হেফাজত আপনাদের উপর আস্থা রাখলে আমরা কাদের উপর আস্থা রাখবো

হেফাজত ইসলামের সমালোচনা করে এসেছি এতদিন, কেন তারা সামান্য একটা মুর্তি সরাতে চায়। তাদের দাবি যে অযৌক্তিক সেটা সুস্থ মস্তিস্কের যে কেউ বুঝবে। আমাদের এই সমালোচনার পিছনে একটা বিশ্বাস ছিল এদের দাবি পুরণ হবে না। কারণ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিশ্চয়ই এমন অসুস্থ দাবি মেনে নিবে না। বিশ্বাসের উপর এক বালতি পানি ঢেলে দিলেন তিনি নিজেই। গত ১১ এপ্রিল তাঁর বক্তব্য শুনে যারপরনাই বিষ্মিত হলাম।

“আমি নিজেও এটা পছন্দ করিনি। বলা হচ্ছে এটা নাকি গ্রিক মূর্তি… এখানে গ্রিক মূর্তি কেমন করে আসবে? গ্রিকদের পোশাক ছিল একরকম। এখানে আবার দেখি শাড়ি পরিয়ে দিয়েছে। এটাও হাস্যকর হয়েছে। প্রধান বিচারপতির সঙ্গে খুব শিগগিরই বসব। আপনারা ধৈর্য ধরেন। ভরসা আপনারা রাখেন। এটায় যা যা করা দরকার আমরা তা তা করব”।- মাননীয় প্রধানমন্ত্রী

আপনাকে ভোট দিয়েছিলাম, এই তরুণ সমাজ আপনার পক্ষে ছিল। এই বিশ্বাস ছিল যে আপনি দেশকে প্রগতিশীলতার দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন। বিএনপি জামায়াতের সাথে তরুণ সমাজ ছিল না তাদের পশ্চাদমুখীতা আর দেশদ্রোহীতার জন্য। আপনি তাদের মত অন্ধ বিশ্বাসী নন বলেই আস্থা ছিল। সর্বোপরি বঙ্গবন্ধুর দলের প্রতি চাওয়া ছিল অনেক।

আপনি নিজেও এই ভাস্কর্য নাকি পছন্দ করেন নি । এটি কি অশ্লীল কিছু? একটি গ্রিক দেশীয় ন্যায়ের ভাস্কর্য। ন্যায়ের প্রতীক হিসেবে এটি অনেক দেশেই ব্যবহার করা হয়। এটি কোনো উলঙ্গ কিছু না যে এটি দেখতে খারাপ লাগতে পারে কারো। কেন আপনার পছন্দ না সেটির কোনো ব্যাখ্যা দেন নি। যাক, আপনি প্রধানমন্ত্রী, ব্যাখ্যা দিতে বাধ্য নন।

শাড়ি পরিয়েছে তাতেও আপনার আপত্তি। আমাদের দেশের সংস্কৃতির সাথে মানানসই হওয়ার জন্যই শাড়ি পরিয়েছে। এটি আপনার কাছে হাস্যকর। যদি শাড়ি না পরিয়ে অন্য কিছু পরাতো হাস্যকর লাগত না? আর গ্রিক মুর্তি এখানে কেন, কারণ এটা কোন নির্দিষ্ট দেশের এক্তিয়ার ভুক্ত ভাস্কর্য নয় যে অন্য দেশ ব্যবহার করতে পারবে না। সারাবিশ্বে এটি ন্যায়বিচারের প্রতীক হিসেবে ধরা হয়। যেটা ব্যবহার করার একটাই উদ্দেশ্য, ন্যায়বিচারের একটি প্রতীক দেশের সর্বোচ্চ আদালত প্রাঙ্গণে থাকা।

হেফাজত ইসলামের ভাষ্য ছিল বাংলাদেশ মুসলিম দেশ, মুসলিম দেশে গ্রিক নারী মুর্তি কেন থাকবে ? এটি নাকি আমাদের দেশের সংস্কৃতির সাথে যায় না। একটা ন্যায়বিচারের ভাস্কর্যের সাথে আমাদের দেশের সংস্কৃতি মানানসই হয় না কীভাবে? আমাদের সংস্কৃতিতে কি ন্যায়বিচার নেই? কীসের সাথে তবে মানানসই হয়? একজন আমাকে জ্ঞান দিয়ে গেল যে ঈদ্গাহ থেকে এটি দেখা যায়, নামাজ পড়ার সময় এদিকে চোখ যায় যাতে মনোযোগের ব্যাঘাত ঘটে তাই এটি সরানো প্রয়োজন।

আপনিও কি তবে তাদের এমন বন্তব্যের সাথে একমত? সামান্য একটি নারী মুর্তি দেখেই যাদের অনুভূতি এত নড়বড়ে হয়ে যায় এমনকি নামাজেও ব্যাঘাত ঘটায় তাদের প্রতি আপনি সমর্থন জানাচ্ছেন? অটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম সুন্দর বক্তব্য দিয়েছিলেন যে, একবার হেফাজত ইসলামের এই দাবি মেনে নিলে দেশের অন্য ভাস্কর্য নিয়েও এরা প্রশ্ন তুলবে। ঠিক এমন বক্তব্য আমরা আপনার কাছে আশা করেছিলাম মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। হতাশ নিরাশ দুটোই হলাম।

এরা সেই হেফাজত ইসলাম যারা কোরান পুড়িয়েছিল, যারা শাহবাগের আন্দোলনের বিরোধিতা করেছিল, নারী নীতি বাতিল চেয়েছিল। এরা তারা যারা নারীকে তেতুলের সাথে তুলনা করেছিল। তাদের চিন্তাধারা কোন পর্যায়ে সেটা কি আপনাকে বুঝিয়ে দিতে হবে? এরা অন্ধ উগ্র নারী বিদ্বেষী চরম পুরুষতান্ত্রিক । এদের একটাই উদ্দেশ্য দেশটাকে পাকিস্তান আফগানিস্তান বানানো। এখানে ইসলামি আইন চালু করবে, নারীদের ঘরবন্দী করবে, ছেলেরা মাদ্রাসায় পড়বে একেকটা জঙ্গি হবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, এই কি ছিল বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন? এর জন্যই কি স্বাধীনতা যুদ্ধ হয়েছিল?

দেশে কী পরিমান জঙ্গী তৎপরতা হচ্ছে সে নিশ্চয়ই আপনার অজানা নয়। আতিয়া মহল সিলেট মৌলভীবাজারে ঘটনা বেশ কিছু পুরোনো নয়, যে ভুলে যাবেন। এর কিছু দিন পরেই আপনি মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার সর্বোচ্চ ডিগ্রিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্সের সম পর্যায়ের বলে ঘোষনা দিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ব্যবস্থা আর মাদ্রাসার শিক্ষাব্যবস্থাকে একই কাতারে ফেলে কোনটাকে অপমান করলেন আর কোনটাকে মাথায় তুললেন?

এসবের সাথে আমরা অভ্যস্থ নই। কারণ এসব কর্মকাণ্ড আর সিদ্ধান্ত আমরা এই দলের কাছে আশা করি না। আপনার কাছে তো অবশ্যই না। বিএনপি জামায়াত দল এসব কাজ করবে বলেই আমরা নিশ্চিত ছিলাম, বা তাদের দ্বারা এসব সম্ভব বলে তাদের বর্জন করেছিলাম। আজ খুব বেশিই অবাক এবং আহত হচ্ছি কারণ সন্দেহ জাগছে আসলে কারা দেশ চালাচ্ছে? আওয়ামীলীগ নাকি বিএনপি? দু দলের নীতি আর আদর্শে এত মিল কীভবে হয়ে গেলো?

যদি এই হয়ে থাকে আপনাদের ভোট নীতি , যদি এমন করলে মনে করে থাকেন এই শ্রেণী আপনাদের ভোট দিবে তবে বিএনপি আজ ক্ষমতায় থাকত। এদের দাবী একে একে মেনে নিচ্ছেন; প্রথমে পাঠ্য পুস্তকে পরিবর্তন এখন ভাস্কর্য সরানো। ধরুন এরপর এরা “মুসলিম দেশে” নারী নেতৃত্ব হারাম বলে দাবী তুলল, তখন কী করবেন ? সেখানেও কি বলবেন এটা আমারও পছন্দ না?

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “হেফাজত আপনাদের উপর আস্থা রাখলে আমরা কাদের উপর আস্থা রাখবো

  1. এটা ভোট নীতি নয় , কেননা
    এটা ভোট নীতি নয় , কেননা আওয়ামী লীগ জানে এতে তাদের ভোট বাড়বে না , কিন্তু তারাও তো মুসলিম , তাঁদের ও তো ইচ্ছা করে আল্লার নির্দেশ মানতে । একজন মুসলিম হিসাবে কীভাবে তাঁরা মূর্তি সমর্থন করবে ?

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

16 + = 21