ভারত-বাংলাদেশ প্রতিরক্ষা চুক্তি : একটি নেহেরুভিয়ান যুগের কূটনৈতিক অপরিপক্বতার নিদর্শন।

গত ক’মাস ধরেই ফেসবুক টাইমলাইন ভারত-বাংলাদেশ সম্ভাব্য প্রতিরক্ষা চুক্তির খবরকে কেন্দ্র করে সয়লাব হয়ে আছে। এই হবে হবে প্রতিরক্ষা চুক্তিকে কেন্দ্র করে কিছু মনের কথা না বলে পারলাম না। স্রেফ একজন কৌতূহলী ব্যক্তির দৃষ্টির বিবেচনায় যা বুঝেছি তাই এই প্লাটফর্মে বলছি, কোন বিশেষজ্ঞ আমি নই! ভুল-ত্রুটি পাঠককূল ক্ষমা করবেন।

ভারত সরকার এর আগে বাংলাদেশের ভারতবিদ্বেষী গ্রুপগুলির কর্মকান্ড নিয়ে তেমন মাথা না ঘামালেও বর্তমানে বন্ধুপ্রতিম আওয়ামী সরকারের সময় চীন থেকে দু’টো রিফার্বিশড করা মিং শ্রেণির ডিজেল-ইলেক্ট্রিক সাবমেরিন ক্রয় করার পর তাদের হঠাৎ টনক নড়েছে। সাবমেরিন ক্রয় করা সামরিক ভাষায় বহু গুরুত্ব বহন করে। কোন দেশ অন্যদেশ হতে সাবমেরিন ক্রয় করার মাধ্যমে রক্ষণাত্মক না আক্রমণাত্বক অথবা সেদেশ কোন সামরিক এবং অর্থনৈতিক বলয়ভুক্ত থাকতে যাচ্ছে বা খপ্পরে পরছে সেটার বার্তা কোন না কোনোভাবে দিয়ে দেয়। এসব ছাড়াও আরো বিভিন্ন অর্থ থাকে।

এখানে ভারত বাংলাদেশের সাবমেরিন ক্রয় করা নিয়ে অযথাই উদ্বিগ্ন হয়েছে বলে আমার অভিমত। ভারত সরকার মনে করছে তাদের ব্যাকইয়ার্ডে ( ভারত মহাসাগর অঞ্চলকে ভারত নিজের বাড়ির আঙিনা মনে করে থাকে) বাংলাদেশ চীনা সাবমেরিন কেনার মাধ্যমে চীনকে বৃহৎ পরিসরে আরো খেলা করার সুযোগ করে দিয়েছে এবং এটা উক্ত অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান হবে যদি এটাতে হস্তক্ষেপ না করা যায়। তাই বাংলাদেশকে ছলে-বলে এমন এক বাধ্যতামূলক সামরিক চুক্তিতে আনতে হবে যেটা বাংলাদেশের চীনের সামরিক প্রভাব ধীরে ধীরে কাটিয়ে আনতে সক্ষম হবে।

আর এতেই ভারতের মতো অভিজ্ঞ কূটনীতিজ্ঞ রাষ্ট্রের উপর নেহেরুভিয়ান যুগের অপরিপক্ব কূটনীতির অপচ্ছায়া আমি দেখতে পাই। পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরু হচ্ছেন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী। তাঁকে অভিজ্ঞ ও ঝানু রাষ্ট্রনায়ক আর কূটনৈতিক হিসেবে যেভাবে চিত্রায়িত করা হয় তিনি আদতে ততটা ছিলেন না। ভারত আজ পর্যন্ত তার বহু বিভ্রান্তিকর সিদ্ধান্তের জন্য ভুগতে হচ্ছে। তাঁকে প্রেসিডেন্ট আইজেনআওয়ার সাহেব নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদেশ করার প্রস্তাব দিলেও কোন এক বিস্ময়কর কারণে তিনি সেটা চীনের কাছে ঠেলে দেন, প্রেসিডেন্ট জেএফকে জুনিয়র পারমাণবিক অস্ত্র দেয়ার প্রস্তাব দিলে তা অগ্রাহ্য করেন, তাঁর এবং তাঁরই প্রশাসনের হিন্দি-চীনি ভাই ভাই ধারণা ‘৬২র চীন-ভারত যুদ্ধে ভারতের শোচনীয় পরাজয়ের অন্যতম কারণ, সোভিয়েত – আমেরিকান ব্লকের যেকোন একটাতে না ঢুকে কাবিলতি দেখিয়ে পৃথক ন্যাম ব্লক গড়ার অপদার্থতা করেছিলেন যা ভারতকে কখনোই তেমনভাবে সাহায্য করেনি। নেহেরুর চিন্তা-ভাবনা ছিলো মোদ্দা কথায় নতুন নতুন বিপজ্জনক পরীক্ষায় নেমে ফেল মারার মত।

ভারত যে প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলাদেশকে রাজি করাতে চাইছে তা একই নেহেরুভিয়ান অপরিপক্ব কূটনীতিকসুলভ শ্রেণিতে নির্দ্বিধায় ফেলা যায়। এমনিতেই বাংলাদেশি সংখ্যাগুরু ভারতবিদ্বেষীদের মাঝে সাম্প্রদায়িক বিষ মেশানো ভারতবিরোধি গ্রুপটা প্রধান। তারপর অল্পকিছু পাবলিক ভারত-পাকিস্তান দু’টো দেশকেই ঘৃণা করে। এর বাইরে বামপন্থী সংগঠনদের ভারতবিরোধি ভূমিকাতো লাগাতার আছেই। তাদের বাইরে স্বল্পসংখ্যক বাংলাদেশি আছে যারা এখনো ভারতের ‘৭১র মুক্তিযুদ্ধকালের ভূমিকায় এখনো ভারতের প্রতি কৃতজ্ঞচিত্ত আছে এবং সমর্থন করে। তবে তারা ভা:দা: ট্যাগ খেয়ে একপ্রকার কোণঠাসা অবস্থায় থাকে সবমসময়। এরা মূলতঃ আওয়ামী সরকারের সময়েই কিছুটা ভালো হালে থাকে নতুবা ব্যাকফুটে।

অথচ সেখানে বাংলাদেশকে ভারত এক রহস্যময় প্রতিরক্ষা চুক্তিতে জোর করে রাজি করিয়ে নিজেদের অবস্থানকেই দুর্বল দিকে ঠেলে দিচ্ছে। একে তো এটা ভারত কাছে সবচেয়ে ভরসাজনক আওয়ামী লীগ সরকারের গ্রহনযোগ্যতা তারই জনগণের কাছে সীমিত করবে উপরন্তু ভারতবিরোধি রাজনীতিতে নতুন করে জ্বালানি সরবরাহের মাধ্যমে প্রবল স্থানীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমস্যার সৃষ্টি করবে। বাংলা বাগধারায় বিষয় দু’টোকে “হাতের কাছের লক্ষ্মীকে পায়ে ঠেলা মারা” আর “নিজের পায়ে নিজেই কুড়োল মারার” সাথে তুলনা করা যায়।

বাংলাদেশের ভারতবিরোধী রাজনীতিতে এই অপ্রকাশিত প্রতিরক্ষা চুক্তিটা অভাবনীয় প্রয়োজনীয় জ্বালানী সরবরাহ করবে তাতে আমার কোন সন্দেহই নেই। এই ব্যাপারে প্রত্যেকের মত যখন পড়ছি তখনই না’বাচক উত্তর পাচ্ছি। তবু সবকিছু ঠেলেঠুলেই এই অপ্রয়োজনীয় বিপদ ডেকে আনা প্রতিরক্ষা চুক্তির দিকে এগিয়ে গেছেন দু’দেশের সরকারপ্রধান। বাংলাদেশের সরকার তবু এর পরিণতি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল যেমনটা ভারতের ক্ষেত্রে দেখতে পাচ্ছিনা। বাংলাদেশ তাই অনেকবার চুক্তিতে নারাজি থেকেছে। অপরদিকে ভারতের হয়তো এই সম্পর্কে কোন ফিল্ডওয়ার্কই নেই, যা তাকে ভবিষ্যতের ফল অনুধাবন করতে সাহায্য করবে। হয়তো ক্ষুদ্র প্রতিবেশিদের ক্ষেত্রে “সাউথ ব্লক” প্রয়োজনীয় কাজকারবার করে অতঃপর দেন-দরবারে নামেনা যেটা সে বৃহৎ শক্তি-পরাশক্তির জন্যে করে থাকে। হয়তো সেখানের কূটনীতিকদের বিবেচনায় এটা থাকে যে “বাংলাদেশ! হে আবার এমন কি সমস্যা? ওদের একটু টাইটে রাখলেই সমস্যা সলভ (solve) হয়ে যাবে।” আর এই রকম পরিকল্পনার জন্যই পাকিস্তানের মত শত্রু আর ভূটানের মত করদ রাজ্য ব্যতিত ভারতের অপরাপর প্রতিবেশিরাও মারাত্মকভাবে সংক্ষুব্ধ!

বাংলাদেশিরা দেখেছে কিভাবে ভারত নেপালের সাথে প্রতিরক্ষা চুক্তির মাঝে অবমাননাকর শর্ত রেখেছে। কিভাবে ভূটানের মতো স্বাধীন দেশের প্রতিরক্ষার দায়িত্বে থেকে তাদের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করেছে। আর সিকিমের লেন্দুপ দর্জির উপাখ্যানতো বাঙালি মুসলমানদের মুখে মুখে ঘুরে। আর এখন এই অপ্রকাশিত ধারা – উপধারা, নানা শর্তের প্রতিরক্ষা চুক্তি তাদের মাঝে কি পরিমাণ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে তা কি ভারত সরকার অনুমান করতে পারছেনা? নাকি ভারত সরকার একটা উটপাখি!?

ইদানিং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সফরের পরপরই ভারতীয় ডিফেন্স নিউজ পোর্টালগুলোয় এই চুক্তি সংক্রান্ত নানা সংবাদ দেখতে পাচ্ছি। প্রধানমন্ত্রীর সফরের পূর্বে কোন কোনটা লিখেছিল ভারতের ঋণে ভারতীয় অস্ত্র কিনতে হবে। এরপর খবর অনুযায়ী একূলের সামরিক ব্যক্তিত্বদের মাঝে তার অনাগ্রহ দেখে সফরের পরেই ভারত এবার বাংলাদেশের জন্য রুশ সামরিক বিমান কেনার জন্য অর্থায়ন করার প্রস্তাবনা দিচ্ছে। ভারতীয় পাঁচশ মিলিয়ন ডলারের (৫০ কোটি ডলার) ঋণে রাশিয়ান মিগ-২৯ যুদ্ধবিমানের স্পেয়ারপার্টস এবং ব্রান্ড নিউ আটটি মিগ-৩৫ যুদ্ধবিমান কেনা হতে পারে। ধরে নেয়া যেতে পারে, এটা করা হচ্ছে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীতে সামনে রিটায়ার করার পর্যায়ে থাকা চীনা এফ-৭ এমবি বিমানের বদলে যাতে নতুন করে সরকার চীনা এয়ারক্রাফট না কেনে, ভারতকে ফের অস্বস্তিতে না ফেলে।

বিষয়টা আমার কাছে ঋণ করে ঘি খাওয়ার মতো মনে হয়েছে। ভারত পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ ঋণগ্রহীতা এবং দরিদ্র সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র আর সেখানে তার অন্যদেশের সশস্ত্র বিমানবলকে পুষ্ট করার মতো কাজে না জড়ানোটাই উচিত ছিলো! কিন্তু ভারতের নীতিনির্ধারক মহল এতোটাই অবিবেচক যে তারা চীনের প্রভাবমুক্ত বাংলাদেশের জন্য এত্তা খরচ করতেও রাজি! অর্থের কি নিদারুণ অপচয়?

এখন আরেকটু সমরজ্ঞানের দৃষ্টিতে ভারতের বর্তমান নীতিনির্ধারক মহলের দুঃশ্চিন্তাকে বিশ্লেষণ করা যাক। প্রথমেই এই দুঃশ্চিন্তার গোড়ায় আসি। এটার প্রারম্ভ হয়েছে বাংলাদেশের সাবমেরিন ক্রয়ের কাহিনীর মাধ্যমে। তৎকালীন বিদায়ী আওয়ামী সরকার দু’টো পুরাতন সাব-মেরিনের ক্রয়ের আগ্রহ দেখিয়ে চীনসহ ১৫টি দেশকে আরএফআই ( রিকুয়েস্ট ফর ইনফরমেশন) চিঠি পাঠায় যাদের মধ্যে ভারত-পাকিস্তানের মতো দেশও ছিলো। সরকারের উদ্দেশ্য ছিলো নৌবাহিনীকে ত্রিমাত্রিক বাহিনীতে পরিণতি করার নিশ্চয়তা দিয়ে সামরিক বাহিনী যাতে ক্যু না করেরে তার প্রতিশ্রুতি আদায় করা। তখন ভারত তার কাছে অনেক রিটায়ার করা এবং খুব দ্রুত রিটায়ার করা হবে এমন পুরানো সাবমেরিন থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশকে দেয়ার প্রতিশ্রুতি না দিয়ে বরং রাশিয়া থেকে কিনতে বলে! এমতাবস্থায় চীন চটজলদি এগিয়ে আসে। আর দু’টো পুরানো মিং শ্রেণির সাবমেরিন রিফার্বিশিং করে একটা নতুন সাব-মেরিনের দামে বিক্রী করার প্রস্তাব দেয়। উক্ত প্রস্তাবে বাংলাদেশের সম্মত না থাকার কোন কারণও ছিলোনা। সুতরাং একথা বলা বাস্তব যে ভারতকে অস্বস্তিতে না ফেলে বরং নিজেদের ত্রিমাত্রিক রুপে প্রকাশ করাই ছিলো নেভির চীনা সাব ক্রয়ের প্রকৃত উদ্দেশ্য। বাংলাদেশ বহু ছোটখাটো চীনা প্রযুক্তির সমরাস্ত্র ব্যবহার করে থাকে যা সস্তায় পাওয়া যায় এবং বাংলাদেশের মতো স্বল্প আধুনিক প্রতিরক্ষা সরঞ্জামধারী রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয়তাও সার্বিকভাবে পূরণ করে। এক্ষেত্রে ভারতের তো বিরক্তির কিছুই তো আমি দেখিনা! বাংলাদেশ আর পাকিস্তান যে ভারতের প্রতিরক্ষা নীতিতে সমান গুরুত্ব বহন করেনা সেটা মোদি সরকারকে বুঝতে হবে। বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের চীনা মিডিয়াম রেঞ্জের এয়ার ডিফেন্স মিসাইল কেনা সমান হুমকি বহন করেনা। একটা দেশ যুদ্ধের প্রস্তুতিকে কেন্দ্র করে ক্ষেপনাস্ত্র ব্যবস্থা কিনছে অপরটি নিছক আকাশ সুরক্ষিত রাখতে নিচ্ছে। বিষয়টা কি মোদিজী বুঝতে অপারগ?

আর বর্তমান আন্তর্জাতিক সমরাস্ত্র রপ্তানি বাজারে চীনের মতো সফল রপ্তানিকারক দেশ হতে গেলে, বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল বিশ্বের অস্ত্রবাজারের দখল নিতে চাইলে ভারতের দরকার তার সমরশিল্পের কোয়ালিটি রেভ্যুলুশন! একই একে-৪৭ নকল ও উন্নয়ন করে ইসরায়েল তৈরী করে বিখ্যাত “গালিল এস” রাইফেল আর ভারত তৈরী করেছে ইনসাস রাইফেলের মতো বদখত দেখতে অস্ত্র। সৃজনশীলতার অভাব প্রকট। ভারতের এখনো ভরসা সেই বিদেশী রাইফেলেই!

এখন এই অংশে আমার আলোচনার উপসংহার টানছি। ভারত যদি বাংলাদেশ হতে সত্যিকারের উপকৃত হতে চায় তবে তিস্তা চুক্তি করুক, অভিন্ন নদীর পানিবন্টন নীতিমালা ও চুক্তি করুক, সীমান্ত সমস্যা সমাধান করুক, বাংলাদেশের মূল রপ্তানি পণ্যের উপর অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক, এই শুল্ক, সেই শুল্ক ইত্যাদির মতো বাঁধা দূর করে মুক্ত বাণিজ্যের পথ উন্মুক্ত করুক, বাংলাদেশ সরকারের নানা উদ্যোগের উপরে যেমন : বিশ্ব গণহত্যা দিবস, বঙ্গবন্ধুর খুনীদের ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে স্বপ্রণোদিত হয়ে নিজের শক্তিশালী কূটনীতিক প্রভাব খাটিয়ে সহায়তা করুক। এতে হয়তো বা ভারতপ্রীতি কারুর মাঝে বাড়বেনা কিন্তু ভারতবিরোধি রাজনীতিতে পানি ঢালার কাজ করবে, তাদের দুর্বল করবে। আওয়ামী লীগের মতো বন্ধুপ্রতিম রাজনৈতিক দলের জনসমর্থন বাড়বে। আর সেটা কি একটা অপ্রয়োজনীয় উদ্বেগ বাড়ানো প্রতিরক্ষা চুক্তির তুলনায় শ্রেয়তর নয় কি?!

মিঃ মোদি আপনি কি শুনছেন………?

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

17 + = 27