ভারতের গোলামী করে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্যই রামপাল প্রকল্প

ভারত ও চীন ক্রমাগতই কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প কমিয়ে আনছে। তবে বাংলাদেশে কেন ভারতের হাতে সর্বনাশী সুন্দরবনের পাশে এই কয়লা ভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ প্রকল্প করছে ।


রামপাল কয়লা ভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র কেন সুন্দরবনের জন্য ক্ষতিকারক… তথ্য ও বৈজ্ঞানিক যুক্তি।

এই প্রকল্প ব্যস্তবায়নকারী সংস্থা:
বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সংস্থা বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও ভারতের কোম্পানি ন্যাশনাল থারমাল পাওয়ার করপোরেশনের (এনটিপিসি) যৌথ উদ্যোগে প্রকল্পটি প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে এবং চালু থাকবে।

প্রকল্পের ব্যয় ও লাভ/ক্ষতি:
মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১৬ হাজার কোটি টাকা। পিডিবি ও ভারতের এনটিপিসি প্রত্যেকে ১৫ শতাংশ করে পুঁজি বিনিয়োগ করবে। বাকি ৭০ শতাংশ আন্তর্জাতিক বাজার থেকে ঋণ আকারে সংগ্রহ করা হবে। ঋণের টাকা প্রধানত আসবে ভারত থেকে ১৪ শতাংশ হারে চড়া সুদে। অন্যান্য কাজ, যেমন নির্মাণকাজ, সরবরাহ, ঠিকাদারি প্রধানত ভারতই পাবে।এই প্রকল্পের অর্থায়ন করবে ১৫% পিডিবি, ১৫% ভারতীয় পক্ষ আর ৭০% ঋণ নেয়া হবে ভারতের কাছ থেকে।
আর নীট লাভ হবে সেটা ভাগ করা হবে ৫০% হারে। উৎপাদিত বিদ্যুৎ কিনবে পি ডি বি। বিদ্যুতের দাম নির্ধারিত হবে একটা ফর্মুলা অনুসারে। তা হল যদি কয়লার দাম প্রতি টন ১০৫ ডলার হয় তবে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ এর দাম হবে ৫ টাকা ৯০ পয়সা এবং প্রতি টন ১৪৫ ডলার হলে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ ৮ টাকা ৮৫ পয়সা। অথচ দেশীয় ওরিয়ন গ্রুপের সাথে মাওয়া, খুলনার লবন চড়া এবং চট্টগ্রামের আনোয়ারা তে যে তিনটি কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের যে চুক্তি হয়েছে পিডিবির সাথে সেখানে সরকার মাওয়া থেকে ৪ টাকায় প্রতি ইউনিট এবং আনোয়ারা ও লবন চড়া থেকে ৩টাকা ৮০ পয়সা দরে বিদ্যুৎ কিনবে।

কয়লা কিভাবে ক্ষতি করবে:
বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য বছরে ৪৭ লক্ষ ২০ হাজার টন কয়লা প্রয়োজন। এই কয়লা পোড়ানোর ফলে বাতাসে যে তিনটি বায়ুদূষক নাইট্রোজেন অক্সাইড (নক্স), সালফার অক্সাইড (সক্স) ও কার্বন অক্সাইড ছড়িয়ে পড়ে, এ ব্যাপারে কারও দ্বিমত নেই। রামপাল কেন্দ্রে এসব দূষক সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে আটকে দেওয়া হবে বলে সরকার ও মৈত্রী কোম্পানি দাবি করছে। কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর অভিজ্ঞ এক মার্কিন বিশেযজ্ঞ আরশাদ মনসুর মৈত্রী কোম্পানির কাছে প্রশ্ন রাখেন যে নক্স আটকানোর জন্য সর্বাধুনিক প্রযুক্তি সিলেকটিভ ক্যাটালিটিক রিডাকশন (এসসিআর) ব্যবহার করা হবে কি না। উত্তরে মৈত্রী কোম্পানি বলে যে না, এর পরিবর্তে বরং লো-নক্স বার্নার ব্যবহার করা হবে। তিনি আরও জানতে চান, কয়লা থেকে উদ্ভূত ছাই ও মারকারি আটকে দেওয়ার জন্য বিশ্বে প্রচলিত সর্বাধুনিক ব্যাগহাউস প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে কি না। উত্তরে মৈত্রী কোম্পানি বলে যে তা করা হবে না, ইলেকট্রোস্ট্যাটিক প্রেসিপিটেটর প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে। মার্কিন বিশেষজ্ঞ রণজিৎ সাহু মন্তব্য করেন, মৈত্রী কোম্পানির প্রস্তাবিত লো-নক্স বার্নার প্রযুক্তি বহু পুরোনো; উন্নত দেশগুলোতে এটা আর এখন ব্যবহার করা হয় না। তাঁর মতে, মৈত্রী কোম্পানির গৃহীত ইলেকট্রোস্ট্যাটিক প্রেসিপিটেটর প্রযুক্তি সর্বাধুনিক নয়, তা ব্যাগহাউস প্রযুক্তির তুলনায় নিম্নমানের।

সুতরাং, কয়লা থেকে উদ্ভূত বিষাক্ত গ্যাস ও ছাই আটকে দেওয়ার জন্য সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করার যে সরকারি ঘোষণা, তা নিয়ে বিভ্রান্ত হওয়ার সব কারণ উপস্থিত।

কয়লা পরিবহন :
১৩২০ মেগাওয়াটের জন্য প্রতিদিন প্রায় ১৩ হাজার টন কয়লা লাগবে। এর জন্য সুন্দর বনের ভেতরে হিরণ পয়েন্ট থেকে আকরাম পয়েন্ট পর্যন্ত ৩০ কিমি নদী পথে বড় জাহাজ বছরে ৫৯ দিন এবং আকরাম পয়েন্ট থেকে মংলা বন্দরপর্যন্ত প্রায় ৬৭ কিমি পথ ছোট জাহাজে করে বছরে ২৩৬ দিন হাজার হাজার টন কয়লা পরিবহন করতে হবে!

কয়লাবাহী জাহাজ সুন্দরবনের নদীতে ডুবে কয়লার ¯স্তূপ নদীর তলে জমা হওয়ার বেশ কয়েকটি ঘটনা কয়েক বছর ধরে ঘটেছে। সর্বশেষ কয়লাডুবি হয় গত বছরে, যখন প্রায় ১ হাজার টন কয়লা নদীর পানিতে ডুবে যায়। রামপালে কয়লা সরবরাহের জন্য প্রতিদিন অন্তত একটি জাহাজ ১০ হাজার টন কয়লা সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত পশুর নদ দিয়ে পরিবহন করবে। পরিবেশবিদদের আশঙ্কা যে এ ধরনের কোনো একটি জাহাজ ডুবে গেলে তার কয়লা দীর্ঘদিন নদীর পানিকে দূষিত করতে থাকবে। অথচ কোনো কোনো মন্ত্রীকে জনসমক্ষে বলতে দেখা গেছে যে নদীতে কয়লা পড়লে তাতে ক্ষতির কিছু নেই। কেউবা এমনও বলেন যে কয়লা পানিতে পড়লে পানি বরং পরিষ্কার হবে। এটাও একধরনের বিভ্রান্তির উপাদান।
ওপরের বিষয়টি থেকে সরকারি মহলে জ্ঞানের দৈন্য সুস্পষ্ট। প্রকৃতপক্ষে, কাঠ পুড়ে যে কয়লা হয়, যা কাঠকয়লা বা ইংরেজিতে চারকোল নামে পরিচিত, তা কোনো কোনো সময় পানি পরিশোধনে ব্যবহার করা হয়। কিন্তু যে কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহৃত হয় এবং যা রামপালেও ব্যবহৃত হবে, তা খনিজ পদার্থ। বিটুমিনাস বা সাববিটুমিনাস শ্রেণির খনিজ কয়লা, যা রামপালে ব্যবহৃত হবে, তার ভেতর নানা ধরনের দূষণকারী উপাদান থাকে (আরনেনিক, মারকারি, ক্যাডনিয়াম, ক্রোমিয়াম ইত্যাদি)। সেগুলো পানি ও মাটি দূষিত করে। কয়লা পানিতে পড়লে সেখানে রাসায়নিক পরিবেশের যে পরিবর্তন তথা পিএইচ লেভেলে যে পরিবর্তন আসে, তা ভারী ধাতুর গতি-প্রকৃতি বা মবিলিটি পরিবর্তন করে এবং কয়লা থেকে বের হয়ে আসে। অসংখ্য গবেষণা প্রবন্ধে কয়লা থেকে ভারী ধাতু বের হয়ে কীভাবে পানি বা মাটির দূষণ ঘটায়, তা প্রকাশিত হয়েছে। কানাডার ব্রিটিশ কলম্বিয়া প্রদেশের এক নদীতে ১৮৯১ সালে একটি কয়লাবাহী জাহাজ ডুবে যায়। ২০০৯ ও ২০১১ সালের দুটি গবেষণায় দেখানো হয়েছে যে আজ পর্যন্ত নদীর তলে ডুবে থাকা কয়লা থেকে রাসায়নিক দূষক পলিসাইক্লিক অ্যারোমেটিক হাইড্রোকার্বন নির্গত হয়ে চলেছে, যা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর।

কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ব্যবহৃত পানি ও গরম পানি অপসারন:
রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রে ঠান্ডা পানির প্রয়োজন মেটানো হবে পশুর নদ থেকে পানি নিয়ে। ব্যবহারের পর প্রায় অর্ধেক পানি গরম অবস্থায় ওই নদেই ফেলা হবে। মৈত্রী কোম্পানির তথ্য অনুযায়ী এ পানির তাপমাত্রা মিশ্রণ বলয়ের প্রান্ত সীমানায় নদের পানির তাপমাত্রার চেয়ে ২ ডিগ্রি বেশি থাকবে। মার্কিন কয়লাদূষণ বিশেষজ্ঞ ডোনা লিসেনবি বলেন, প্রান্ত সীমানায় ২ ডিগ্রি মানে মিশ্রণ বলয়ের মধ্যবর্তী স্থানে তাপমাত্রা আরও বেশি। তাঁর মতে, এ অবস্থা দীর্ঘদিন চললে তা সুন্দরবনের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত এই নদীর জীববৈচিত্র্যে ব্যাপক ক্ষতিসাধন করবে। ভারতের এনটিপিসি কোম্পানি, যারা রামপাল কেন্দ্র স্থাপন করছে এবং পশুর নদের পানি ব্যবহার করবে, তারা ভারতে স্থাপিত কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্রে (মহারাষ্ট্রে সোলাপুর কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্র) অত্যাধুনিক জিরো লিকুইড ডিসচার্জ প্রযুক্তি ব্যবহার করছে, যাতে নদীর কোনো পানি ব্যবহার করা হয় না বরং রিসাইকেল পানি ব্যবহার করা হয়। সুতরাং, এ ক্ষেত্রেও সরকারঘোষিত সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ঘোষণা সাধারণ মানুষকে কেবলই বিভ্রান্ত করেছে।

এ পর্যন্ত যা বলা হলো, তার সবই বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে ইতিমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে; এ রকম আরও অনেক বিষয় এখানে আলোচনা করা যাচ্ছে না জায়গার অভাবে। রামপালে কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হলে সুন্দরবনের পরিবেশের যে ক্ষতি হতে পারে, তা রোধ করার জন্য সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের যে দাবি সরকার করে আসছে, তা প্রশ্নবিদ্ধ ও বিভ্রান্তিকর। জনসাধারণ আশা করে, সরকার এ বিভ্রান্তি দূর করে সব পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য ব্যবস্থা নিতে এগিয়ে আসবে।

সুপার ক্রিটিকেল প্রযুক্তি না আল্ট্রা সুুপার ক্রিটিকেল প্রযুক্তি:

সরকারপক্ষে বিভিন্ন ফোরামে বলা হয় যে রামপাল কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্রটি সর্বাধুনিক আলট্রা-সুপারক্রিটিক্যাল প্রযুক্তিনির্ভর হবে; এর ফলে দূষণ কম হবে এবং সুন্দরবনের পরিবেশের ক্ষতি হবে না। কিন্তু এ প্রকল্প নির্মাণের দায়িত্বে নিয়োজিত ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী কোম্পানির প্রধান কর্ণধার ম্যানেজিং ডিরেক্টর পঙ্কজ ভট্টাচার্য ঘোষণা করেন, রামপাল আলট্রা-সুপারক্রিটিক্যাল প্রকৃতিনির্ভর হবে না। এটি স্থাপন করার জন্য যে টেন্ডার দেওয়া হয়েছে, তাতে সুপারক্রিটিক্যাল প্রযুক্তি ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে (নিউ এজ, ৩১ অক্টোবর ২০১৬)। এ প্রকল্পের পরিবেশ প্রভাব সমীক্ষার ৯৭ নম্বর পৃষ্ঠায়ও উল্লেখ আছে যে এতে সুপারক্রিটিক্যাল প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে।

যদি সুপারক্রিটিক্যাল টেকনোলজি ব্যবহার করা হয়, তাহলে ভারত-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ কোম্পানির কর্তাব্যক্তিরা প্রধানমন্ত্রীসহ অন্য মন্ত্রীদের কেন এহেন তথ্য দিয়েছিলেন যে সর্বাধুনিক আলট্রা-সুপারক্রিটিক্যাল প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে?

প্রতিবাদ:
সরকারের প্রতি জাতিসংঘের সংস্থা ইউনেসকো, রামসার সেক্রেটারিয়েট এবং নোবেল পুরস্কার বিজয়ী পরিবেশবাদী ও সাবেক মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট আল গোর সমর্থন জানিয়ে এই বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল বা সরিয়ে নেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন। তেল গ্যাস খনিজ সম্পদ ও বিদ্যু্ৎ বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি এই প্রকল্প বাতিলের দাবিতে ধারাবাহিক আন্দোলন করে আসছে।

সুন্দরবনের ক্ষতি হবে কি হবে না:
উপরক্ত তথ্য ও উপাত্ত বিশ্লেষণ করলেই বোঝা যায় কয়লা ভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ফলে জীব বৈচিত্রের আঁধার এই ম্যানগ্রোভ বন ধীরে ধীরে ক্ষতি হতে থাকবে।

পরিশেষে ফ্রেডরিক অ্যাঙ্গেলসের কথা দিয়েই শেষ করা যাক:
প্রকৃতির দ্বন্দ্ববাদ শীর্ষক গ্রন্থে ফ্রেডরিক অ্যাঙ্গেলস বলেছেন, ‘প্রকৃতির ওপর আমাদের বিজয় নিয়ে নিজেদের গর্বিত ভাবার দরকার নেই। কারণ, প্রতিটি বিজয়ের পর প্রকৃতি প্রতিশোধ নেয়।

আল আমিন হোসেন মৃধা
সভাপতি
সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট
ঢাকা কলেজ

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “ভারতের গোলামী করে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্যই রামপাল প্রকল্প

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 3 = 8