আমার ছেলেবেলার ছাদ…

ফেসবুকের হোমপেজে চোখ বুলাচ্ছিলাম। মাঝে মাঝে থেমে থেকে পড়ছিলাম…দেখছিলাম। কিন্তু এই ছবিটাতে এসে থমকে গেলাম। চুপচাপ তাকিয়ে রইলাম কিছুক্ষন। মূহুর্তেই নষ্টলজিয়া এসে আষ্টে পৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরলো আমায়।


ফেসবুকের হোমপেজে চোখ বুলাচ্ছিলাম। মাঝে মাঝে থেমে থেকে পড়ছিলাম…দেখছিলাম। কিন্তু এই ছবিটাতে এসে থমকে গেলাম। চুপচাপ তাকিয়ে রইলাম কিছুক্ষন। মূহুর্তেই নষ্টলজিয়া এসে আষ্টে পৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরলো আমায়।

আমাদের মিরপুর কলোনীপাড়ার বাড়ীটা ছিলো ঠিক এইরকম। আমরা যে বাড়ীতে থাকার সময় আমি জন্মেছিলাম। পুরনো সবুজাভ আর কালচে শ্যাওলা ধরা, পিছল ছিলো যার শরীর। চারিদিকে লোনা গন্ধ, জায়গায় জায়গায় পলেস্তারা খসে পড়েছে সেই শরীরের ভিতরে ও বাইরে। আব্বু তখন একটা ছোটখাটো চাকুরী করেন। তাই ভালো বাসায় বেশী ভাড়া দিয়ে থাকার মতো সামর্থ্য তারঁ ছিলো না।

আমরা ছিলাম দোতলায়। বাড়ীটা ছিলো চারতলা। বি-শা-ল ছিলো তার ছাদ। এত বিশাল ছিলো যে আমরা সেখানে পিচ বানিয়ে ক্রিকেট খেলতাম। ছাদের উপর ছিলো বড় বড় ড্রাম কেটে বানানো বেশ কয়েকটি ফুল আর ফল গাছের টব। আমার শৈশব আর কৈশোরের দশটি বছর কেটে গেছে এই বাড়ীর নোনাধরা দেয়াল আর স্যাতস্যাতে শৈবালগুলোর মাঝে।

খুব ভোরে ওঠতাম সে সময়, ওঠেই দেখতাম টবের ফুলগাছগুলোতে ফুল ধরেছে। যেমন তার গন্ধ তেমনি তার রূপ! একদিন ঝিম ধরা দুপুরে বাড়িওয়ালার ছেলে আর আমি কবুতরের একটা বড়সড় খোপ কিনে নিয়ে আসলাম ছাদে। ওর সাথে ভীষণ সখ্যতা ছিলো আমার। বয়সে বছর দুয়েকে বড়। ডাকতাম বাবু মামা>বাম্মা বলে কিন্তু মিশতাম বন্ধুর মতো। তো বাম্মার খুব শখ হলো হঠাৎ, কবুতর পুষবে। ধনী পিতার একমাত্র সন্তান হলে যা হয়, শখ পূরণ করা হলো সাথে সাথেই।

খোপটা পানির ট্যাংকের উপর বসিয়ে দিয়ে বাম্মা এক ঝাকঁ গিরিবাজ কবুতর কিনে আনলো পরদিন। এতগুলো কবুতর কাছ থেকে দেখিনি কখনো। তাই মুগ্ধ হয়েছিলাম ভীষন। শুনলাম এই কবুতরগুলো নাকি ট্রেনিং দেয়া। অন্য বাসার খোপ থেকে অন্য কবুতর নিজেদের খোপে আনতে ওস্তাদ। কিছুদিন পরেই এর সত্যতা টের পেলাম। একদিন বিকালে দেখি বাম্মার কবুতরে দুটি খয়েরি রংয়ের বেশ বড় কবুতর। বাম্মা একটা গর্বের হাসি দিয়ে বল্ল – বল তো প্রলয়, এই দুটোর জাত কি?
আমি তখন বোকা হয়ে বসে আছি। জাত তো আমি চিনিনা। বাম্মা তার হাসি আরো বিস্তৃত করে বল্ল – জালালী। আমার তো চক্ষু চড়কগাছ। জালালী কবুতর ধরে এনেছে আমাদের গিরিবাজ!! ধরানা করা হয়, সিলেটের শাহ জালাল (রহঃ) এই কবুতরগুলো পুষতেন বলে এদের জাতের নামই হয়ে গেছে জালালী। খুব বিখ্যাত আর দামী এই জাতের কবুতর।

বিকেলে বাড়ীর মেয়ে/মহিলারা ছাদে ওঠতেন। থাকতেন সন্ধ্যে অবধি। মাগরিবের আযান দিলেই মাথায় ঘোমটা চড়িয়ে সিড়ি বেয়ে চুপচাপ নীচে নেমে যেতেন। পাশের বাড়ীর মেয়েগুলোও ছাদে ওঠতো। মজার ব্যাপার, আমি কখনো লজ্জায় ওদের দিকে ভালো করে তাকাতে পারতাম না। তবে ক্লাস নাইনে ওঠার পর সাহস করে তাকাতাম। দেখতাম ওরাও আমাদের ছাদের দিকে তাকিয়ে আছে। তিনতলা বাড়ী হবার যন্ত্রনা অনেক। আশে পাশের সব অট্টালিকা থেকে ওরা আামদের দিকে ফেলফেল করে তাকিয়ে থাকতো আর আমরা চোয়াল উচিয়ে তাকিয়ে ঘাড় ব্যাথায় মরতাম।

বাম্মা ক্রিকেটে তুখোর ছিলো। একবার ছক্কা মারলো বিরাশি শিক্কার। আর পড়বি তো পড় মালির ঘাড়ে। পাশের বাড়ীর একটা কলেজ পড়ুয়া মেয়ের বেডরূমের জানালা গলে সেই বল গিয়ে পড়লো মেয়েটার বিছানায়। বাম্মা বল আনতে গেলে সেই মেয়ে বলে – ‘এক শর্তে বল দিবো। যদি তোমার একটা কবুতর আমাকে দাও।’ বাম্মা অসম্ভব মিতভাষী একটা ছেলে ছিলো, পেটে বোমা মারলেও তার মুখে প্রয়োজনের বাইরে কোন কথা ফুটতো না। মেয়েটার এই কথার উত্তরে বাম্মা কিছু না বলে “নিলাম না বল” – ভাব করে সোজা উল্টা দিকে হাটাঁ দিলো। আমি ওর পিছু পিছু রওনা দিলাম। তবে যাবার আগে মেয়েটাকে বল্লাম
– “আপু, আপনি তো কবুতরের বিষয়ে কিছুই জানেন না। আপনার হাতে কবুতর গেলে কবুতরগুলো সুইসাইড করবে।”
-কেন?
– কারন কবুতর পুষতে হয় জোড়ায় জোড়ায়। সিঙ্গেল কবুতর পুষলে কবুতর বেশীদিন বাচেঁ না বা থাকে না। পালিয়ে চলে যায়। আপনি একটা কবুতর চাইলেন কেন?

আপু আমার কথা শুনে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলো। কি অদ্ভুত, এই তো সেই দিনের ঘটনা অথচ আপুর নামটা মনে করতে পারছি না!

বৃষ্টি হলে আমাদের ছাদটা নিমিষেই পিচ্ছিল হয়ে যেতো। পানি জমতো, সেই পানিতে পা দিয়ে পানি ছিটিয়ে আমরা ফুটবল খেলতাম সন্তপর্ণে; কারন পা পিছলে পড়ে গেলেই শেষ, আর দেখতে হবে না। মনে আছে, প্রিটেষ্টের পর এক বিকেল বেলা, একা একা বৃষ্টিতে ভেজার সময় পাশের বাড়ীর ছাদে একটা মেয়েকে দেখেছিলাম নীল শাড়ি পড়ে বৃষ্টিতে ভিজতে। ভীষন অবাক হয়েছিলাম কারন অমনটা কখনো কোনদিন দেখিনি। ওটাই প্রথম ছিলো আর ওটাই শেষ। সে রাতে ডায়রী খুলে ‘নীলাম্বরী’ নামে একটা সুদীর্ কবিতা লিখে ফেল্লাম।

রাতের বেলা লোডশেডিং হবার পর আমি আর নীচ তলার বউমনি ছাদে ওঠে পানির পাইপগুলোর উপর বসে থাকতাম। বিদ্যুৎ না ফেরা পর্যন্ত গল্প করতাম দুজনে। বউমনির ছোটবোন মিলি গ্রাম থেকে আসলে আমার সাথে ছাদে দেখা হলেই বায়না ধরতো – ‘দুলাভাই, গিটার শুনবো!’ বাসা থেকে আব্বু আম্মুর চোখ ফাকিঁ দিয়ে গিটার সে আমাকে দিয়ে আনিয়েই ছাড়তো। সে এক যন্ত্রনা ছিলো বটে!!

তখন নিয়মিত অঞ্জন দত্ত শুনতাম। গিটারের প্রতি লোভটা সেই দেখিয়েছিলেন। কত রাতের আধার পারি দিয়েছি ছাদে বসে একা একা গিটারে সুর তুলে, আহারে কই গেলো আমার সেই মিষ্টি আর সুরেলা দিনগুলো?

[ভাবছি এটা নিয়মিত আপডেট করবো। একটু একটু করে মনে পড়বে আর একটু একটু করে স্মৃতি যুক্ত করবো। স্ট্যটাসের সাথে ছবি দেবার এই সুবিধে!]

ছবি কৃতজ্ঞতা: Mashroor Nitol

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১৩ thoughts on “আমার ছেলেবেলার ছাদ…

  1. পরবর্তী আপডেট এ মেইল পাঠাবেন
    পরবর্তী আপডেট এ মেইল পাঠাবেন ভাই। আপ্নার লেখার কৌশল খুভ ভাল। বুজাই যায়, অনেকদিন ধরে লেখলেখি করছেন। এখন থেকে নিয়মিত পোষ্ট লিখবেন। অন্যকিছু নয় শুধু গল্প লিখবেন।
    ইশ্বর থাকলে তার কাছে প্রাণভরে দোয়া করতাম।

    ভালো থাকবেন

    1. ঠিকাছে ভাই আপডেট করলে আপনাকে
      ঠিকাছে ভাই আপডেট করলে আপনাকে জানাবো। হুট করে লেখা তো, আদৌ কখনো আপডেট হবে কিনা কে জানে! তবে হলে জানাবো। 🙂

  2. চমৎকার স্মৃতিচারণা। ফেসবুকে
    চমৎকার স্মৃতিচারণা। ফেসবুকে গতকালই পড়েছি। ব্লগে দিয়ে ভালো করেছেন। খুঁজে পেতে সুবিধা। :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:

    1. ধন্যবাদ; আতিক ভাই। আপনার এই
      ধন্যবাদ; আতিক ভাই। আপনার এই কমেন্টা খেয়ালই করিনি তাই রিপ্লাইও দেয়া হয়নি। আশা করি কিছু মনে করেন নি। 🙂

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

12 + = 22