মানুষের গল্পঃ ইজরায়েলি ফিল্মমেকার উদি আলোনির ফরগিভনেস

ইজরায়েলি ফিল্মমেকার উদি আলোনির একটা সিনেমা আছে। সিনেমার নাম ফরগিভনেস। একটা বিশেষ কারণে এই সিনেমাটা আমার প্রিয়, কারণটা এখন বলবো না, আমি সেটা বলবো এই লেখার শেষদিকে।

ডেভিড নামের এক ইজরায়েলি-আমেরিকান ছেলে, যার বাবা আউশউইৎজ থেকে বেঁচে ফেরা ইহুদিদের একজন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বাস করে। সে তাঁর ইহুদি পরিচয় নিয়ে অবসেসড থাকে, নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারে না সমাজে, অর্থ খুঁজে বেড়ায় জীবনের। শেষ পর্যন্ত সে ইজরায়েলে ফিরে যায়, যোগ দেয় ইজরায়েল সেনাবাহিনীতে, অধিকৃত এলাকায় নতুন জীবন শুরু হয় তাঁর।

একদিন সে একটা ফিলিস্তিনি কিশোরীকে মেরে ফেলে। এই ঘটনায় সে পুরোপুরি ট্রমাটাইজড হয়ে পড়ে। তাঁকে ভর্তি করা হয় একটি মেন্টাল ইন্সটিটিউশনে।

মেন্টাল ইন্সটিটিউশনটা অবস্থিত দেইর ইয়াসিন গ্রামে, জেরুসালেমের পশ্চিম দিকের এই গ্রামটার একটা ইতিহাস আছে।

১৯৪৮এর ৯ এপ্রিল, ইরগুন এবং লেহি নামক দুই জায়োনিস্ট মিলিশিয়া, গ্রামটিতে প্রবেশ করে। গ্রামটিতে অধিবাসীর সংখ্যা ছিল ৬০০র কাছাকাছি, ১০০রও বেশি সেদিন খুন হয়ে যান। ১৯৪৮এর নাকবার সমান্তরালেই ঘটেছিলো এই ঘটনা, সেই সময় ৭০০০০০ ফিলিস্তিনি আরব স্বীয় মাতৃভূমি ছাড়তে বাধ্য হন, আজ পর্যন্ত এই মাস এক্সোডাস নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলা ইজরায়েলে নিষিদ্ধ।

মেনাহিম বেগিন সেই সময় ইরগুনের কমাণ্ডার ছিলেন। এই ভদ্রলোক পরবর্তীতে ইজরায়েলের ষষ্ঠ প্রধানমন্ত্রী হন। ইন্ডিয়ার নরেন্দ্র মোদিও গুজরাত গণহত্যার কারণে বিখ্যাত, তার প্রধানমন্ত্রী হওয়াটা একেবারেই অভূতপূর্ব নয়।

সে যাই হোক, আমি সিনেমার কথায় ফিরি।

সিনেমাটির বক্তব্য অনুসারে, দেইর ইয়াসিনের যেখানে সেই ফিলিস্তিনি আরবরা থাকতেন, তার ধ্বংসস্তূপে গড়ে ওঠে একটি মেন্টাল ইন্সটিটিউশন। সেখানে প্রথম এডমিটেড পেশেন্টরা ছিলেন হলোকাস্ট সারভাইভার, অর্থাৎ সেই ইহুদিরা, যারা নাজি জার্মানির তৈরি করা কনসেনট্রেশন ক্যাম্প থেকে বেঁচে ফিরতে পেরেছিলেন। অনেক বছর পর, ডেভিড ভর্তি হয় এখানেই।

হেড সাইকায়াট্রিস্ট চিকিৎসার চেষ্টা চালালেও শেষ পর্যন্ত ডেভিডের উপকারে আসেন সেই হাসপাতালেই এডমিটেড এক বৃদ্ধ হলোকাস্ট সারভাইভার, আয়রনিকালি, যার নাম Muselmaan। এটা একটা জার্মান শব্দ, এর অর্থ মুসলমান। নাজিরা শব্দটাকে ব্যবহার করতো একটা গালি হিসেবে, ইহুদিদের মিন করতে, যাঁদেরকে কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে নির্মমভাবে খুন করা হত।

লোককথা অনুসারে, ইহুদি হলোকাস্ট সারভাইবাররা, জায়োনিস্ট মিলিশিয়ার হাতে খুন হওয়া ফিলিস্তিনি আরবদের আত্মার সাথে যোগাযোগ করতে পারে।

ডেভিডের হাতে যেই ফিলিস্তিনি কিশোরী খুন হয়েছিল, তাঁর আত্মা তাঁকে তাড়া করে ফেরে। Muselmaan ডেভিডকে বলে মেয়েটার কাছে ক্ষমা চাইতে। অপরাধ স্বীকার করতে, যা ক্ষতিপূরণ আর ক্ষমা পাওয়ার একটি পূর্বশর্ত, একমাত্র এভাবেই তাঁর অসুখের চিকিৎসা হতে পারে।

ফরগিভনেস নিয়ে মার্কসবাদী দার্শনিক ও সংস্কৃতি তাত্ত্বিক স্লাভোয় জিজেক একটা আর্টিকেল লিখেছেন, যা অনলাইনে পাবলিশড হয় ২০০৯এর ৭ জানুয়ারিতে, ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অফ অ্যাপ্লায়েড সাইকোএনালিটিকাল স্টাডিজের ৬(১) : ৮০-৮৩ (২০০৯) সংখ্যায়। আমি সেখান থেকে কিছু অংশ উদ্ধৃত করছি। আমাদের অনেকের কাছে কথাগুলো প্রাসঙ্গিক মনে হবে।

“বর্তমান দুনিয়াতে, আমরা যাকে ‘স্বাভাবিক পরিস্থিতি’ বলি তাকে ‘জরুরী অবস্থা’ থেকে আলাদা করা দুষ্কর হয়ে দাঁড়িয়েছে। পশ্চিম বেশি বেশি করে ভয়ের কোনো ফিগার দাঁড় করাচ্ছে আর তার পরেই প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে এর থেকে মুক্তির। এটা আসছে অনেক বড়ো একটা মূল্যে, কারণ এমন একটি দৃশ্যে ভয় আর জরুরতের রেটোরিক চিন্তার কাজকে আচ্ছন্ন করে দেয়ার চেষ্টা করে। এই সবকিছু আসছে ঠিক সেই সময়ে যখন তত্ত্বের মর্যাদা আবশ্যক- কোনো রকমের তাত্ত্বিক নার্সিসিজমের জন্য নয়, বরং আমাদেরকে অবশ্য ভয়ের রাজনীতির মূল উদ্দেশ্যটাকে পরাভূত করতে হবে, যা আমাদেরকে প্রশ্ন করা থেকে, এবং সেইসূত্রে কাজ করা থেকে বিরত রাখতে চায়। জরুরী অবস্থার রাষ্ট্রের মূল যুক্তিটাই হচ্ছে, সে-ক্ষেত্রে, আমাদেরকে ঠিক তা করা থেকে বিরত রাখা যা আসলে করা উচিত। আজকে অতীতের যে-কোনো সময়ের চেয়ে বেশি, আমাদের এমন একটি চিন্তা দরকার, যা স্রেফ জরুরী অবস্থার রাষ্ট্রের প্রতি এলেবেলে প্রতিক্রিয়া হবে না। আমি কোনো বিমূর্ত-ভাববাদী নয়, আমি একজন মার্কসবাদী। মার্কসের লেখায় আমার প্রিয় প্যাসেজ এসেছে একটি চিঠি থেকে, যা মার্কস লিখেছিলেন এঙ্গেলসে, যেখানে তিনি বহু শব্দে জিজ্ঞেস করেছিলেন বিপ্লব কি আর দুএকবছর অপেক্ষা করতে পারে না যতোক্ষণ না তিনি সেই চেতনা সম্পর্কে লেখা শেষ করেন বিপ্লবের যা ধারণ করার কথা, সেটা হচ্ছে, দাস ক্যাপিটাল। সুতরাং সেই চিঠির স্পিরিটেই বলছি, ঠিক এইসব সময়েই, আলোনির ফরগিভনেসের মতো সিনেমা দরকার। আমাদের মনে রাখতে হবে যে, একটা সিনেমার উচিত নয় প্রশ্নের উত্তর দেয়ার দায়িত্ব নেয়া, এর ওকালতি করা উচিত খোদ প্রশ্ন নির্মাণ ও পুনঃনির্মাণের পক্ষে। ফরগিভনেস কোনো মাল্টিপল ন্যারেটিভ নিয়ে খেলা করা আভাঁ-গার্দ উত্তরাধুনিক সিনেমা নয়; এটা এমন একটি সিনেমা যা একদিকে আবেগ দিয়ে চিন্তা করে, আর অন্যদিকে, একটা সরল নৈতিক গল্প হিসেবে কাজ করে, একটা তরুণ, উদ্ভ্রান্ত কিন্তু প্রবণতাগতভাবে সৎ ইহুদি ছেলে, যে ধারাবাহিকভাবে শেখে, এবং বলতে সক্ষম হয়ঃ “আমি একজন খুনী”। আর এই সরল স্বীকৃতি তাঁকে নৈতিক ভূমিকম্পের হাত থেকে রক্ষা করে এবং, রিকনসিলিয়েশনের একটি চূড়ান্ত মুহূর্ত হিসেবে কাজ করে, এটা জবাবদিহিতার ভেতর দিয়ে দায়মুক্তি চাওয়ার সম্ভাবনা খুলে দেয়। এবং জবাবদিহিতার ভেতর দিয়ে অর্জন করা দায়মুক্তি পুরোপুরি বিপরীত সেই প্রক্রিয়ার যা আসে অপরাধী হিসেবে সাধারণ ক্ষমা পেয়ে যাওয়া থেকে।” (তর্জমা আমার)

ফরগিভনেস আমার প্রিয়, কারণ দায়মুক্তি পাওয়ার স্রেফ একটা উপায় আছে, সেটা হচ্ছে আন্তরিকতার সাথে অন্যায় স্বীকার করা। এ-ছাড়া দায়মুক্তি পাওয়ার আর কোনো উপায় নেই। কোনোদিন ছিলও না।

আল মাহমুদ অনেক আগে একটি কবিতা লিখেছিলেন, সেই সত্তরের দশকে, তার দুটি লাইন ধ্রুপদী মনে হয় আমার।

“যদিও বোঝে না কবি রাজাদের স্বপ্নের কি মানে,
কিন্তু এটা তো জানে, হত্যাই হত্যা ডেকে আনে।”

শুধু ইজরায়েল-প্যালেস্টাইন নয়, দুনিয়ার কোনো রাজনৈতিক সমস্যারই সামরিক সমাধান নাই, কখনোই ছিল না। আপনি খুন করবেন, আপনার প্রতিপক্ষ খুন করবে, পাল্টাপাল্টি খুনের একটা চক্র তৈরি হবে। এই চক্র থেকে জন্মেও বেরোতে পারবেন না। ঘৃণা করতে করতে আপনি ভালোবাসতে ভুলে যাবেন। ধর্মের নামে, জাতির নামে, অনন্তযুদ্ধ চলতে থাকবে। অপরাধ স্বীকার করেন, অনুতপ্ত হন, আপনার যে কাজ অন্ধ ও অযৌক্তিক ঘৃণা উসকে দিতে পারে সেই কাজের পথ থেকে সরে আসেন। মনে রাখবেন, আমরা না থাকলেও এই মহাবিশ্ব থাকবে, কিন্তু এই নীল গ্রহটা না থাকলে আমরা থাকবো না।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 4 = 4