ভারত বাংলাদেশ সামরিক চুক্তির ইতিবৃত্ত

গ্লোবাল ফায়ার পাওয়ার,এপ্রিল ২০১৪ এর তথ্য অনুসারে,বিশ্বে উল্লেখযোগ্য সামরিক শক্তিধর দেশের সংখ্যা ১২৬টি। এদের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৫২তম। প্রতিবেশী ভারত রয়েছে ৪র্থ স্থানে, পাকিস্তান ১৩তম আর বাংলাদেশের অপর প্রতিবেশী মিয়ানমার রয়েছে ৩৩ নাম্বারে।

এমন সামরিক শক্তিধর একটি দেশ যখন বাংলদেশের মতো কম সামরিক শক্তির দেশের সাথে সামরিক চুক্তি করতে চায় তখন নিশ্চয় তা কিছু ধোঁয়াশার সৃষ্টি করে। ধোঁয়াশা সৃষ্টি হচ্ছে সমসাময়িক আন্তর্জাতিক মেরুকরনের কারনেই। ভারতের সামরিক্ত চুক্তি করার পেছনের পটভূমি দেখতে হলে চোখ বুলাতে হবে নিকট অতীতের কিছু ঘটনায় :

১. কৌটিল্য’র কূটনীতি ছিলো ‘শত্রুর শত্রু,পরম মিত্র’। হয়তো এই নীতিকে বেদবাক্য মেনে ২০১৬ সালে ভারতের সাথে আমেরিকার দ্বিপাক্ষিক সামরিক চুক্তি হয়েছিলো। দক্ষীন-এশিয় অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব ঠেকাতে এ চুক্তি করা
হয়েছে। চীনের সঙ্গে ভারতের জোরালো বাণিজ্য সম্পর্ক থাকলেও অরুণাচল ইস্যুতে বিরোধ আছে। আর পাকিস্তানতো ভারতের শত্রু দেশ। ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের এ
বিশেষ সম্পর্কের ফলে স্বাভাবিকভাবেই পাকিস্তানের দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র একটু দেরীতে হলেও মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। স্বভাবতই পাকিস্তান এ চুক্তিতে খুশি নয়।

তাই ভারত চাইছে এ অঞ্চলে বাংলাদেশকে কাছে পেতে, যাতে ভারত মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে চীন-পাকিস্তানের প্রভাব বৃদ্ধি না পায়। অন্তত চীনা সাবমেরিন ক্রয়ের পর থেকে ভারতের ভেতর একটা অস্থিতিশীলতা কাজ করছে, সেই অস্থিশীলতা কাটানোর জন্যই ভারতের তোড়জোড়।

২. আমেরিকা যদি চীনকে আক্রমন করে কিংবা চীনের আক্রমনের জবাবে পাল্টা আক্রমন করে তবে আমেরিকার জন্য সবচেয়ে সুবিধাজনক অঞ্চল হচ্ছে বাংলাদেশ ও এর সমুদ্র অঞ্চল। তাছাড়া চীনকে সামরিকভাবে মোকাবেলা করতে হলে পরে মার্কিন নৌবহরকে ভারত মহাসাগর ও
বঙ্গোপসাগরে নিয়মিত টহল দিতে হবে। এবং ভারত যেহেতূ চীনের প্রতিদ্বন্দ্বী তাই ভারত চাইছে বাংলাদেশের সাথে সামরিক চুক্তি করে চীনের সম্ভাব্য হামলার ক্ষেত্রে সামরিক সুবিধা পাওয়া। আমেরিকাতো ভারতের পাশে আছেই, এখন যদি বাংলাদেশকে পাওয়া যায় তাহলে ভারতীয় মহাসাগর থেকে বঙ্গোপসাগর হয়ে দক্ষীন চীন সাগরের সীমানা পর্যন্ত ভারতের একচ্ছত্র প্রভাব পাকাপোক্ত হবে।

৩. বাংলাদেশের গা ঘেঁষে থাকা ভারতের ‘সেভেন-সিস্টার্স’ অঙ্গরাজ্যগুলোকে নিয়ন্ত্রন করার জন্য বাংলাদেশ ভারতের কাছে খুব গূরুত্বপূর্ন। অদূর ভবিষ্যৎে যদি ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় অঙ্গরাজ্যগুলোতে কোনো ধরনের গোলযোগপূর্ণ অবস্থার সৃষ্টি হয় তবে ভারত হয়তো চাইবে বাংলাদেশের সামরিক শক্তি ব্যবহার করে সেটি সমাধান করতে।

৪. ২ ডিসেম্বর ২০১৩ সালে ভারতের টাইম অফ ইন্ডিয়ার একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছিলো ভারত এই মূহুর্তে বঙ্গোপসাগর এলাকায় কোন ধরনের বিরোধ মোকাবেলায় প্রস্তুত নয়। বিশেষত পশ্চিমবাংলায় কোন ঘাটি বা সামরিক অবকাঠামো গড়ে তোলার অভাবে প্রতিরোধ বা মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। এই প্রতিবেদনের আরো বলা হচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গের সাগর দ্বীপে একটি মিজাইল ব্যাটারিসহ বিশাল সামরিক ঘাটি গড়ে তোলা হচ্ছে যা দিয়ে এ এলাকার ওপর সামরিক আক্রমন ও প্রতিহতের ব্যবস্থা রাখা হবে। সাগর দ্বীপ থেকে সুন্দরবন নিকটে, বাংলাদেশও নিকটে। তাছাড়া ভারত জানে চীন থেকে কেনা সাবমেরিনগুলো ভারতীয় জলসীমায় ঢুকলেও তা শনাক্ত করা সম্ভব নয়,তাই তাদের এতো মাথাব্যাথা।

আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে স্থায়ী মিত্র বা স্থায়ী শত্রু বলে কেউ নেই। সবকিছু “স্বার্থের” উপর নির্ভর করে। বাংলাদেশ যখন রাশিয়া কিংবা চীন থেকে অস্ত্র আমদানি করে তখন নিশ্চয় প্রতিবেশী দেশগুলোর সক্ষমতার উপর একটি প্রশ্নবোধক চিহ্ন একে দেয়,যেটা থেকে শুরু হয় অন্তরজ্বলা। চীন থেকে সাবমেরিন ক্রয়ের পর থেকে এই বিষয়টিই বারবার ঘুরে ফিরে আসছে।

প্রশ্ন উঠছে বাংলাদেশের সাথে ভারতের প্রতিরক্ষা চুক্তি হলে তা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে নষ্ট করবে কিনা? প্রশ্ন উঠাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু কেউ যদি বলে শুধুমাত্র সামরিক চুক্তির জন্য দেশ ভারতের অধীনে চলে যাবে তাকি সম্পূর্ন যুক্তিযুক্ত? বাংলাদেশতো ২০০২ সালে চীনের সাথে প্রতিরক্ষা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। এই চুক্তি এখনো কার্যকর আছে। তাই বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী চীন থেকে আমদানিকৃত ছোট অস্ত্র থেকে শুরু করে ট্যাঙ্ক, নৌ ফ্রিগেট, প্যাট্রল ক্রাপট ইত্যাদি দিয়েই তাদের কাজ চালাচ্ছে। তাছাড়া নৌ বাহিনীতে চীনা মিসাইল বা ক্ষেপণাস্ত্রও অভিষিক্ত করা হয়েছে। এতে কি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব চীনের কাছে চলে গেছে???

…আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ধরে রাখার জন্য বিভিন্ন চুক্তি সমঝোতা স্মারক করতে হয়। বাংলাদেশও তার ব্যাতিক্রম নয়। কিন্তু চুক্তির সময় মাথায় রাখতে হবে এতে নিজ দেশের স্বার্থ সমুন্নত থাকছে কিনা! ৩০ লাখ শহীদের রক্তে কেনা ‘বাংলাদেশের’ সার্বভৌমত্ব যেনো কোনোভাবেই ধ্বংস না হয়, সেটাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ সবচেয়ে বড় চাওয়া।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “ভারত বাংলাদেশ সামরিক চুক্তির ইতিবৃত্ত

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

9 + 1 =