আজ ১৩ এপ্রিল ইতিহাসের সেই কলঙ্কিত জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকান্ড দিবস।

অপেক্ষা – একটি রাত্রিশেষের অপেক্ষা – একটি সূর্যোদয়ের আকাঙ্ক্ষা – চিরন্তন নতুনত্বের সময় যখন – একটি নববর্ষের। মাত্র একদিন বাদেই বাঙ্গালীর প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ বাংলা নববর্ষ। ৯৮ বছর পূর্বে এমনই একদিনে ভারতর্ষের পাঞ্জাব প্রদেশের অমৃতসরের জালিয়ানওয়ালাবাগের বৈশাখী মেলায়(পাঞ্জাবে বছরে একটি মাত্র উৎসব) একত্রিত হয়েছিল কৃষক-শ্রমিক, মজুর, যুবক-ছাত্র মা-বোন-বাচ্চা সহ কয়েক হাজার মানুষ ( সংখ্যাটি সম্ভবত ২৫ হাজার)। তারা এসেছিল আমাদের মতো উল্লাস আনন্দে আহ্লাদিত হতে নয় একত্রিত হয়েছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সূর্যকে অস্তমিত করতে তাদের মৌলিক অধিকারসহ নূন্যতম বেঁচে থাকার অধিকার আদায়ে।

“এখন আমাদের জেগে ওঠার সময় এখন আমাদের সময় পথে নামার এখন সময় নতুন সূর্যের.. এখন সময় পূর্বপানে চাওয়ার” হয়ত এমনি প্রত্যয় ছিল তাদের।

১৩ এপ্রিল ১৯১৯ সনের এ দিনে জালিয়ানওয়ালাবাগে ব্রিটিশ জেনারেল এডোয়ার্ড হ্যারি ডায়ারের নেতৃত্বে সেনাবাহিনী কর্তৃক চালানো হয়েছিল এক পৈশাচিক হামলা নিহত হয়েছিল প্রায় ২৫০০ জনতা।

ব্রিটিশদের অন্যায়, অত্যাচার অবিচারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে প্রাণ দিয়েছিলেন অসংখ্য মানুষ। তন্মধ্যে জালিয়ান ওয়ালাবাগের এই হত্যাকান্ড ইতিহাসের সবচেয়ে ঘৃণ্য অধ্যায়। জালিয়ানওয়ালাবাগের বিদ্রোহের ইতিহাস একদিনের নয় বহু পুরোনো বাণিজ্য করতে এসে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রাজ্য ক্ষমতা লাভের পর থেকেই। জালিয়ানওয়ালাবাগের বিদ্রোহের এই বিস্তৃত ইতিহাস মোটামুটি ১৯০১ থেকে আলোচনা করলে কিছুটা তুলে ধরা যাবে।

ভারতবর্ষের মানুষের সাথে ইংরেজদের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক বিভিন্ন অন্যায় অবিচারে বিরুদ্ধে (১৯০১-১৯০৫) গড়ে উঠে অনুশীলন, যুগান্তর ও আত্মশক্তিসহ বহু গুপ্ত সংগঠন। সমগ্র ভারতবর্ষের রাজনীতি ছিল বাংলা কেন্দ্রিক অর্থ্যাৎ বাংলা থেকে রাজনৈতিক যে দিক নির্দেশনা দেয়া হত ছড়িয়ে পরতো তা সমগ্র ভারত বর্ষে। লর্ড কার্জন বাংলার রাজনীতির এই বিষয়গুলো অনুধাপন করে বাংলার রাজনীতিকে দুর্বল করার লক্ষে ১৯০৫ সালে বাংলাকে দ্বিখন্ডিত (বঙ্গভঙ্গ) করে ফেলে। ভারতীয়দের অভাব অনটন অভিযোগের কথা ইংরেজ সরকারের কাছে তুলে ধরার লক্ষে ১৮৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত ভারতীয় কংগ্রেস ও বঙ্গভঙ্গের এই সিদ্ধান্ত মানতে পারেনি।

১৯০৭ সালে কংগ্রেস নেতাদের মধ্যে মতোভেদ দেখা দিলে নরমপন্থি ও চরমপন্থি নামে দুভাগে ভাগ হয়ে যায়। চরমপন্থির নেতৃত্ব দেন লালা লাজপত রায়(পাঞ্জাবের নেতা) ।

কলকাতার ম্যাজিস্ট্রেট কিংসফোর্ড নির্বিচারে সামান্য কারণে একের পর এক যুবকদের গ্রেফতার করতে থাকে। কিংসফোর্ডের এই অত্যাচার চিরতরে বন্ধ করার জন্য বিপ্লবী ক্ষুদিরাম ও তাঁর বন্ধু প্রফুল্ল চাকী প্রকাশ্যে কিংসফোর্ডের গাড়িতে হামলা করে। গাড়ি চিনতে ভুল হওয়ায় দুই শ্বেতাঙ্গ মারা যায়। প্রফুল্ল চাকী পুলিশের গ্রেফ্তার ঠেকাতে নিজের মাথায় গুলি করে আত্মহুতি দেন এবং ক্ষুদিরামকে গ্রেফতার করে (১১ আগস্ট ১৯০৮) ফাঁসি দেওয়া হয়। ক্ষুদিরামের ফাঁসির খবর ছড়িয়ে পরলে ১৯০৯ সালে বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন আরো ব্যপকতা লাভ করে।

ভারতের মানুষের দূঃখ দুর্দশা ও কিছু সুযোগ সুবিধার কথা ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরতে (১৯১৪ সালের ২৪ শে জুন) পাঞ্জাবী নেতা সিংহ লালা লাজপত রায়ের নেতত্বে কয়েকজন ভারতীয় নেতা ব্রিটেনের উদ্দশ্যে রওনা দেন। ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী লয়েড জর্জ তাদের কথা শুনে কোন কর্ণপাত করে না এক পর্যায়ে গলা ধাক্কা খাওয়ার মতোই ফিরে আসলেন ভারতীয় প্রতিনিধি দল। লালা লাজপত ভাবলেন সাত সাগর পারি দিয়ে এসে খালি হাতে ফিরে যাওয়া ঠিক হবে না তাই তারা লন্ডনে বসবাসরত ভারতীয়দের কাছে তাদের দুর্দশার কথা তুলে ধরবেন ভেবে লন্ডনে সপ্তাহখানেক থেকে যান। লন্ডনে বসবাসরত ভারতীয়দের কাছে তারা ব্যাপক সারাও পেলেন।
পণ্য বিক্রির বাজার নিয়ে বৃহৎ শক্তির দুই দেশ ব্রিটেন ও জার্মানির বাধলো বিবাদ বিবাদ থেকে বিশ্বযুদ্ধ।

বিশ্বযুদ্ধের শুরুতেই জার্মানির কাছে বেশ শক্ত হাতেই মার খেতে লাগলো ব্রিটিশ সৈন্য। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রধান কলোনি ভারত। যুদ্ধের এই ডামাডোলে ভারতবর্ষের সাধারণ মানুষেরা যদি বিগড়ে যায় তাহলে তাদের নিরস্ত্র করা কঠিন হয়ে পরবে ব্রিটিশ হারাবে তার বৃহত্তম সাম্রাজ্য। প্রধানমন্ত্রী এই ভেবে ভারতীয় প্রতিনীধি দলকে ফের ডেকে এবার সযত্নে আপ্যায়ন করে নাগরিক সুবিধা, সেনাবাহিনীতে চাকুরিসহ বিভিন্ন প্রস্তাব দেওয়া হলো প্রথমে লালা লাজপত প্রস্তাব গ্রহণ না করলেও প্রতিনিধিদলের অন্যদের কথায় ভারতীয়দের দূঃখ দুর্দশার কথা বিবেচনা করে প্রস্তাবে রাজি হলেন দেশে ফিরে আসলেন। এবার তাদের কথায় হাজার হাজার ভারতীয় যুবকদের চাকুরীতে যোগ দিল ব্রিটিশদের পক্ষ হয়ে বিশ্বযুদ্ধে অংশ নেবার জন্য। বিশ্বযুদ্ধের ফলে সেনাবাহিনীতে ব্রিটিশদের পর্যাপ্ত অফিসার না পাওয়ায় কিছু ভারতীয়দেরকে অফিসার পদে নেওয়া হলো।

বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলো ব্রিটিশরা ঠিকই বিজয় অর্জন করলো কিন্তু নেমে এলো ভারতবাসীদের উপর সেই পুরোনো বর্বরত। যে সব ভারতীয়দেরকে সেনাবাহিনীতে চাকরি দেওয়া হয়েছিল তাদের সবাইকে করা হলো চাকুরিচ্যুত। এমনকি যুদ্ধে আহত সৈন্যদেরকেও সরকারি চিকিৎসা সুযোগ্ থেকে বঞ্চিত করা হলো। বন্ধ করা হলো সকল হাসপাতাল যুদ্ধের আর্থিক ক্ষতি পূরণের জন্য বাড়িয়ে দেওয়া হলো সরকারী রাজস্ব কর।

ফলে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় মানুষের কষ্টও বাড়তে লাগলো। উত্তর ভারতে দেখা দিলো ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ। হাজার হাজার মানুষ খাবারের সন্ধানে শহরে এসে ভিড় জমাতে লাগলো। পেটে অন্ন নেই, পরনে কাপড় নেই। মা বোনের আব্রু রক্ষার জন্য হন্যে হয়ে পুরুষেরা ছুটতে লাগলো এক দুয়ার থেকে অন্য দুয়ার। বিক্ষুব্ধ জনতা বড়লাটের বাসভবনে হামলা করলো, আক্রমন করলো থানায় পুড়য়ে দিল কাছাড়ি।

অবস্থা বেগতিক দেখে বড়লাট ভারত রক্ষা আইন জাড়ি করলেন। এ আইনে গ্রেফতার করা হলো শত শত যুবক কে।ভারতীয় কংগ্রেসের নেতা তখন গোখলে তার সাথে যোগ হলেন সত্যাগ্রহী আন্দোলনের নেতা ব্যারিস্টার গান্ধী। গোখলে ও গান্ধী দেখা করলেন লর্ড উইলিংকটনের সাথে তুলে ধরলেন তাদের অভিযোগ। কার কথা কে শুনে। অবস্থা আরো বেগতিক দেখে জাড়ি করা হলো রাওয়ালাট আইন। রাওয়ালাট আইন ব্রিটেনের এক কুখ্যাত আইন যার উদ্দেশ্য হলো রাজদ্রোহমূলক অপরাধী বলে সরকার যাকে চিহ্নিত করবে তার কোন বিচার নেই সাক্ষী ডাকারও অবকাশ নেই। এই আইনের বিরুদ্ধে ৩০ মার্চ পালন করা হলো হরতাল। গান্ধীর সত্যাগ্রহী নীতির মাধ্যমেই পালিত হলো হরতাল হিন্দুদের উপবাস ও মুসলমানদের নফল রোজার মাধ্যমে।

৬ এপ্রিল ১৯১৯ সাল
গান্ধীজীর আহ্বানে আবার হরতাল ডাকা হলো। গান্ধীরর হরতালের এই আহ্বান ছড়িয় পড়লো ভারতের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে দিল্লে থেকে বোম্বে আহমেদাবাদ পাঞ্জাব পর্যন্ত।

ইংরেজ শাসকদের অত্যাচারে পাঞ্জাবের অবস্থা তখন আগ্নেয়গিরিতে পরিণত হয়েছে। শিক্ষিত মধ্যবিত্ত, ধনী গরিব, কৃষক জমিদার কেউ রেহাই পাইনি ইংরেজদের হাত থেকে। ডাঃ সত্যপাল ও ব্যারিস্টার সাইফুদ্দিন কিচল পাঞ্জাবের দুই কৃতি সন্তান দেশ বরেণ্য নেতা। এদিকে পাঞ্জাবের গভর্নর তার অধিনস্ত সামরিক বাহিনীর সকল অফিসারদের ডাকলেন যে করেই হোক পাঞ্জাবে হরতাল পালন করতে দেওয়া যাবে না। তাই গভর্নর সত্যপাল ও সাইফুদ্দিন কিচলকে বিভিন্ন ব্যক্তিগত প্রতিপত্তির প্রলোভন দেখালেন হরতাল পালন না করার জন্য। তারা এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেন।

এদিকে অশান্ত পাঞ্জাবকে শান্ত করা এবং ৬ তারিখ হরতালে যোগ দেওয়ার উদ্দেশ্যে গান্ধীজী রওনা হলেন পাঞ্জাবের উদ্দেশ্য। ব্রিটিশ গুপ্তচরের কাছ থেকে জানতে পারলো গভর্নর গান্ধী আসার খবর। খবর পেয়ে রেল স্টেশনেই আটকিয়ে দেওয়া হলো গান্ধীকে, পাঞ্জাবে ডুকতে দেয়া হলো না। যথারীতি ৬ তারিখের হরতাল পালিত হলো।

৯ এপ্রিল ১৯১৯সাল
পাঞ্জাবাসী খবর পেলো গান্ধীকে পাঞ্জাবে ঢুকতে দেয়া হয়নি।এ খবর শুনে আন্দোলনের মাত্রা বেড়ে গেল তীব্র থেকে তীব্রতর। এদিকে গান্ধীর ঠুকতে না দেওয়ার প্রতিবাদে শত শত মানুষ রাজপথে নেমে এলো দোকানপাট বন্ধ করে ছাত্র যুবকরাই নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। পুলিশি বাধার মুখে পড়লো মিছিল, ডাকা হলো সেনাবাহিনী। এগিয়ে এলেন জননেতা সত্যপাল সেনাবাহিনীকে কথা দিলেন তারা সহিংস আন্দোলন করবেন না। সেনাবাহিনী ১৫ মিনিট সময় বেধে দিলো আন্দোলন কারীদের থামাতে। সত্যপালের কথায় সবাই থেমে গেল কিন্তু ১৫ মিনিট শেষ না হতেই সেনাসদস্যরা গুলি শুরু করলেন নিহত হলেন তিনজন।

১০ এপ্রিল ১৯১৯
পাঞ্জাবে এই নারকীয় হত্যাকান্ডের খবর পৌছে গেলো অমৃতসরে। অমৃতসরে খবর পৌছা মাত্রই শুরু হলো বিদ্রোহীদের তান্ডবলীলা। রেল-ইয়ার্ড তছনছ করা হল, টেলিগ্রাম অফিস দখল পুড়ানো হলো একটি ব্যাংক ভবন। উন্মত্ত জনতা সামনে পেয়ে খুন করলো একজন শেতাঙ্গকে।

এবার অমৃতসরের রাস্তায় নামানো হলো ব্রিটিশ সৈন্য। গুলি চালাতে লাগলো অবিরাম। শহরে যখন এরকম পরিস্থিতি জনতা পেলো না তাদের প্রাণ প্রিয় দুই নেতা সত্যপাল ও কিচলুকে। ইতিমধ্যেই ডেপুটি কমিশনার আরভিং তাদের কে সামান্য অজুহাতে বাংলোতে ডেকে গ্রেপ্তার করেছে।

১১ই এপ্রিল ১৯১৯ সাল
ভারতীয় ইংরেজ সেনাবাহীনির ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডায়ার এসে পৌছলেন অমৃতসরে। অশান্ত অমৃতসরকে ঠান্ডা করতেই তাকে ডেকে এনেছে স্থানীয় প্রশাসন।
স্থানীয় নেতা মকবুল মুহম্মদ গেলেন কমিশনার আরভিং এর বাংলোয় জানতে চাইলেন তাদের প্রাণ প্রিয় দুই নেতা ডঃ সত্যপাল ও ব্যারিস্টার কিচলুর কথা। আরভিং তাদের গ্রেফতারের কথা অস্বীকার করলেন। গতকালের গুলিতে নিহত ছয় জনের লাশ সৎকারের জন্য নিতে চাইলেন মকবুল, আরভিং প্রথমে দিতে অস্বীকৃতি জানালেও সৎকার্যে চার জনের বেশি বের হতে পারবে না শর্ত সাপেক্ষে রাজি হলেন।

১২ এপ্রিল ১৯১৯ সাল
ডেপুটে কমিশনার, পুলিশ কমিশনার সহ অন্যান্য কমিশনার হাজির হলেন ডেপুটি কমিশনারের বাংলোতে। জেনারেল ডায়ারকে অবহিত করা হলো গত তিন দিনের ঘটনা। সব শুনে, পরিস্থিতি আয়ত্বের বাইরে চলে গেলে কি হবে ভেবে শিউরে উঠলেন ডায়ার। ভাবতে লাগলে যে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সূর্য অস্তমিত হয় না তা আজ ডুববে। বিদ্রোহীদের দমন করার দায়িত্ব তিনিই নিলেন। গ্রেপ্তার করা হলো বাকি সব স্থানীয় নেতাদের। ১২০ জন ব্রিটিশ সেনা ও ৩১০ জন দেশীয় সেপাই নিয়ে গঠন করলেন ট্রপ। ডায়ার জারি করলেন এক সামরিক ঘোষনা, ঘোষনায় জারী হলো শহরের আশেপাশে হিংসাত্মক কিছু ঘটলেই ধরে নেওয়া হবে শহরবাসীই তা করেছে।

১৩ এপ্রিল ১৯১৯ সাল
জেনারেল ডায়ার সকালের দিকেই নতুন ফরমায়েস জাড়ি করেন প্রশাসনের লিখিত অনুমতি ছাড়া অমৃতসরের বাইরে কেউ বেরতে পারবে না এমনকি শহরের বাইরে থেকেও কেউ প্রবেশ করতে পারবে না। দিনের বেলা শহরে কিংবা শহরের আশেপাশে কোন প্রকার সভা-জমায়েত চলবে না।

সপ্তাখানেক আগেই ঘোষনা কর হয়েছিল বৈশাখী মেলার দিন জালিয়ানওয়ালাবাগে সভা বসবে। অন্যায়ের প্রতিবাদ করা হবে। ডায়ার তার নয়া ফরমানে শহরের কয়েকটা নির্দিষ্ট স্থানের উল্লেখ করেছিল। অমৃতসর থেকে মাইল সাতেক দূরে সর্ণমন্দির এই মন্দির থেকে আধা মাইল দূরেই জালিয়ানওয়ালাবাগ। জনতা ভেবেছিল শহর থেকে ব্রিটিশ সেনারা এত দূরে হয়তো আসবে না। সারা পাঞ্জাবে বছরে একটি মাত্র উৎসব এই বৈশাখী মেলা। জালিয়ানওয়ালাবাগের এই বৈশাখী মেলাতে জমায়েত হয়েছে হাজার পঁচিশেক মানুষ। অন্যান্য বারের মতো মেলায় এবার আনন্দ নেই সবার মুখেই থমথমে ভাব। গুপ্তচর খবর দিলো ডায়ারকে জালিয়ানওয়ালাবাগে শহরবাসী হাজির হচ্ছে বিদ্রোহ করতে। বাংলোর বাইরে এসে ডায়ার দেখতে পেলেন শহরবাসী জালিয়ানওয়ালাবাগের দিকেই যাচ্ছে।

এত বিদ্রোহীদের একসাথে পাওয়া যাবে ভেবেই আনন্দে জেনারেল ডায়ার বেরিয়ে পরলেন দুটো সাজোয়া যান ও শ’খানেক সৈন্য নিয়ে। জালয়ানওলাবাগে বৈশাখী মেলায় প্রবেশ-বাহিরের জন্য একটামাত্র সরু গলি। ডায়ারের সাজোয়া যান গলির মুখেই থামাতে হলো এগিয়ে চললেন সেনাদের নিয়ে। এদিকে গ্রাম থেকে যারা মেলায় এসেছে তাদের অনেকেই শহরে ঘটে যাওয়া ব্রিটিশদের বর্বরতার ঘটনা জানে না হংসরাজ তাদের কে এই বর্বরতার ঘটনা একের পর এক বলে যাচ্ছে। মিনিট পাঁচেক হাটার ওর জেনারেল ডায়ার পৌছলেন বাগে নির্দেশ দিলেন একটা গুলিও যেন বাজে না খরচ হয়, এবার বিদ্রোহীরা শিক্ষা পাবে ভবিষ্যতে আর বিদ্রোহ করার সুযোগ পাবে না। তারপর ঘটে গেল ইতিহাসের কলঙ্কময় অধ্যায়। একটানা চালানো হলো ১ হাজার ৬৫০ রাউন্ড গুলি। শেষ হলো ডায়ারের অভিযান। মৃত আর মুমূর্ষেরা পরে রইলো রক্তাক্ত প্রান্তরে। বুলেটবিদ্ধ দেহ থেকে রক্ত ঝরতে ঝরতে একসময় তা হলো নিষ্প্রাণ। অনেক ক্লিষ্ঠ কন্ঠ শেষ আর্তনাথ করে অন্ধকার হলো স্তব্ধ।

তিন মাস পর ধীরে ধীরে জালিয়ানওয়ালাবাগের এই পৈশাচিক হত্যাকান্ডের খবর ছড়িয়ে পরলো ভারতবর্ষের এ প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। সমস্ত ঘটনা শান্তিনিকেতনে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের কানে গেল। তাঁর প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে একদা ব্রিটিশ সরকার যে ‘নাইট’ উপাধি দিয়েছিল এই হত্যা কান্ডের প্রতিবাদে তিনি তার এই উপাধ পরিত্যাগ করলেন। বিশ্ববাসী যখন এ পৈশাচিক হত্যাকান্ডের কথা জানতে পারলো জেনারেল ডায়ারের সমালোচনার ঝড় উঠলো অনেক জল্পনা কল্পনাশেষে বছর দুয়েক পর জেনারেল ডায়ার কে চাকুরিচ্যুত করা হয়। এর পর সাত বছর বেঁচে থাকলে কঠিন রোগে ১৯২৭ সালে মারা যায় ডায়ার। কিন্তু পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেও ডায়ারক ভুলতে পারবে না কেউ যতদিন জালিয়ানওয়ালাবাগের স্মৃতি থাকবে। ভুলতে পারবে না এই অত্যাচারিত নির্মম হত্যাকরীকে।

আল আমিন হোসেন মৃধা
সভাপতি
সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট
ঢাকা কলেজ

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “আজ ১৩ এপ্রিল ইতিহাসের সেই কলঙ্কিত জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকান্ড দিবস।

  1. প্যারাগ্রাফগুলোতে একটা এন্টার
    প্যারাগ্রাফগুলোতে একটা এন্টার দিলে লেখাটা দেখতে ভাল দেখায়। নীচে দলীয় টাইটেল যোগ করার চেয়ে লেখাকে সুন্দর করে উপস্থাপন করাটা বেশি জরুরী। আশাকরি ভবিষ্যতে খেয়াল রাখবেন।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

3 + 7 =