সব মুসলমানই বাঙালী কিন্তু সব বাঙালী মুসলমান না


বৈশাখী বিতর্ক
বৈশাখ মাস এলেই বাঙালী সংস্কৃতি নিয়ে টানাটানি শুরু হয়। এর পক্ষে-বিপক্ষে বিস্তর তর্ক-বিতর্ক হয় এবং তা কখনো সংঘাত-সংঘর্ষ অবধি গড়ায়। আমাদের দেশের এমন কোন বিষয় নেই যেটা নিয়ে ঝগড়া-বিবাদ-অনৈক্য নেই! বিভিন্ন দেশে সমাজে নানা ইস্যুতে মতভিন্নতা ও ঝগড়া-বিবাদ থাকলেও, তাদের জাতীয় ও মৌলিকগুলো মিমাংশিত, এবং তা নিয়ে তারা বিতর্ক করে না। কিন্তু বাঙালিরা করে! কেন বিতর্ক হয়? কারা বিতর্ক করে? সেটা কি অনন্ত কাল চলতেই থাকবে? সরকারের ভূমিকা কি? বিরোধী দল? ক্ষমতা ও রাজনীতি নিয়ে না হয় তাদের অনেক বিরোধ-বিতর্ক আছে বুঝলাম! কিন্তু বৈশাখ, বর্ষবরণ, বাঙালী সংস্কৃতির আপাত অরাজনৈতিক সার্বজনীন বিষয় নিয়েও কি রাজনীতি ও বিতর্ক করতে হবে? চলমান রাজনৈতিক বিরোধের বাইরে কি জাতী কি কখনো কোন একদিন একসাথে হাসতে-আনন্দ করতে পারবে না? অন্তত সংস্কৃতির ইচ্ছা নিরপেক্ষ বিষয়গুলোতে তো আমাদের একাত্ব হতে বাধা থাকার কথা না!

কেন এই মৌসুমী বিতর্ক?
বিতর্ক হয় কারণ, বাংলাদেশে বসবাসকারী এদেশের নাগরিকদের একটি বড় অংশ বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ভিত্তি ও জন্মকে মেনে নিতে পারেনি। রাষ্ট্রের ভৌগলিক সীমানা অনিবার্য বাস্তবতায় স্বীকার করলেও তার ভাবাদর্শকে কোন ভাবেই গ্রহন করেনি! ধর্মভিত্তিক জাতীয়তার বিপরীতে ভাষাভিত্তিক, বাঙালী জাতীয়তার বিষয়টিকে তারা আজও মেনে নিতে পারেনি!

তারা কারা? তারা হচ্ছে বাংলাদেশের ইসলামিক মৌলবাদী রাজনীতির বিভিন্ন ধারা ও দল। জামায়াতে ইসলাম, হেফাজতে ইসলাম, ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনসহ দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সাম্প্রদায়িক শিক্ষার ধারা মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা! এবং তাদের সমর্থক, তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল তথাকথিত বিভিন্ন গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক দল, শক্তি, সংগঠন। সবচেয়ে বিপদজনক প্রবণতা হচ্ছে ক্ষমতাকেন্দ্রীক রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষমতা দখল ও রক্ষার কৌশলগত কারণ-সমীকরণের সুবিধা ও পৃষ্টোপোষকতায়, এই ধারা দিনদিন শক্তিশালী হচ্ছে!

বাংলাদেশে রাষ্ট্রের ভিত্তি কি?
বাংলাদেশে রাষ্ট্রের ভিত্তি রাষ্ট্রীয় ৪ মূলনীতিঃ ১. বাঙালী জাতীয়তাবাদ ২. গণতন্ত্র ৩. সমাজতন্ত্র ও ৪. ধর্মনিরপেক্ষতা। এই নীতি বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্মের ভিত্তি। এই নীতিকে ভিত্তি বলার যুক্তি কি? এই প্রশ্নে কি তখন জাতীয়ঐক্য হয়েছিল? হয়েছিল। কিন্তু যার কোনটাই এই ধর্মান্ধ-প্রতিক্রিয়াশীলরা সমর্থন করে না। তৎকালীন রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ, ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টি জনগণের মধ্যে জাতীয় ঐক্যমত প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তার প্রমান ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পূর্ববাংলায় ১৬২ আসনের ১৬০ টি আসন পেয়েছিল। প্রদত্ত ৬৫% ভোটের ৪০% ভোট পেয়েছিল দলটি। স্বাধীন দেশের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ৩০০টির মধ্যে ২৯৩টি আসন পেয়েছিল। প্রদত্ত ভোটের ৭৩% পেয়েছিল। সেখানে ন্যাপ-সিপিবি-জাসদও এই অভিন্ন নীতির পক্ষের ভোট পেয়েছিল ১২%! প্রদত্ত ভোটের ৭৫% উপরে নাগরিকরা এই মতাদর্শকে সমর্থন করে। এই তথ্য প্রমান করে স্বাধীনতার আগে-পরে মুক্তিযুদ্ধের এই মূলনীতি নিয়ে কোন বিরোধ-বিতর্ক ছিল না, এবং জাতীয় ঐক্যমত ছিল।

সংস্কৃতির এই বিতর্ক কি নতুন?
মোটেই না! এই বিতর্ক বাংলাদেশের ভাষা-স্বাধীনতার সংগ্রাম ও ইতিহাসের সাথে যুক্ত! পাকিস্তানের শাসকরা ধর্মের কথা বলে এই ইস্যু-বিষয়ে বাঙালীকে শাসন করতে চেয়েছে, কিন্তু এজাতী মানেনি। একই কথা আগে মৃদু কন্ঠে বলেছে, এখন জোড়ালো কন্ঠে বলছে! বিধায় বিষয়টা বোঝা খুব কঠিন নয়, এরা কারা? কাদের প্রেতাত্মা!

মোল্লাদের এসব বিতর্ক-বিরোধীতার বিএনপি কখনো প্রতিবাদ করেনি। বরং তাদের মৌনতা ও পৃষ্টপোষকতায় মোল্লাদের শক্তি-সামর্থ-ঐদ্ধত্য বৃদ্ধি পেয়েছে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল বাঙালী জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিক ভাবে বিতর্কিত করা এবং দলটিকে ইসলাম প্রতিপক্ষ বানানো! বাঙালী সংস্কৃতির অনেক কিছুকে হিন্দুয়ানী সংস্কৃতির অংশ-ধারা বলে এর চর্চা ও পৃষ্ঠপোষকদের ভারতের দালাল ও তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল প্রমান করে, ভারত বিরোধীতার রাজনীতি করা। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ ধর্ম নিরপেক্ষতার নীতিতে বিশ্বাসী হলেও প্রমান করতে মরিয়া হয় যে, তারাই প্রকৃত ধার্মিক এবং ইসলামের সবচেয়ে বড় হেফাজতকারী। ক্ষমতার প্রশ্নে ধর্মান্ধ মৌলবাদীদের সাথে সখ্যতা গড়ে তোলে এবং তাদের নীতি ও ঐতিহ্য ক্রমান্বয়ে বিচ্যুত হতে থাকে। এই অসুস্থ ও অপরাজনীতির প্রতিযোগীতাকে কৌশলে ব্যবহার করে মৌলবাদ তাদের শক্তি-সামর্থকে বৃদ্ধি করেছে!

মঙ্গলপ্রদীপ তাদের ইস্যু মাত্র এজেন্ডা আরও গভীর
শুরতেই বলেছি, তারা এই দেশ দর্শণই মানে না। তারা কেবল মঙ্গলপ্রদীপ নয়, বাঙালি সংস্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য, মূল্যবোধ, গণতান্ত্রিক রাজনীতি ও ভাবাদর্শেরও বিরোধী! তারা কেবল সুযোগ-সামর্থ-ক্ষমতা ও বাস্তবতার অভাবে সবটা চাইতে পারছে না। তবে তারা আর আবদারের জায়গায় নেই। তাদের পরিকল্পনার ছক্ সরকার-প্রশাসন-প্রতিষ্ঠানের সর্বত্র ঢুকে পরেছে! বুঝতে পারছেন কি? তারপরও যদি অপেক্ষা করেন কোন এক গায়েবী আহ্বানের মূল্য দিতে হবে অনেক বেশী। দেখুন, ধর্মান্ধ ও মৌলবাদীদের প্রকাশ্যে চাওয়া ও আকাঙ্খার সংক্ষিপ্ত তালিকা।

• এরা তো বাংলা ভাষাই মেনে নেয় নি! শুনে অবাক হচ্ছেন? কওমী মাদ্রাসা দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শিক্ষায় কি ভাষায় লেখাপড়া করা হয়? সেখানে সেখানো হয় আরবী, উর্দূ, ফারসি এবং সামান্য বাংলা ও ইংরেজী! আমাদের দেশে বাংলা-ইংরেজী বাদে বাকী ভাষার কি গুরুত্ব? কোথায় তার প্রয়োগ আছে? উর্দূতে পাকিস্তানের পন্ডিতদের জ্ঞান অর্জন! এটা কেবল ধর্মের অন্ধ সমর্থন ও পাকিস্তানের প্রতি অতিভক্তির প্রকাশ ছাড়া আর কি?

• জাতীয় সংঙ্গীত মেনে নেয়নি, সমর্থন করে না! তাদের প্রতিষ্ঠানে কখনো জাতীয় সংঙ্গীত গাওয়া হয় না! এটা একজন হিন্দুকবির রচনা এবং একে অনৈসলমিক সঙ্গীত ও বিষয় মনে করা হয়।

• বর্ষবরণ অনুষ্ঠান, বৈশাখী মেলা, আনন্দ মিছিল, গান-বাজনা-নাচ, বর্ণিল সাজসজ্জা, মঙ্গল শোভাযাত্রা, মঙ্গলপ্রদীপ, (যাকে ওয়াল্ড হেরিটেজের মর্যাদা দেয়া হয়েছে), এগুলোকে ইসলাম বিরোধী ও শিরক মনে করা হয়। ইসলাম ধর্ম অনুযায়ী যে পাপ ক্ষমার অযোগ্য!

• বাংলা গান, কবিতা, নাটক, সাহিত্য, চলচ্চিত্র, চিত্রকলা, শিল্প, ভাষ্কর্য, খেলাধূলাকে সমর্থন করা হয় না! আফগানিস্থানে তালেবানরা ক্ষমতায় এসে এগুলো সব নিষিদ্ধ করেছিল!

• শহীদ মিনার ও একুশ উদযাপন, বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবস, উদযাপনের যে প্রচলিত স্বীকৃত রীতি তারা সেটাকে মূর্তির পুজার সামিল, শিরক মনে করে। যার অংশ হিসেবে দেশে প্রায়ই শহীদমিনার, ভাষ্কর্য, স্মৃতিস্তম্ভকে মূর্তি গণ্য করে ভাঙ্গচুর করা হয়। ইসলামের নামে আফগানিস্তানে ২০০১ সালে, বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ গ্রহের বৃহত্তম বামিয়ানের বুদ্ধমূর্তি ডিনামাইট দিয়ে ধ্বংস করা হয়।

• মুক্তচিন্তা, মুক্তিবুদ্ধির চর্চা বিরোধীতা করে, নাস্তিক বা ভিন্নধর্মের লেখকদের লেখাপড়াকে সমর্থন করে না। যে কারণ নাস্তিক ও ভিন্নধর্মের লেখকদের লেখা পাঠ্যপুস্তক থেকে বাদ দেয় হয়! হুমায়ুন আজাদ, অভিজিৎ, রাজিব, নিলয়, বাবুদের হত্যা করা হয়!

• নারী মুক্তি ও নারী স্বাধীনতা, অভিন্ন শিক্ষার ধারা, সহশিক্ষা ইত্যাদির ঘোরবিরোধী। যে কারণে ২০০৮ সালে প্রণীত নারীনীতি প্রণয়ন করলেও তা অগ্রসর হতে পারেনি। ২০১০ সালে অভিন্ন শিক্ষানীতি প্রণয়ন করা যায়নি!

• রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, শরৎচন্দ্র, তারা শংকর, হুমায়ুন আহমেদ, সত্যজিৎ, লালন, লতা, হেমন্ত, সন্ধ্যা, রুনা, সাবিনা, এদের সৃষ্টি, সঙ্গীত, মেধা-প্রতিভা, কর্মকে স্বীকার করা হয় না।

• এরা আধুনিকতা, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, বিচারব্যবস্থা, উন্নয়ন সংস্থা প্রভৃতির বিরোধী। দলের নামগুলো একটু খেয়াল করুণ, ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন, খেলাফত মজলিস, জামায়াতে ইসলাম, হেফাজতে ইসলাম ইত্যাদি। সেই স্বপ্নের শাসনতন্ত্র ও খেলাফত প্রতিষ্ঠার আগেই সমাজের চেহারা পাল্টাতে শুরু করেছে! এরা ক্ষমতায় আসবে বা ক্ষমতার অংশীদার হবে আর আমাদের বোনেরা সাদাশাড়ী লালপার, লালটিপ, মাথায় বেলীফুল দিয়ে ঘুরবে সেটা কি মোল্লারা মানবে?

উদারগণতন্ত্র ও ধর্মভিত্তিক রাজনীতি
ধর্ম ও রাজনীতি দুটি আলাদা বিষয়। একটি ইহোলৌকিক, অন্যটি পারলৌকিক! একটি বিশ্বাস, অন্যটি যুক্তি ও বিজ্ঞান! এক ব্যবস্থায় জনগণের সার্বভৌমত্ব অন্যটিতে স্রষ্টার সার্বভৌমত্ব স্বীকার করা হয়। এমন ব্যবস্থায় ধর্ম থাকবে রাষ্ট্র থেকে সম্পুন্ন আলাদা। উদারগণতন্ত্রে বিশ্বাসী রাজনৈতিক দলগুলো হয় বিষয়টি বোঝেন না, না হয় মানেন না। সেটা না করার বিপদজনক সমস্যা হচ্ছে ইতিহাস, ঐতিহ্য, রাজনীতি, সংস্কৃতি সবকিছুর মধ্যে ধর্ম ডুকে পরবে, ঢোকানা হবে! এবং তাকে ঘিরে দিনদিন বিভেদ ও বিতর্ক প্রবল হবে।

কওমীমাদ্রাসা ভিত্তিক প্রধান সংগঠন হেফাজত ইসলামের ১৩ দফার কথা মনে আছে? এই দাবীকে কি আপনারা সমর্থন করেন? বাঙালী সংস্কৃতি নিয়ে তাদের বক্তব্য ১৩ দফার একটি দাবী মাত্র! আর তাদের সবগুলো দাবী বিবেচনায় নিলে পুরো রাষ্ট্র কাঠামোই পরিবর্তন করতে হবে! সেটা হলে আদর্শ পাকিস্তান রাষ্ট্রের রুপ নেবে বাংলাদেশ!

এই প্রশ্নের শত্রু-মিত্র নির্ধারণ জটিল হয়ে পরছে। কে গণতন্ত্রী আর কে ইসলামপহ্নী বোঝা মুশকিল! যেমন আওয়ামী ওলামা লীগ, এরা হেফাজতের চেয়ে একধাপ উপরে! আর আওয়ামী লীগ মনে করে তারা নিজেরাই সমাজতন্ত্রী, তাই বামদলের আর দরকার কি? দলটির নেত্রী তো ঘোষণাই দিয়েছেন মদিনাসনদের আলোকে বাংলাদেশ চলবে! আর উদারগণতন্ত্রে বাংলাদেশ বিশ্বের রোল মডেল একথা সবসময় শুনতে হয়! আর বিএনপি আত্মপরিচয়, অস্তিত্ব সংকট ও রাজনৈতিক অপুষ্টিতে ভূগছে! বামপহ্নীরা তাদের আশু জরুরী কর্তব্য নির্ধারণে বিভক্ত। রাজনীতির এই বহুমাত্রিক সমীকরণে সাদা-কালো সূত্রে শত্রু-মিত্র নির্ধারণ করা হয়েছে জটিল! তবে এমন পরিস্থিতিতে বলা যায় চিহ্নিত শত্রুর চেয়ে অচিহ্নিত মিত্র, অনেক বেশী ভয়ঙ্কর!

অদ্ভুদ আঁধার এক এসেছে..
জ্ঞান-বিজ্ঞানের যে কোন অতিগুরুত্বপূর্ণ ধারা-প্রবণতার উপর সাধারণত সে সব ব্যক্তিরাই বিশেষজ্ঞ মতামত প্রদান করেন, যাদের সে বিষয়ের উপর বিশেষজ্ঞ জ্ঞান আছে! কিন্তু আমাদের দেশে তার ব্যতিক্রম! যাদের নিজেদের শিক্ষারই কোন স্বীকৃতি নেই। কেবল নিজেদের শিক্ষার সনদের স্বীকৃতির জন্য সরকারের কাছে আবেদন করেছে, ধর্ণা দিয়েছে! তারাই কি’না আবার দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংস্কৃতি নিয়ে বিশেষজ্ঞ জ্ঞান প্রদান করছেন! যাদের বিদ্যার কোন গ্রহনযোগ্যতা নেই, স্বীকৃত নেই। তারাই বুক ফুলিয়ে, গলা উচিয়ে ভারত উপমহাদেশে হাজারের বাঙালী সংস্কৃতির কোনটি দেশী, কোনটা বিদেশী, সে বিষয়ে নিশ্চিত বিশেষজ্ঞ জ্ঞান প্রদান করছেন! জীবনানন্দের ভাষায়, অদ্ভুদ আঁধার এক এসেছে পৃথিবীতে আজ, যারা অন্ধ সবচেয়ে বেশী আজ চোখে দেখে তারা।
বাঙালী সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য নিয়ে কোন বৈজ্ঞানিক ও যৌক্তিক বিতর্ক স্বীকৃত পন্ডিতদের কাছ থেকে এলে বিষয়টি গুরুত্ব পেতো। কিন্তু যাদের কাছে থেকে এই বিতর্ক এলো তারা আরব সংস্কৃতিকে বাঙালীর সংস্কৃতি মনে করে! আরবদের পোষাক, ভাষা, রীতিনীতি, শিক্ষা, অভ্যাস কিভাবে আরেকটি জাতীর সংস্কৃতি হয়? পাশ্চাত্য থেকে কোন কিছু এলে তা হয়ে যায় বিজাতীয় সংস্কৃতি কিন্তু আরব থেকে হলে তা হয়ে যায় আমাদের সংস্কৃতি না’কি?

সব মুসলমানই বাঙালী কিন্তু সব বাঙালী মুসলমান নয়!
যে কোন গোড়া মুসলমানই মনে করে যে, সে আপদমস্তক বাঙালি এবং তার বাঙালিত্ব নিয়ে কোন সমস্যা নেই! সে যা করছে, যেভাবে করছে, যেভাবে করবে, সেটাই বিশুদ্ধ বাঙালিত্ব! মঙ্গলপ্রদীপ, বর্ষবরণ, শোভাযাত্রা, মেলা-গান-বাজনা, ছেলেমেয়ের হৈচৈ, আড্ডা-আনন্দ তাদের কাছে বিজাতীয় ও হিন্দুয়ানী সংস্কৃতি! তাদের ভাষায়-বিবেচনায় যে সব বাঙালি মুসলমান বিজাতীয় ও হিন্দুয়ানী সংস্কৃতির চর্চা করে তারা আসলে মুসলমান নয়, হিন্দুধর্মের অনুসারী অথবা বিধর্মী! এই আলোচনা-বিতর্ক এখন কেন্দ্রে ও মূলধারায় জায়গা করেছে! বাঙালির আত্মপরিচয়ের সংকট কেবল ব্যক্তিজীবনে নয়, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনেও তা প্রকট ও ভয়াবহ! যে কারণে তারা জাতী ও ধর্ম পরিচয় নিয়েও বিবাদ ও বিতর্ক করে! সে আগে বাঙালি, না আগে মুসলমান এই প্রশ্নে বিভ্রান্ত! জাপান, জার্মান, কিউবানদের এমন আহম্মক বিতর্ক কেউ শুনেছেন কখনো?

একটি রাষ্ট্রের বৃহৎ জনগোষ্ঠী, ‘দেশ, জাতী, ভাষা, সংস্কৃতি, রাজনীতি’ এই ৫টি মৌলিক প্রশ্নের ভাবনা ও বিশ্বাস সাংবিধানিক ধারার বিপরীতি ও সাংঘর্ষিক, সেখানে জাতীয় সংহতি ও উন্নতি আশা করি কিভাবে? সামান্য আয়, প্রবৃদ্ধি, অবকাঠামোর উন্নয়নে এক কর্তৃত্বপরায়ন সরকার খুব আহ্লাদিত হচ্ছে, কিন্তু দেখতে পাচ্ছে না, সমাজের অন্তর্গত কাঠামোর দূর্বলতা ও দূরাবস্থা! যুদ্ধাবস্থার পূর্বের ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়া, ইয়েমেনের উন্নয়নের কাছেও আমরা যাইনি, কিন্তু তাদের বর্তমান অবস্থা কতটা করুণা ও হতাশার, দেখতে পাচ্ছেন? জাতী গঠন ও উন্নয়নের যে শিক্ষা ও সংস্কৃতি দরকার সেটা দেয়া না গেলে পরিণতি হবে তাদের চেয়েও ভযাবহ!
———————————————————-
ড. মঞ্জুরে খোদা, প্রাবন্ধিক-গবেষক, ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়, কানাডা

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

39 − = 31