মানুষের স্বাধীন ইচ্ছাশক্তির কোনই ভিত্তি নেই।

স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি বলে কিছুর অস্তিত্ব এই বাস্তব জগতে নেই। ধরুন আপনার খিদে লেগেছে। কিন্তু আপনার কাছে খাবার নেই। খাবার কেনার মতো কোন টাকাও নেই। অথচ খিদের জ্বালায় আপনি অস্থির হয়ে যাচ্ছেন। তখন আপনি কি করবেন? নিশ্চয়ই হন্নে হয়ে খাবারের খোজ করবেন। প্রথমে আপনি এর ওর কাছ থেকে খাবার চাইলেন। কিন্তু তারা খাবার দিতে অপারগতা প্রকাশ করলো। কিন্তু আপনার খিদের মাত্রা বেড়েই যাচ্ছে। হঠাৎ আপনি দেখলেন একজনের ঘরে খাবার রাখা আছে।
আপনি চাইলে তারা বললো, তাদের পরিবারে অনেক মানুষ তাই তারা কোন খাবার দিতে পারবে না। তখন আপনি কোন উপায় না দেখে সেই খাবার কেড়ে নিয়ে দিলেন দৌড়। এবং খেলেন পেট পুরে।

যখন আপনার খাওয়া সম্পূর্ণ হলো তখন আপনার মনে হলো কাজটি আপনি ঠিক করেননি। আপনি খাবার চুরি করে আনায় ওই পরিবারের অনেকেই না খেয়ে থাকবে। আপনার মধ্যে এক ধরনের অনুশোচনা কাজ করতে থাকলো।

এর কিছু দিন পরে আপনি আবার একই পরিস্থিতিতে পড়লেন। আপনার খুব খিদে লেগেছে কিন্তু কোথাও খাবার পাচ্ছেন না। আগের দিনের মতই ওই বাড়িতে গেলেন কিন্তু তারা আপনাকে খাবার দিতে অস্বিকৃতি জানালো। এদিকে আপনার খিদের যন্ত্রনা বেড়েই চলছিল। আপনি কোন উপায় না দেখে আবারও খাবার নিয়ে দিলেন দৌড়। এবং পেট ভরে খাওয়ার পুর্বে আপনার মনেই হলো না যে আপনি কাজটি খারাপ করেছেন। কিন্তু যখনই আপনি পেট ভরে খেয়েছেন এবং শরীরে আরাম অনুভব করছেন তারপর থেকেই আপনার মনে হতে লাগলো কাজটি আপনি ঠিক করেননি। আপনার এই অপরাধটুকুর জন্য অনেককে না খেয়ে থাকতে হবে।

উপরের আলোচনা থেকে আমরা এটাই বুঝতে পারছি যে, মানুষের আসলে কোন স্বাধীন ইচ্ছা থাকে না। সে সম্পূর্ণই প্রকৃতির হাতে বন্দি।

আমরা জানি আমাদের স্বভাব চরিত্র আচার আচরণ আমরা তিনটি জিনিসের কাছ থেকে পাই। প্রথমটি হলো আমাদের জেনেটিক ভাবে পাওয়া আচার আচরণ বা বৈশিষ্ট্য। যেমন বাবা রাগী হলে সন্তানের রাগী হবার সম্ভাবনা অনেক বেশী। বাবা শান্ত হলে সন্তানও শান্ত হয়।

দ্বিতীয়ত, পরিবেশ থেকে পাওয়া শিক্ষা দিক্ষা এবং ভদ্রতাবোধ। যেমন একজন সন্তান ভালো পরিবারে থাকলে সে স্বাধারণত ভদ্র বা ভালো মানুষ হয়। অপরদিকে পুটপাতে বা বস্তিতে থাকা শিশুর পক্ষে ভালো হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম। কারণ তাকে নানা প্রতিকুলতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। ফলে তার আচার আচরনে খারাপ প্রভাবই বেশী পরিলক্ষিত হয়।

তৃতীয়ত, আমাদের শরীরের গঠনের তারতম্যের উপরে। যেমন শরীরের হরমোনের আধিক্যতা বা অনাধিক্যতার প্রভাবে আচার আচরণের পরিবর্তন। যেমন রেগে গেলে যৌক্তিকতা ঠিক ভাবে কাজ করে না। আবার অধিক আবেগে মানুষ প্রায়শই ভূল সিদ্ধান্ত নেয়।

এখন ধরুন কোন একজন মানুষের হঠাত রাগ হলো। এর কারণ হতে পারে তার মধ্যে জেনেটিক্যালি রাগ বেশী। অতিরিক্ত রাগের ফলে তার চিন্তাশক্তি ঠিক ভাবে কাজ করবে না। যদি তার রাগকে সে কন্ট্রোল করতে না পারে (যেহুতু তার মধ্যে অতিরিক্ত হরমোন নির্গত হচ্ছে) তখন হয়তো সে কোন দুর্ঘটনা ঘটিয়ে ফেললো। কিন্তু যদি সে সুস্থ অবস্থায় থাকতো অর্থাৎ যদি তার রাগ না উঠতো (তখন তার মধ্যে রাগজনীত হরমোন বেশী নির্গত হতো না) তবে সে কিন্তু সেই অপরাধটুকু করতো না।

তাহলে এক্ষেত্রে তার ইচ্ছাশক্তি কতটুকু কার্যকরি থাকে? প্রথমত, তার বংশগত রাগের জন্য কিন্তু সে দ্বায়ী নয়। দ্বিতীয়ত, সে যদি পরিবেশ থেকে রাগের উপাদানগুলো না পেতো (যেমন কারো কথা শুনে রাগ করা বা কারো ব্যবহারে রাগ উঠা) তবে সে রেগে যেতো না এবং শরীর থেকে অতিরিক্ত হরমোনও নির্গত হতো না। ফলে সে সেই অপরাধটিই করতো না।

অর্থাৎ আপাত দৃষ্টিতে যে অপরাধটি সে করেছে তার জন্য সে আসলে দায়ী নয়। দায়ী হলো তার শারীরিক গঠন এবং আশেপাশের পরিবেশের সমষ্টির ফল। তাহলে এতে কি তার কোন দোষ আছে?
ঠিক একই ভাবে মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা বলে বাস্তব জগতে কিছুর অস্তিত্ব নেই।

যে সাইকো প্যাথ একের পর এক খুন করে চলেছে তার জন্য কিন্তু তার দোষ নেই। কারণ সে একটি ভয়ংকর রোগে আক্রান্ত। আর সেই রোগের প্রতিক্রিয়াতেই কিন্তু সে খুনগুলো করছে। যদি তার সেই মানসিক রোগটি না থাকতো হবে সে কোন খুন খারাবি করতো না। ফলে সে অপরাধীও হতো না।

আবার ধরুন যে মানুষটির মধ্যে সেক্সের ক্ষমতা অধিক অথবা তার মধ্যে বিকৃত কামনা কাজ করে স্বাধারণত সেই মানুষটিই ধর্ষনের মতো অপরাধ করে। এখন যেহেতু তার বিকৃত সেক্স বা কামনা এক ধরনের সেক্সচুয়াল রোগ – ডিসওর্ডার তাই তার দ্বারা সংঘটিত ধর্ষনের জন্য সে নিজেকে বিরত রাখতে পারে না। যখনই তার সামনে কোন মাধ্যম আসে তখনই তার মধ্যে ধর্ষণের বিকৃত বাসনাটি তৈরি হয়।

অর্থাৎ এক্ষেত্রেও তার কোন স্বাধীন ইচ্ছা কাজ করে না। সে নিতান্তই প্রকৃতির নিষ্ঠুরতার স্বীকার হয়ে ধর্ষন করে।

বিষয়টি বুঝার জন্য একজন সাধারণ যৌন ক্ষমতার মানুষের কথা চিন্তা করুন। যখন সেই মানুষটি প্রাপ্ত বয়স্ক হবার পরেও বিয়ে করেনি অথবা অন্য কোন উপায়ে তার যৌন চাহিদা পুরন করে না। ফলে কি হয়? তার মধ্যে জমে থাকা যৌন উপাদান তাকে একধরণের যৌন ক্ষুদা তৈরী করে। যদি তার মধ্যে জমে থাকা বীর্য সে বের করে না দেয় তবে সেই বীর্যের কারণে তার মধ্যে যৌন ক্ষুদাটি থেকেই যায়। এর ফলে সে যদি কোন মেয়েকে দেখে তবে তার মধ্যে খুব সহজেই যৌনতা জেগে উঠে। এবং অনেক ক্ষেত্রে ধর্ষনের মতো অপরাধ করে বসে। অপর দিকে যদি সে নিয়মিত সেক্স করতো অথবা হস্তমৈথরের মাধ্যমে তার দেহের যৌন উপাদান অর্থাৎ বীর্য বের করে দিতো তবে তার মধ্যে যৌন ক্ষুদা যত্রতত্র তৈরি হতো না। ফলে সে ধর্ষনের মতো অপরাধও করতো না।

অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে এসব ক্ষেত্রেও মানুষের ইচ্ছাশক্তি কোনই কাজ করে না। যখন আপনার মধ্যে যৌন উপাদান জমা থাকবে তখন আপনার দ্বারা অপরাধ করার সম্ভাবনা বেশী থাকবে। কিন্তু যখন আপনার ভিতরে যৌন উপাদান জমা থাকবে না তখন কিন্তু আপনার দ্বারা অপরাধ করার সম্ভাবনা একদম কম। এক্ষেত্রে ইচ্ছাশক্তির কোনই ভূমিকা নেই। শুরু শারীরিক গঠন এবং পরিবেশই দায়ী। আপনার শরীরে যদি যৌন ক্ষমতা না থাকে তবে আপনি যত ইচ্ছাশক্তিই প্রয়োগ করুন না কেন আপনি ধর্ষন করতে পারবেন না। আবার যদি আপনার শরীরে নির্দিষ্ট মাত্রার বাইরে যৌন উপাদান জমা হয় এবং বাইরে থেকে যৌন উত্তেজক সংকেত দেহে প্রবেশ করে তবে আপনি নিজেকে অপরাধ থেকে বিরত রাখতে পারবেন না। সমস্যাটি যখন শরীরের তখন মনের ইচ্ছাশক্তি শরীর দ্বারা প্রবলভাবে প্রভাবিত হয়। অনেক ক্ষেত্রে বিষয়টি রোগের পর্যায়ে চলে যায়। আর তাই ইচ্ছাশক্তি বা স্বাধীন ইচ্ছার যে প্রচলিত ধারণাটি আছে সেটি অকার্যকর হয়ে যায়।

কোন অপরাধ প্রবনতা বংশ পরম্পরায় চলে আসে। যেমন দাদা যদি রাগি হয় তবে তার বংশধর অর্থাৎ ছেলে বা নাতিও রাগি হয়। দাদার মধ্যে যদি ধর্ষণের রোগ থাকে তবে সেটা নাতির মধ্যেও থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। এখন জেনেটিক্যালি যদি কোন নাতি তার দাদার খারাপ রাগ এবং এই ধর্ষণ প্রবনতা নিয়ে জন্মে এবং একই সাথে সে তার দাদা কর্তৃক ধর্ষনের মুখরোচক গল্প শুনে থাকে তার আশে পাশের মানুষের কাছ থেকে তবে তার মনে এই ধর্ষনের প্রবনতাটুকু প্রকট হয়ে থাকবে। ফলে সে যদি কোন মেয়েকে (সেক্সি বা সুন্দরী) দেখে তবে তার মধ্যে ধর্ষনের সিমটম গুলো দেখা দেবে। সে কিন্তু তার বংশগত অতিযৌনতা নিয়ে জন্মে এবং পরিবেশ থেকে ধর্ষনের শিক্ষা পায়। ফলে তার দারা ধর্ষনের মতো অপরাধ ঘটানোর সম্ভাবনা অনেক বেশী থাকে। এবং উপযুক্ত পরিবেশে সে নিজেকে ধর্ষন করা থেকে বিরত রাখতে পারে না। অর্থাৎ তার কোন ইচ্ছাশক্তি থাকে না। সে প্রকৃতি এবং পরিবেশ দ্বারা পরিচালিত হয় মাত্র।

এক্ষেত্রে বলে রাখা ভালো যে যদি কোন মানুষের মধ্যে ধর্ষনের বংশগত উপাদান থাকে কিন্তু সে তার শৈশব থেকে যৌবন পর্যন্ত ভালো পরিবেশে বড় হয় তবে অনেক ক্ষেত্রেই তার শরীরের ধর্ষনের প্রবনতা কমে যায়। আর এতে তার ইচ্ছাশক্তির বিন্দুমাত্র ভূমিকা থাকে না। এটি নির্ভর করে তার শরীর এবং পরিবেশের উপর। অর্থাৎ যদি কারো মধ্যে ধর্ষনের উপাদান শরীরে থাকে বা সে অতিরিক্ত যৌনকামনা সম্পন্ন হয় কিন্তু তার পরিবেশের শিক্ষা তাকে এর উপর প্রভাব ফেলে তবে সে নাও ধর্ষক হতে পারে। অথবা সে ভয়ংকর ধর্ষক হতে পারে যদি সে খারাপ পরিবেশ পায়। আবার একজন মানুষ খারাপ পরিবেশ পেলেও যদি তার ধর্ষনের উপাদান কম থাকে অর্থাৎ তার শরীরে বিকৃত যৌন উপাদান কম থাকে তবে সে ধর্ষক হয় না।
এবং ধরি একজন মানুষ বংশগত ভাবেই বিকৃত যৌনতা নিয়ে বড় হলো এবং তার চারপাশের পরিবেশ থেকেও ধর্ষনের সংকেত পেয়ে বড় হলো কিন্তু সে অতিরিক্ত যৌন কাজে ব্যয় করলো তবুও কিন্তু তার দ্বারা ধর্ষক হওয়া সম্ভব হবে না। কারণ সে প্রতিদিন নিয়মিত তার ভিতরের যৌন উপাদান বের করে দেবার ফলে তার মধ্যে আর কোনই ধর্ষন প্রবনতা কাজ করবে না। অর্থাৎ এক্ষেত্রেও তার প্রাত্যহিক অভ্যাস তার ইচ্ছাশক্তির উপর ব্যাপক হারে প্রভাব ফেলবে।
অর্থাৎ বাস্তবিকই ইচ্ছাশক্তি বলে প্রকৃতিতে কিছু নেই।

যেসব ছেলে মেয়ে ভালো পরিবেশে বড় হয়েছে তারা স্বাধারণত ভালো মন মানুষিকতা নিয়ে বড় হয়। অনেক ক্ষেত্রে কেউ রক্ষনশীল পরিবেশে বড় হলে তাদের মন মানুষিকতাও রক্ষনশীল হয়। আবার যারা উদার পরিবেশে বড় হয় তারা রক্ষনশীল হয় না। অর্থাৎ মানুষ কেমন হবে সেটি সম্পুর্ণই নির্ভর করছে সে কোন পরিবেশে বড় হচ্ছে তার উপর। অনেক ক্ষেত্রে জেনেটিক কারণেও মানুষের আচর ব্যবহারগুলো কিছুটা ব্যতিক্রম হয়।

আবার ধরুন যেসব ছেলে মেয়ে বস্তি বা ফুটপাতে বড় হচ্ছে তারা স্বাধারণতই খুব খারাপ আচরণগুলো নিয়ে বড় হয়। সমাজের অনেক ঘৃন্যতা দেখে দেখে তাদের মন মানুষিকতাও সেরকম রুক্ষ কঠিন হয়ে যায়। ফলে তাদের দ্বারা খুব সহজেই কোন অপরাধ সংঘটিত হয়। যে ছেলেটি দেখছে তার চারপাশের মানুষ গুলো মারামারিতে লিপ্ত স্বভাবতই তার মনে একটি ধারণা জন্মে যে মারামারি করাটা একটি স্বাধারণ বিষয়। যেসব ছেলে মেয়েরা নেশাগ্রন্থ পরিবেশে বড় হয় তাদের মধ্যে নেশাগ্রন্থের সংখ্যা স্বাভাবিক ভাবেই অনেক বেশী। অর্থাৎ একজন মানুষ কেমন হবে, তার চিন্তা ধারা আচার আচরণ কেমন হবে সেটা সম্পূর্ণটাই তার বংশগত এবং পরিবেশগত ব্যাপার। অর্থাৎ একজন মানুষ ভালো হবে নাকি খারাপ হবে সেটি সম্পূর্নটাই তার বংশগত বৈশিষ্ট্য এবং তার পরিবেশের প্রকৃতি কেমন সেটা দিয়ে প্রভাবিত। কোন শিশুই তার ইচ্ছাশক্তিতে জন্ম গ্রহন করে না। বরং তার চিন্তা ভাবনাই গঠিত হয় তার চারপাশের পরিবেশ থেকে। তার মধ্যে যোগ হয় তার বংশগত প্রকৃতি এবং তার শারীরিক গঠন কেমন তার উপর। যে শিশুটি খারাপ পরিবেশে জন্মেছে এবং জন্মের পরেই শুধু পরিবেশ থেকে খারাপ শিক্ষা পেয়েছে সেই শিশুটির চিন্তা ভাবনা নিয়ন্ত্রিত হয় তার পরিবেশের আচার আচরণ এবং আকৃতি প্রকৃতির উপর। সে যেমন তার ইচ্ছাশক্তি খরচ করে খারাপ পরিবেশে জন্ম নেয় না ঠিক একই ভাবে তার শিক্ষা দিক্ষাও তার স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত নয়। বরং মানুষের মন মানুষিকতা তথা কথিত স্বাধীন ইচ্ছাশক্তিই গঠিত হয় মানুষের জন্মগত এবং পরিবেশগত বৈশিষ্ট্যের উপর ভিত্তি করে। একজন মানুষ কখনই তার জীবনে স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি পায় না। বরং তার স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি গঠিত হয় এবং নিয়ন্ত্রিত হয় প্রকৃতি ও পরিবেশ দ্বারা।

প্রকৃতিপক্ষে মানুষের স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি বলতে বাস্তব জগতে কিছুরই কোন অস্তিত্ব নেই।

একজন মানুষ যে কিনা মুসলমান পরিবারে জন্ম নিয়েছে সে তার স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি ব্যবহার করে মুসলমান পরিবারে জন্ম নেয়নি। ফলে একজন মানুষ সম্পূর্ণই প্রকৃতির খেয়াল খুশি মতো মুসলমান পরিবারে জন্মেছে। ফলে সে মুসলমানের শিক্ষা দিক্ষায় বড় হয়েছে। সে জেনেছে পৃথিবীটা আল্লাহর। আর তাই সারা পৃথিবীতে আল্লাহর শাসন কায়েম করাটাই প্রতিটি মুসলমানের দায়িত্ব। সেই বিশ্বাসগুলোই তার চিন্তা ধারাকে নিয়ন্ত্রন করে। তার যুক্তিগুলো দাড়িয়ে আছে এই অন্ধবিশ্বাসগুলোকে কেন্দ্র করে। ফলে সারা জীবনেও সে তার এই চিন্তা ধারার বাইরে আসতে পারে না। তার চিন্তা চেনতার ভিত্তিই গড়ে উঠে এসব বিশ্বাসকে কেন্দ্র করে। আর তাই তার ইচ্ছাশক্তির ভিত্তিই হলো এসব ধারণাগুলো। ফলে সে বুকে বোমা বেধে শেষ করে দেয় নিজেকে এবং অনেক নিরীহ মানুষকে। এই যে তার আত্ম ঘাতির প্রবনতা, এসবে তার ইচ্ছাশক্তি কতটুকু কার্যকর? সে তাই শিখেছে যা তার পরিবেশ তাকে শিক্ষা দিয়েছে। সে সেগুলোকেই চিরন্তন সত্য বলে বিশ্বাস করেছে অন্ধের মতো করে, যা তার আপনজনরা তাকে বলেছে। ফলে তার যৌক্তিক মন মানুষিকতা এবং ইচ্ছাশক্তিগুলো সেসব ধারণার উপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে। ফলে সে নিজে মরছে এবং সাথে সাথে কিছু নিরীহ মানুষকেও মেরে ফেলছে। এসবে তার স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি কতটুকু ভূমিকা রাখছে? একদম শুন্য।

যে ছেলেটি সুন্নি পরিবারে জন্মেছে তার ধ্যান ধারণা এবং ইচ্ছাশক্তি গড়ে উঠেছে সুন্নি মনোভাব নিয়ে। একই ভাবে সে শিয়া বা আহমদীয়া পরিবারে জন্মেছে তার ধ্যান ধারণা এবং ইচ্ছাশক্তিও শিয়া বা আহমদীয়াদের মতো করে হয়েছে। এসব কিছুতে তার কোনই স্বাধীন ইচ্ছা কাজ করেনি।

আপনারা একজন খ্রিস্টান বা ইহুদীর কথা চিন্তা করতে পারেন। সে মনে করে তার পিতামাতার ধর্মটিই সত্যি। একজন মুসলমান যেভাবে মনে করে যে ইসলামই সত্য ধর্ম এবং পৃথিবীর সবারই স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি আছে যা খরচ করে তারা মুসলমান হতে পারে বা ইহুদী খ্রিস্টান হতে পারে ঠিক একই ভাবে একজন ইহুদী বা খ্রিস্টানও ভাবে মুসলমানদের স্বাধীন ইচছাশক্তি আছে এবং তারা সেই স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি খরচ করে ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করে খ্রিস্টান ধর্ম বা ইহুদী ধর্ম গ্রহন করতে পারে। যদি তারা না করে তবে তারা তাদের স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি খরচ করেই মুসলমান থেকে গেছে এবং এজন্য সমস্ত মুসলমানগনই জাহান্নমের আগুনে জ্বলবে অনন্তকাল ধরে।

ঠিক একই ধারণা মুসলমানরাও রাখে এবং তারা বিশ্বাস করে যদি খ্রিস্টান বা ইহুদিরা তাদের স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি ব্যবহার করে মুসলমান না হয় তবে তারা অনন্তকাল ধরে জাহান্নামের আগুনে জ্বলবে।

তারাও ভাবে যে মুসলমানদের স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি আছে। কিন্তু প্রকৃত সত্য হলো যে, কোন মুসলমানদেরই কোন স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি নেই। তারা সেটাই সত্য বলে অন্ধের মতো বিশ্বাস করে যা তাদের বাবা মা এবং আশেপাশের পরিবেশ তাদেরকে শিক্ষা দিয়েছে। তাদের কথিত স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি গড়েই উঠেছে এসব অন্ধবিশ্বাসকে কেন্দ্র করে। এজন্যই তাদের কাছে ইসলামই সত্য ও বাকী সব ধর্মই মিথ্যা। ঠিক একই ভাবে একজন হিন্দু বা খ্রিস্টান অথবা ইহুদীর কাছে তাদের ধর্মটিই একমাত্র সত্য। পৃথিবীর বাকী ধর্মগুলোই মিথ্যা। সবাই সমান ভাবেই তাদের নিজেদের ধর্মকে সত্য বলে অন্ধের মতো বিশ্বাস করে। তাদের ধারণা তারা সেই বিশ্বাসটুকু পেয়েছে তাদের স্বাধীন ইচ্ছাকে কাজে লাগিয়েই। কিন্তু তারা কেউই বুঝতে পারে না যে তারা যেটাকে স্বাধীন ইচ্ছা বলে ভাবছে সেই স্বাধীন ইচ্ছাটুকুই আসলে প্রকৃতি এবং পরিবেশের কাছে বন্দি। সেই কথিত স্বাধীন ইচ্ছাটি আসলে প্রকৃতি এবং পরিবেশের কাছে পরাধীন। এবং তাদের সেই কথিত স্বাধীন ইচ্ছাটি গড়েই উঠেছে প্রকৃতি এবং পরিবেশের দ্বারা প্রবল ভাবে প্রভাবিত হয়ে।

জঙ্গিবাদ অথবা ধর্মান্ধতার ক্ষেত্রে যে শব্দটি বিপুল পরিচিত তা হলো ব্রেইন ওয়াশ বা মগজ ধোলাই। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে মানুষের ব্রেইন ওয়াশ বা মগজ ধোলাই আসলে সেই শৈশব থেকেই তৈরী হয়। তাদের যুক্তিবুদ্ধি যখন তৈরিই হয়নি তখন কিছু মিথ্যা ধারণা এবং ভ্রান্ত বিশ্বাস ঢুকিয়ে দেবার মাধ্যমে তাদেরকে সেই শৈশবেই ব্রেইন ওয়াশ বা মগজধোলাই করা হয়। ফলে সে সারাজীবন স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি বা স্বাধীন ইচ্ছা বলে চিৎকার করে এবং পরাধীনের মতো করে তাদের ব্রেইনওয়াশ্ড্ বা মগজধোলাইময় ইচ্ছাশক্তিকে স্বাধীন ইচ্ছা বলে মনে করে। আর এসব কিছুই করে অন্ধবিশ্বাসী হয়ে। তাদের ধ্যান ধারণা এবং অন্ধবিশ্বাসের উপরই যেহেতু তাদের ইচ্ছাশক্তি দাড়িয়ে থাকে তাই তাদের কাছে সেই পরাধীনময় চিন্তা ভাবনাগুলোকেই তারা স্বাধীন ইচ্ছা বলে মনে করে।

প্রকৃতপক্ষে বাস্তব জগতে স্বাধীন ইচ্ছা বলে কিছু নেই। আপনি যাকে স্বাধীন ইচ্ছা বলে ভাবছেন সেটি আসলে গড়ে উঠেছে প্রকৃতি এবং পরিবেশের পরাধীনতার উপর ভিত্তি করে। আমাদের কোন স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি নেই। আমরা প্রকৃতি ও পরিবেশের কাছে পরাধীন। আমাদের ইচ্ছেশক্তিও প্রকৃতি এবং পরিবেশের কাছে পরাধীন।

বিশেষ দ্রষ্টব্যঃ প্রশ্ন আসতে পারে, আচ্ছা বুঝতে পারলাম যে আস্তিকরা ধর্ম দ্বারা ব্রেইন ওয়াশ হয় বলে তাদের কোন স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি নেই কিন্তু নাস্তিকদেরও কি স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি নেই? তারাতো কোন অন্ধবিশ্বাসকে আকড়ে ধরে থাকে না!
উত্তরটি খুব সহজ। নাস্তিকদেরও কোন স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি নেই। তাদের ইচ্ছাশক্তিটিও প্রকৃতি এবং পরিবেশের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। তবে নাস্তিকদের ক্ষেত্রে একটি বিষয় ঘটে যা আস্তিকদের ক্ষেত্রে ঘটে না। তাদের ইচ্ছাশক্তিটি গড়ে উঠেছে প্রকৃতি এবং পরিবেশের দ্বারা প্রভাবিত হয়েই। কিন্তু তারা তাদের ধ্যান ধারণাকে পরিবর্তন করেছে বা গড়ে তুলেছে প্রকৃতি এবং পরিবেশের প্রভাবে প্রভাবিত হয়েই। তবে তাদের সাথে আস্তিকদের ইচ্ছাশক্তির পার্থক্য হলো আস্তিকরা তাদের গঠিত ইচ্ছাশক্তি বা ধ্যান ধারণা প্রকৃতি ও পরিবেশের যৌক্তিক অংশের থেকে নিরাপদ দুরত্বে রাখে। অপরদিকে নাস্তিকরা প্রকৃতির যৌক্তিক ধারণাগুলো দ্বারা প্রভাবিত হয়। এজন্য নাস্তিকরা তাদের বাপদাদা কর্তৃক প্রবর্তিত কথিত ইচ্ছাশক্তিগুলোকে মুল কাঠামো ধরে নেয় না। বরং তারা প্রকৃতির যৌক্তির নিয়মগুলোকেই তাদের ইচ্ছাশক্তি বা ধ্যানধারণার মূল কাঠামো হিসেবে ধরে নেয়। এই ধরে নেওয়াটা গড়ে উঠে প্রকৃতি এবং পরিবেশের প্রভাবেই। যেমন তারা নানা রকমের ভিন্ন ভিন্ন বিপরীত ধারণাগুলোর দ্বারা প্রভাবিত হয়। ফলে তারা প্রকৃতির যৌক্তিক ধারণাগুলো দারাই বেশী প্রভাবিত হয়ে যৌক্তিক মন মানুষিকতা গ্রহন করে। অর্থাৎ সার্বিকভাবে তারাও স্বাধীন নয়। যেসব আস্তিক অতিমাত্রায় কুসংস্কার দ্বারা আক্রান্ত তারা বিপরীত ধর্মী ভিন্ন ভিন্ন ধ্যান ধারণা দ্বারা প্রভাবিত হয় না। অপরদিকে নাস্তিকরা কুসংস্কার দ্বারা অতটা প্রভাবিত হয় না বলেই তারা প্রকৃতির যৌক্তিক ধারণাগুলো দ্বারা খুব সহজেই প্রভাবিত হয়। এবং তাদের ধ্যান ধারণা ও ইচ্ছাশক্তি অনেক যৌক্তিক এবং বাস্তবমুখি হয়।
প্রকৃতপক্ষে নাস্তিক আস্তিক কেউই ইচ্ছায় স্বাধীন নয়। তাদের ইচ্ছাশক্তি পুরোটাই প্রকৃতি ও পরিবেশ দ্বারা প্রভাবিত এবং নিয়ন্ত্রিত। বান্তব জগতে স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি বলে কোন কিছুর অস্তিত্ব নেই। আস্তিকরা যত চেঁচিয়ে বলুক না কেন যে ‘তাদের স্বাধীন ইচ্ছা রয়েছে এবং তারা তাদের স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি খরচ করেই তাদের ধর্মকে বেঁছে নিয়েছে’ প্রকৃত সত্য হলো তারা কেউই তাদের স্বাধীন ইচ্ছাশক্তির দ্বারা তাদের কুসংস্কারগুলোকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করেনি। বরং তাদের আশে পাশের পরিবেশই তাদেরকে সেই কুসংস্কারময় অপবিশ্বাসকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করতে বাধ্য করেছে। তারা ইচ্ছাশক্তিতে স্বাধীন নয়। বরং তাদের ইচ্ছাশক্তিটিই পরাধীন।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 1 = 1