বিজয়

বিজয় বলল, ”মে হিন্দু হু, লেকেন মে কিয়া ইনসান নেহি হু ? ” আমি বললাম, এহি বাত হামারা সোসাইটি নেহি মানতিহে।”

ছোট গল্প

বিজয়

আমি বাংলাদেশের একটি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে কর্মরত আছি। আমার আশপাশের সমাজ, আমার কর্মজগত, আমার আত্মীয় স্বজন সবার কাছে আমি একজন ভাল, প্রগতিশীল, অসাম্প্রদায়িক মানুষ হিসেবে পরিচিত। আমি বিবাহিত নই। সমাজে যেটি বিবাহের স্বাভাবিক বয়স সেটি পার হয়েছে, কিন্তু বিয়ের ভাল ভাল প্রস্তাব আসা বন্ধ হয়নি। তবে আমি যাকে মনে মনে খুঁজি সে যেন জীবনে আর আসেনা এরকম অবস্থা যখন , তখন একজন ব্যক্তির সাথে আমার ফেসবুকে পরিচয় হয় যার কথাবার্তা আমার ভাল লাগে এবং অনেক জ্ঞানী মনে হল। তার নাম অন্বয়। অন্বয়ের সাথে পরিচয় হওয়ার পর আমার সময় অনেক ভাল কাটছিল। কারণ অন্বয় আমার কাজের ফাঁকে ফাঁকে সারাদিন ভিডিও কলে আমার সাথে নানারকম সামাজিক আলোচনা ও রোমান্টিক কথাবার্তায় ব্যস্ত থাকত। আমি চাকরিকালীন সময়ের পর মাঝে মাঝে শখ করে লেখালেখি করি, গান করি। অন্বয় আমার এসব ব্যস্ততা খুব পছন্দ করত। অন্বয় সামাজিক নিয়ম কানুুনকে কম তোয়াক্কা করে যেটি তার সাথে আমার তর্কের কারণ হত প্রায়ই। অন্বয়ের সাথে পরিচয় হওয়ার পর একপর্যায়ে আমার পরিবার থেকে আমার উপর বিয়ে করার চাপ সৃষ্টি হয়। আমি অন্বয়কে একথা জানানোর পর সে এটাকে তেমন একটা গুরুত্ব দেয়নি। কিন্তু আমার প্রতি তার আবেগধর্মী কথা এবং আমাকে নিয়ে সারা দেশ, সারা দুনিয়া বেড়ানোর জন্য অনেক পরিকল্পনা তার ছিল। একজন পুরুষের প্রতিষ্ঠিত হওয়ার একটা স্বাভাবিক প্রচেষ্টা থাকে, কিন্তু অন্বয়ের মধ্যে সেটির সম্পূর্ণ অভাব ছিল। আমার পরিবারের সবাই এই নিয়ে বিরক্ত ছিল। কিন্তু অন্বয়ের প্রতি আমার ভালবাসার কারণে আমি তাকে কখনও কোন কড়া কথা বলতে পারিনি।
অন্বয়ের সাথে সম্পর্ক চলাকালীন হঠাৎ গত চার পাঁচমাস পূর্বে বিজয় নামক ইন্ডিয়ান একজন সুদর্শন চাকরিজীবি আমাকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠায়। আমি একসেপ্ট করি। সে অনেকদিন ” হাই হেলো” বলার পর একদিন আমি “হাই” বললাম। সে আমাকে আমার দু’একটা ছবি পাঠাতে বলল। আমি পাঠালাম। বিজয় বলল, ”সুন্দর।” সে হঠাৎ আবার বলল, ”একটা সেক্সি ছবি পাঠান।” আমি রেগে গিয়ে বললাম, “এই কমেন্ট আমি পছন্দ করিনা। সুন্দর কিংবা আকর্ষণীয় এসব কমেন্ট আমি পছন্দ করি। আপনার সাথে আমি বন্ধুত্ব করবনা।” বিজয় সাথে সাথে আমার কাছে সরি বলল ও ক্ষমা চাইল। আর বায়োডাটা জানতে চাইল। আমি জানালাম। সে বলল, “বিয়ের ব্যাপারে আপনি কি ভাবছেন? ” আমি বললাম, “আমার বয়ফ্রেন্ড আছে।” সে বলল, ” ভেরী গুড।”
এরপর অতি সরলভাবে বিজয় তার অফিসের কাজের ফাঁকেফাঁকে আমাকে ভিডিও কল দিয়ে কথা বলতে লাগল। বিজয়ের সাথে পরিচয় হওয়ার কিছুদিনের মধ্যে আমি আমার বয় ফ্রেন্ডের সাথে রিয়া নামক অন্য একটি মেয়ের ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্বের কথা জানতে পারি। ফেসবুক ঘেটে সেই মেয়েটার বেশকিছু ছবি পেলা্ম যা বাঙ্গালী মুসলিম কালচার থেকে দূরে এবং অশ্লীল বলা যায়। এই বিষয়টি নিয়ে রাগারাগি করে অন্বয়ের সাথে আমি বলা বন্ধ করে দিই। যেটি বিজয় জানতনা। বিজয় আমাকে নেটে দেখলেই কল দিত। আমি যেখানেই যেতাম বিজয়ের কল আসতে থাকত এবং তার শুভেচ্ছা মেসেজ পৌঁছে যেত। আমার একজন কলিগ এসব দেখে বিরক্ত হয়ে বলল, “ও আপনাকে পাহারা দিচ্ছে।” আমি কলিগের কথায় হাসলাম।
বিজয় একসময় আমাকে “আই লাভ ইউ” বলল। আমাকে বিবাহের কথা বলল। আমি দুষ্টুমি করে বললাম,” দেশ, ধর্ম, বয়স সব যদি আপনার সাথে মিলে যেত তাহলে আমি আপনাকে আমি বিয়ে করতাম।” বিজয় বলল, ”মে হিন্দু হু, লেকেন মে কিয়া ইনসান নেহি হু ? ” আমি বললাম, এহি বাত হামারা সোসাইটি নেহি মানতিহে।”
এই কথায় বিজয় থামলনা। সে আমাকে “আই লাভ ইউ “বলা বন্ধ করলনা। যে অনুষ্ঠানে, যে কাজে, যে পথে সে যায় সেখানে বসেই আমার সাথে তার কথা বলা চাই। যেহেতু আমি নেটে বসি প্রধানত লেখালেখির জন্য, তাই বিজয়ের কল অনেকসময় বিরক্ত হয়ে বারবার কেটেছি। কিন্তু তাতে তার থামা নেই। সুন্দর সুন্দর ছবি, গান পাঠাতে থাকল সবসময়। একবার তার খালাতো বোনের নাচগানে ভরা ইন্ডিয়ান বিয়েটা সম্পূর্ণ লাইভ দেখালো আমাকে। তার অবস্থা দেখে আমার শুধু হাসি পেত। একদিন বলল, “মে আপকো বিশলাখ রুপিয়া দুঙ্গি, মুঝে শাদি করল।” আমি হাসলাম। বললাম, ”নিশ্চয়ই আপনাকে বিয়ে করতাম, কিন্তু আমার আর আপনার মাঝে অনেক সামাজিক বাধা আছে। ”
এরই মধ্যে আমার বয়ফ্রেন্ডের সাথে আমার সম্পর্কটা আবার ঠিক হয়ে গেল। অন্বয় আমাকে আস্বস্ত করল যে, তার সাথে অন্য মেয়েদের সাথে সম্পর্ক নেই, এমনকি রিয়ার সাথেও নয়। অন্বয়ের সাথে আবার আমার আগের মত যোগাযোগ ও ভালবাসার হাজার কথা শুরু হল। আমার পরিবার থেকে অন্বয়ের সাথে আমার বিয়ের কথা পরিষ্কার করতে বলা হল। আমি অন্বয়কে সেটি জানালাম। অন্বয় পরিষ্কার কোন সিদ্ধান্ত দিচ্ছিলনা। বিজয় যখন বারবার বিয়ের কথা তুলছিল তখন আমি আমার বয়ফ্রেন্ডের সাথে তোলা একটি ছবি পাঠিয়ে তাকে বললাম, আমার বিয়ে ঠিক হয়েছে।”
বিজয় মন খারাপ করে বলল, ”এই লোকটাকে আমার ভাল লাগছেনা। ওত কালো। আপনি ওকে ভালবাসেন?”
আমি বললাম, ”হ্যা, ভালবাসি।” বিজয় মন খারাপ করে রইল। কিন্তু কখনোই তার ”আই লাভ ইউ” বলা থামালনা।
বিজয় একদিন একটা মেয়ের ছবি পাঠিয়ে বলল ছবির মেয়েটার সাথে তার বিয়ে ঠিক হয়েছে। আমি বললাম, ”মেয়েটাকে দেখতে ব্যাটাদের মত লাগছে। ওকে বিয়ে করনা। আরও মেয়ের ছবি দেখাও, আমি বেছে দেব তোমার জীবনসঙ্গী।”
বিজয় ছবির মেয়েটিকে বিয়ে করলনা।
একদিন রাত এগারোটার দিকে ও ভিডিও কল দিল। আমি রিসিভ করে দেখলাম এক গণেশ মন্দিরে গণেশ পূজা হচ্ছে – বিজয় সেখানে তাদের গণেশ দেবতার মূর্তি থেকে একটু দূরে নিরিবিলি স্থানে মাঠে দাঁডিয়ে আছে। আমার সাথে আবেগধর্মী কিছু একটা বলতে চাইল। আমি বললাম, ”আমার বিয়ের তারিখ ফিক্সড হয়েছে।”
ও মুখ মলিন করে বলল, ”কখন?”
আমি বললাম, ”দু’মাস পর।”
বিজয় বেশ কিছুক্ষণ দু:খের হাসি হাসল। তারপর চোখ মুছতে শুরু করল। কাঁদতে কাঁদতে আকাশের দিকে হাত দিয়ে ইশারা করে দেখিয়ে বলল, “উপরওয়ালা জো তৈয়ার কিয়া ও মেনে ক্যায়সে বদলাউ,,,,আপকো ভগবান বহুত খোশ রাখে স্রেফ এহি দোয়ায়ে করতিহু। ”
আমার চোখও জলে ভরে গেল। আমি বললাম, “আমি সারাজীবন আপনার বন্ধু হয়ে থাকব। আমি এর বেশী কিছু করতে পারছিনা।”
তখন পূজা মন্ডপে সবাই বারবার করে বলে উঠল, “গণেশজিকি জয়। ”
বিজয় চোখ মুছতে মুছতে বারবার বলছিল, “জয়।” এইদিন রাতে ঘুমোতে গিয়ে বিজয়ের সরল সহজ কথাবার্তা আর কান্নার কথা মনে করে আমিও কান্না করেছি।
এরপর আমার সাথে বিজয়ের সাথে কথা বলা কমে যায়। ও মাঝে মাঝে শুধু জিজ্ঞাসা করছিল বিয়ের ডেট ফিক্সড হয়েছে কিনা। আমি বললাম, “না।”
ও বলল, ”আমাদের ইন্ডিয়াতে বিয়ে ঠিক হলে সবাই আংটি পরে, তুমি পরনি কেন? ”আমি বললাম, “যার সাথে বিয়ে হবে তার বাবা মা এখনও আমাকে দেখেনি।”
এরপর একদিন বিজয়ের এক বন্ধু আমাকে ভিডিও কল দিয়ে বলল, ”বিজয় আপনাকে নিয়ে সিরিয়াসলি ভাবছে, আপনি কি ভাবছেন?”
এসময় বিজয় তার বন্ধু’র পাশে বসে গম্ভীর হয়ে রোমান্টিক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে ছিল। আমি একটু লজ্জা পেয়ে উত্তর দিলাম, ” আমি মুসলিম, ও হিন্দু, ওর পরিবার আমার পরিবারে এসব কেউ মানবেনা।” বিজয়ের বন্ধু রবি বলল, ”পরিবারের কথা বাদ দিন, আপনার মতামত বলুন।”
আমি চুপ হয়ে গেলাম। রবি দুষ্টুমি করে কথা শুরু করল। আমি রাগ করে কল কেটে দিলাম।
বিজয় আবার তার সাথে আমার বিয়ের কথা বলল। আমি দুষ্টুমি করে বললাম,”ঠিক আছে,আমার জন্য ছোট্ট একটি বাড়ী তৈরি করুন আর সামনে একটা বাগানের জন্য জায়গা রাখুন। আমি লোভী নই।কিন্তু আমার নিরাপত্তার জন্য আপনার সব সম্পত্তি আমার নামে লিখে দিন। আর সবচেয়ে বড় কথা হল যার সাথে আমার বিয়ে ঠিক হয়েছে তার কাছ থেকে আপনার অনুমতি নিতে হবে।”
বিজয় বলল, “মুঝে সবকুছ মঞ্জুর হে।”
আমি এরপর অন্বয়ের সাথে আমার আর তার বিয়ের ব্যাপারে সিরিয়াসলি আলোচনা শুরু করলাম। অন্বয় সিদ্ধান্ত দিতে পারছিলনা। আমি তার সাথে রেগে গেলাম। এরপর কিছুদিনের মধ্যেই অন্বয় আমি পছন্দ করিনা এরকম একটি মেয়ে রিয়াকে আমাকে না জানিয়ে বিয়ে করে ফেলল আর তাদের হানিমুনের ছবি পাঠিয়ে দিল তার স্ত্রী’র ইমো’র মাধ্যমে। যেদিন সে তাদের হানিমুনের ছবি পাঠালো তার আগেরদিন রাতেও অন্বয়ের সাথে আমার ভিডিও কলে কথা হয়েছে এবং সে আমার নিকট থেকে টাকা নিয়েছে।
হঠাৎ এভাবে প্রতারিত হয়ে সীমাহীন খারাপ লাগছিল আমার। বিজয় এসময় কল দিল। আমি তাকে অন্বয়ের হানিমুনের ছবি পাঠালাম। বিজয় সব শুনে অবাক হয়ে গেল। আমাকে সান্ত্বনা দিয়ে অনেক কথা বলল আর কাঁদল। অন্বয়কে অভিশাপ দিল। আমি অন্বয়ের প্রতারণার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছি। অন্বয় আমার সাথে কথা বলার জন্য অনেক চেষ্টা করেছে এরপর। আমি তাকে বলে দিয়েছি যে, “তোমার মত নিম্নমানের কুকুরের সাথে আমার কোন কথা থাকতে পারেনা এবং তোমার অপরাধ আমার পক্ষে কখনও ক্ষমা করা সম্ভব নয়।”
অন্বয়ের সাথে আমার সম্পর্ক শেষ। বিজয় আমাকে হাসানোর জন্য তাদেরর বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তার বন্ধুদের সাথে মিলে মজা করে নাচে আর আমাকে সেগুলোর ভিডিও পাঠায়, গান পাঠায়, ছবি পাঠায়। তাই দেখে আমার হাসি পায়। আমি তাকে বলেছি, ”যদি একদেশে আপনার আমার জন্ম হত, যদি আমাদের একই ধর্ম হত তবে আমি এখনই আপনাকে বিয়ে করতাম। আমি বিজ্ঞানসম্মত জীবনযাপনে বিশ্বাস করি। কিন্তু আমাদের সমাজ এখনও অনেক নিচে পড়ে আছে। আপনাকে বিয়ে করলে আমার পরিবার আর আপনার পরিবার দু:খে ভেঙ্গে পড়বে।”
বিজয় এইটুকু শুনেই খুব খুশী। আজকাল আমাকে হাসানো আর তার কাজের ফাঁকে ফাঁকে ভিডিও কল দিয়ে আমার দিকে রোমান্টিক করে চেয়ে থাকা ওর ধর্ম হয়ে গেছে।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 1 = 2