কান বরাবর চটকানা

বহুকালের ঘনিষ্ঠ বন্ধু আফজাল আর আমি পাশাপাশি কফি নিয়ে বসেছি, শবে মাত্র শীতের মাত্রা কাটিয়ে সূর্যের আলো সোনালী রং ছিটিয়ে ঝলমলিয়ে উঠলো, ইউরোপের সূর্যটাই যেন মানুষের প্রানের স্পন্দনকে স্পর্শ করে, বন্ধু কি যেন ভেবে খানিক উদাস ভাবে প্রশ্ন করলো
-এতো প্রতিভা নিয়ে পাগল পাগল ভাব নিয়ে থাকিস কেন, সারাটা জীবন সবাই কি তোকে পাগল হিসেবেই জানবে ?
উত্তরটা যেন আমার বহুকাল আগেই জানা হয়ে গেছে, প্রবাসে এসে নিজের দেশের মানুষদের সাথে পরিচয়ের প্রথম সূত্রেই বুঝতে পারতাম সবাই যেন নিজেদের একটা অদৃশ্য চাদরের আড়ালে ঢেকে রেখেছে | কেউ হয়তো নিজে থেকেই নিজেকে বিশেষ পণ্ডিত প্রমাণে উঠে পরে লেগেছে, এই দেশে দেশী মানুষের সংখ্যা খুবই কম, বড়জোর হাজার দশেক, কে রাখে কার খবর তাই হয়তো তিল কে তাল সাজাতে সুযোগটা সবাই গ্রহণ করে, সবার ভেতরেই এমন একটা ভাব যেন মিনিস্টার তালতো ভাই শত মানা করার পরও নেহায়েত অনিচ্ছা সত্ত্বেও পা পিছলে বিদেশে পরে গেছেন, এলাকাতে তিনি ইচ্ছে করলেই এম পি হয়ে যেতেন, ইচ্ছে আছে বাচ্চা-কাচ্চারা একটু বড় হলেই অদূর ভবিষ্যতে দেশে ফিরে গিয়ে এম পি হবেন, এলাকার সব আক্কু পাক্কু মাস্তানরা সবাই উনাকে দারুণ রকম তোয়াজ করে চলে, দেশে বেড়াতে গেলে অনেক মন্ত্রী মিনিস্টাররা নাকি উনার নাম শুনলেই মিষ্টির হাড়ি বগল দাবা করে দৌড়ে দেখা করতে চলে আসেন, বৌ প্রায়শই বলেন এতো কিছু থাকতে বিদেশে পরে আছি কেন, ঝামেলা শুধু ঐ বাচ্চা-কাচ্চারাই, তারা একটু বড় হলেই তিনি আর প্রবাসেই থাকছেন না | নেত্রী বহুবার নাকি উনাকে অনুরোধ করেছেন দেশে এসে দেশ সেবায় মন দিতে |
নিজেকে বেশ অসহায় মনে হতো, এতো সব মহান ধনাঢ্য ব্যক্তিদের মাঝে আমি নেহায়েত একটা ঝুট ঝামেলা, পারতো পক্ষে এই মানুষগুলোকে এড়িয়ে চলতাম |
বিকেলে পার্কের বেঞ্চে বসে হাতে একটা বিয়ারের গ্লাস নিয়ে সবে রোদ পোহাতে বসেছি, হঠাৎ চকবাজারের পল্টু ভায়ের সাথে দেখা যিনি পিস্তলের বাট দিয়ে বারি মেরে বল্টু ভায়ের মাথায় ফাটিয়ে দিয়েছিলেন, সেই কারণে পারায় সবাই নাকি উনাকে বেশ সমীহ করে চলতো , লীগে উনি বহুকাল জড়িত ছিলেন, রাজনীতিতে বেশ ভালই করতে পারতেন, যাই হোক দুর্ভাগ্যবশত পা পিছলে তিনিও প্রবাসে চলে এসেছেন | আমার পাশে বসেই জিজ্ঞাস করলেন,
-কি ভায়া, হাতে দেখি বিয়ারের গ্লাস নিয়ে রোদ পোহাচ্ছেন, বেশ সুখেই আছেন ভায়া !!
আমি- জী বলতে পারেন অনেকটা তাই, তা আপনি কি মনে করে এদিকটায়?
– নাহ ইয়ে মানে, আমিও একটু ঘুরতে চলে এলাম |
উনার ধারণা আমি উনাকে দেখতে পাইনি, কারণ এই সামারের বিকেলের দিকটায় আমি প্রায়শই এদিকে চলে এসে একটা বিয়ার নিয়ে বসি প্রায় প্রতিদিনই ভদ্রলোক পার্কের আসে পাশে ঘুর ঘুর করেন আর মধ্য বয়সী মহিলা দেখলেই পাশে গিয়ে, ভাঙ্গা ভাঙ্গা ইংরেজিতে হাউ আর ইউ, আই লাইক ইউ বা ইউ লাইক ইন্ডিয়ান ফুড, এসব বলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফুসলোবার চেষ্টা তদবির চালিয়ে যেতে থাকেন | আসলে চেষ্টা উনি দিনের পর দিন করেই যাচ্ছেন কিন্তু বুঝতে পারছেন না যে হাউ মাউ কাউ জাতিও ইংরেজি শুনতে শুনতে ইউরোপের মহিলাদের কান ঝালাপালা, ভদ্রতা ইউরোপের মানুষের স্বভাব তা না হলে এই ভদ্রলোকের কষে কান বরাবর একটা চটকানা পাবার কথা সেই অনেক আগেই |
বন্ধুকে সহজ ভাবেই উত্তরটা দিলাম,
-আমি পাগল সেজে মানুষরূপী ভাদ্রমাসের কুকুরদের পায়ের কাছে বসে থাকি, তাদের ভেতরের কুকুরটাকে দেখবো বলে |
/// মাহবুব আরিফ (কিন্তু) [ মন্তব্য করলে বাধিত হবো ]

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

57 + = 61