গুলো এখানেই চিত্রায়িত করা হয়েছিলো।

শান্তির প্রতীক পীস প্যাগোডা
জাপানের মানবতাবাদী নাগরিক শান্তির দূত নিকিডাৎসু ফুজির উদ্যোগে স্থাপিত দার্জিলিংয়ের ওয়ার্ল্ড পিস প্যাগোডাটি পর্যটকদের জন্য একটি আকর্ষণীয় স্থান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আনবিক বোমা নিক্ষেপে জাপানের হিরোসিমা ও নাগাসাকি শহর দুটি সম্পূর্ণরুপে বিধ্বস্ত হয়। দুটি শহরের সব ঘর-বাড়ি মাটির সাথে মিশে যায় আর হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটে। এরই প্রেক্ষিতে নিকিডাৎসু ফুজি শান্তির প্রতীক হিসাবে বিশ্ব জুড়ে পিস প্যাগোডা স্থাপনের উদ্যোগ নেন। ফুজি নিজেই ১৯৭২ সালে দার্জিলিংয়ের পিস প্যাগোডাটির ভিত্তি প্রস্তর স্থপন করেন। তবে নান্দনিক স্থাপত্যের নিদর্শন এই পিস প্যাগোডাটির কাজ শেষ হতে হতে ১৯৯২ সাল এসে যায়। ইতোমধ্যে ফুজির মৃত্যু হলে তার একজন সিনিয়র শিষ্য প্যাগোডাটির উদ্বোধন করেন। নিকিডাৎসু ফুজি ভারতের শান্তিবাদী নেতা মহাত্মা গান্ধীর ঘনিষ্ট বন্ধু ছিলেন। জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে বিশ্বের সকল মানুষের মধ্যে সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন ও যুদ্ধবিরোধী মনোভাব গড়ে তোলার লক্ষে ফুজি পিস প্যাগোডা স্থাপনের মহতী উদ্যোগ গ্রহণ করেন। দার্জিলিংয়ের মনোরম নৈসর্গিক পরিবেশে নির্মিত পিস প্যাগোডাটির সামনে দাঁড়ালে প্রশান্তিতে ভরে যায় মন।

কাকচক্ষু স্বচ্ছ জলে নৌবিহার
ভ্রমণের দ্বিতীয় দিন সকালে গোসল ও নাস্তা সেরে আমরা দার্জিলিংয়ের অন্যতম আকর্ষনীয় পর্যটক-প্রিয় স্থান মিরিকের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম। সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে ৫০০০ ফুট উচ্চতায় ঘন সবুজ অরণ্য-পর্বতের মাঝখানে কচি-কোমল সবুজ কমলা বাগান আর কাঁচা এলাচ বাগান পরিবেষ্টিত একটি সুদৃশ্য লেককে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে মায়াবী ছোট্ট শহর মিরিক। পশ্চিম বঙ্গ সরকারের পর্যটন শিল্প বিকাশ কার্যক্রমের অংশ হিসাবে স্থানীয় অধিবাসীদের নিকট থেকে প্রয়োজনীয় জমি অধিগ্রহণের পর ১৯৭৪ সালে লেকটির খনন কাজ শুরু হয়। সুমেন্দু লেক নামে পরিচিত এই স্বপ্নিল জলাশয়টির চতুর্দিকে ৩/৪ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি পায়ে চলার পথ তৈরী করা হয়েছে। পার্শ্ববর্তী কাঞ্চনজঙ্ঘার দৃশ্য দেখে দেখে অনেকেই এই পথ দিয়ে লেকটি একবার চক্কর দিয়ে আসেন। ইন্দ্রানী পুল নামে পরিচিত একটি সেতু নির্মাণ করে লেকের দুই তীর সংযুক্ত করে রাখা হয়েছে। দর্শনার্থীরা ইচ্ছে করলে সেতুটি ব্যাবহার করে লেকের ওপার ঘুরে আসতে পারেন। চতুর্দিকে মনোরম নৈসর্গিক দৃশ্যাবলী সমৃদ্ধ গভীর নীল জলের এই ছোট্ট জলাশয়টি পর্যটকদের হাতছানি দিয়ে ডাকে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকরা মিরিক লেকের অপ্রতিরোধ্য আকর্ষণে ছুটে আসেন। পাহাড়-পর্বত থেকে নেমে আসা ঝর্ণা আর মেীসুমী বৃষ্টিই মূলত: এই লেকের পানির প্রধান উৎস। পার্শ্ববর্তী লোকালয়ের পানীয় জল আর চাষাবাদের প্রয়োজনীয় জলের উৎস হিসাবেও লেকটির গুরুত্ব রয়েছে। বিভিন্ন জাতের মৎস্যের আবাদ হয় এখানে। লেকের কাকচক্ষু স্বচ্চ জলে অতিকায় মাছেরা কেলি করে ঘুরে বেড়ায়। রঙ-বেরঙের ইঞ্জিন চালিত সুসজ্জিত নৌকা ও প্যাডেল বোট সওয়রীর আশায় ঘাটে অপেক্ষমাণ থাকে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত। মিরিকের আবহাওয়া প্রায় সারা বছরই আরামদায়ক থাকে। গ্রীষ্মে তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের উপরে উঠে না আর শীতে ২/৩ ডিগ্রি পর্যন্ত নেমে যায়।

মনোরম মিরিক লেক
মিরিকের রাস্তায় রাস্তায় বিশেষ করে জোড়-পুকুরিয়ায় যাত্রা বিরতির কারণে মিরিক পৌঁছাতে আমাদের দুপুর হয়ে গেলো। এদিকে ক্ষিধেও পেয়েছে, ঠিক করলাম দুপুরের খাবার সেরেই একবারে লেকের পাড়ে যাব। গাড়ীর চালক ভুপেন আমাদের এক পাঞ্জাবী রেস্টুরেন্টে নিয়ে গেলো। আমরা ওয়াশ রুমে হাত-মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে রেস্টুরেন্টের ডাইনিং রুমে গিয়ে দেখি শুধুমাত্র পাঞ্জাবী থালা ছাড়া আর তেমন কোনো খাবার নেই। দুপুর বেলা এই সব পাঞ্জাবী ছাইপাশ গলাধ:করন করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। আমাদের হাবভাব দেখেই ওয়েটাররা উষ্মা প্রকাশ করতে লাগলো, এদিকে পাঞ্জাবী মালিক নিজেও এগিয়ে আসছে। বেগতিক দেখে আমি আর হুমায়ুন কবীর কেটে পড়লাম। সুন্দর আলীসহ বাকী তিনজন টয়লেট থেকে বের হয়েই তোপের মুখে পড়লো। পাঞ্জাবী মালিক কোনোমতেই ছাড়তে রাজী নয়। সর্দারজীর সাফ কথা- রেস্টুরেন্ট কা টয়লেট এস্তেমাল কিয়া, লেকিন খানা নেহি খায়ে গা, ও কভী হোগা নেহি, মাঁয় তোম লোগ কো নেহী ছোড়ঙ্গা অর্থাৎ রেস্টুরেন্টের টয়লেট ব্যাবহার করেছ অথচ খানা খাবে না তা কখনই হতে পারে না, আমি তোমাদের ছাড়বো না। শেষ পর্যন্ত অনেক কাকুতি-মিনতি করে, মাফ-টাফ চেয়ে কোনোরকমে ছাড়া পাওয়ার পর সুন্দর আলীর ব্যবহার আর সুন্দর থাকলো না। ফিরে এসেই আমার সাথে মহা রাগারাগি, পাঞ্জাবী শেরের মুখে তাদের ঠেলে দিয়ে আমরা কেনো পালিয়ে এলাম? যা হোক শেষ পর্যন্ত এক বাঙ্গালী রেস্টুরেন্টে মিরিক লেকের বিশালাকৃতির কৈ মাছ আর ডাল বোনা দিয়ে তৃপ্তিসহ দুপুরের খাবার খেয়ে লেকের দিকে রওয়ানা হলাম। অমরা যখন মিরিকের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেছিলাম তখন আকাশে এক ফোটা মেঘও ছিলো না। উজ্জ্বল রৌদ্রের সোনালী আলোয় চারিদিকের প্রকৃতি বর্ণময় হয়ে উঠেছিলো।

কিন্তু দার্জিলিংয়ের জল-হাওয়ার কোনো ঠিক-ঠিকানা নেই। কখন যে মেঘমুক্ত আকাশ থেকে উজ্জ্বল আলোর বন্যা এসে চতুর্দিক উদ্ভাসিত করে তুলবে আর কখন যে জলভরা কালো মেঘ এসে পাহাড়ের গায়ের ওপর অঝোর ধারায় বর্ষণ শুরু করবে বলা মুশকিল। আমরা মিরিকে পৌঁছুতে না পৌঁছুতেই শুরু হলো বিরামহীন বৃষ্টি। দুপুরের খাবারের পর রেস্টুরেন্ট থেকে বের হওয়াই অসম্ভব হয়ে উঠলো। তবে বৃষ্টি আমাদের শৈল সরোবর মিরিকের সৌন্দর্য দর্শন থেকে বিরত রাখতে পারে নি। ছাতা মাথায় করেই লেকের কিনারায় উপস্থিত হলাম। একটি সুসজ্জিত ইঞ্জিন বোট ভাড়া করে ভেসে পড়লাম মিরিক লেকের ছায়া-ঢাকা রহস্যময় জলের বুকে।

কালিম্পংয়ের বর্ণিল ক্যাটাস উদ্যানে
দার্জিলিং জেলার দুইটি পর্যটক-প্রিয় মহকুমা কালিম্পং আর মংপু ভ্রমণ একই দিনে শেষ করার পরিকল্পনা নিয়ে হোটেল ভ্যালেন্টিনোতে নাস্তা সেরে সকাল সকাল বেরিয়ে পড়লাম পরের দিন। আমাদের গাড়ীর নেপালী ড্রাইভার ভুপেন ছিলো বাংলা গানের বিশেষ করে রবীন্দ্র সঙ্গীতের মহা সমঝদার। তার বায়না গান গেয়ে শুনাতেই হবে। আমাদের পাঁচ সহকর্মীর মধ্যে শুধু আমিই তাল-লয়হীন বেসুরো সুরে ছিটে-ফোঁটা গাইতে পারতাম। আমাদের গাড়ী তখন দূ’কুলে সবুজ-শ্যামল বনানী আর পাহাড়-পর্বতে ঘেরা খরস্রোতা নদী তিস্তার তীর ধরে দ্রুত বেগে এগিয়ে চলেছে। দু’পাশের নৈ:শব্দময় নিসর্গ থেকে অলৌকিক সুর মূর্ছনা ভেসে এসে আমাদের সবাইকে মোহাবিষ্ট করে ফেলেছে। আমিও তখন গেয়ে চললাম একের পর এক রবীন্দ্র সঙ্গীতের কলি। আমি জানতাম এসব গানের তাল-লয়-সুর কিছুই ঠিক ছিলো না, আমার গান গাওয়ার দৌড় বাথরুম থেকে বেডরুম পর্যন্ত সীমাবদ্ধ। কিন্তু আমার ভ্রমণসঙ্গীরা দেখলাম আমার বেসুরো গানকেই বেশ উপভোগ করছে। অবশ্য ঐরকম একটা প্রাকৃতিক পরিবেশে আমার নিজের কাছেও তা মন্দ লাগেনি। পাথুরে নদী তিস্তার ধার ঘেঁষে নির্মিত দার্জিলিং-কালিম্পং রাস্তা ধরে এই স্বপ্নের যাত্রায় কখন যে কালিম্পং পৌঁছে গেলাম টেরই পেলাম না।

দার্জিলিংয়ের সঙ্গে সংযুক্ত হওয়ার পুর্বে কালিম্পং পর্যায়ক্রমে সিকিম ও ভুটানের রাজা কর্তৃক শাসিত হয়েছে। সিকিম রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত থাকার সময় এর নাম ছিলো ডার্লিংকোট। ১৭০৬ সালের দিকে ভুটান রাজ্যের সাথে সংযুক্ত হলে এর নাম পাল্টে রাখা হয় কালিম্পং। পরবর্তীতে ইংরেজরা ভুটান রাজার নিকট থেকে কালিম্পং দখল করে দার্জিলিংয়ের একটি মহকুমা হিসাবে যুক্ত করে নেয়। চমৎকার আরামদায়ক আবহাওয়ার জন্য ইংরেজরা কালিম্পংকে তাদের শীতকালীন আবাস হিসাবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়। এতে করে নিভৃত পাহাড়ী পল্লীটিতে শহরায়নের ছোঁয়া লাগে। নেপাল ও ভুটানের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত শৈল শহর কালিম্পং মনাস্ট্রির দেশ হিসাবে বিশ্বখ্যাত। অবারিত পাহাড়ি প্রকৃতির কোলে কচি সবুজ চা বাগান আর কাঁচা এলাচ বাগান সমৃদ্ধ কালিম্পংয়ের বুনো সৌন্দর্য সবাইকে মুগ্ধ করে। কালিম্পং থেকে আঁকাবাঁকা চড়াই-উৎরাই পাহাড়ি রাস্তায় গাড়িতে চড়ে কালিঝোরা, চিত্রভানু কলিম্পংয়ের ইত্যাদি পর্যটন কেন্দ্র ঘুরে দেখা যায়। চির-সবুজ বৃক্ষরাজিতে ঢেকে থাকা অসংখ্য পাহাড়-পর্বত পরিবেষ্টিত কালিঝোরার নৈসর্গিক সৌন্দর্য এক কথায় তুলনাহীন। বিয়াং আর তিস্তা নদীর উপকূলবর্তী চিত্রভানু উপত্যকা বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের খুব প্রিয় স্থান ছিলো। চিত্রভানুর প্রকৃতির টানে তিনি বেশ কয়েকবার এ এলাকা ভ্রমণ করে গিয়েছেন। কালিম্পংয়ে মনে রাখার মতো আর একটি স্থান পরিদর্শন করেছিলাম আর সেটি হলো রং-বেরংয়ের ক্যাকটাস ফুলে সজ্জিত একটি বর্ণময় উদ্যান। ক্যাকটাস ফুল যে কতো বিচিত্র বর্ণের, কতো বিচিত্র জাতের হতে পারে এখানটায় না আসলে তা বিশ্বাস করা যায় না। চতুর্দিকে নানা জাতের, নানা আকারের, নানা উচ্চতার ক্যাকটাস গাছ বিচিত্র বর্ণের ফুল ধারণ করে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। এ রকম একটি চমৎকার উদ্যানে প্রবেশ মূল্য মাত্র পাঁচ টাকা।

রবীন্দ্রনাথের মংপুতে
কালিম্পংয়ের পর আমাদের পরবর্তী গন্তব্য ছিল রবীন্দ্রনাথের স্মৃতি বিজড়িত স্থান মংপু। বিচিত্র বর্ণের অজস্র ফুলের সমারোহে সজ্জিত সমগ্র মংপু যেনো নিপুণ শিল্পীর বিশাল ক্যানভাসে আঁকা এক বর্ণময় তৈলচিত্র। রবীন্দ্রনাথ এখানে চার চার বার এসে দীর্ঘ সময় ধরে বসবাস করেছেন এবং এখানে বসে অসংখ্য গান-কবিতা রচনা করেছেন। রবীন্দ্রনাথ এখানে এসে যে বাড়িটিতে বসবাস করতেন আমাদের প্রথম গন্তব্য ছিলো সেটি। বর্তমানে রবীন্দ্রভবন নামে পরিচিত বাড়িটি আসলে রবীন্দ্র-ভক্ত সুসাহিত্যক মৈত্রয়ী দেবীর স্বামীর সরকারী বাংলো ছিলো। মংপু বেড়াতে এলে মৈত্রয়ী দেবীর বিশেষ অনুরোধে রবীন্দ্রনাথ এই বাড়িটিতেই অবস্থান করতেন। একটি বিস্তির্ণ উপত্যকার এক কোণে পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা কাচের দেয়াল ঘেরা বাড়িটি সত্যিকার অর্থেই কবিতা লেখার একটি উপযুক্ত স্থান। বাড়িটির সন্মুখস্থ উন্মুক্ত আঙ্গিনায় চতুর্দিকে দৃষ্টি মেলে দাঁড়ালে অবারিত প্রকৃতির বিশালত্ব দেখে অবাক হতে হয়। যতদূর দৃষ্টি যায় সবুজ অরণ্যে আবৃত মেঘে ঢাকা পাহাড় ছাড়া আর কিছুই দেখা যায় না। রবীনদ্রনাথ ঘুম থেকে উঠে আঙ্গিনার এক কোণে বসতেন, সকাল বেলার ঘন কুয়াশা কেটে গিয়ে আস্তে আস্তে উদীয়মান সূর্যের বর্ণিল আলোয় মংপুর প্রকৃতি উদ্ভাসিত হয়ে উঠতো আর বিশ্বকবি একের এক কবিতার ছন্দ গেঁথে যেতেন।

কুজ্জ্বটিকা সরে গেলে মংপুর
চোখের কোণে ভেসে উঠে রংপুর

এখানে এসে ক্ষণিকের জন্য আবেগাপ্লূত হয়ে গেলাম। এই সেই মুক্তাঙ্গন যেখানটায় অসীমের চিন্তায় মগ্ন দার্শনিক কবি রবীন্দ্রনাথ ধীর পদক্ষেপে ঘুরে বেড়াতেন, এখানটায় উপবিষ্ট হয়ে কবিগুরু সুদূরের পানে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে সীমার মাঝে অসীমের সন্ধানে নিমগ্ন হতেন। বাড়িটির অভ্যন্তরে রবীন্দ্রনাথের লেখা ও ছবি আঁকার সামগ্রী, বসার চেয়ার টেবিল, আরাম কেদারা, বিছানা-পত্র, গল্প-কবিতার পাণ্ডুলিপি সবকিছুই সযত্নে সংরক্ষিত আছে। তাছাড়া রয়েছে একটি পরিদর্শন বই যেখানে দর্শনার্থীরা মতামত লিখে স্বাক্ষর করতে পারেন। রবীন্দ্র ভবনে রবীনদ্রনাথের উপর মন্তব্যসহ পরিদর্শন বইয়ে স্বাক্ষর করাটা আমার জীবনের একটি স্মরনীয় দুর্লভ ঘটনা হয়ে থাকবে।

চার দিনের দার্জিলিং ভ্রমণ সেরে দেশে ফেরার পথে পরের দিন এসে পৌঁছালাম সমতলের শিলিগুড়িতে। এসেই আবার মুখোমুখি হলাম সেই যানজট-জনজটে ভরা, কল-কোলাহলময়, ঝক্কি-ঝামেলাপূর্ণ, যান-বাহনের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন, বিকট শব্দে হর্ণ-বাজানো আর ভ্যাপসা গরমে জীবন অতিষ্ঠ হওয়া এক নারকীয় পরিবেশে। আমাদের প্রিয় ঢাকা নগরীর অবস্থা ভিন্ন কিছু নয়। ইচ্ছে হলো দার্জিলিং ফিরে গিয়ে সেখানটাতেই বাকি জীবন কাটিয়ে দেই। কিন্তু ইচ্ছে হলেই তো আর হয় না, সংসার জীবনের বাস্তবতা ভিন্ন। তাই দার্জিলিং বসবাসের রোমান্টিক চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে তড়িঘড়ি শিলিগুড়ি থেকে ঢাকাগামী বাসে চেপে বসলাম।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 27 = 32