ভুলে গেছি

শিমু আর রাফির প্রেমটা আই.বি.এ তে পড়ার সময় থেকেই। শিমু ছিল বাংলা বিভাগে।ওদের বিয়ের প্রায় দুবছর হতে চলেছে।
সিনিয়র ব্যাংক কর্মকর্তা মি. রাফির ছোটবোন মৌরির গায়ে হলুদ আজ। মৌরি এম.বি.বি.এস শেষ করে ইন্টার্নিশিপ করছে। রিমুর বাবা মাকেও দাওয়াত দেয়া হয়েছে।রাফির কলেজ জীবনের বান্ধবী রিমু।রিমুর ডিভোর্সের খবরটা রাফি লোকমুখে শুনেছিল।

এক,

ক্রিংক্রিং, ক্রিংক্রিং
পেটমোটা মিকি মাউস ঘড়িটা বেজে উঠলো।
– এইবার কিন্তু আমি সত্যি পানি ঢেলে দেব।
-একটু ঘুমাতে চাই।
-কোনো ঘুম হবেনা। আজকে মৌরির গায়ে হলুদ। বেআক্কেল কোথাকার!
;এই বলে শিমু পাশের ঘরে মৌরীর কাছে যায়।
শিমু আর রাফির প্রেমটা আই.বি.এ তে পড়ার সময় থেকেই। শিমু ছিল বাংলা বিভাগে।ওদের বিয়ের প্রায় দুবছর হতে চলেছে।
সিনিয়র ব্যাংক কর্মকর্তা মি. রাফির ছোটবোন মৌরির গায়ে হলুদ আজ। মৌরি এম.বি.বি.এস শেষ করে ইন্টার্নিশিপ করছে। রিমুর বাবা মাকেও দাওয়াত দেয়া হয়েছে।রাফির কলেজ জীবনের বান্ধবী রিমু।রিমুর ডিভোর্সের খবরটা রাফি লোকমুখে শুনেছিল।
-ভাইয়া, তোর নতুন পাঞ্জাবী পছন্দ হয়েছে?
-অনেক বেশী পছন্দ হয়েছে, পাগলী একটা।
-আমার বিয়েতে তোদের চেয়ে আমার আনন্দ বেশী দেখা যাচ্ছে, হা হা
মৌরির সাথে সুজনের প্রেম তিন বছরের। দুজনই ডাক্তার। “মানাবে খুব পাশাপাশি দুজনকে”, ভেবে একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে রাফি।
ওয়ারড্রোবের উপরে নতুন পাঞ্জাবীটার পাশে একটা স্টেথোস্কোপ। স্টেথোস্কোপ দেখলে একটা চাপা নিশ্বাস লুকানো রাফির বহুবছরের পুরনো অভ্যাস।

দুই,
ক্রিংক্রিং, ক্রিংক্রিং
এলার্মের শব্দে পাশ ফিরে শুলো রাফি। মিকি মাউস আকা পেটমোটা এলার্ম ঘড়িটা এবারের জন্মদিনে ছোট বোন মৌরী উপহার দিয়েছে।
সকাল সাড়ে আটটা বেজে গেছে। নয়টায় বায়োলজি ‘রক্ত ও রক্ত সঞ্চালন’ অধ্যায় থেকে পঁচাত্তর নাম্বারের পরীক্ষা। রাফি চশমাটা খুজে নিয়ে শেষবারের মতো আড়মোড়া ভেঙে চটপট তৈরি হয়ে নিলো।
ঢাকার সকাল এতক্ষনে জমজমাট হয়ে উঠেছে। রাফি ঢাকায় এসেছে বেশীদিন হয়নি, আজ নিয়ে নয়দিন পুর্ন হবে। এর আগে দু’বার ঢাকায় এসেছিল। ক্লাস ফাইভে বড়মামাকে এয়ারপোর্ট অব্দি এগিয়ে দিতে এসেছিল বাবার সাথে। রাফির মামা সৌদিআরব থাকতেন।সেবার যাওয়ার আগে মামার কিনে দেওয়া রিমোটচালিত গাড়িটা নষ্ট হয়ে গেছে, তবুও রাফি ওটা শোকেসের এককোনে রেখে দিয়েছে। ওটা মামার শেষ স্মৃতি। পরের বছর সৌদিআরবে এক ক্রেন দুর্ঘটনায় মারা যায় বড় মামা।
কোচিং এর সামনে একটা ছোটখাটো জটলা দেখা যাচ্ছে। দুজন লোক মারামারি করছে, লোকজন গোল হয়ে দেখছে আর দাত কেলাচ্ছে। এটা ঢাকার স্বাভাবিক চিত্র। রাফি তাড়াতাড়ি কোচিং এ ঢুকে তিনশ চার নাম্বার রুমের দিকে ছুটল।
– আসতে পারি, ভাইয়া!
-তাড়াতাড়ি আসো।অলরেডি ৫ মিনিট শেষ। ও.এম.আর ঠিকঠাকভাবে পুরন করো।
গত পরীক্ষায় নাম্বার এসেছে বাষট্টি। আজ সঞ্জিব ভাইয়ার কেমেস্ট্রি ক্লাস। সঞ্জিব ভাইয়া ঢাকা মেডিকেলের ৩য় বর্ষের ছাত্র।
কোচিং এর সব ভাইয়া আপুদের ঘটনাবহুল অভিজ্ঞতার গল্প শুনতে রাফির ভালোই লাগে। ডাক্তারি পেশায় নিজেকে চিন্তা করে রোমাঞ্চিত হওয়া এখানে সবার নিত্তনৈমত্তিক ব্যাপার।
অথচ এই একমাস আগেই গোল্ডেন এ প্লাসের চেয়ে উত্তেজনাকর কোনো ভাবনাই হতে পারতো না। সময়ের সাথে সাথে শুধু চাহিদা না, স্বপ্ন এবং স্বপ্নের ধরনও বদলায়।
জৈব যৌগের অধ্যায় পড়ানো হলো ক্লাসে। পরদিন আবার পরীক্ষা। বাইরে রনরনে রোদ যেন সবাইকে সিদ্ধ করে দিচ্ছে। তবুও সবাই প্রানপনে ছুটছে।
-রাফি!! দাড়া,,,
পেছন থেকে সিফাত ডাকছে।সিফাত আর রাফি স্কুলজীবনের বন্ধু।কিন্তু ইন্টারমিডিয়েট ঢাকায়। সিফাত কলাবাগানে ওর কাকার বাসায় থাকে। রাফির হোস্টেল ফার্মগেটেই।
-কিরে হোস্টেলে যাচ্ছিস!
-হুম,, ভালো লাগছে না। কবে যে বাড়ি যাব! ঢাকায় দমবন্ধ হয়ে আসছে।
-হা হা, দু’দিনেই এই অবস্থা! আমি দুই বছর কাটিয়ে ফেলেছি।এখন তো ভালোই লাগে।তোরও ঠিক হয়ে যাবে।
-আল্লাহভরসা।
– আজ বিকেলে বের হ। কোথাও একটা ঘুরতে যাবো। তোরও ভালো লাগবে।
– ঠিক আছে। আমি তো কিছুই চিনি না।শুধু আমরা দুজনই যাচ্ছি?
-আমার কয়েকটা কলেজ ফ্রেন্ডও আসবে। পরিচয় করিয়ে দেব।

তিন,

-হা হা,, আমিই ফার্স্ট হব দেখে নিও!
-এহ, আর আমি যে এখনো হিটলার সেজে বসে আছি!
হুট করে ঘুমটা ভেঙে গেল।স্বপ্নে আজ যেমন খুশী তেমন সাজো অনুষ্ঠান হয়েছে। রিমু মৎস্যকন্যা সেজেছে আর রাফি হিটলার। প্লে গ্রুপের ছোট বাচ্চাদের অনুষ্ঠান। ওরা দুজন সাইজে বড়।সবার মধ্যে রাফির নিজেকে বেমানান লাগছিল। রিমু তো বাচ্চাদের সাথে মিশেই গেছে।
এখনো পেট মোচড়াচ্ছে, তবে আর বমি হচ্ছে না।কাল সিফাতের ফ্রেন্ড ফয়সালের বার্থডে ছিলো। রাফিও ওদের সাথে নিজের প্রথমবার বারে ঢোকার কৌতুহলটা দমাতে পারলো না। দুই পেগ ব্রান্ডি, চারবার বমি আর গাড়ীর প্যা পো, সবমিলিয়ে অসুস্থ হয়ে কাটলো পরের দিন।ঘোর খুব খারাপ জিনিস।

চার,

-কি অবস্থা, বন্ধু! কত পেলে কেমেস্ট্রিতে?
-বেশী পাইনি।বলা যাবে না। তুমি?
-এ সপ্তাহের অবস্থা ভালো না। আজ ঊনআশি।
-ভালোই তো!! চালিয়ে যাও।”
বলে রাফি সামনের দোকানে ঢুকে যায়। সুজা ওদের ব্যাচের নিয়মিত মেধাবীদের দলে। রাফিও এতদিন ছিল। মাসখানেক ধরে দলছুট।রাফি একটা গোল্ডলিফ জ্বালাতে জ্বালাতে বিদায় দিল সুজাকে।
মনটা ভালো লাগছে না। কিন্তু ভালো না লাগার কারনও জানা নেই। পকেটে হাত দিয়ে একহাজার টাকার নোটটা বের করল রাফি। এ মাসের হোস্টেল ভাড়ার সাথে বাড়তি একহাজার হাত খরচ।হাটতে হাটতে বারের সামনে থামলো রাফি।
-মামা, একটা হাফ হুইস্কি।
-নয়শ পঞ্চাশ ট্যাকা, মামা।
-এই নাও।
-মামা, বাকিটা আমার বখশিশ?”
বলে ওয়েটার দাত বের করল।
-রেখে দাও।

পাঁচ,

ঢাকায় রাফির তিনমাস কেটে গেল। মাঝে দু’বার বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিল।আর রাফির দৈনিক রুটিনের জায়গাটায় ইদানিং সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, রেড বাটন, ফার্মগেট পার্ক জায়গা করে নিয়েছে।সিগারেট খাওয়ার অভ্যাসটা দিনে দিনে ঘিরে ফেলেছে। ঢাকায় আব্বু আম্মুর কাছ থেকে গন্ধ লুকোনোর ঝামেলা নেই। মেডিকেল পরীক্ষা আর মাত্র সতেরো দিন পর। প্রস্তুতি নেয়ার শেষ সময়। লেখাপড়ার চেয়ে আড্ডাবাজি বেশী করেই কেটে গেছে পুরোটা সময়।
ডাক্তার হওয়ার প্রচন্ড ইচ্ছেটা এখন জেকে বসেছে। কিন্তু মন বলছে, তুমি হেরে গেছ। গত সপ্তাহে বোটানি তে বারো পাওয়ার পর সুজার হো হো করে হাসার শব্দটা যেন এখনো কানে বাজছে। সেদিন থেকে রাফিকে আর কোচিংয়ে দেখা যায় নি। সিফাতদের সাথে বারের টেবিল চেনার পরে, মনখারাপের মুহুর্তগুলোতে রাফির ওখানে হরদম যাওয়া আসা। ঘোরের সময়টাতে নিজেকে লক্ষ্যচুত হিসেবে মেনে নিতেও অপরাধবোধ করে না।ঘোর খুব খারাপ জিনিস।
রিমুর সাথেও আর কথা হয়নি। সেদিন ফোন দিয়ে বললো, ওর সাথে আর কথা হবে না। ওর বয়ফ্রেন্ড হয়তো মানা করে দিয়েছে। এরপর থেকেই ফোন বন্ধ, নাম্বার বদলেছে বোধহয়। রিমুকে ভালোবাসি বলা হবে না, এটা রাফি আগে থেকেই জানত। রাফি আর রিমু কলেজ থেকে ভালো বন্ধু। শুধু খুব ভালো বন্ধু।
পড়াশোনা, ক্যারিয়ার, লক্ষ্য, সম্মান, টাকা, বাবা, মা,রিমু আরো হাজারটা শব্দের জালে ঘোরে আচ্ছন্ন হয়ে নিঃশব্দে তলিয়ে যায় রাফির আরো একটি অপূরণীয় স্বপ্ন। ঘোর খুব খারাপ জিনিস।তবে “সময়ের সাথে সাথে শুধু চাহিদা না, স্বপ্ন এবং স্বপ্নের ধরনও বদলায়”।

ছয়,

-কি হলো!! আর কতসময় লাগবে তোমার?”
ঘোর কেটে যায়।রাফি চমকে পেছনে তাকায়।ঘোর খুব খারাপ জিনিস। শিমু ঘরে ঢুকে চোখ লাল করে তাকিয়ে আছে। রাফি স্টেথোস্কোপটা ড্রয়ারে রেখে তাড়াতাড়ি পাঞ্জাবীটা গায়ে চড়ায়। নিজের ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন বোধহয় মৌরী পূরন করেছে।পাগলীটা শশুরবাড়ি চলে যাবে ভাবলেই খারাপ লাগে।বাইরে কে যেন গান গাচ্ছে। হলুদ বাটা চলছে।আজ ডাক্তারনীর গায়ে হলুদ।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 3 = 1