আলিয়া-মাদ্রাসার হুজুররা সম্পূর্ণ অবৈধভাবে বিভিন্ন পদে চাকরি করছে এবং সরকারি অর্থও খাচ্ছে (প্রথম পর্ব)

আমাদের দেশে একটা সময় সরকারি-অনুদানপ্রাপ্ত দাখিল-আলিম মাদ্রাসার প্রধানগণ ‘সুপার’ ও ‘সহসুপার’ নামে অভিহিত হতো। এটিই ছিল তাদের পদবী। বেসরকারি-কলেজের মতো এখানে তখনও অধ্যক্ষ-উপাধ্যক্ষের কোনো পদ ছিল না। আস্তে-আস্তে এদের নানারকম আন্দোলন ও তদবিরের কারণে একটা সময় এদের সমন্বয় করা হয়। আর এতে আলিমস্তরের মাদ্রাসাগুলোতে সুপারের পদকে অধ্যক্ষের পদে উন্নীত করা হয়। আরও কিছুকাল পরে ডিগ্রী-কলেজগুলোর আদলে ফাজিল-কামিল-মাদ্রাসাগুলোর অধ্যক্ষের পদকে ডিগ্রী-কলেজের অধ্যক্ষের সমমান প্রদান এবং এখানে একটি উপাধ্যক্ষের পদও সৃষ্টি করা হয়। সেই নিয়মেই এখনও পর্যন্ত মাদ্রাসাগুলো চলছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো—সরকারি-অনুদানভুক্ত মাদ্রাসাগুলোতে শিক্ষক-নিয়োগে ও তাদের বেতনকাঠামো নির্ধারণে নানাপ্রকার জটিলতা বিরাজমান। আর এরচেয়েও বড় সমস্যা হলো: মাদ্রাসা-শিক্ষাবোর্ডের “কামিল-পাসের” সামান্য সার্টিফিকেট দিয়ে মাদ্রাসার হুজুররা কলেজগুলোর সমমানে অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ ও আরবি-বিষয়ে প্রভাষকের পদদখল করে অবৈধভাবে চাকরি করছে, এবং তারা এ যাবৎকাল চাকরির নামে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে শত-শত কোটি টাকা ভোগ করে আসছে।


আলিয়া-মাদ্রাসার হুজুররা সম্পূর্ণ অবৈধভাবে বিভিন্ন পদে চাকরি করছে এবং সরকারি অর্থও খাচ্ছে (প্রথম পর্ব)
সাইয়িদ রফিকুল হক

দেশের ৯৮ ভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বেসরকারি এবং এগুলো সরকারি-অনুদানে পরিচালিত। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে স্কুল-কলেজ ও আলিয়া-মাদ্রাসাসমূহ (কওমীমাদ্রাসার সনদ দেশের কোনো বোর্ড কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় স্বীকৃত নয় বলে এদের মনগড়া-সার্টিফিকেট ধর্তব্য নয়)। অর্থাৎ, এইসকল প্রতিষ্ঠানের সর্বস্তরের অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ, সুপার, সহসুপার, শিক্ষক-কর্মচারীগণ সরকারের নিকট থেকে তাদের স্ব-স্ব বেতন-স্কেলের ১০০ভাগ বেতন পাচ্ছেন। কিন্তু তাদের বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, বোনাস ইত্যাদি বাবদ যৎসামান্য বা নামমাত্র অর্থ দেওয়া হয়। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীগণ ‘বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, বোনাস’ ইত্যাদি ক্ষেত্রে সরকারি-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সমান সুযোগ-সুবিধা পান না। এছাড়াও, বেসরকারি-শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ, সুপার, সহসুপার, শিক্ষক-কর্মচারীগণ তাদের ন্যায্য ‘বার্ষিক-ইনক্রিমেন্ট, বৈশাখীভাতাসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধাও’ পান না।

দেশের সরকারি-অনুদানভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে এম.পি.ও.ভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নামে অভিহিত করা হয়। কারণ, সরকার এইসকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সর্বস্তরের শিক্ষক ও কর্মচারীদের ‘Monthly Pay Order’ বা M.P.O.-এর মাধ্যমে বেতন-ভাতা প্রদান করে থাকে। স্কুল-কলেজের এস.এস.সি. ও এইচ.এস.সি. এর সার্টিফিকেটের সমমান হলো মাদ্রাসার দাখিল-আলিম পাসের সার্টিফিকেট। আর এই সকল সার্টিফিকেট প্রদান করে থাকে দেশের আটটি শিক্ষাবোর্ড ও একটি মাদ্রাসা-শিক্ষাবোর্ড। এখানে, উল্লেখযোগ্য যে, এপর্যন্ত মাদ্রাসার “ফাজিল ও কামিল” ডিগ্রীর কোনো স্বীকৃতি নাই। কিন্তু মাদ্রাসার হুজুররা ফাজিল-কামিলকে বি.এ. বা এম.এ.-এর সমমান মনে করে থাকে। আসলে, এগুলো তাদের মনগড়া ও পাগলামি। কারণ, মাদ্রাসার ‘ফাজিল-কামিল’ ডিগ্রী প্রদান করে থাকে দেশের একমাত্র মাদ্রাসা-শিক্ষাবোর্ডটি! পাঠক বুঝতে পারছেন তো? এই মাদ্রাসা-বোর্ড ‘ফাজিল-কামিল’ ডিগ্রী প্রদান করছে। অর্থাৎ, মাদ্রাসার দাখিল (এসএসসি-সমমান), আলিম (এইচএসসি-সমমান) ও ফাজিল-কামিল সার্টিফিকেট প্রদান করছে মাদ্রাসা-বোর্ড! পৃথিবীর কোথাও নাই—গ্রাজুয়েট বা গ্রাজুয়েট-সমমান বা ব্যাচেলর-সমমান বা মাস্টার-ডিগ্রী সমমানের কোনো সার্টিফিকেট দেশের কোনো শিক্ষাবোর্ড প্রদান করে। ‘শিক্ষাবোর্ড’ কখনও ‘ব্যাচেলর বা মাস্টার-ডিগ্রী’ বা এর সমমানের ডিগ্রী প্রদান করতে পারে না। এটি একমাত্র প্রদান করতে পারে দেশের যেকোনো স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয়। তাই, মাদ্রাসা-বোর্ডের এই ডিগ্রীগুলো বেআইনি ও সম্পূর্ণ অবৈধ। বাংলাদেশসহ বিশ্বের সকল সভ্যরাষ্ট্রে ‘ব্যাচেলর বা গ্রাজুয়েট ও মাস্টার-ডিগ্রী’র সার্টিফিকেট প্রদানের একমাত্র ক্ষমতা সে-দেশের স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর। অধুনা আমাদের দেশে একটি চক্র ‘আরবি বিশ্ববিদ্যালয়’ নামে একটি ‘মোল্লাতান্ত্রিক-বিশ্ববিদ্যালয়’ বানিয়ে তার অধীনে ‘ফাজিল-কামিল’কে হস্তান্তর করে এ-কে ‘ব্যাচেলর ও মাস্টার-ডিগ্রী’ সমমান দেওয়ার চেষ্টা চলছে।

আমাদের দেশে একটা সময় সরকারি-অনুদানপ্রাপ্ত দাখিল-আলিম মাদ্রাসার প্রধানগণ ‘সুপার’ ও ‘সহসুপার’ নামে অভিহিত হতো। এটিই ছিল তাদের পদবী। বেসরকারি-কলেজের মতো এখানে তখনও অধ্যক্ষ-উপাধ্যক্ষের কোনো পদ ছিল না। আস্তে-আস্তে এদের নানারকম আন্দোলন ও তদবিরের কারণে একটা সময় এদের সমন্বয় করা হয়। আর এতে আলিমস্তরের মাদ্রাসাগুলোতে সুপারের পদকে অধ্যক্ষের পদে উন্নীত করা হয়। আরও কিছুকাল পরে ডিগ্রী-কলেজগুলোর আদলে ফাজিল-কামিল-মাদ্রাসাগুলোর অধ্যক্ষের পদকে ডিগ্রী-কলেজের অধ্যক্ষের সমমান প্রদান এবং এখানে একটি উপাধ্যক্ষের পদও সৃষ্টি করা হয়। সেই নিয়মেই এখনও পর্যন্ত মাদ্রাসাগুলো চলছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো—সরকারি-অনুদানভুক্ত মাদ্রাসাগুলোতে শিক্ষক-নিয়োগে ও তাদের বেতনকাঠামো নির্ধারণে নানাপ্রকার জটিলতা বিরাজমান। আর এরচেয়েও বড় সমস্যা হলো: মাদ্রাসা-শিক্ষাবোর্ডের “কামিল-পাসের” সামান্য সার্টিফিকেট দিয়ে মাদ্রাসার হুজুররা কলেজগুলোর সমমানে অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ ও আরবি-বিষয়ে প্রভাষকের পদদখল করে অবৈধভাবে চাকরি করছে, এবং তারা এ যাবৎকাল চাকরির নামে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে শত-শত কোটি টাকা ভোগ করে আসছে।

দেশের যেকোনো কলেজে অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ, সহকারী অধ্যাপক ও প্রভাষক পদে চাকরির প্রথম ও প্রধান শর্ত হলো: যেকোনো প্রার্থীকে দেশের স্বীকৃত কোনো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার-ডিগ্রী অথবা অনার্সসহ মাস্টার-ডিগ্রী পাস হতে হবে। আর যারা প্রভাষক ও পরবর্তীতে প্রমোশনের মাধ্যমে সহকারী অধ্যাপক পদে উন্নীত হবেন তাদেরও স্ব-স্ব বিষয়ে মাস্টার-ডিগ্রী/অনার্সসহ মাস্টার-ডিগ্রী পাস হতে হবে। পাঠক লক্ষ্য করবেন, দেশের যেকোনো সরকারি কিংবা বেসরকারি কলেজের বিষয়ভিত্তিক “শিক্ষক বা প্রভাষক” হতে চাইলে তাদের স্ব-স্ব বিষয়ে দেশের স্বীকৃত কোনো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ন্যূনতম মাস্টার-ডিগ্রী অর্জন করতে হবে (আজকাল আবার অনার্সসহ মাস্টার ডিগ্রী জরুরি)। দেশের সর্বত্র এই নিয়ম প্রচলিত। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো: মাদ্রাসাগুলোতে যারা অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ, আরবি প্রভাষক হচ্ছে তাদের কিন্তু কোনো স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাচেলর ডিগ্রীসহ মাস্টার-ডিগ্রী নাই। এযাবৎকাল যারা বাংলাদেশে এমপিওভুক্ত মাদ্রাসাগুলোতে অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ ও আরবি-বিষয়ের প্রভাষক হয়েছে—তারা সবাই মাদ্রাসা-বোর্ডের সাধারণ কামিল-পাসের সার্টিফিকেট দিয়েই হয়েছে। আর এই “কামিল-ডিগ্রী” প্রদান করেছে দেশের আত্মস্বীকৃত ও বিধিবহির্ভূত মাদ্রাসা-শিক্ষাবোর্ড! দেশের কোনো শিক্ষাবোর্ড কি “ব্যাচেলর ও মাস্টার-ডিগ্রী” প্রদানের ক্ষমতা, যোগ্যতা ও আইনগত অধিকার রাখে?

মাদ্রাসা-শিক্ষাবোর্ডের সামান্য ও সাধারণ সার্টিফিকেট দিয়ে আলিয়া-মাদ্রাসার মোল্লা-মৌলোভীরা সম্পূর্ণ অবৈধভাবে এখন ‘অধ্যক্ষ-উপাধ্যক্ষ-প্রভাষক’পদে চাকরি করছে এবং সরকারি অর্থও খাচ্ছে। দেশের প্রচলিত ও সাধারণ আইনে এটি সম্পূর্ণ অবৈধ ও নিয়োগবিধিবহির্ভূত। এদের বিরুদ্ধে অতিসত্বর ও জরুরিভিত্তিতে আইনগত ব্যবস্থাগ্রহণের দায়িত্ব রাষ্ট্রের। স্বাধীন-সার্বভৌম একটি রাষ্ট্রে কখনওই এই বেআইনি-কার্যক্রম চলতে পারে না।

(ক্রমশঃ)

সাইয়িদ রফিকুল হক
মিরপুর, ঢাকা, বাংলাদেশ।
০৬/০৪/২০১৭

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

87 − 80 =