সব বাঁধা পেরিয়ে পদ্মা সেতু

বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতুর অর্থায়নের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করলে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী দৃঢ়চেতা শেখ হাসিনা ঘোষণা করেছিলেন যে, বাংলাদেশ তার নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে। শেখ হাসিনা তার এই বিষয়ে দেয়া বিভিন্ন বক্তব্যে সুস্পষ্টভাবে সকল উন্নয়নশীল দেশকে জানিয়ে দেন যে, অর্থ-নিলয়ের অহমিকার জোরে বাংলাদেশ বা কোন উন্নয়নশীল অর্থনীতিকে জোর করে অসত্য ও অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত বিশ্বব্যাংক বা ওই ধরনের আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান চাপিয়ে দিতে পারে না। বাংলাদেশকে যে অবহেলা করা যায় না তা এ সকল আন্তর্জাতিক সংস্থা যারা কথায় কথায় মিথ্যা দোষারোপ দিয়ে তাদের কাছে অনুন্নত বা উন্নয়নশীল দেশকে নতজানু করে রাখতে চায় তারা সে শিক্ষা পেয়ে গেছে। বাঙালীকে কেউ মাথা নিচু করে চলার লক্ষ্যে আর ষড়যন্ত্র করতে পারবে না। অন্তর্বর্তীকালে বাংলাদেশের অবস্থানকে নৈতিকভাবে সমর্থন করে মালয়েশিয়া পদ্মা সেতু অর্থায়নে ২.৯ বিলিয়ন ডলার দেবে বলে ঘোষণা করে। চীন সরকার এই প্রেক্ষিতে পদ্মা সেতুর অর্থায়নে অংশগ্রহণ করা বিবেচনা করবে বলে জানায়। পরে মূল সেতুর সঙ্গে রেল সেতু নির্মাণে চীন সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেয়। বিশ্বব্যাংক ও অন্যান্য সহযোগী প্রতিষ্ঠান কর্তৃক অর্থায়ন বাতিল করার ফলে পদ্মা সেতুর বাস্তবায়নকাল এবং ব্যয়ও বৃদ্ধি পায়। তথাপি ২০১৫ সালের ১২ ডিসেম্বর অপ্রতিরোধ্য পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী এই প্রকল্পে এই পর্যন্ত সেতু সংশ্লিষ্ট সংযোগ সড়কের কাজ জাজিরা প্রান্তে শতকরা ৮৮ ভাগ এবং মাওয়া প্রান্তে শতকরা ১০০ ভাগ সম্পাদন হয়েছে। সার্ভিস এলাকা উন্নয়নের শতকরা ১০০ ভাগ এবং মূল সেতু নির্মাণের শতকরা ৩৫ এবং নদী শাসনের শতকরা ২৯ ভাগ সম্পাদিত হয়েছে। পদ্মা সেতুতে রেল সংযোজনের অংশটি চীন সরকারে অর্থায়নে করা হচ্ছে। এই সকল তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ দুটি কারণ পাওয়া যায়। এক. বিশ্বব্যাংক কর্তৃক পদ্মা সেতু অর্থায়নে কোন কিস্তি অবমুক্ত করা হয়নি বলে কেউ এই প্রক্রিয়ায় লাভবান হয়েছে বা দুর্নীতি করেছে তা বলা যায় না। যেখানে কোন আর্থিক লেনদেন ঘটেনি সেখানে আর্থিকভাবে কেউ ক্ষতিগ্রস্ত বা লাভবান হয়েছেন এবং লাভবান হয়ে লাভালীন কোম্পানিকে সহায়তা করেছেন তা বলা অযৌক্তিক ও হাস্যকর। দুই. বিশ্বব্যাংক মূলত দুর্নীতির অভিযোগ আনে তখন যখন প্রকৌশলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে দুটি পরিদর্শক সংস্থা নিয়োগের বিষয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিবেচনা করেছিলেন। এই বিবেচনাক্রমে পারদর্শী পরামর্শকদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অভিমতের বিপক্ষে বিশ্বব্যাংক তাদের পছন্দমতো ভিন্নতর একটি প্রতিষ্ঠানকে নিযুক্তির জন্য পরোক্ষভাবে প্রস্তাব করে বা চাপ দেয়। নৈতিকভাবে বিশ্বব্যাংকের বোঝা সঙ্গত যে, এক্ষেত্রে দুর্নীতি হয়ে থাকলে বিশ্বব্যাংকই তা করেছে, অন্য কেউ নয়। এখন স্পষ্ট হয়ে গেছে, তাদের প্রস্তাব বা চাপ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত না নেয়ায় বিশ্বব্যাংক এ দুর্নীতির অভিযোগ তুলেছিল। উল্লেখ্য, বিশ্বব্যাংক কর্তৃক নিযুক্ত প্রকল্পের প্রাকৃতিক নির্মাণ বিষয়ক বিশেষজ্ঞরা এক্ষেত্রে দুর্নীতির কোন অভিযোগ বা অনুযোগ তুলেননি। বরং তারা প্রকল্পটির বাস্তবায়ন নিয়ে এগিয়ে যেতে বিশ্বব্যাংক কর্তৃপক্ষকে সুপারিশ করেছিল। যারা প্রকল্পটির বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ করবেন তাদের বাদ দিয়ে তথাকথিত ন্যায়পরায়ণতা বিষয়ক বিশ্বব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগ লাভালীন কোম্পানি ও বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রী নির্বাহীদের যোগসাজশে দু’জন কর্মকর্তার দিনলিপিতে উল্লেখিত কতিপয় সঙ্কেতমূলক কথিতভুক্তির আলোকে দুর্নীতি হয়েছে বা হবে বলে সিদ্ধান্তে পৌঁছায়। তর্কাতীতভাবে এ ধরনের সিদ্ধান্ত মনগড়া, স্বার্থান্বেষী এবং সুযোগ সন্ধানমূলক। তথাপিও বিষয়টি বিশ্বব্যাংকের তৎকালীন প্রেসিডেন্টে রবার্ট জোয়েলেকের কাছে উত্থাপিত হলে তিনি তার মেয়াদ পূর্তির মাত্র একদিন আগে পদ্মা সেতুর অর্থায়ন বাতিল করেন। এই সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্রমে তিনি সম্ভবত নিজের স্বার্থের দিকেই বেশি নজর দিয়েছিলেন। বলা প্রয়োজন, এই প্রক্রিয়া স্পষ্টতা ও স্বচ্ছতাবিহীন এবং এই প্রেক্ষিতে বিশ্বব্যাংক প্রকারান্তরে ব্রেটন উডস্ চুক্তির সূত্র লঙ্ঘন করে তাদের নিজস্ব সংগঠনের দুরভিসন্ধিমূলক দুর্নীতি প্রতিফলিত করেছে। বাংলাদেশের কতিপয় তথাকথিত সুশীল সমাজের আঁতেল সদস্য প্রাথমিক পর্যায়ে বিশ্বব্যাংকের দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে সরকারকে দোষারোপ করার অপচেষ্টা চালায়। সব বাঁধা কাটিয়ে সেতুটি ২০১৮ সালে পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হবে।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

61 − 56 =