নাস্তিকতার জন্মতত্ত্ব : মুক্তচিন্তার সাথে সম্পর্ক

নাস্তিকতা কারন নয়, এটি ফলাফল।নাস্তিকতা জিনিসটা আল্টিমেটলি কোন প্রকার সর্বশক্তিমান সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বে অনাস্থা এবং তাকে অস্বীকার করা সংক্রান্ত বিষয়াদির সমষ্টি। এই অনাস্থা এবং অস্বীকার একটা দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ঘটে। প্রচুর অধ্যয়ন, জগৎ, জীবন,প্রকৃতি ও পরিবেশ এবং প্রতিবেশের প্রতি সজাগ দৃষ্টিপাত এবং পর্যবেক্ষণ, সামাজিক বিজ্ঞান ও প্রকৃতি বিজ্ঞানের অগ্রগতি সম্পর্কে অবগত থাকা ইত্যাদি বহুমাত্রিক এবং বহুবিধ কার্যকলাপের মাধ্যমে একজন মানুষের নাস্তিকতার পথে যাত্রা শুরু হয়। অর্থাৎ নাস্তিকতা রূপকথার গল্পের মতো কারো মাথায় হঠাৎ করে গজিয়ে ওঠা শিং নয় ;এটা বরং নদীর বুকে জেগে ওঠা চর – দীর্ঘদিনের একটু একটু পলি সঞ্চয়ের মাধ্যমে এটা জন্মে। নাস্তিকতার পলিমাটি হচ্ছে জ্ঞানের প্রতি ভালোবাসা,যুক্তির চর্চা, মানবিকতা, জনমুখীনতা প্রভৃতি ।এসবের সংশ্লেষণে একজন ব্যক্তি একটা পর্যায়ে এসে হয়তো সৃষ্টিকর্তার ধারণাতে আর বিশ্বাস রাখতে পারেননা।তখন সে নিজেকে আইডেন্টিফাই করে নাস্তিক হিসেবে। নাস্তিকতা শেষবিচারে সৃষ্টিকর্তায় অবিশ্বাস হলেও এই অবিশ্বাসের মূলে আছে জ্ঞান বিজ্ঞান আর চিন্তার চর্চা। এই চর্চার সাথে মুক্ত চিন্তার অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক আছে।

যে মানুষটা পৃথিবী, পরিবেশ, প্রতিবেশ, প্রথা, ঐতিহ্য, প্রতিষ্ঠান, সামাজিক ঘটনাবলী প্রভৃতির প্রতি পূর্বধারণা ও বিশ্বাস ভরা মন নিয়ে মুগ্ধ বিস্ময়ে শুধু তাকিয়ে না থেকে বরং পৃথিবীর উদ্ভব, বিকাশ, রূপান্তর, সামাজিক ও প্রাকৃতিক ঘটনাবলীর ব্যাখ্যা ও কার্যকারণ সম্পর্ক ইত্যাদি ব্যাপারে প্রশ্ন করে, প্রশ্ন করে উত্তর পেতে চায়, উত্তরের জন্য প্রথাগত ধর্মগ্রন্থের কাছে আশ্রয় নিয়ে যে তৃপ্ত হয়না,(কারণ নিজের লব্ধ অভিজ্ঞতায় সে কোন অলৌকিক শক্তির নিদর্শন পায়না)তাই সে কোন পূর্বধারণার ওপর নির্ভর না করে বিকল্প উত্তর অনুসন্ধান করে, নিজের বোধ ও যুক্তি দিয়ে সমস্যার বিশ্লেষণ করতে চায়, (তার লেখাপড়া যত সামান্যই হোক) তিনিই মুক্তমনা হয়ে ওঠেন ক্রমে ক্রমে। ক্রমে ক্রমে বলছি কারণ এটি নিরন্তর অনুশীলনের বিষয়। প্রাত্যহিক চিন্তা ও কাজের মধ্যে এর চর্চা করতে হয়।মুক্তমনা হওয়ার পূর্বশর্ত হচ্ছে মুক্তভাবে চিন্তা করার প্রবণতা থাকা। এই চিন্তার চর্চার একপর্যায়ে কেউ হয়ত সর্বশক্তিমানের অস্তিত্ব বিষয়ে সন্দিহান হয়ে ওঠে। তার চরমপর্যায় হচ্ছে নাস্তিকতা। সকলেই যে একই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই নাস্তিকতায় উপনীত হয় তেমন হয়ত নয়। মুক্তভাবে চিন্তার চর্চা না করেও কেউ ঈশ্বরের অস্তিত্বে অবিশ্বাসী হতে পারে। তবে সুচিন্তিত বিচার বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে যারা এই পর্যায়ে আসে তাদের ভিত্তি মজবুত থাকে।

প্রশ্ন হচ্ছে কেন মুক্তচিন্তার চর্চাকারীরা নাস্তিকতার দিকে ঝুকে পড়ে? উত্তরটা বোধ হয় এই যে তাদের মনে নানা বিষয়ে যেসব প্রশ্নের উদ্ভব হয়, সেসবের যে উত্তর প্রচলিত আছে তাতে তারা সন্তুষ্ট হতে পারে না। তাই তারা নতুন উত্তর সন্ধান করে। আর পুরনো প্রচলতি উত্তরগুলো আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞানের কষ্টিপাথরে যাচাই করতে যেয়ে সেসবের মধ্যে নানান অসঙ্গতি খুজে পায়।প্রথাগত উত্তরে যেসব অসঙ্গতি তার মূলে থাকে অজ্ঞতা, কুসংস্কার, বিজ্ঞানহীনতা ইত্যাদি।ধর্ম হচ্ছে যাবতীয় অসঙ্গতির ধারক, বাহক ও চরমতম সমর্থক।ধর্মের ভেতরকার সঙ্গতিহীন কথাবার্তাই একজন মুক্তচিন্তককে নাস্তিক করে তোলে।

নাস্তিকতা কোন ধর্মও নয়, বরং ধর্মের সাথে তার বিরোধ। বাস্তবে নাস্তিকতা এখনো পর্যন্ত কোন আন্দোলন হিসেবেও গড়ে ওঠেনি।অর্থাৎ এর কোন ভিশন, মিশন নেই। ধর্মের বিরোধিতা করাটাও নাস্তিকতার আসল উদ্দেশ্য নয়। নাস্তিক শুধু কেন সে নাস্তিক এই ব্যাখ্যাটাই করে যায় জীবনভর। সেই ব্যাখ্যা দেওয়ার উদ্দেশ্যেই সে ধর্মের ভেতরকার নানান অসংগতি, অযৌক্তিকতা, মিথ, মিথ্যা এবং অমানবিক দিকগুলো তুলে ধরে। এটা ধার্মিকের অনুভূতিতে আঘাত দেয় হয়তো, কিন্তুু ধর্মের বিরোধিতা করা কিংবা বিশ্বাসীর বিশ্বাসকে আঘাত দেওয়া কোনটাই তার প্রাথমিক লক্ষ্য নয়। ঠিক যেমন “পৃথিবী সূর্যের চারিপাশে ঘোরে” এই আবিষ্কারের উদ্দেশ্য ছিলো শুধুই পৃথিবীকে সঠিকভাবে জানা ও ব্যাখ্যা করা, কোন ধর্মগ্রন্থের বাণীকে মিথ্যা প্রমাণ করা তার উদ্দেশ্য ছিলো না। নাস্তিকতা নিয়ে লেখালেখির ব্যাপারটাও তেমনি। নাস্তিকদের কোন নবী বা অবতার নেই, কোন পবিত্র গ্রন্থ নেই,কোন উপাসনালয় নেই, অলৌকিক উপাস্য নেই, নেই কোন পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান বা কোড অব কন্ডাক্ট।কোন নাস্তিকের লাইফস্ট্যাইল কি হবে সেটা তার একান্ত ব্যক্তিগত অভিরুচির ব্যাপার,কারণ তার কোন দিকনির্দেশনামূলক আসমানী কিতাব নেই। ফলে কোন নাস্তিক যদি চুরি করে আপনি তাকে এমনিতেই চোর বলতে পারেন। তার চৌর্যবৃত্তির সাথে নাস্তিকতার কোন সম্পর্ক নেই। অর্থাৎ “নাস্তিকেরা চোর ” এই ধরনের স্টেটমেন্ট দেওয়ার কোন সুযোগ নেই।

এখন কথা হচ্ছে মুক্তমনা বলতে আমরা ঠিক কী বুঝি? মুক্ত মন যার তাকেই বলবো মুক্তমনা? ‘মন’ ও ‘মুক্তি’ দুটোই বড় গোলমেলে বস্তু। এদুটো শুধু শব্দ মাত্র নয়, এরা হলো কনসেপ্ট। উপরে আমি যে সমস্ত বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন মনকে মুক্তমনা বলেছি, সেই মন আসলে কী থেকে মুক্ত?লক্ষ্য করুণ সেই মন কিন্তু শুধুই প্রচলিত ধারার চিন্তার দাসত্ব থেকে মুক্ত। মানুষের মন কতকিছুর বন্ধনেই না আবদ্ধ। ষড়রিপুর বন্ধন অর্থাৎ কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ, মাৎসর্য এগুলোর বন্ধন বড় শক্ত।তাই আস্তিকদের মতো নাস্তিকদের মধ্যেও চোর, লম্পট, মিথ্যাবাদী,হিংসুক, কামুক থাকতে পারে। সব মিলিয়ে এরাও সমাজিক জীব। তবে আপনারা অনেকেই এদেরকে আপনাদের বিশ্বাসের জন্য বিপদজনক প্রাণী ভাবেন, শত্রু মনে করেন। এই কারনে ওরা আজ বিপন্নপ্রায় প্রজাতি না হলেও বিপদাপন্ন প্রজাতিতে পরিণত হয়েছে। নাস্তিকতার ডিকশানারীতে হত্যা শব্দটাই নেই অথচ ওরাই টার্গেট কিলিংয়ের মূল শিকার।

যাকে আমরা মুক্তমনা বলছি, মনে রাখতে হবে, তাকে এটা বলছি এই বিচারে যে তিনি চিন্তার রাজ্যে অর্থাৎ বুদ্ধিবৃত্তিক দিক দিয়ে প্রচলিত চিন্তাপদ্ধতি বা ধর্মীয় শাস্ত্রানুগত্যের বন্ধনটা ত্যাগ করতে পেরেছেন। ষড়রিপুর অন্য কোন বন্ধনকে তিনি ছিন্ন করে থাকতেও পারেন আবার নাও পারেন।সেটা বিবেচ্য নয়। অর্থাৎ আমরা যাকে মুক্তমনা বলছি তিনি চিন্তার জগতে মুক্ত হয়েও, বা নাস্তিক হয়েও আটকে থাকতে পারেন হিংসায়, কামনায় বা পরশ্রীকাতরতায়। কিন্তুু একজন মুক্তচিন্তক কী এমন সংকীর্ণতায় আটকে থাকতে পারেন? এই প্রশ্ন যখনই করি তখন মুক্তচিন্তা বা মুক্তমনা বিষয়টা বাস্তবতার মাটি ছেড়ে খানিকটা উপরে উঠে পরিণত হয় আইডিওলোজি বা দার্শনিকতায়। তখন বলতে হয়, মুক্তচিন্তক বা মুক্তমনা মানুষ কোন সংকীর্ণতার গণ্ডিতে নিজেকে আটকে রাখবে না। ওদের চিন্তার কেন্দ্রে মানুষ, ওদের চিন্তা চালিত হয় বিজ্ঞান, যুক্তি আর শ্রেয়বোধ দ্বারা। সুতরাং ওদের লক্ষ্য আরো দূরে। মুক্তমনা তাই একটা আদর্শের নাম, একটা দূরবর্তী লক্ষ্যের নাম, যে লক্ষ্যে মুক্তচিন্তকেরা পৌছাতে চায়। মুক্তচিন্তা একটা জার্নি, যার ঠিকানার নাম ‘মুক্তমন’। যে মন সকল প্রকার সংকীর্ণতা থেকে মুক্ত,যে মন মানুষকে মানুষ হিসেবে সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা জানানোর জন্য ব্যাকুল সেই কাঙ্ক্ষিত মন অর্জন করাটাই মুক্তচিন্তার লক্ষ্য।

একটা মানুষের কিন্তু মাল্টিপল আইডেন্টিটি থাকে।একেক ক্ষেত্রে একেকটা পরিচিতি প্রধান হয়ে উঠে। যেমন একজন শিক্ষক তার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রধানত শিক্ষক। আবার তিনিই বাড়িতে সন্তানদের কাছে বাবা, স্ত্রীর কাছে স্বামী।সামাজিক মানুষকে কখনোই তাই কোন একটা আইডেন্টিটির গণ্ডিতে আটকিয়ে রেখে তার বিচার করা চলেনা।ধর্ম বিশ্বাসের ক্ষেত্রে যিনি নাস্তিক, তাকে শুধু নাস্তিকতার কারনে যদি তার অন্য সব পরিচয় অগ্রাহ্য করি,তাহলে সেটা আমাদের বিরাট বর্বরতার পরিচয়।নাস্তিকতা তো কোন অপরাধ নয়। জঙ্গিদের মতো এরা সশস্ত্রও নয়।বেশিরভাগ নাস্তিকই প্রকাশ্যে স্বীকার করতেই ভয় পায় যে সে নাস্তিক।অথচ আপনারা এদেরকে শুধু নাস্তিক হওয়ার “অপরাধে” এবং আপনাদের অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার অজুহাতে খুঁজে খুঁজে হত্যা করছেন, জেলে ভরছেন,ওদের মুখ ও হাত বন্ধ করার জন্য সংসদে আইন তৈরী করছেন।সমাজকে পেছন দিকে ঠেলে নেওয়ার জন্য এমন প্রাণান্তকর শ্রমের অপব্যয় আপনাদের মতো বর্বর অনুভূতিসম্পন্ন লোকেদের দ্বারাই সম্ভব।

আসুন বর্বরতা ত্যাগ করে মুক্তমনের মানুষ হওয়ার প্রয়াস নিই।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

4 + 5 =