গণজাগরণ মঞ্চ ঘিরে বিতর্কের নতুন সুর এবং আগামীর চ্যালেঞ্জ

আমাদের সামাজিক চিন্তার অনেকগুলো নষ্টামির মধ্যে একটা হচ্ছে, গুন্ডা-বদমাশ গোছের কিংবা শেয়ালের মত ধূর্ত না হলে কাউকে আমরা কাউকে নেতা মানতে চাই না। রাজনৈতিক, সামাজিক তো বটেই এমনকি সাংস্কৃতিক অঙ্গনের নেতৃত্বের ক্ষেত্রেও জটিল প্যাচ কষতে না জানলে তাকে নেতৃত্বের যোগ্য বিবেচনা করতে আমাদের মন চায় না। সরল সাধাসিধে কেউ কেউ নিদারুন কোন সংকটের সময় নৈতিকতার দায় থেকে নেতৃত্বে এলে তাকে ঘিরে মুহুর্তেই বিপুল আগ্রহ তৈরি হয় পুরো জাতির। আবার সংকট কিছুটা কাটলেই তাকে আর নেতা মনে হয় না, এক দল তো সংকটের সময়ের সেই নেতাকে বাড়ির দারোয়ান বানাতে পারলে খুশী হয়, ‘ব্যাটার যথেষ্ট সাহস আছে, চোর-ডাকাত দেখলে ঘাড় গুঁজে দৌড় দেওয়ার মত চালাক তো অন্তত: নয়’- দারোয়ান হিসেবে মন্দ না। আর এক দল সেই নেতার চরিত্রের অনেকগুলো দূষণীয় দিক খুঁজতে খুঁজতে শেষ পর্যন্ত গলির মোড়ের ঠ্যাঙ্গারে চাঁদাবাজের চেয়েও খারাপ প্রমাণ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। মাঝামাঝি আর এক দল যারা বিত্তে, চিন্তায়, কথা-বার্তা চাল চলনে সবকিছুতে মধ্যপন্থা অবলম্বন করেন, তারা ধরি মাছ না ছুঁই পানি’র মত কিছু চটকদার বাক্যবাণে সংকটকালীণ নেতৃত্বের অজস্র ব্যর্থতা খোঁজার ডজন ডজন খোঁড়া যুক্তি হাজির করেন, আর শেষ বিচারে নিজেদের বুদ্ধিবৃত্তিক নষ্টামির বাতাবরণ তৈরি করে প্রচলিত গুন্ডা-বদমাস নেতৃত্বের কাছেই নতজানু হন। এই প্রক্রিয়ায় কানসাটের গোলাম রব্বানি, যাত্রবাড়ির আমিনুলের মত নাগরিক আন্দোলনের নেতাদের বিকাশ ঘটতে দেওয়া হয়নি। অসংখ্য উদ্ভট সমালোচনার ঝড় তুলে তাদের বিলীণ করা হয়েছে। কারন রাষ্ট্রের একটা খেলা হচ্ছে রাষ্ট্রক্ষমতার পরিবারতন্ত্রের বলয়ের বাইরে কোন নেতৃত্বকে বিকাশ ঘটতে দেওয়া হবে না, আন্দালিব রহমান পার্থের মত বিষাক্ত কীট না হলে কোন তরুন সেলিব্রেটি রাজনীতিবিদও হতে পারেবন না! বর্তমানে গণজাগরণ মঞ্চের তরুণ নেতৃত্বকে ঘিরেও এই পুরনো খেলা নতুন করে শুরু হয়েছে। গত কয়েকদিন ধরে গণজাগরণ মঞ্চের নেতৃত্বের যোগ্যতা এবং দায়িত্ব নিয়ে বিতর্কের নতুন সুর লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশেষ করে ‘প্রথম আলো’ বলয়ের ভেতরে থাকা শুঁচিবায়ুগ্রস্ত বুদ্ধিজীবী শ্রেণীটি শুধু প্রথম আলোর পাতায় কৌশলী অবস্থান নয়, অনলাইন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও এই বিতর্কটি সুচতুরভাবে তোলার চেষ্টা করছেন এবং অদ্ভুতভাবে এদের যুক্তির সঙ্গে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার উদ্ভট দাবির বেশ মিল আছে।

গণজাগরণ মঞ্চের বিরুদ্ধে প্রথম আলো বলয়ের আক্রমণের নতুন উপলক্ষ তৈরি হচ্ছে সাভার ট্র্যাজেডি ঘিরে। গণজাগরণ মঞ্চ কেন এই ইস্যুতে যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসীর দাবি এবং জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধের দাবির মত কঠোর হচ্ছে না! শুধু এখানেই সীমাবদ্ধ নয়, গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ডা.ইমরান এইচ সরকারকে সরকারের নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলা হচ্ছে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার নেতা বলেই যুদ্ধাপরাধ ইস্যুর বাইরে কথা বলতে পারে না গণজাগরণ মঞ্চ। গণজাগরণ মঞ্চকে একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির উপ কমিটি বলে আখ্যায়িত করা, কতকিছু অবান্তর প্রসঙ্গ যে আনা হচ্ছে তার শেষ নেই। কয়েক মাস আগে যখন তাজরীন ফ্যাশনে আগুন লেগে ১১১ জনেরর মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল, অসংখ্য শ্রমিক পুড়ে কয়লা হয়ে চিরদিনের জন্য নিখোঁজের তালিকায় নাম লিখিয়েছেন, তখন তো গণজাগরণ মঞ্চ ছিল না, সে সময় শ্রমিকদের স্বার্থের পক্ষে আজকের এই বুদ্ধিজীবীরা কি কোন গণজাগরণ তৈরি করতে সমর্থ হয়েছিলেন? প্রথম আলো যখন এসিড আক্রান্তদের নিয়ে সামাজিক আন্দোলন গড়তে পত্রিকার পাতার পাশাপাশি রাস্তায় মানববন্ধন করছিল, তখন শায়খ রহমান-বাংলা ভাই জঙ্গীদের এর তান্ডবে দেশে ভয়াবহ অস্থিরতা চলছিল, তখন কি প্রথম আলো এসিড আক্রান্তদের রক্ষার ব্যানারের পাশে এই জঙ্গীদের বিরুদ্ধে আরও একটা ব্যানার নিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়েছিল? দাঁড়ায়নি, পত্রিকার পাতায় নিরপেক্ষ রিপোর্ট করে দায় শেষ করেছে, এবং সেটাই স্বাভাবিক ছিল। আজকের গণজাগরণ মঞ্চ গঠিত হয়েছে জাতির জন্মের সময় সৃস্টি হওয়া সবচেয়ে স্পর্শকাতর ‘যুদ্ধপরাধীদের বিচারের’ ইস্যুতে। এই ইস্যুর বাইরে অন্য কোন জনসম্পৃক্ত ইস্যুতে গণজাগরণ মঞ্চ বক্তৃতা বিবৃতি দিতে পারে, সহমর্মিতা জানাতে পারে, কিন্তু রাস্তায় টানা অবস্থান করতে পারে না, কারন সুনির্দিষ্ট ইস্যুভিত্তিক কোন আন্দোলন ইস্যুর বাইরে গেলে সেই আন্দোলন থাকেন না। জাতীয় তেল-গ্যাস-বিদ্যুৎ বন্দর রক্ষা কমিটি কি দেশের সব ইস্যুতে রাস্তায় নামে? নামে না, কারন সব ইস্যু নিয়ে এই ব্যানার রাস্তায় নামলে দেশের খনিজ সম্পদ রক্ষায় এই ব্যানারটির যে গ্রহনযোগ্য অবস্থান আছে, সেটি হারিয়ে যাবে। সাভার ট্র্যাজেডির পর গণজাগরণ মঞ্চ তাদের পূর্ব নির্ধারিত কর্মসূচী স্থগিত করেছে, বিধ্বস্ত ভবনের ভেতর উদ্ধার কাজে অংশ নিয়েছে, পাঁচটি মেডিকেল টিম গঠন করে আহতদের প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়েছে, নাগরিক শোক সমাবেশ করেছে। এর বাইরে এই বিষয় নিয়ে গণজাগরণ মঞ্চের আর কিছু করার নেই, থাকে না। তেল-গ্যাস-বিদ্যুৎ বন্দর রক্ষা কমিটিও একটি বিবৃতির বাইরে এই ট্র্যাজেডি ঘিরে আর কোন কর্মসূচী দেয়নি, কারন সেটা দেওয়া যুক্তিসঙ্গত নয়। শ্রমিক স্বার্থের জন্য আন্দোলনের দাবিদার অনেকগুলো রাজনৈতিক দল আছে, শুধু গার্মেন্টস শ্রমিকদের নিয়ে কাজ করে এমন অনেক শ্রমিক সংগঠন আছে। শ্রমিকদের কর্মস্থলে নিরাপত্তা, মালিকের অতি মুনাফার লোভে রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি’র মত ভয়াবহ হত্যাকান্ড বন্ধে কঠোর আন্দোলন তৈরির দায়িত্ব এই রাজনৈতিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর, তারা কোথায়? শ্রমিক শ্রেনীর স্বার্থ নিয়ে রাজনীতির দাবি করা রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা স্পেকট্রাম, তাজরীন, রানা প্লাজার ঘটনার পর একই ধারায় বার বার দেখা গেছে। একদিন প্রেসক্লাকেবর সামনে বিক্ষোভ, একদিন বিজএিমইএ ভবন ঘেরাও, তৃতীয় দিনে পার্টি অফিসে গোল টেবিল আলোচনা, চতুর্থ দিন পত্রিকায় কলাম লিখে বিপ্লব, পঞ্চম দিনে সারা দিন ঘুমিয়ে সন্ধ্যায় পার্টি অফিসে চায়ের আড্ডায় নতুন ইস্যু নিয়ে মেতে ওঠা। এই তো শ্রমিক শ্রেণীর পক্ষে রাজনীতি করা রাজনৈতিকদলগুলোর সামর্থ্য! আমাদের এই বুদ্ধিজীবীদের ভেতরে অনেকে এ ধরনের ভয়াবহ ট্র্যাজেডির পর রাজপথেও নামেন। একদিন আধাবেলা বিজিএমইএ ভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচী পালন করে মহান দায়িত্ব পালনের কৃতিত্ব জাহির করে দীর্ঘদিন ধরে তার মহিমান্বিত দায়িত্ববোধ সম্পর্কে জনতাকে অবহিত করতে থাকেন। যখন জানতে চাইবেন, ভাই শুধু আধাবেলা কেন? শ্রমিক শ্রেণীর জন্য নিরাপদ কর্মস্থল, নায্য বেতন নিশ্চিত করার দাবিটি খুবই যুক্তিসঙ্গত এবং দেশের ৯৯ শতাংশ মানুষ এটা সমর্থন করে, তাহলে এই সময় শ্রমিক শ্রেণীর পক্ষে একটা বৃহৎ গণজাগরণ কেন সৃস্টি না করে আধাবেলার ঘেরাও শেষে ফিরলেন কেন? কেউ স্মিত হাসেন, কেউ ফোঁস করে জবাব দেন। ‘পুরো বাংলাদেশ কি অ্যাকটিভিস্ট হয়ে যাবে না’কি। আমি পেশাজীবী, পেশাগত অবস্থানে থেকে যেটুকু দায়িত্বপালন সম্ভব তার চেয়ে বেশী কিছু করা আমার কর্তব্য নয়।’ যদি সেটাই হয়, তাহলে গণজাগরণ মঞ্চের নেতৃত্বকে সাভার ট্র্যাজেডি নিয়ে যুদ্ধাপরাধী ইস্যুর মত আন্দোলণ তৈরি না করার জন্য আক্রমণ করছেন কেন? এবার সিগারেটের ধোঁয়া গোল গোল করে উপড়ে ছাড়তে ছাড়তে শুঁচিবায়ুগ্রস্ত বুদ্ধিজীবীদের কেউ কেউ অতি ভাবুক হয়ে যান। ‘গণজাগরণ সরকারের দালাল হয়ে গেছে, ও দিয়ে আর কিছু হবে না’। আর একজন এই ফাঁকেই ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেন, ‘সবকিছু সরকারের খেলা, একই সূতোয় গাঁধা বলে সাভার ট্র্যাজডি নিয়ে শাহবাগ থেকে কোন দাবি উচ্চারিত হয় না, শাপলা চত্বর থেকেও একটা শব্দ উচ্চারণও করা হয় না’। অথচ শাহবাগ তার সবটুকু সাধ্য নিয়ে সাভার ট্র্যাজেডি’র হতাহতদের পাশে দাঁড়িয়েছে আর তথাকথিত হেফাজত সাভার ট্র্যাজেডি কে ‘আল্লাহর গজব’ বলে আখ্যায়িত করে হতাহত হতভাগ্য শ্রমিকদের সঙ্গে সঙ্গে নিষ্ঠুর প্রহসন করেছে। আসলে এই বুদ্ধিজীবীদের ভন্ডামির উদ্দেশ্যটা হচ্ছে ছলে বলে কৌশলে গণজাগরণ আর হেফাজত কে একই সূতোর উপড়ে রেখে বিচার করে গণজাগরণের তরুন নেতৃত্বকে বিলীণ করে দেওয়া। শুরু থেকেই তারুণ্যের বিপুল গণজাগরণ কে বিতর্কিত করার জন্য যে নাষ্টামি ফরহাদ মজহার, পিয়াস করিম, আসিফ নরজরুলের মত বুদ্ধিবৃত্তিক লম্পটেরা প্রকাশ্যে করেছে শুঁচিবায়ুগ্রস্ত প্রথম আলো বলয়ের সুশীল বুদ্ধিজীবীরা সেটা করছে ভন্ডামির সাদা তোয়ালায় মুখ ঢেকে।

গণজাগরণকে শেষ করে দেওয়ার উদ্দেশ্য কেন? এর কারন সবাই জানেন, রাজনৈতিক। কারন বিএনপি’র রাজনীতি দাঁড়িয়ে আছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ভিত্তির বিপরীত পৃষ্ঠের উপর। এই পৃষ্ঠকে শক্ত ভিত দেওয়ার জন্য বার বার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করা, খালেদা জিয়ার জন্মতারিখ পর্যন্ত পরিবর্তণ করেছে বিএনপি। চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের মন্ত্রী বানিয়ে গাড়িতে জাতীয় পতাকা তোলার কাজটি যে দল কিংবা দলের চেয়ারপারসন করতে পারেন, সেই দলের মুক্তিযুদ্ধবিরোধী অবস্থান সম্পর্কে কোন ব্যাখা-বিশ্লেষণের প্রয়োজন হয় না। আবার বাংলাদেশের রাজনীতিতে গুন্ডা-মস্তান সন্ত্রাসী নেতৃত্ব তৈরির কাজটিই রাষ্ট্রিয়ভাবে বিএনপিই শুরু করেছে। ত্যাগী রাজনীতিকদের বাদ দিয়ে অবসরপ্রাপ্ত আমলা, লুটেরা ব্যবসায়ীদের রাজনীতিতে টেনে আনার কাজটিও বিএনপিই শুরু করেছে। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপির কালো টাকা, মস্তানি আর সুবিধাবাদী আমলা প্রার্থীর বিপরীতে আওয়ামীলীগ দলের ত্যাগী নেতাদের মনোনয়ন দিয়ে নির্বাচনে জিততে পারেনি, এরপর আওয়ামীলীগও গুন্ডা-বদমাস অনেককেই নেতা বানিয়েছে, এমপি বানিয়েছে, সরকার গঠন করেছে, মন্ত্রী সভায় সাবেক দূর্নীতিবাজ আমলাও ঠাঁয় পেয়েছেন। এখন সামাজিক চিন্তায় ওই নষ্ট ধারানা মোটামুটি প্রতিষ্ঠিত, গুন্ডা-বদমাস কিংবা শেয়ালের মত ধূর্ত না হলে কেউ নেতা হতে পারেন না। গণজাগরণকে নিয়ে রাষ্ট্রকাঠামো এবং রাজনৈতিক দলগুলোর ভয়টা এখানেই। ‘একাত্তর, বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রসঙ্গ যত বেশী উচ্চকিত হবে তত বিএনপি’র ভোট কমবে, রাজনীতির ময়দানে অস্তিত্বের সংকট তৈরি হবে, এ কারনে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিরুদ্ধে বিএনপি গণজাগরণ কে সরাসারি আঘাত করে, নাস্তিকতার বায়বীয় অভিযোগ তুলে হেফাজতে ইসলামের ব্যানারে ধর্মান্ধ, জঙ্গী গোষ্ঠিকে লেলিয়ে দিয়ে খালেদা জিয়া যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পুরো প্রক্রিয়া বানচালের গভীর ষড়যন্ত্র করেন, মঞ্চে উঠে প্রশ্ন করেন ‘এই তরুনেরা কেন পদ্মাসেতুর দূর্নীতি নিয়ে আন্দোলন করে না, কেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ইস্যু নিয়ে কথা বলে না।’ কিস হাস্যকর যুক্তি! খালেদা জিয়া এটা বোঝেননা, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ইস্যুটির সঙ্গে তার দলের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি আর পদ্মাসেতুর দূনীতির বিচার দাবির ইস্যুর চরিত্র একেবারেই আলাদা। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ইস্যুটির রাজনৈতিক চরিত্রের পাশাপাশি একটি সার্বজনীন গ্রহনযোগ্য অবস্থান আছে, এমনকি বিএনপি’র ভেতরেও অনেক শহীদ পরিবার আছে, একাত্তরে স্বজন হারানোর বেদনা বয়ে বেড়ানো অনেকে আছেন, তারও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চান। এ কারনে সাড়ে তিনশ মানুষ হত্যারি অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পর কসাই কাদের মোল্লার ফাঁসীর রায় না হলে গোটা জাতি স্তব্ধ হয়ে যায়। আওয়ামীলীগের সঙ্গে জামায়াতের আঁতাত নিয়ে গভীর সন্দেহের সৃস্টি হয়। তখনই তারুণ্য জেগে ওঠে, গণজাগরণ মঞ্চ তৈরি হয়। যুদ্ধাপরাধীদের প্রতি মানুষের ঘৃনা এবং বিচারের দাবি অনেক বেশী তীব্র বলেই তরুনরা যখন কাদের মোল্লার ফাঁসীর দাবি নিয়ে রাস্তায় নামে তখন পুরো জনপদ ভেঙ্গে এসে তাদের সঙ্গে শ্লোগান ধরে। খালেদা জিয়া এই সত্যটা অবশ্য বোঝেন! বুঝতে পেরেই আঁতকে ওঠেন। উন্মাদিনীর মত আচরণ করে তরুন প্রজন্মকে নষ্ট বলে গালি দেন। এরপর ‘এবাদত নামা’ গ্রন্থের মত তীব্র ধর্মবিদ্বেষী কাব্যগ্রন্থের কবি ফরহাদ মজহারদের মত স্বঘোষিত নাস্তিক আর উত্তরা ষড়যন্ত্রের নায়ক মাহমুদুর রহমানের মত জাতীয় কুলাঙ্গারদের সঙ্গে নিয়ে নাস্তিকার ভুয়া অভিযোগ তুলে যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করা তরুন প্রজন্মকে সমাজ, রাষ্ট্রে হেয় করা ভয়ংকর খেলায় মেতে ওঠেন। খালেদা জিয়ার এই ভয়ংকর খেলা নিয়ে কিন্তু প্রথম আলো বলয়ের সুশীলরা প্রশ্ন তোলেন না। বরং কেউ বিএনপির রাজনীতির ভন্ডামির কথা বললে তাকে আওয়ামীলীগের চামচা বলে গালিয়ে দিয়ে মুখ বাঁকা করেন। আওয়ামীলীগ ধোয়া তুলসী পাতা নয়, কিন্তু তুলনামূলক বিচার করলে বিএনপির রাজনীতিতে নষ্টামির বিশাল ক্ষেত্রের ভেতর একবিন্দু আলোর রেখা খুঁজতে দূরবীণ লাগে। আর আওয়ামীলীগের রাজনীতির নষ্টামি একটা পুরনো বাড়ির স্যাতসেঁতে দেওয়ালে গজিয়ে ওঠা শেওলার মত দেখা যায়। প্রথম আলো বলয়ের শুঁচিবায়ুগ্রস্তরা আওয়মীলীগের পক্ষে একটি শব্দ কেউ বলে তাকে চাচমার তালিকায় ফেলে দরজার বাইরে বের করে দেন, আর বিএনপির পক্ষে বললে তাকে নিরপেক্ষ তালিকায় রেখে সামনে মিস্টির বাটিটা এগিয়ে দেন। প্রথম আলোর ছাঁচটা এত বেশী প্রত্রিক্রিয়াশীল হয়ে গেছে যে হাসনাত আব্দুল হাই এর মত সম্মানিত লেখকরা পর্যন্ত প্রথম আলোর পাতায় এসে নষ্ট মানুষে পরিণত হন। একটা কার্টুন ছাপার জন্য প্রথম আলোর সম্পাদক ক্যামেরারা সামনে দাঁড়িয়ে বায়তুলল মোকরারমের খতিবের কাছে ক্ষমা চান, কিন্তু গণজাগরণ মঞ্চ নিয়ে নোংরা, রুচিহীন গল্প ছাড়ার পর দায়সারা একটা ক্ষমা বিজ্ঞপ্তি ছাড়িয়ে পরক্ষণেই আবার গণজাগরণ মঞ্চের বিরুদ্ধে বলয়ভুক্ত বুদ্ধিবৃত্তিক লম্পটদের দিয়ে অবাধে কৌশলগত আক্রমণ চালিয়ে যেতে থাকে। প্রথম আলোর ক্ষোভের কারন, গণজাগরণ মঞ্চের বিশাল ঢেউ প্রথম আলোর নিরপেক্ষতার ছদ্মাবরণ ধরেও টান দিয়েছে। আগামীতে বিএনপিকে ক্ষমতায় দেখার প্রথম আলোর সুপ্ত বাসনা পূরণের প্রক্রিয়াকে বিপদপ্রস্ত করে তুলেছে।

গণজাগরণ মঞ্চ নিয়ে আওয়ামীলীগেরও ভয় কম নয়। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতিভূ হয়ে বসে থাকা আওয়ামীলীগের সমান্তরালে গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলন অসাম্প্রদায়িক চেতনার অন্য রাজনৈতিক কোন দল তৈরির সুযোগ সৃস্টি করে দেয় কি’না তা নিয়ে আওয়ামীলীগে শংকা থাকারই কথা। যেমন শহীদ জননী জাহানরা ইমাম গণ আদালত গঠনের পর আওয়ামীলীগ একই ধরনের ভয়ে ভীত ছিল এবং ওই ভয় থেকেই একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটিকে কূট কৌশলে দুর্বল করে ফেলে আওয়ামীলীগই। এমনকি ততকালীণ বিএনপি সরকার শহীদ জননী জাহানরা ইমামেরর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা দিলেও তার বিরুদ্ধেও আওয়ামীলীগ নিশ্চুপ ছিল। এবারও গণজাগরণ কে ঘিরে আওয়ামীলীগের ভয় সেটাই। নতুন একটা ভয়ও আছে, গণজাগরণ কে ঘিরে ‘চিলে কান নেওয়ার’ মত নাস্তিকতার যে গুজব উঠেছে তা দেশের শুধু অশিক্ষিত-অর্ধ শিক্ষিত নয়, তথাকথিত শিক্ষিত সমাজও খায় ভাল। গুজব খাওয়ানোর ক্ষেত্রে নষ্ট রাজনীতির মূল স্রোতে থাকা বিএনপি অনেকটাই সফল,ফলে এর কতটা প্রভাব আগামী র্নিবাচনে পড়ে তা নিয়েও আওয়ামীলীগের শংকা রয়েছে।
একটা বিষয় কেউই আমলে নিচ্ছেন না। সেটা হচ্ছে নাস্তিকতার ধুয়া। হেফাজতে ইসলাম বার বার নাস্তিকতার অভিযোগে তিন জনের শাস্তি দাবি করেছে। সেক্টর কমান্ডার ফোরামেরে সভাপতি মুক্তিযুদ্ধের উপ সেনাপতি এ কে খন্দকার, একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপাতি শাহরিয়ার কবির এবং গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ডা.ইমরান এইচ সরকার। এই তিন জন কেন, কিভাবে নাস্তিক এর প্রমাণ তারা কখণই দেননি। এই তিনজনের লেখায়, বলায়, ভাষণে কোথাও কখনও একটি কটুক্তি কিংবা নাস্তিকতার প্রসঙ্গ আসেনি। তাহলে এই তিনজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ কারন তারা তিনজনই যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির অভিন্ন দাবি নিয়ে আন্দোলন করছেন। এই আন্দোলকে বাধাগ্রস্ত করে যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষার জন্যই পরিকল্পিতভাবে এই তিনজনের বিরুদ্ধে নাস্তিকতার বায়বীয় অভিযোগ। ৫ মে ঢাকায় হেফাজতের স্মরণকালের ভয়াবহ তান্ডব এবং শেষ মুহুর্তে সরকারের শুভবুদ্ধির উদয়ে আইন-শৃংখলা বাহিনীর যৌথ অভিযানের পর শাপলা চত্বর থেকে পিছু হটতে বাধ্য হয়ে হেফাজত এবং তাদের পৃষ্ঠপোষক বিএনপি-জামায়াত বেশ বেকায়দায়। এখণ দেখা যাচ্ছে লাফালাফি শুরু করেছেন চরমোনাই পীর। চরমোনাই পীর প্রত্যেকবার জাতীয় নির্বাচনের আগে বেশ কিছুদিন লাফালাফি করেন, তার সঙ্গে এর আগে পতিত স্বৈরাচার এরশাদকেও লাফাতে দেখা গেছে।এবার চরমোনাই পীর লাফালাফির নতুন ধান্ধা পেয়েছেন। তিনি এখন শাহবাগকে ‘নাস্তিক’ আখ্যা দিয়ে সংবাদ সম্মেলন করছেন। আমার মনে হয়, এখনই হাইকোর্টে একটা রিট আবেদন হওয়া উচিত, প্রমাণ ছাড়া কাউকে নাস্তিক বলা যাবে না সে ব্যপারে নির্দেশনা চেয়ে। এর সঙ্গে আর একটি প্রসঙ্গ জোরালোভাবে আসা দরকার। কুটক্তি, ধর্মবিদ্বেষ আর নাস্তিকতা এক বিষয় নয়। কেউ নাস্তিক হলেই তার শাস্তি দাবি করা যায় না, সংবিধান সে অধিকার দেয় না। কটুক্তি, বিদ্বেষ ছড়ানো আইনের ভাষায় অপরাধ হতে পারে, নাস্তিকতা কখনই অপরাধ বিবেচিত নয়। এ বিষয়টিও আদালতের নির্দেশনার মাধ্যমে পরিস্কার হওয়া দরকার। যাকে ইচ্ছা নাস্তিক ঘোষণা করে ধর্মান্ধরা তার জীবন বিপন্ন করবে, সামাজিকভাবে হয় করবে, এটা হতে পারে না।

গনজাগরণ মঞ্চকে যদি আজ নানা অভিযোগে অভিযুক্ত করে শেষ করে দেওয়া হয় তাহলে সেটা জাতির জন্য বিপদের আশংকা বাড়িয়ে দেবে। এখন গণজাগরণ মঞ্চ একাত্তরের ঘাতক-যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসীর দাবির মঞ্চ শুধু নয়,ধর্মান্ধতা, কূপমন্ডুকতা, উগ্র সাম্প্রদায়িকতা এবং ধর্মকে ব্যবহার করে নষ্ট রাজনীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদের দৃঢ় প্রতীক। এ কারনেই আজ গণজাগরণ মঞ্চ ভেঙ্গে দেওয়ার জন্য ধর্মান্ধ গোষ্ঠির এত আস্ফালন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায় কার্যকর হওয়ার মধ্য দিয়ে জাতির কলঙ্ক মোচনের শেষ সময় পর্যন্ত তাই গণজাগরণ মঞ্চকে ধরে রাখা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শুভবুদ্ধিসম্পন্ন প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব। সেই সঙ্গে ধর্মান্ধতা এবং ধর্মের নামে নষ্ট রাজনীতির বিরুদ্ধে দীর্ঘ মেয়াদী সামাজিক আন্দোলনের সূচণাও হতে পারে গণজাগরণ মঞ্চ থেকেই।
রাশেদ মেহেদী, সাংবাদিক
rasedmehdi.blogspot.com

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৬ thoughts on “গণজাগরণ মঞ্চ ঘিরে বিতর্কের নতুন সুর এবং আগামীর চ্যালেঞ্জ

  1. সাম্প্রতিক সময়ের জন্য অসাধারণ
    সাম্প্রতিক সময়ের জন্য অসাধারণ বিশ্লেষণ সমৃদ্ধ একটি পোস্ট। ধন্যবাদ পোস্টের জন্য…..

  2. সম্প্রতি সময়ে যা ঘটছে তার উপর
    সম্প্রতি সময়ে যা ঘটছে তার উপর অসাধারণ বিশ্লেষণ মূলক একটি পোস্ট। ধন্যবাদ পোস্টের লেখককে।

  3. যারা শাহবাগের আন্দোলনকে খাটো
    যারা শাহবাগের আন্দোলনকে খাটো করে দেখাতে চায় তারা কারা সেটা আমরা খুব ভালো করেই জানি। আর যারা গণজাগরণ মঞ্চকে নিছক একটা বাঁশ কাঠের কাঠামো মনে করে তারা এই মঞ্চের চেতনাকেই ধরতে পারেনি। শাহবাগ আমাদের দেখিয়েছে দেশের প্রয়োজনে প্রজন্ম এক হতে জানে। শাহবাগ আমাদের নতুন করে স্বপ্ন দেখিয়েছে। যদিও মঞ্চের বিভিন্ন কর্মসূচী এবং মঞ্চকে কেন্দ্র করে অনেকের ফায়দা লোটার চেষ্টাও আমরা দেখেছি, কিন্তু সেটা এই চেতনাকে মুছে দিতে পারে না।

    অসাধারণ এই লেখাটার জন্য রাশেদ ভাইকে ধন্যবাদ। আপনার লেখার ফ্যান হয়ে গেলাম। :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:

  4. কি বলে যে আপনাকে ধন্যবাদ দিব
    কি বলে যে আপনাকে ধন্যবাদ দিব এই লেখার জন্য…। গণজাগরণ মঞ্চের বিপক্ষে উঠা প্রতিটি কটূক্তির অসাধারণ যৌক্তিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
    গণজাগরণ মঞ্চ সৃষ্টি হয়েছে যুদ্ধাপরাধীর বিচারের জন্য। এনিয়েই আন্দোলন চলবে। এটা তো কোন মিশ্র আন্দোলন না যে যখন যা ঘটবে সেটা নিয়ে আন্দোলন শুরু করবে। অন্যান্য সংস্থা গুলো আন্দোলন করুক, আমরা সমর্থন দিবো। আন্দোলনে শরিক হবো। কিন্তু আমাদের আসল উদ্দেশ থেকে বের হয়ে অন্য কিছু করলে তো জগাখিচুড়ি হয়ে যাবে।
    তাছাড়া এই গণজাগরণ মঞ্চ আমাদের অনেক কিছুই দিয়েছে। মানবতার বোধকে বিকশিত করেছে। মানুষ ছুটে এসেছে নিজের শরীরের রক্ত আহতদের দেওয়ার জন্য। সাভারে স্বেচ্ছায় সেবা দান করেছে।
    আর ৬ ফেব্রুয়ারির পর থেকে ইমরান এইচ সরকার নেতৃত্বের প্রয়োজন ছিল। তখন তো কেউ আঙ্গুল তুলে নি তার দিকে। তবে এখন কেন? আন্দোলন সংঘটিত করার জন্য তার প্রয়োজন ছিল, এখন প্রয়োজন শেষ?

  5. গণজাগরণ মঞ্চের বিরুদ্ধে প্রথম
    গণজাগরণ মঞ্চের বিরুদ্ধে প্রথম আলোর ষড়যন্ত্র, অপপ্রচার চলছে।তাদের সাম্প্রতিক জরীপে বলঅ হয়েছে জরীপে অংশ নেওয়া ৫৫ শতাংশ মানুষ গণজাগরণ মঞ্চ সমর্থন করেন না, ৬৪ শতাংশ মানুষ জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধ চান না। ২৫ শতাংশ মানুষ গণজাগরণ মঞ্চের নাম শোনেনিন। তারা ৩ হাজার মানুষের মধ্যে জরীপ চালিয়েছে।সম্ভবত, এই তিন হাজার অংশগ্রহনকারী জামায়াত-হেফাজত কর্মী,সমর্থক।কিংবা হেফাজতের সমাবেশর দিন তিন হাজার ফরম বিতরণ করে জরীপটা চালানো হয়েছে। আমার ব্যক্তিগত ধারনা প্রথম আলোর যাত্রা এখন ‘মাহমুদুর রহমানের দৈনিক আমার দেশ’ মুখী।
    যারা মন্তব্য করেছেন, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

54 − = 53