মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি ৩০লক্ষ শহীদের রাষ্ট্রকে অপমান করেছেন

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, পৃথিবীর প্রায় সকল সভ্যরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ-বিচারালয়ের সামনে “ন্যায়-বিচারের প্রতীক” হিসাবে স্থাপন করা হয়েছে—‘লেডি অব জাস্টিস’-এর ভাস্কর্য। এটিকে কেউ গ্রীকদেবীর মূর্তি হিসাবে রাখেনি। আর মনে রাখবেন: এটি কোনো মূর্তি নয় ভাস্কর্য। আর আমাদের দেশের সর্বোচ্চ-বিচারালয়—সুপ্রীমকোর্ট-চত্বর থেকে সেই ভাস্কর্য সরাতে চাইছেন “হেফাজতে শয়তানে”র কথায়—আর তাদের শয়তানীদাবির প্রেক্ষিতে! আর এই অন্যায়কর্মটি সম্পাদনের জন্য আপনি দেশের ‘প্রধান বিচারপতি’র উপর চাপসৃষ্টি করতে চাইছেন! কিন্তু কেন? কার স্বার্থে? হেফাজতে শয়তানদের স্বার্থে? এই ‘হেফাজতে শয়তানরা’ এই দেশের কে?

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি ৩০লক্ষ শহীদের রাষ্ট্রকে অপমান করেছেন
সাইয়িদ রফিকুল হক

বঙ্গবন্ধু কোনোদিন সামান্য ভোটের জন্য কারও সঙ্গে আপস করেননি—কিংবা কারও কাছে ধর্না দেননি। তিনি ছিলেন বাঙালির চিরচেনা নেতা। আর তাই, শেষ পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশরাষ্ট্রকে অসাম্প্রদায়িক আর ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। তিনি বাংলাদেশকে ধর্মনিরপেক্ষ-রাষ্ট্র হিসাবে গড়ে এর প্রতি চিরবিশ্বাসী ছিলেন। তবুও তিনি দুষ্কৃতিকারীদের হাতে সপরিবারে নিহত হয়েছেন। তিনি ছিলেন আমৃত্যু ধর্মনিরপেক্ষতাবাদে বিশ্বাসী। আর তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ অসাম্প্রদায়িক। অথচ, তাঁর হাতেগড়া রাজনৈতিক দল “আওয়ামীলীগ” এখন ধীরে-ধীরে একটি সাম্প্রদায়িক ও ধর্মান্ধ দলে পরিণত হতে চলেছে। ক্ষমতার মোহে আওয়ামীলীগের নেতারা এখন আগাছা-পরগাছা বাছবিচার করছে না। স্বার্থনেশায় তারা এখন যাকে সামনে পাচ্ছে তাকেই আঁকড়ে ধরছে। এখন আওয়ামীলীগের শীর্ষস্থানীয় (মন্ত্রী-এমপি-পর্যায়ের) প্রায় সকল নেতা ধর্মান্ধ ও সাম্প্রদায়িক! আর এটি এখন পরীক্ষিত-সত্য।

সম্প্রতি বাংলাদেশরাষ্ট্রবিরোধী ও সাম্প্রদায়িক তেঁতুল-হুজুর-খ্যাত (হেফাজতে শয়তানের আমির) ভণ্ড-শফির সঙ্গে বৈঠক করেছেন আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী! তিনি এদের যে-ভাবে ‘রাষ্ট্রীয় না সরকারি’ সমাদর করেছেন, তাতে মনে হয়েছে—এরাই বুঝি রাষ্ট্রের সবচেয়ে গণ্যমান্য ব্যক্তি! অথচ, এই শয়তানগুলোই ২০১৩ সালের ৬ই এপ্রিল ও ৫ই মে (শাপলা-চত্বরে) বাংলাদেশরাষ্ট্রকে ধ্বংস করার জন্য বিরাট প্রস্তুতিগ্রহণ করেছিলো। সামান্য ভোটের লোভে সব ভুলে গেলেন আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী! তিনি ১১ই এপ্রিল ২০১৭ খ্রিস্টাব্দে দেশবিরোধী এই ভণ্ডদের সঙ্গে বিশেষ খোশগল্পে মেতে উঠলেন। আর আপসকামিতার এক ভয়াবহ নজিরস্থাপন করলেন। তিনি দেশের আত্মস্বীকৃত ও নামসর্বস্ব কওমীমাদ্রাসাবোর্ডের আলতুফালতু, আজেবাজে ও মনগড়া কামিল-পাসের সার্টিফিকেটকে একঠেলায় মাস্টার-ডিগ্রীর স্বীকৃতি দিয়ে সমমান করে দিলেন!

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
আপনার অনেক ক্ষমতা! আর ক্ষমতা আছে বলেই কি এর অপব্যবহার করতে হবে? এই কাজগুলোতো এই দেশে একসময় জিয়া-এরশাদ-খালেদারা করেছে। আর আপনি এইসব কীভাবে করলেন? আপনি না আমাদের জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর কন্যা?

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনার জ্ঞাতার্থে বলছি: কওমীমাদ্রাসার পাতিহুজুররা আমাদের মাতৃভাষা-বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান, ভূগোল, ইতিহাস, সামাজিক বিজ্ঞান ইত্যাদি কিছুই পড়েনি। হয়তো বলবেন, এরা এখন পড়বে! কিংবা এরা বাংলা-ইংরেজি পড়ছে! আসলে, এই পাতিহুজুররা এখন কওমীমাদ্রাসাগুলোতে নামকাওয়াস্তে বা যৎসামান্য ‘বাংলা-ইংরেজি’ পড়ছে! তাও এরা নিজেরা অপটু হাতে “বাংলা-ইংরেজি-বিষয়ে” খুব ফালতু দুটি বই তৈরি করে নিয়েছে। আর এদের রচিত বাংলা-বইয়ে ঠাঁই পায়নি আমাদের মাইকেল মধুসূদন দত্ত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়সহ বাংলা সাহিত্যের কালজয়ী কবি-সাহিত্যিক-লেখকগণ। আর এইসব কওমীমাদ্রাসার পাতিহুজুরদের দরবারে ঠাঁই পেয়েছে—পাকিস্তানের গোলাম-কবি ফররুখ আহমেদ, রাজাকার-কবি আল মাহমুদ, বাংলাভাষাবিরোধী-শয়তান ও কবি সৈয়দ আলী আহসান ইত্যাদি! এরা আমাদের ‘জাতীয় পতাকা’ মানে না, ‘জাতীয় সঙ্গীত’ মানে না, দেশের ভাষাশহীদ-দিবস (২১-এ ফেব্রুআরি), স্বাধীনতাদিবস, বিজয়দিবস ইত্যাদি মানে না ও পালন করে না! এদের মাদ্রাসাগুলোতে আজও জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া হয় না। আর আপনি তাদের হাতে একঠেলায় তুলে দিলেন ‘মাস্টার-ডিগ্রী’র সমমানের সার্টিফিকেট!
এই কওমীমাদ্রাসার পাতিহুজুররা আমাদের “জাতীয় চার-মূলনীতি” মানে না! আর তারা তাদের পাইকারি ওয়াজমাহফিলে ও বিভিন্ন প্রচার-প্রচারণায় সবসময় আমাদের ‘জাতীয় চার-মূলনীতি’র প্রধান দুটি স্তম্ভ—সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ নিয়ে নানারকম কুরুচিপূর্ণ ও অশ্লীল কথাবার্তা বলে থাকে। আর আপনি তাদের আমাদের সমমান করে দিলেন? আর এই জন্যেই কি ১৯৭১ সালে স্বাধীন-বাংলাদেশরাষ্ট্র-নির্মাণে ৩০লক্ষ মানুষ জীবন দিয়েছে?

আমরা দেখলাম, অনুষ্ঠানে আপনি বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয়-ভণ্ড শাহ আহমেদ শফীকে “আল্লামা” বলে সম্বোধন করেছেন! আপনি নিশ্চয়ই জানেন “আল্লামা” মানে কী? এরা কখনওই “আল্লামা”, “আলেম”, “মুফতী” কিংবা “জ্ঞানী” হওয়ার যোগ্য নয়। এদের “পাতিহুজুর” বলাই সমীচীন। এরা স্রেফ ভণ্ড আর ভণ্ড। তাও আবার একেবারে আপাদমস্তক-ভণ্ড। আর এই ভণ্ডদেরই আপনি রাজদরবারে ঠাঁই দিয়েছেন!

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, পৃথিবীর প্রায় সকল সভ্যরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ-বিচারালয়ের সামনে “ন্যায়-বিচারের প্রতীক” হিসাবে স্থাপন করা হয়েছে—‘লেডি অব জাস্টিস’-এর ভাস্কর্য। এটিকে কেউ গ্রীকদেবীর মূর্তি হিসাবে রাখেনি। আর মনে রাখবেন: এটি কোনো মূর্তি নয় ভাস্কর্য। আর আমাদের দেশের সর্বোচ্চ-বিচারালয়—সুপ্রীমকোর্ট-চত্বর থেকে সেই ভাস্কর্য সরাতে চাইছেন “হেফাজতে শয়তানে”র কথায়—আর তাদের শয়তানীদাবির প্রেক্ষিতে! আর এই অন্যায়কর্মটি সম্পাদনের জন্য আপনি দেশের ‘প্রধান বিচারপতি’র উপর চাপসৃষ্টি করতে চাইছেন! কিন্তু কেন? কার স্বার্থে? হেফাজতে শয়তানদের স্বার্থে? এই ‘হেফাজতে শয়তানরা’ এই দেশের কে?

আপনি মনে রাখবেন: এই হেফাজতিপশুরা আজ আপনাকে ‘লেডি অব জাস্টিস’-এর ভাস্কর্য-অপসারণ করতে বলেছে। আপনি তা-ই করতে চলেছেন। কিন্তু এই ‘হেফাজতে শয়তানে’র আমির শফী যদি আপনাকে মূর্তিপূজার অপরাধে সারাদেশ থেকে ‘বঙ্গবন্ধু’র সমস্ত ভাস্কর্য-অপসারণ করতে বলে—তখন আপনি কী করবেন? আশা করি ভেবেচিন্তে এর উত্তর দিবেন।

আজ বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকলে আপনার কার্যকলাপে তিনি ভীষণভাবে লজ্জিত হতেন। আর হয়তো আপনার ভুলগুলোর জন্য তিনি দেশত্যাগ করে হিজরত করতেন।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
আপনি একাত্তরের পাকিপ্রেমীদের হাতে সরাসরি ‘মাস্টার-ডিগ্রী’র সার্টিফিকেট তুলে দিয়ে, এবং এই পশুদের কথায় হার মেনে দেশের সর্বোচ্চ-আদালতের সামনে থেকে সারাবিশ্বের ‘ন্যায়বিচারের প্রতীক’ ‘লেডি অব জাস্টিস’-এর ভাস্কর্য-অপসারণের কথা বলে ৩০লক্ষ শহীদের রক্তরঞ্জিত-রাষ্ট্রকে চরমভাবে অপমান করেছেন। আর এতে আমরা মুক্তিযুদ্ধের সকলস্তরের সপক্ষশক্তি অত্যন্ত ব্যথিত, লজ্জিত, ক্ষুব্ধ ও অপমানিত।

সাইয়িদ রফিকুল হক
মিরপুর, ঢাকা, বাংলাদেশ।
১২/০৪/২০১৭

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

18 + = 24