দুঃস্বপ্ন অথবা ………

অনেকক্ষণ ধরেই দৌরের উপর আছে রিয়াজ। প্রচন্ড তৃষ্ণায় বুকটা ফেটে যাবে মনে হচ্ছে। কিন্তু থামার কোন উপায় নেই। কিছুক্ষণ আগ পর্যন্তও পিছনে পায়ের আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছিল। এখন নেই। আপাতত তাকে ওঁরা হারিয়ে ফেলেছে। যদি তাকে ধরতে পারে তাহলে কি হবে ভাবতেই তীব্র আতংকে শরীর নিঃসাড় হয়ে পড়তে চায়। ওঁরা তাকে ছাড়বে না। যা দেখেছে তার কোন সাক্ষীই তারা রাখবে না। চোখ বন্ধ করলেই রিয়াজ সেই দৃশটা দেখতে পায়। চারজন লোক মিলে একটা লোককে কোপাচ্ছে। আক্রান্ত লোকটার শরীর টুকরো টুকরো হয়ে গেছে কিন্তু আক্রমণকারীদের কোপানোর বিরাম নেই। নাইট শো তে সিনেমা দেখে বাড়ি ফিরছিল রিয়াজ। সময় বাঁচানোর জন্য শর্টকাট রাস্তাটা ধরতে গিয়েই সে এই ঘটনার সাক্ষী হয়ে গেল আর নিজের ঘাড়েই বিপদ টেনে আনল। এখন লোকগুলো তাকে কোপানোর জন্য খুঁজছে।

হাত দিয়ে কপালের ঘাম মুছে রিয়াজ তার ছোটার গতি বাড়িয়ে দিল। তাকে পালাতে হবে। বাঁচতে হবে। সামনের বাঁকটা পার হতে পারলে পিছনের বিপদ থেকে বাঁচার সম্ভাবনা বেড়ে যাবে এই বিশ্বাসেই সে এখনো ছুটতে পারছে। কিছু বুঝে উঠার আগেই আচমকা কিসে জানি হোঁচট খেয়ে রিয়াজ পড়ে গেল। উঠতে গিয়ে সামনের দিকে তাকিয়েই রিয়াজ জমে গেল। কেন পিছনে পায়ের শব্দ পায়নি তার কারন এখন তাঁর কাছে পরিষ্কার। আততায়ীরা এই লাইনের কাঁচা লোক না। তারা ঠিকই বুঝেছিল যে রিয়াজ এই পথ দিয়েই যাবে। তারা তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিল। তাদের হাতের অস্ত্রগুলো চকচক করছে। বোঝাই যায় না যে কিছুক্ষণ আগেই এই অস্ত্র দিয়ে আরেকজনকে কোপানো হয়েছে। রিয়াজের শরীরে আর কোন শক্তিই অবশিষ্ট নেই। সে পড়ে থেকেই দেখল লোকগুলো তাঁর দিকে নিশ্চিন্তমনে এগিয়ে আসছে। কোন তাড়াহুড়া নেই তাদের মাঝে।

*****
ধড়মড় করে ঘুম থেকে জেগে উঠল রিয়াজ। তাঁর সারা শরীর ঘামে ভিজে গেছে। উফ, কি ভয়ংকর স্বপ্নটাই না সে দেখল। বালিশের পাশেই মোবাইলটা রাখা। সেটাতে দেখাচ্ছে রাত তিনটা বাজে। আজ রাতে আর ঘুম হবে না। রিয়াজ বিছানা থেকে নেমে দাঁড়াল। পাশেই টেবিলের উপর গ্লাসটা ভরাই আছে। ঢকঢক করে এক নিঃশ্বাসে সবটুকু পানি শেষ করে হেঁটে বেলকনিতে এসে দাঁড়ালো সে। ইস্কাটনের ১৮ তলার এই এপার্টমেন্টের টপ ফ্লোরে সে থাকে। টপ ফ্লোর তাঁর পছন্দ না। কিন্তু কি করবে সে, পুষ্পিতার খুব শখ সে টপ ফ্লোরেই থাকবে। টপ ফ্লোরের বেলকনিতে দাঁড়িয়ে রিয়াজের গায়ে হেলান দিয়ে পূর্ণিমা দেখা খুব পছন্দের ছিল পুষ্পিতার। আজও পূর্ণিমা। হায় পুষ্পিতা। রিয়াজ আনমনেই দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

যাকে বলে একজন ব্যর্থ মানুষ, রিয়াজ ঠিক তাই। জীবনে যত দ্রুত সফলতার সিঁড়ি বেয়ে সে উপরে উঠেছিল, তারচেয়েও দ্রুতগতিতে সে নিচে নেমে এসেছে। এখন তাঁর জীবনটা অর্থহীন। পরিবার ছেড়েছে সে বহু আগেই, কোন যোগাযোগ নেই কারো সাথেই। ছোট একটা বোন ছিল যে কি না মাঝে মাঝে তাঁর খোঁজ নিত সেও বছরখানেক হল মারা গেছে। যার কারণে ঘর ছেড়েছিল সেই পুষ্পিতাও একদিন এমন এক চন্দ্রালোকিত রাতে তাঁকে ঘুমের মাঝে রেখে নিরুদ্দেশ হয়ে গেল। যাবার আগে একটা চিঠিতে শুধু লিখে রেখেছিল “Sorry”. লিখেছিল যেন তাঁর কোন খোঁজ করা না হয়। রিয়াজ কোন খোঁজ করেনি আর। কি লাভ খোঁজ করে? যে চলে যেতে চায় তাঁকে কে ধরে রাখতে পারবে? চাকরিটা ছেড়ে দিয়েছিল ব্যবসা করে প্রচুর লাভ করবে সেই আশায়। ঘনিষ্ঠ যেই বন্ধুকে বিশ্বাস করেছিল সেই সব কেঁড়ে নিয়ে দেশের বাইরে পালিয়েছে। লোনের টাকায় কেনা এই ফ্ল্যাটের লোন শোধ করতে না পারায় ফ্ল্যটটাও ছেড়ে দিতে হবে সামনের মাসে। রিয়াজ যদি ব্যর্থ না হয় তবে কে ব্যর্থ এই পৃথিবীতে?

আবার স্বপ্নটার কথা চিন্তা করল রিয়াজ। এই ধরণের স্বপ্ন ইদানিং সে ঘন ঘনই দেখছে। কারণটা কি কে জানে? সাইকিয়াট্রিস্টরা হয়ত ভাল বলতে পারবেন। হঠাত করেই রিয়াজের মাথায় একটা বিচিত্র চিন্তা খেলা করে গেল। ঘুম ভাঙার আগ পর্যন্ত তাঁর একবারও মনে হয়নি যে সে স্বপ্ন দেখছে। স্বপ্নের জগতটাকেই বাস্তব বলে মনে হচ্ছিল। আচ্ছা এমন কি হতে পারে না যে তাঁর বর্তমান জীবনটাও আসলে কারো স্বপ্নের জীবন? তাঁর সমস্ত আনন্দ বেদনার মুহূর্তগুলো আসলে কিছুই না, কেবল একজনের স্বপ্নের কিছু বিচ্ছিন্ন মুহূর্ত। চিন্তাটা ক্রমেই রিয়াজের মাথায় আসন গেঁড়ে বসলো। হাতের সিগারেট শেষ হয়েছে বহু আগেই। আরেকটা সিগারেট ধরিয়ে পায়চারী করতে করতে এই কথাই সে ভাবছিল। তাঁর জীবনটা যদি কারো বিক্ষিপ্ত মনের স্বপ্নই হয় তাহলে তাঁর এতদিনকার ব্যর্থ জীবনটা কি মিথ্যা? পুষ্পিতা মিথ্যা? সবকিছুই কি শূন্য? যদি তাই হয়, তবে এই স্বপ্নকে সে কেন আরো অগ্রসর হতে দিবে? কেন এই মিথ্যা জীবনকে সে বয়ে বেড়াবে? কেনই বা যে তাঁকে স্বপ্ন দেখছে তাঁকে কষ্টের মাঝে সে রাখবে?

অস্থির অবস্থায় হাঁটাহাঁটি করতে করতে হঠাত করেই রিয়াজ থমকে দাঁড়ালো। হ্যাঁ, এর সমাধান তাঁর কাছে আছে। খুব সহজ সমাধান। একটু সাহস করতে হবে এই যা। আবারো বেলকনিতে এসে দাঁড়ালো সে। নিচের দিকে তাকিয়ে কিছুটা হলেও শিউরে উঠল রিয়াজ। ১৮ তলা কম উঁচু নয়। এখান থেকে লাফিয়ে পড়লে বাঁচার কোন সম্ভাবনাই নেই। আরেকবার চিন্তা করল সে। তাঁর জীবনটা যদি কারো কল্পনার বা স্বপ্নের জীবন হয়ে থাকে তাহলে লাফ দিলেই যে তাঁকে স্বপ্ন দেখছে তাঁর ঘুম ভেঙে যাবে আর সে নিজে কল্পনার জগত থেকে বের হয়ে যাবে। অথবা তাঁর কোন অস্তিত্বই থাকবে না। আর যদি তাঁর বর্তমান জীবন বাস্তব হয়ে থাকে তবে না হয় সে মারাই যাবে। এর বেশি তো আর কিছু হবে না। শুধু শুধু এই ব্যর্থ জীবনকে টেনে নিয়ে কি লাভ? অতএব তাঁর হারানোর কিছুই নেই।

শেষবারের মত থালার মত গোল পূর্ণিমার চাঁদের দিকে তাকাল রিয়াজ। রেলিঙে উঠে দাঁড়িয়ে বুক ভরে নিঃশ্বাস নিল একবার। এবং তাঁর শরীরটাকে বাতাসে ভাসিয়ে দিল। নিচে পড়তে পড়তে রিয়াজের হঠাত মনে হল তাঁর জীবনটা সত্যি, কারো স্বপ্নের জীবন নয় এবং ১৮ তলা থেকে লাফ দিয়ে সে অনেক বড় ভুল করেছে। এমন ভুল যা কি না চাইলেও আর শোধরানো যাবে না। তীব্র আতংকে দ্রুতগতিতে ছুটে আসা মাটির দিকে রিয়াজ তাকিয়ে রইল।

*****
ধড়মড় করে ঘুম থেকে জেগে উঠল ইউসুফ। তাঁর সারা শরীর ঘামে ভিজে গেছে। উফ, কি ভয়ংকর স্বপ্নটাই না সে দেখল। বালিশের পাশেই মোবাইলটা রাখা। সেটাতে দেখাচ্ছে ভোর পাঁচটা বাজে।আজ রাতে আর ঘুম হবে না। ইউসুফ বিছানা থেকে নেমে দাঁড়াল। পাশেই টেবিলের উপর গ্লাসটা ভরাই আছে। ঢকঢক করে এক নিঃশ্বাসে সবটুকু পানি শেষ করে হেঁটে বেলকনিতে এসে দাঁড়ালো সে। ইস্কাটনের ১৮ তলার এই এপার্টমেন্টের টপ ফ্লোরে সে থাকে। স্বপ্নটার কথা চিন্তা করল ইউসুফ। ভাবছিল স্বপ্নে দেখা রিয়াজ নামক ছেলেটার কথা। ছেলেটাকে তাঁর নিজের সত্ত্বা বলেই মনে হচ্ছিল। এই ধরণের স্বপ্ন ইদানিং সে ঘন ঘনই দেখছে। কারণটা কি কে জানে? সাইকিয়াট্রিস্টরা হয়ত ভাল বলতে পারবেন। হঠাত করেই ইউসুফের মাথায় একটা বিচিত্র চিন্তা খেলা করে গেল। ঘুম ভাঙার আগ পর্যন্ত তাঁর একবারও মনে হয়নি যে সে স্বপ্ন দেখছে। স্বপ্নের জগতটাকেই বাস্তব বলে মনে হচ্ছিল। আচ্ছা এমন কি হতে পারে না যে তাঁর বর্তমান জীবনটাও আসলে কারো স্বপ্নের জীবন…………?

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১৬ thoughts on “দুঃস্বপ্ন অথবা ………

  1. আচ্ছা এমন কি হতে পারে না যে

    আচ্ছা এমন কি হতে পারে না যে তাঁর বর্তমান জীবনটাও আসলে কারো স্বপ্নের জীবন…………?

    লাইন টা পড়ে চিন্তায় পড়ে গেলাম । হুম । ……… :ভাবতেছি: :চিন্তায়আছি:

    1. চিন্তার কি আছে? আমাদের এই জগত
      চিন্তার কি আছে? আমাদের এই জগত যদি স্বপ্নের জগত হয় তাহলে তো ভালই। ঘুম ভাঙলেই দেখব সমস্ত অপ্রাপ্তি এই নিমেষে দূর হয়ে গেছে।

    1. এই গল্পটা অনেকদিন আগে
      এই গল্পটা অনেকদিন আগে লিখেছিলাম। যখন লিখেছিলাম তখন পর্যন্ত “স্বপ্ন” গল্পটা পড়ি নি। পরবর্তীতে গল্পটা পড়বার পর আসলেও চমকে গিয়েছিলাম।

  2. আমি আগে জাফর স্যার এর ‘
    আমি আগে জাফর স্যার এর ‘ স্বপ্ন ‘ পড়ি নাই , আমার কাছে গল্পের টূইস্ট ভালো লাগছে :তালিয়া:

  3. চমৎকার… আগে পড়া ছিল। তবুও
    চমৎকার… আগে পড়া ছিল। তবুও ভালো লাগল। আপনার নেক্সট হরর সিরিজ কবে আসতেছে? :অপেক্ষায়আছি:

    1. প্লটটা মাথায় ঘুরছে। গোছাতে
      প্লটটা মাথায় ঘুরছে। গোছাতে পারলেই লেখা শুরু করে দিব। কাজের খুব প্রেশারে আছি রে ভাই। একটু রিলাক্স হলেই লিখব ইনশাল্লাহ।

  4. স্বপ্নের জগতটাকেই বাস্তব বলে
    স্বপ্নের জগতটাকেই বাস্তব বলে মনে হচ্ছে। আচ্ছা এমন কি হতে পারে না যে আমার বর্তমান জীবনটাও আসলে কারো স্বপ্নের জীবন…………?

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

3 + 7 =