বন্ধুত্ব কি কাঁটাতারে, না ফেলানীর রক্তে?

নেই কোথাও কোন কাটাতার, নেই বন্ধুকের গুলির আওয়াজ এমনকি সীমান্ত রক্ষী,নেই কোন ধরাধরি। আছে মাত্র বিভক্তকারী রেখা। কোথাও নদী বিভক্ত করেছে দুটি অথবা একাধিক দেশকে। কোথাও আবার সামান্য তল্লাশি চৌকি।
সীমান্তের এপারে-ওপারে দাঁড়িয়ে খেলা যায়; কোথাও আবার একসাথে বসে চা পান করছেন দুজন, কিন্তু একজন একদেশে, অন্যজন আরেক দেশের।

বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী মানুষের কাছে এগুলো গল্প স্বপ্নের মত গল্প, এমন দেশ হয় নাকি! কারণ তাদের কাছে সকালের ঘুম ভাঙ্গে সীমান্তের গুলাগুলির শব্দে অথবা কোন না কোন পরিবারের ( বিএসএফ কর্তক আটক, হত্যা, নির্যাতন ) আহাজারিতে।

বিশ্বের সবচেয়ে প্রাণঘাতী সীমান্ত কোনটি? এমন প্রশ্নের জবাবে মনের মধ্যে ভেসে উঠতে পারে ফিলিস্তিনি গাজা ভূখণ্ডের সঙ্গে ইসরায়েলের সীমান্তের কথা অথবা যুক্তরাষ্ট্র আর মেক্সিকোর সীমান্ত । কিন্তু গুগলে অনুসন্ধান করলে দেখা যাবে যে এই প্রশ্নের উত্তরটি হচ্ছে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত। কেননা, সংখ্যার দিক থেকে সীমান্তে প্রাণহানিতে বিশ্ব রেকর্ডটি আমাদেরই (আর এই হতাহতের ৯৫ শতাংশই বাংলাদেশি)। সীমান্তে হত্যাকান্ডের ঘটনার খবর কিছু দিন অন্তর অন্তর চোখে পড়লেও বিষয়টি যে এখন একটা বিশ্ব রেকর্ডে দাঁড়িয়েছে।
গত বিশ বছরে বিএসএফ কর্তৃক বাংলাদেশি নাগরিকদের হত্যার পরিসংখ্যান:
১৯৯৬ – বর্তমান
♦ ১৯৯৬ সালে ১৩০টি হামলায় ১৩ জন নিহত।
♦ ১৯৯৭ সালে ৩৯টি ঘটনায় ১১ জন।
♦ ১৯৯৮ সালে ৫৬টি ঘটনায় ২৩ জন।
♦ ১৯৯৯ সালে ৪৩টি ঘটনায় ৩৩ জন।
♦ ২০০০ সালে ৪২টি ঘটনায় ৩৯ জন নিহত হয়।
♦ ২০০১ সালে ৯৪ জন নিহত হন।
♦ ২০০২ সালে ১০৫ জন নিহত হন।
♦ ২০০৩ সালে ৪৩ জন নিহত হন।
♦ ২০০৫ সালে ১০৪ জন নিহত হন।
♦ ২০০৬ সালে ১৪৬ জন নিহত হন।
♦ ২০০৭ সালে ১২০ জন নিহত হন।
♦ ২০০৮ সালে ৬২ জন নিহত হন।
♦ ২০০৯ সালে ৯৬ জন নিহত হন।
♦ ২০১০ সালে ৭৪ জন বাংলাদেশীকে হত্যা করে।
♦ ২০১১ সালে হত্যার শিকার হন ৩১ জন।
♦ ২০১২ সালে হত্যার শিকার হন ৩৮ জন।
♦ ২০১৩ সালে হত্যার শিকার হন ২৯ জন।
♦ ২০১৪ সালে হত্যা করা হয়েছে ৩৩ জনকে।
♦ ২০১৫ সালে ৪৫ জনকে এবং
♦ ২০১৬ সালে বিএসএফ হত্যা করেছে ৩০ জন।
(তথ্য সুত্র হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, বিবিসি ও আসক)

পৃথিবীর এমন কোন রাষ্ট্র নাই যেখানে সীমান্তে প্রতি বছর এত বেশী হত্যা হয়। ভারত দক্ষিণ এশিয়ার একটি বড় দেশ। তার সাথে বাংলাদেশ ছাড়াও সীমান্ত রয়েছে মিয়ানমার, চীন, ভুটান, নেপাল, পাকিস্তান, মালদ্বীপ ও শ্রীলংকার। এর প্রতিটি দেশের সাথেই সীমান্ত উন্মুক্ত।
পাকিস্তান ভারতের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ও বৈরী রাষ্ট্র। বাংলাদেশের চেয়ে পাকিস্তানের সাথে তাদের সীমান্ত দৈর্ঘ্যও অনেক বেশী। অথচ সীমান্তে পাকিস্তানী নাগরিকদের চেয়ে বিএসএফ-এর হাতে বাংলাদেশী নিহত হওয়ার সংখ্যা কয়েকগুন বেশি। পাক-ভারত সীমান্তে নিহত পাকিস্তানি নাগরিকদের একটি বড় অংশই সামরিক ও আধা-সামরিক বাহিনীর সদস্য।
যাদের সাথে সীমানা প্রাচীর নাই এমনকি শত্র রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত পাকিস্তানি সীমান্তেও এত মানুষ নিহত হয় না যত মানুষ বন্ধু রাষ্ট্র বাংলাদেশের সাথে হয়েছে।

এত সব সীমান্তে হত্যাকান্ডের মধ্যে আলোচনায় উঠে আসে ফেলানী হত্যার।

কুড়িগ্রামের অনন্তপুর-দিনহাটা সীমান্তের খিতাবেরকুঠি এলাকায় (০৭ জানুয়ারি ২০১১) ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ-এর সদস্যরা ফেলানীকে(১৫) গুলি করে হত্যা করে। বাবার সাথে দিল্লিতে গৃহকর্মীর কাজ করত। বিয়ের উদ্দেশে সে দেশে ফিরছিল। দীর্ঘক্ষণ তার মৃতদেহ কাঁটাতারে ঝুলে থাকে, যা গণমাধ্যমে প্রকাশ হলে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন তোলে।
এই ঘটনায় দীর্ঘ দুই বছর আট মাস পর ভারতের কোচবিহারে বিশেষ আদালতে অভিযুক্ত বিএসএফ সদস্যের বিচার শুরু হলেও, সে নির্দোষ বলে প্রমাণিত হয়।

২০১৩ সালে রাশিয়ার কাছ থেকে আট হাজার কোটি টাকা ( যদিও ৪.৫% চড়া সুদে) ঋণ নিয়ে অস্ত্র ক্রয়, চীনের কাছ থেকে (২০৩ মিলিয়ন ডলার ঋণে) ২৪ বছরের পুরনো সাবমেরিন ক্রয় এবং ভারতের কাছ থেকে (৫০ কোটি ডলার ঋণ নিয়ে) প্রতিরক্ষা চুক্তি করে পুরনো অস্ত্র ক্রয়ের কারনে যারা উৎফুল্ল যারা ভাবছেন এত অস্ত্রসস্ত্র থাকলে বিএসএফ আমাদের উপর ভয়ে বা আমাদের সামরিক শক্তি দেখে আর গুলি চালাতে পারবে না তাদের উদ্দেশ্য একটা ঘটনা বলি;

গত মার্চ মাসে ভারতীয় বিএসএফ সিমান্তে গুলি করে গোবিন্দ গৌতম নামের এক নেপালিকে খুন করেছে। বিএসএফের কাছে এইটা সামান্য ব্যাপার হলেও নেপালিদের কাছে বিশাল ব্যাপার। নেপালিরা রাস্তায় নেমে সরকারকে বাধ্য করছে গৌতম রে শহিদ ঘোষণা করতে, তোপধ্বনি দিয়া সম্মান জানাতে, তার পরিবারের দায়িত্ব নিতে আর ভারতের প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা উপদেষ্টা ফোন করে ক্ষমা চেয়েছে দুঃখ প্রকাশ করেছে নেপালি প্রধানমন্ত্রীর কাছে। নেপালীদের আমাদের মত এত বড় সেনাবাহিনী নেই সাবমেরিনও নেই এমনকি আমাদের সামরিক খাতে যে পরিমান বাজেট বরাদ্দ করা হয় তার তিন ভাগের এক ভাগও হয় না। পার্থক্য একটাই নেপালিদের মেরুদন্ড আছে আমাদের নাই ওরা মাথা নত করতে শিখে নাই আমরা শিখেছি আমরা গোলামী করতে শিখেছে।
যারা অস্ত্র কেনাতে উৎফুল্ল তাদেরকে বলে অধিকার আদায়ে, সীমান্তের হত্যা কান্ডের প্রতিবাদে রাজপথে নামেন দেখবেন ঋণ নিয়ে ক্রয়কৃত অস্ত্র আপনার দিকেই তাকিয়ে আছে।

গত ১৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হয় বিজিবি ও বিএসএফ
মহাপরিচালক পর্যায়ের ৪৪তম সীমান্ত সম্মেলন।
সম্মেলন শেষে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে আসেন বিজিবি প্রধান মেজর জেনারেল আবুল হোসেন ও বিএসএফ প্রধান কে কে শর্মা।

কে কে শর্মা উক্ত সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে দাবী করেন, “সীমান্তে মৃত‌্যুর সংখ‌্যা কমে আসার পর এখন অপরাধীদের দ্বারা ভারতীয় সীমান্ত রক্ষীদের আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা বেড়েই চলেছে।”
তার এহেন বক্তব্যে কি প্রকাশ পাই ভারতে সংবিধানে কি সীমান্ত হত্যার বৈধতা আছে।

ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর পক্ষ থেকে আত্মপক্ষ সমর্থনে যুক্তি দেখানো হয় যে, বিএসএফ সদস্যরা সাধারণ নাগরিকের ওপর গুলি ছোড়ে না, অস্ত্রধারী চোরাকারবারিরা দল বেঁধে জোয়ানদের ওপর আক্রমণ করে, তখন তারা আত্মরক্ষার্থে গুলিবর্ষণে বাধ্য হয়।
যারা হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন, তাদের অনেকে চোরাচালানি তা ঠিক কিন্তু তারা সশস্ত্র আক্রমণকারী তার প্রমাণ কিন্তু নেই। আর সীমান্ত এলাকায় চোরাকারবার নিয়ে সীমান্তের উভয় পাড়েই রয়েছে অসাধু বাণিজ্যের বিস্তার। কিন্তু প্রতিটি ঘটনাতেই নিরস্ত্র বাংলাদেশিরা শুধু নিহত হচ্ছেন। কয়েক দশক ধরে গুলি করে হত্যা করে চোরাকারবার ঠেকানো গেছে কি? দু’দেশের মধ্যে সমঝোতা এবং এ সম্পর্কিত চুক্তি অনুযায়ী যদি কোনো দেশের নাগরিক অননুমোদিতভাবে সীমান্ত অতিক্রম করে, তবে তা অনুপ্রবেশ হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার কথা এবং সেই মোতাবেক ওই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে বেসামরিক কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তরের নিয়ম। তাহলে গুলি করে নিরস্ত্র মানুষ হত্যা কেন? এ প্রশ্নের উত্তর কারো কাছে পাওয়া যাবে কি?

গত সাত বছর পর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতকাল ৭ এপ্রিল ভারতের প্রধানমন্ত্রীর নরেন্দ্র মোদীর আমন্ত্রণে দেশটিতে গেছেন প্রধানত দ্বিপাক্ষীয় সামরিক সহযোগীতা চুক্তি সহ সম্ভাব্য ৩৩ টি সমঝোতা স্বারক সই করতে। সীমান্তে এই নিরস্ত্র সাধারণ মানুষকে বিএসএফ যেভাবে হত্যা করছে ধরে নিয়ে যাচ্ছে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে আহ্বান এর একটা সুরাহ করুন কড়া প্রতিবাদ করুন, দু’দেশের মধ্যে সমঝোতা এবং এ সম্পর্কিত যে চুক্তি আছে তা কার্যকরে বাধ্য করুন, ফেলানীসহ সীমান্ত হত্যার বিচার চান।

আল আমিন হোসেন মৃধা
সভাপতি
সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট
ঢাকা কলেজ।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 1 = 3