ফলস ফ্ল্যাগ সন্ত্রাস ও বাংলাদেশ

বর্তমান বিশ্বের অধিকাংশ মানুষের মনোজগৎ দখল করে আছে “সন্ত্রাসী-কর্ম” এবং “সন্ত্রাস বা জঙ্গিবাদ”। তবে, এই সন্ত্রাস বা জঙ্গিবাদ “ইতিহাস যুগের” প্রারম্ভ থেকেই চিহ্নিত হয়ে আছে। প্রথমতঃ এর উৎপত্তি ছিল, অত্যাচারী বা দখলদার কোন বিদেশী শাসকের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বৈপ্লবিক প্রতিবাদের ভাষা স্বরূপ। কিন্তু বর্তমান বিশ্বে সন্ত্রাসী বা জঙ্গি কর্মকাণ্ডের অর্থে এসেছে পরিবর্তন এবং প্রয়োগের ক্ষেত্রে যোগ হয়েছে বিভিন্ন মাত্রা।

সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের সমাজ এমনকি সভ্যতাও ধ্বংস করে দিচ্ছে। এরূপ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড অতিতে আমাদের সমাজে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেও এর বিধ্বংসী রূপ আজ আমরা প্রতিনিয়ত প্রত্যক্ষ করছি। বাংলাদেশে সংগঠিত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড দেশবাসীকে আতঙ্কগ্রস্ত করে তুললেও, এ ধরনের কর্মকাণ্ডের প্রকৃতি, এর উদ্দেশ্য, প্রকৃতপক্ষে কারা এসবের সাথে জড়িত তা রহস্যে ঘেরা। সন্ত্রাস সম্বন্ধীয় অধিকাংশ সংবাদ অনুমাননির্ভর এবং ক্ষেত্র বিশেষে বানোয়াট তথ্যে ভরপুর।

“সন্ত্রাস” বা “জঙ্গিবাদ” বলতে কি বোঝায় ?
সাধারনভাবে, যখন কোন সংগঠন তাদের রাজনৈতিক, ধর্ম ভিত্তিক বা আদর্শগত লক্ষ্য অর্জনে সামরিক সদস্য বা বেসামরিক জনসাধারণের বিরুদ্ধে আক্রমণ বা অন্য কোন প্রকার ধ্বংসাত্মক কার্য পরিচালনা করে, তাকেই সন্ত্রাসী কর্ম, সন্ত্রাস বা জঙ্গিবাদী কর্ম বলে গন্য করা হয়।

যখন কোন ব্যক্তি বা সংগঠন রাজনৈতিক, ধর্মীয় বা আদর্শগত কোন লক্ষ্য অর্জনে নিজ রাষ্ট্রের সরকার বা জনগনের মাঝে আতংক সৃষ্টি করার উদ্দেশ্যে স্বীয় রাষ্ট্রের জনগনের বা সম্পদের উপর সন্ত্রাসী কর্ম পরিচালনা করে, তাকে “অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাস” হিসেবে গণ্য করা হয়। অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাস সংগঠিত হয় কোন রাষ্ট্রের স্থায়ী অধিবাসী বা নাগরিক দ্বারা। এ ধরণের সন্ত্রাসী কর্মে কোন প্রকার আন্তর্জাতিক প্রভাব থাকেনা।

বিগত কয়েক শতাব্দীর মধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্র ও সংস্থা সন্ত্রাস বা জঙ্গিবাদের শতাধিক সংজ্ঞা প্রদান করেছেন। কিন্তু অধিকাংশ সংজ্ঞাই একদিকে যেমনই বিতর্কিত অন্যদিকে তেমনি একপেশে হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে।

যদিও প্রাথমিক পর্যায়ে এ ছিল জনগনের পক্ষ থেকে অত্যাচারী শাসক বা দখলদার বিদেশী শাসকের বিরুদ্ধে, কিন্তু নতুন মাত্রায় সন্ত্রাসের শিকার সাধারন জনগনও। সাধারন জনগন পরিণত হয় কখনও সশস্ত্র আন্দোলন পরিচালনাকারী বিদ্রোহীদের শিকারে, কখনও বা অত্যাচারী দেশী বা বিদেশী দখলদার শাসকদের দ্বারা বিদ্রোহ দমনের নামে, যা রাষ্ট্র পরিচালিত সন্ত্রাস বলে পরিচিত। যেহেতু রাষ্ট্র পরিচালিত যুদ্ধে অগণিত নিরস্ত্র নর নারীর মৃত্যু হয়, সেই হিসেবে রাষ্ট্রই সবচাইতে বড় সন্ত্রাসী বা সন্ত্রাসের পৃষ্ঠপোষক কারন একমাত্র রাষ্ট্রই সুগঠিতভাবে গণহত্যা পরিচালনা করার উপযুক্ত এবং পর্যাপ্ত সরঞ্জামাদি ধারন করে, যা ক্ষুদ্র দল সমূহের নিকট সহজলভ্য নয়। তা সত্ত্বেও, রাজনীতিক, প্রচার মাধ্যম এবং বুদ্ধিজীবীগণ সরকার পরিচালিত গণহত্যাকে আইনসিদ্ধ বলে সমর্থন করেন অথচ ক্ষুদ্র বিদ্রোহী দল সমুহকে ব্যক্তি বিশেষকে হত্যার কারনে দোষারূপ করেন।

এছাড়াও, রাষ্ট্র পরিচালিত সন্ত্রাস যখন রাষ্ট্রীয় সীমানার বাহিরে অর্থাৎ তৃতীয় কোন রাষ্ট্রে বা রাষ্ট্র সমুহে সমর্থক গোষ্ঠী বা বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত বাহিনী দ্বারা পরিচালিত হয় তা রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সন্ত্রাস নামে গণ্য। বর্তমান বিশ্বে এই দ্বিতীয় মাত্রার অর্থাৎ রাষ্ট্র পরিচালিত বা রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সন্ত্রাসই ধ্বংসলীলায় মেতে উঠেছে ।

প্রায়শই, এই নতুন মাত্রার সন্ত্রাসকে সুকৌশলে ঢেকে দেয়া হয় “ফলস ফ্ল্যাগ অপারেশন” বা “ফলস ফ্ল্যাগ সন্ত্রাস” পদ্ধতির আড়ালে।

সন্ত্রাসবাদের পরিধি অনেক বিস্তৃত, সংজ্ঞা নিয়ে আছে মতভেদ, উদাহরণ সংখ্যাতীত।

সন্ত্রাসবাদ একটি জটিল এবং “আবেগ-অধিকার-আদর্শ” সম্পর্কিত বিষয়। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান যেমন, সমাজ বিজ্ঞান, ইতিহাস, আইন, সাংবাদিকতা এবং দ্বন্দ্ব সমাধান (conflict management) সহ আন্তঃবিষয়ক প্রতিষ্ঠান সমূহের সদস্যগণ সন্ত্রাস কর্ম বা সন্ত্রাসবাদ নিয়ে গবেষণা করেন। গোয়েন্দা সংস্থা, আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বা সামরিক বাহিনী, কার্য নির্বাহী শাখার কর্মকর্তাগণ এই বিষয় নিয়ে তদন্ত কর্ম পরিচালনা করেন, অন্যদিকে, সরকারের আইন ও বিচার বিভাগ এবং বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক রাষ্ট্রীয় সংস্থা সমূহের প্রধানগণও এই সমস্যাটি নিয়ে উৎকণ্ঠিত। তবে, বিভিন্ন সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান নিজেদের বিভাগীয় দৃষ্টিকোণ থেকে এই বিষয়টিকে বিচার করেন বলে, এই বিষয়টির সংজ্ঞা প্রদানে জটিলতা সৃষ্টি হয়।

বাংলায় সন্ত্রাস বা জঙ্গিবাদ, ইংরেজিতে “টেররিজম” শব্দটি মূলত ফরাসী শব্দ “terrorisme” বা ল্যাটিন শব্দ “terrere” (ভীতিসঞ্চারকারী) থেকে উৎপত্তি হয়েছে। এই শব্দ ১৭৯৩ সনে সংগঠিত ফরাসী বিপ্লবের সাথে সম্পর্কিত। ১৭৯৫ সনে ফরাসী বিপ্লবের পর “ইয়াকবিন ক্লাবে’র ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডকে পরিচিতি দিতে “সন্ত্রাসের রাজত্ব” বা “রেইন অব টেরর” এর মাধ্যমে প্রথম বারের মতো সন্ত্রাসবাদের আধুনিক নাম প্রদান করা হয়।

সন্ত্রাসবাদের সংজ্ঞার পরিধি যতই বিস্তৃত হোক না কেন, সন্ত্রাসবাদের উৎপত্তি এবং প্রয়োগের উদাহরণ পাওয়া যায় অন্ততপক্ষে খৃষ্টীয় প্রথম শতাব্দীতে যখন, প্রাচীন জুদেয়া প্রদেশের সন্ত্রাসী গ্রুপ “সিসারি জিলোটস” (Sicarii Zealots) সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে। সমসাময়িক ইহুদি- রোমান ইতিহাসবিদ “জোসেফাস” (Josephus) ব্যাখ্যা প্রদান করেন, “গ্যালিলের জুদাস” (Judas of Galilee) ষষ্ঠ শতাব্দীতে সিলটসের প্রশাখা “সিসারি” চরমপন্থি সন্ত্রাসী দল গঠন করে। এই সন্ত্রাসী দলের আক্রমণের লক্ষ্য ছিল, রোম সম্রাটের সহযোগী সহ গির্জার পুরোহিত, সদ্দুকী, হেরোদিয় এবং অন্যান্য ধনবান ব্যক্তিকে এবং পরবর্তীতে জুদেয়াতে রোম সম্রাটের বিরুদ্ধে জিয়ালোট্রি (Zealotry) বিদ্রোহের সময় রোম সম্রাটের কতিপয় বিশিষ্ট সহযোগীকে হত্যা করা।

বর্তমান বিশ্বে যত প্রকার সন্ত্রাস রয়েছে, তার মধ্যে নিম্নলিখিত গুলি উল্লেখযোগ্যঃ

· রাজনৈতিক সন্ত্রাস= (সরকার বিরোধী- ডানপন্থি বা বামপন্থি সন্ত্রাস)

· সামাজিক বিপ্লবাত্নক সন্ত্রাস= (ফরাসী বিপ্লব, বলশেভিক বিপ্লব ইত্যাদি)

· জাতীয়তাবাদী বা প্রজাতান্ত্রিক সন্ত্রাস= (আইরিশ রিপাবলিকান আর্মি, ইত্যাদি)

· বর্ণবাদী সন্ত্রাস= (হোয়াইট টেররিজম, কু ক্লুক্স ক্লান ইত্যাদি)

· মনস্তাত্ত্বিক সন্ত্রাস= (ইসলামোফোবিয়া)

· উগ্র ধর্মীয় সন্ত্রাস= (জায়নবাদ, স্যাফ্রন সন্ত্রাস ইত্যাদি)

· নব্য ধর্মীয় সন্ত্রাস= (রাজনেশপুরম; হাউজ অব ইয়াহভেহ- যুক্তরাষ্ট্র, “আউম শিনরিকিও”- জাপান,ইত্যাদি।)

· অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাস= (ওকলাহোমা সিটি বম্বিং, যুক্তরাষ্ট্র ১৯৯৫, মাদ্রিদ ট্রেন বম্বিং ২০০৪, লন্ডন আন্ডারগ্রাউন্ড বম্বিং ২০০৫ ইত্যাদি)

· আন্তর্জাতিক সন্ত্রাস= (বিভিন্ন রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অবৈধ যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগী হিসেবে ন্যাটো বাহিনীর অংশগ্রহন ইত্যাদি)

· রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস= (যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক অবৈধভাবে ইরাক, আফগানিস্তান, লিবিয়া আক্রমণ, প্যালেস্টাইনিদের স্বীয় ভূমি থেকে উৎখাতের জন্য ইসরায়েলের আগ্রাসন, বাংলাদেশের সীমান্তে নিরীহ বাংলাদেশীদের ভারতের বিএসএফ এর প্রতিনিয়ত ক্রমবর্ধমান হত্যা কান্ড ইত্যাদি )

· রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সন্ত্রাস= (আইএস নামক সন্ত্রাসী সংগঠনকে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং অন্যান্য রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান)

· জৈব ও রাসায়নিক সন্ত্রাস= (যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক ইরাকে ডিপ্লিটেড ইউরেনিয়াম ব্যবহার, যার ফলে ইরাকে বিকলাঙ্গ শিশুর জন্ম হচ্ছে)। ইত্যাদি।

রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বাহিরে, সাধারণত সন্ত্রাসীগন বিচ্ছিন্নতাবাদী, মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তকারী, বিপ্লবী, মিলিশিয়া বাহিনী, সংগ্রামী, উপ-সামরিক বাহিনী, গেরিলা-যোদ্ধা, বিদ্রোহী এবং বিভিন্ন ভাষায় তদ্রুপ অর্থবোধক কোন না কোন নামে যেমন, “সিলট” (zealot), “এস্যাসিন” (assassin) এবং “থাগ”(thug) নামে পরিচিত। বৃহত্তর পরিসরে, বিভিন্ন ডানপন্থি- বামপন্থী রাজনৈতিক সংগঠন, জাতীয়তাবাদী বা ধর্মীয় গোষ্ঠী সমূহ বিপ্লব নামে, এমন কি সরকারী বাহিনীও স্বীয় লক্ষ্যে পৌঁছাতে সন্ত্রাস বা জঙ্গি কর্মকাণ্ডের আশ্রয় নিয়ে থাকে। এছাড়াও রয়েছে আঞ্চলিক, রাষ্ট্রীয় বা আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী দল।

সন্ত্রাসবাদ নির্ণয়ে প্রয়োগ করা হয় এক ধরণের সরকারী বা প্রাতিষ্ঠানিক মানদণ্ড, যা দিয়ে সরকার পরিচালিত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বা হত্যাযজ্ঞকে বৈধ বা আইনানুগ এবং বেসরকারি কোন দল বা গোষ্ঠী পরিচালিত কর্মকাণ্ডকে অবৈধ বা বে-আইনি বলে গণ্য করা হয়। এই অর্থে, যে সকল ঘটনা সন্ত্রাস কর্ম হিসেবে গণ্য করা যায়, সে সকল কর্ম যখন স্বয়ং সরকার বা রাষ্ট্র দ্বারা পরিচালিত বা রাষ্ট্রীয় তত্ত্বাবধানে সংগঠিত হয়, তখন তা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড হিসেবে গণ্য করা হয় না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স সহ কতিপয় পশ্চিমা রাষ্ট্র, মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল কর্তৃক রাষ্ট্র পরিচালিত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড এর জ্বলন্ত উদাহরণ।

সন্ত্রাসবাদের উপরোল্লিখিত মানদন্ডের পার্থক্য নির্ণয়ে, বিশ্ব বিখ্যাত সংবাদ মাধ্যম ‘রয়টার’ এর ‘আন্তর্জাতিক সংবাদ’ প্রধান এক অভ্যন্তরীণ স্মারকলিপিতে বলেন, “একজনের দৃষ্টিতে যে সন্ত্রাসী, অন্য কারও দৃষ্টিতে সে মুক্তিযোদ্ধা”। একটি উদাহরনের মাধ্যমে এ বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠে যেমন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, মাষ্টারদা সূর্য সেন, মঙ্গল পান্ডে, ভগৎ সিংহ, রাসবিহারী বসু, আসফাকউল্লা খান, ক্ষুদিরাম বসু, চন্দ্র শেখর আজাদ প্রমূখ যাদের আত্নত্যাগের বিনিময়ে ভারতবর্ষ স্বাধীনতার মুখ দেখতে পেরেছে, তাদেরকে ব্রিটিশ উপনিবেশ শক্তি সন্ত্রাসী হিসেবে গন্য করেছে। এমন কি, তাঁদের অধিকাংশকেই ব্রিটিশ সরকার ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যাও করে।

ব্যতিক্রম উদাহরনঃ

কোন কোন সংগঠন বা দল যখন সশস্ত্র সংগ্রামে লিপ্ত ছিল তখন পশ্চিমা সরকার এবং সংবাদ মাধ্যম সমূহ তাদেরকে সন্ত্রাসী হিসেবে গন্য করে কিন্তু পরবর্তীতে, ঐ সকল মুক্তি সংগ্রামের নেতাদেরকেই একই সরকার এবং সংবাদ মাধ্যমই রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবেও স্বীকৃতি দেয়। এমন কি তারা পরবর্তীতে নোবেল পুরষ্কারও অর্জন করেন। ইসরায়েলের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মেনাখেম বেগিন এবং দক্ষিন আফ্রিকার নেলসন মান্ডেলা তেমনি দুইজন।

যেহেতু সন্ত্রাসবাদের সাথে সহিংসতা জড়িত, তা শুধুমাত্র ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে নয়, বৃহত্তর সামাজিক পরিসরেও আতংক সৃষ্টি করে। এই আতঙ্কের কারনেই সন্ত্রাসবাদকে ‘প্রচলিত যুদ্ধ’ বা ‘গেরিলা যুদ্ধ’ থেকে পৃথক ভাবে চিহ্নিত করা যায়। যেহেতু, প্রচলিত এবং গেরিলা যুদ্ধ উভয়ই মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ এবং গেরিলা বাহিনী সন্ত্রাস মূলক কর্ম এবং অন্যান্য ধরনের প্রচারনা চালায়, তাদের লক্ষ্য থাকে সামরিক বিজয়ের দিকে। তার বিপরীতে, যেহেতু, সরাসরি সামরিক ভাবে বিজয় অর্জন করা সম্ভবপর হয় না, সন্ত্রাসবাদের লক্ষ্য থাকে রাজনৈতিক বা অন্য কোন আদর্শিক লক্ষ্য অর্জনের দিকে।

এই কারনেই, অনেক সমাজ বিজ্ঞানী, গেরিলা যুদ্ধকে, ‘দুর্বলের অস্ত্র’ (weapon of the weak) এবং সন্ত্রাসবাদকে ‘দুর্বলতমের অস্ত্র’ (weapon of the weakest) হিসেবে গন্য করেন।

“ফলস ফ্ল্যাগ সন্ত্রাস” বা অপারেশন কি?

“ফলস ফ্ল্যাগ অপারেশন” হচ্ছে এক প্রকার গুপ্ত তৎপরতা যা কোন সরকার, সংস্থা বা সংগঠন দ্বারা পরিচালিত হয়, তবে এই গুপ্ত তৎপরতা এমন ভাবে সাজানো হয় যাতে প্রতীয়মান হয় যে, অন্য কেউ এর জন্য দায়ী। এরূপ গুপ্ত তৎপরতা শুধুমাত্র যুদ্ধাবস্থা বা পাল্টা বিদ্রোহের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় বরং শান্তিপূর্ণ পরিস্থিতিতেও পরিচালিত হয়ে থাকে।

প্রাচীন কালে সমুদ্রগামী কাঠের তৈরি জাহাজের যুগে, কোন এক জাহাজ স্বীয় নৌ-বাহিনীর কোন জাহাজকে আক্রমণ করার পূর্বে শত্রুপক্ষের পতাকা উত্তোলিত রাখতো, সে থেকেই এই নামের উদ্ভব হয়। যেহেতু, আক্রমণকারী জাহাজ স্বীয় রাষ্ট্রের পতাকার স্থলে শত্রুপক্ষের পতাকা উত্তোলিত রাখত, সেকারণেই, এটাকে “ফলস ফ্ল্যাগ আক্রমণ” বলা হত।

অন্যভাবে বলা যায়, যখন কোন সরকারী সংস্থা বা বাহিনী প্রথমত গুপ্ত তৎপরতা পরিচালনা করে নিজেদেরকেই আক্রান্ত বলে প্রচার করে যদিও প্রকৃতপক্ষে তারা স্বয়ং নিজেদের বাহিনী বা জনতাকে সন্ত্রাসী আক্রমণ করে, অতঃপর, শত্রুর উপর আক্রমণ পরিচালনা করার অজুহাত হিসেবে ব্যবহার কল্পে প্রথমোক্ত আক্রমণের দায় দায়িত্ব শত্রুপক্ষের উপর চাপিয়ে দেয়। এরূপ কর্মকাণ্ডকেই “ফলস ফ্ল্যাগ সন্ত্রাস” বলে আখ্যায়িত করা হয়।

“ফলস ফ্ল্যাগ সন্ত্রাস” এর অবিচ্ছেদ্য অংশ প্রচার মাধ্যম। প্রচার মাধ্যম একদিকে সকল প্রকার সন্ত্রাসী কর্মে এমন কি “ফলস ফ্ল্যাগ সন্ত্রাস” এর সাফল্যেও সজ্ঞানে বা অনিচ্ছাকৃত ভাবে বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে। এরূপ “ফলস ফ্ল্যাগ সন্ত্রাস” পরিচালনার মাধ্যমে কোন রাষ্ট্র বা আধিপত্যবাদি কোন তৃতীয় রাষ্ট্র সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সমস্ত দায়-দায়িত্ব চাপিয়ে দেয় অবদমিত বা বিদ্রোহীদের উপর। বর্তমান বিশ্বে রাজনৈতিক দল বা ধর্মীয় গোষ্ঠী পরিচালিত সন্ত্রাস মূলক কর্মকান্ডের তুলনায় “রাষ্ট্র পরিচালিত সন্ত্রাস” ও “ফলস ফ্ল্যাগ সন্ত্রাস“ উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে।

ফলস ফ্ল্যাগ অপারেশনের কিছু দৃষ্টান্ত

১) ১৮৯৮-স্প্যানিশ-অ্যামেরিকান যুদ্ধ, কিউবার হাভানায় “মেইন” নামক এক জাহাজে আকস্মিক বিস্ফোরণে ২৫৫ জন নাবিকের মৃত্যু হয়। হারস্ট (Hearst press) গণমাধ্যম, এই ঘটনার জন্য স্প্যানিশদের দায়ী করে, এবং দাবী করে যে এ বিস্ফোরণের কারন ছিল রিমোট কন্ট্রোল্ড মাইন। সেই অজুহাতে যুক্তরাষ্ট্র স্পেন এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে এবং স্পেনের অধিনস্ত ফিলিপাইন, গুয়াম এবং কিউবা দখল করে। পরবর্তীতে, অনুসন্ধান করে জানা যায় যে, এই বিস্ফোরন সংঘটিত হয়েছিল জাহাজের ভিতরে এবং এটি ছিল হয়তো কয়লা বিস্ফোরণের মতো কোন দুর্ঘটনা অথবা জাহাজের অভ্যন্তরস্থ কোন “টাইম বম্ব”। ডুবুরিগণ ডুবন্ত জাহাজের ভগ্নাংশ পরীক্ষা করে দেখেন যে জাহাজের বর্ম প্লেট বিস্ফোরণের কারণে ছিল বহির্মুখী, অন্তর্মুখী নয়।

২) পার্ল হারবর
৭ ডিসেম্বর ১৯৪১ সনে ঘটে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ দুর্যোগ কিন্তু এ দুর্যোগ জাপান কর্তৃক পার্ল হারবরে বোমা বর্ষণের জন্য নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্র সরকার এবং ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট কৃত ধোঁকা এবং বিপথগামী সিদ্ধান্তের কারণে।
প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট বিশেষ কারণে ইউরোপীয় যুদ্ধে অংশগ্রহন করতে চেয়েছিলেন, বিশেষ করে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে (১৯৪০ সনে) জার্মানির নিকট ফ্রান্সের পরাজয়ের পর। তার এই সিদ্ধান্তের মূলে ছিল ইংলিশ সম্ভ্রান্ত বংশীয় কিছু ভীমরুল এবং ইহুদী গোষ্ঠীর জোরালো চাপ। ১৪ আগস্ট ১৯৪১ সনে, আটলান্টিক কনফারেন্সে রুজভেল্টের সাথে সাক্ষাতের কথা বর্ণনা দেয়ার কালে উইন্সটন চার্চিল বলেন, রুজভেল্ট ইউরোপীয় যুদ্ধে জড়ানোর জন্য গভীর ভাবে আগ্রহি ছিল, কিন্তু তাতে একটি সমস্যাও ছিল, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি এবং অধিকাংশ অ্যামেরিকানদের ইউরোপীয় যুদ্ধে জড়ানোর বিপক্ষে প্রতিরোধ ডিঙিয়ে তার পক্ষে এ যুদ্ধে জড়ানো সম্ভবপর ছিল না।

সেকারনে রুজভেল্ট প্রতারণার আশ্রয় নেয়। রুজভেল্ট ভেবেচিন্ত ধারাক্রমে আমেরিকা আক্রমণ করতে জাপানকে প্ররোচিত করতে থাকে, যদিও তার আক্রমণের প্রধান লক্ষ্য ছিল জার্মানি। রুজভেল্ট জানত যে যুক্তরাষ্ট্র জাপান আক্রমণ করলে জার্মানি ত্রিপক্ষিয় চুক্তি বাস্তবায়নে আমেরিকার বিরুদ্ধেও যুদ্ধ ঘোষণা করবে। সেই সুত্রে, অ্যামেরিকার পক্ষে ইউরোপীয় যুদ্ধে বিশেষ করে জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার পথে আর কোন বাধা থাকবে না। সেই অনুসারে, রুজভেল্ট জাপানকে “পার্ল হারবোর” আক্রমণ করতে প্রথমত প্ররোচিত এবং অতঃপর সকল সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়।

ডিসেম্বর ৭, ১৯৪১ জাপান নৌ বাহিনী যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াই সীমান্তের “পার্ল হারবোর” নৌ-পোতাশ্রয়ে আক্রমণ চালায়। পরের দিন অর্থাৎ, ডিসেম্বর ৮ তারিখে, যুক্তরাষ্ট্র জাপানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। সেই সাথে যুক্তরাষ্ট্রের গোপন সমর্থক যুক্তরাজ্যও সক্রিয় জোট হিসেবে আত্নপ্রকাশ করে। অতঃপর ১১, ডিসেম্বর ১৯৪১ যুক্তরাষ্ট্র জার্মানির বিরুদ্ধেও যুদ্ধ ঘোষণা করে।

৩) ১৯৫০ সালের প্রথম দিকে, মিশরে কর্মরত ইসরায়েলী সন্ত্রাসী দলের সদস্য যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক স্থাপনা সহ বিভিন্ন ভবনে বিস্ফোরক স্থাপন করে, তার সাথে এমন নিদর্শন রেখে দেয়, যার মাধ্যমে এই কর্মকাণ্ডের সাথে আরবদের সংশ্লিষ্টতা প্রমাণ করে। কিন্তু এই সকল বিস্ফোরকের মধ্যে একটি, নির্ধারিত সময়ের পূর্বেই বিস্ফোরিত হয়। ফলে, মিশরীয় কর্তৃপক্ষ ঘটনার সাথে জড়িত একজনকে সনাক্ত করতে সক্ষম হয়। এই ঘটনা ইসরায়েল সরকার সহ প্রতিরক্ষা মন্ত্রীকে অপদস্ত হতে হয়।
৪) নিউ ইয়র্ক টাইমসকৃত দলিল অনুসারে, ১৯৫০ সালের দিকে সিআইএ’র পক্ষে কর্মরত একজন ইরানী, গনতান্ত্রিক ভাবে নির্বাচিত ইরানের রাষ্ট্রপ্রধানের বিরুদ্ধে জনগনকে ক্ষেপিয়ে তুলতে কমূনিস্ট সেজে ইরানে বোমা বিস্ফোরণের আয়োজন করে।

৫) ইতালির প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী, একজন বিচারক এবং ইতালীর কাউন্টার- ইন্টেলিজেন্স সাবেক প্রধান এই মর্মে নিশ্চিত করেন যে, পেন্টাগন এবং সিআইএ’র সহযোগিতায় “ন্যাটো” ইতালীতে সন্ত্রাস মূলক বিস্ফোরণ ঘটায় এবং কমূনিজমের বিরুদ্ধে তাঁদের যুদ্ধে ইউরোপীয় সরকার সমূহের পক্ষে সমর্থন লাভে ঐ সন্ত্রাসী ঘটনার জন্য কমূনিস্টদের দায়ী করে।

৬) যুক্তরাষ্ট্র সরকারের ১৯৬০ সনের নথিপত্র প্রকাশ করে যে, যুক্তরাষ্ট্র সেনা বাহিনীর উপ প্রধান প্রথমত যুক্তরাষ্ট্রের বিমান সমূহ উড়িয়ে দেয়া সহ যুক্তরাষ্ট্রের সীমানার অভ্যন্তরে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করার, অতঃপর কিউবার বিরুদ্ধে আক্রমণের অজুহাত সৃষ্টির লক্ষ্যে ঐ সমস্ত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের জন্য কিউবাকে দায়ী করতে “অপারেশন নর্থ উড” নামক এক পরিকল্পনা স্বাক্ষর করেছিলেন।

৭) ১৯৮০-১৯৮৮, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল আয়োজিত ইরান-ইরাক যুদ্ধঃ ১৯৫৩ সালে ইরানে সিআইএ আয়োজিত এক অভ্যুত্থানে ইরানের প্রধানমন্ত্রী মোসাদ্দেককে ক্ষমতাচ্যুত করে রেজা পাহলভিকে এবং তাকে ক্ষমতাচ্যুত করে তার পুত্র মোহাম্মদ রেজা পাহলভিকে ক্ষমতাসীন করার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে ক্ষমতার খুটি গাড়ে। ইরানকে ফিনিক্স মিসাইল এবং ব্রিটিশ চিফটেইন এমবিটি সহ যুক্তরাষ্ট্রের এফ-১৪ ফাইটার এবং সর্বোৎকৃষ্ট পশ্চিমা সামরিক সরঞ্জাম দিয়ে সজ্জিত করা হয়। দুর্ভাগ্যজনক ভাবে, ১৯৭৯ সনে এক অভ্যুথানে মোহাম্মদ রেজা পাহলভিকে ক্ষমতাচ্যুত করে আয়াতুল্লাহ খোমেনি ইসলামী রাষ্ট্র গঠন করে।

অতঃপর, যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্র ইরাকের সাদ্দাম হুসেইন এর সাথে উষ্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলে, এবং ইরাককে ইরানের প্রতিযোগী হওয়ার সমর্থ এক জাতি হিসেবে গড়ে তুলতে শুরু করে। পুরাতন গ্যাস যুদ্ধে প্রয়োজনীয় এজেন্ট তৈরির কারখানা সহ বিপুল পরিমাণ কার্যকর অস্ত্রও ইরাক লাভ করে। পরবর্তীতে এসবকেই “গন বিধ্বংসী” অস্ত্র (WMD) হিসেবেই প্রচার করা হয়, যদিও এসব কোন অর্থেই প্রথম বিশ্বযুদ্ধের রাসায়নিক অস্ত্র ছিল না।

যুদ্ধ শুরু হলে উভয় পক্ষই যুদ্ধ করে নিঃশেষ হতে থাকে কারন তৃতীয় পক্ষ শক্তি, বিশেষত ইসরায়েল, সযত্নে ক্ষমতার ভারসাম্য পর্যবেক্ষণ করছিল এবং প্রয়োজনে যে পক্ষ হারতে যাচ্ছে তাকে আরও অস্ত্র সরবরাহ করতে থাকে।

৮) ডেসার্ট স্টরম (প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধ, ১৯৯১)- সাদ্দাম হুসেইন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত এপ্রিল জিলেস্পির মাধ্যমে কুয়েতের কর্মকাণ্ড নিয়ে বন্ধু যুক্তরাষ্ট্রের নিকট অভিযোগ জানালে, আরবদের মধ্যকার দ্বন্দ্বে যুক্তরাষ্ট্র জড়াতে চায় না বলে উত্তর পায়। এটা ছিল প্রকৃতপক্ষে সাদ্দামের জন্য একটা পাতা ফাঁদ। এককালের ইরাকের অংশ কুয়েতকে ইরাক আক্রমণ করার পর, জর্জ বুশ (সিনিয়র) কুয়েতকে মুক্ত করতে এবং সদ্য গঠিত ইরাকী সামরিক ক্ষমতার ভিত্তি গুড়িয়ে দেয়ার লক্ষ্যে ৪০টি রাষ্ট্র নিয়ে এক জোট গঠন করে। এর সাথে যুক্ত হয় এক অপপ্রচার, কুয়েতে যুক্তরাষ্ট্র রাষ্ট্রদূতের মেয়ে টেলিভিশনে নার্সের অভিনয় করে সাক্ষ্য দেয় এই মর্মে যে তিনি ইরাকী সেনা সদস্যগনকে কুয়েতে ইনকিউবেটর থেকে শিশুদের ছুড়ে ফেলতে প্রত্যক্ষ করেছেন।

৯) ১৯৭১ সালের ৩০ জানুয়ারী, বিশিষ্ট কাশ্মীরি জিহাদী জনাব হাশিম কোরেইশী, যিনি বর্তমানে জম্মু কাশ্মীর ডেমোক্রেটিক লিবারেশন ফ্রন্টের চেয়ারম্যান, তিনি এবং তার সহযোদ্ধা আশরাফ ভাট ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সের ‘গঙ্গা’ নামে ফকার এফ টুয়েন্টি সেভেন ফ্রেন্ডশীপ বিমানটি হাইজ্যাক করে লাহোরে নিয়ে যান। বিমানের সব যাত্রীকে শেষ পর্যন্ত মুক্তি দেয়ার পর পয়লা ফেব্রুয়ারী বিমানটিতে আগুণ ধরিয়ে ধ্বংস করে দেয়া হয়। ভারতীয় বিমান সংস্থার এটি ছিলো সবচেয়ে পুরনো বিমান যা বাতিল হয়ে যাওয়ার কারণে সার্ভিস থেকে বাদ দেয়া হয়েছিলো। তবে ঘটনার কয়েকদিন আগে তা আবার চালু করা হয়।

পরে জানা যায় পুরোটা ছিলো র’এর সাজানো অপারেশন যাই হোক, বিমান ছিনতাই এর এ সন্ত্রাসী ঘটনার অজুহাতে তাৎক্ষণিকভাবে ভারতীয় সরকার ভারতের উপর দিয়ে পাকিস্তানের বিমান চলাচল নিষিদ্ধ করে। এর ফলে পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে পূর্ব পাকিস্তানের আকাশপথে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। আর এন কাও এর এই গোপন অপারেশনের ফলশ্রুতিতে আকাশপথে পাকিস্তানের সৈন্য এবং সামরিক সরঞ্জাম পরিবহন ব্যাহত হয়।“

১০) চেচনিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধের অজুহাত সৃষ্টি এবং পুতিনকে ক্ষমতাসীন করার লক্ষ্যে রাশিয়ার কেজিবি রাশিয়ার বিভিন্ন স্থানে বিস্ফোরণ ঘটায়।

১১) তুরস্কে বিদ্রোহী দলকে দমন করার অজুহাত সৃষ্টি করার লক্ষ্যে বিস্ফোরণ ঘটানোর সময় সরকারী বাহিনী ধরা পরে।

* ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘রিসার্চ এন্ড এনালিসিস উইং’ বা ’র’ এর সাবেক অফিসার আর.কে. যাদব ইংরেজিতে “একাত্তরের বাংলাদেশ যুদ্ধঃ ‘র’ শিরোনামে একটি প্রবন্ধে লিখেছেন, …… “১৯৭০ এ পাকিস্তানের জাতীয় নির্বাচনের আগেই সেদেশের আর্মি, রাজনীতিবিদ এবং কূটনীতিবিদের বিভিন্ন জায়গায় থাকা র’ এর সোর্সরা পরিস্কারভাবে জানিয়ে দিয়েছিলো, নির্বাচনে যদি শেখ মুজিবুর রহমান কোনভাবে জিতেও যায় তবু তার হাতে শেষপর্যন্ত পাকিস্তানের ক্ষমতা দেয়া হবে না। এসময় আমরা জানতে পারি পশ্চিম পাকিস্তান থেকে বিপুল পরিমাণ সেনা সদস্যদেরকে পূর্ব পাকিস্তানে বিমানপথে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। তখন র এর প্রধান কাও ভারতের মাটির উপর দিয়ে আকাশপথ ব্যবহারের এ সুযোগ বন্ধ করে দিতে এই নিখুঁত অপারেশনের পরিকল্পনা করেন।

১২) ৯/১১-
আগস্ট ২০০৬, হাওয়ারড/ ওহিও বিশ্ববিদ্যালয়ের এক জাতীয় সমীক্ষা অনূসারে, ৩৬ শতাংশ অ্যামেরিকাবাসী বিশ্বাস করেন যে, ৯/১১ ছিল একটি “ইনসাইড জব” (Inside Job) অর্থাৎ “অভ্যন্তরীণ কর্ম”, যার সাথে সরকারী সংস্থা সমূহের সম্পৃক্ততা রয়েছে। মে ২০০৬ সালের এক পথ সমীক্ষা অনূসারে ৪২ শতাংশ অ্যামেরিকাবাসী সরকারী ব্যাখ্যা এবং ৯/১১ কমিশন সত্য গোপন করছে বলে বিশ্বাস করেন। এছাড়াও, অগনিত লেখক- গ্রন্থকার, সাংবাদিক, গবেষক এবং গনমাধ্যম ব্যক্তিত্ব এমন কি ৯/১১ ঘটনাকে একটি “ইনসাইড জব” ঘোষণাও প্রদান করেন।

৯/১১ এবং তদ্রূপ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের পেছনে কার কালো হাত ছিল, সে সম্পর্কে আলোকপাত করতে গিয়ে কতিপয় গ্রন্থকার কথিত সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা সম্পর্কিত কিছু বাস্তব বিষয়ে তাঁদের অভিমত তুলে ধরেন। তারমধ্যে, তেল শিল্পে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা কল্পে, ইরাকের মত বিভিন্ন রাষ্ট্রের তেল সম্পদ অধিকার করতে যুক্তরাষ্ট্র এবং যুক্তরাজ্যের নেতৃত্বে পরিচালিত বিবিধ প্রচেষ্টার দিকে লেখক- গ্রন্থকার গ্রিফিন, সিকার, জোন্স এবং রূপার্ট প্রমূখ ইঙ্গিত করেন। ইরাক দখল করার মাধ্যমে, তেলের মূল্য বৃদ্ধি করে যুক্তরাষ্ট্র এবং যুক্তরাজ্যের বাণিজ্যিক সংস্থা সমূহ বিশাল স্বল্প মেয়াদি মুনাফা লাভ করতে সক্ষম হয়। মাইকেল রূপার্ট যথার্থই ইঙ্গিত দেন যে, যখনই তেলের উৎপাদন এবং সরবরাহ তুঙ্গে উঠে, ভারত এবং চিনে তেলের চাহিদা বৃদ্ধি পেতে থাকে, তখনই তেলের মূল্য আকাশচুম্বী করার মাধ্যমে এই দুই রাষ্ট্রের তেল কোম্পানি সমূহ দীর্ঘমেয়াদী মুনাফা অর্জন করতে থাকে। সেকারণেই, গুরুত্বপূর্ণ তেল শিল্পে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সুদূর ভবিষ্যতেও বৈশ্বিক অর্থ বাজারে এই সব বাণিজ্যিক সংস্থা সমুহের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হবে।

৯/১১ সম্পর্কিত গ্রন্থকারগণ আরও দাবী করেন যে, ইরাকের বিরুদ্ধে যুদ্ধের মাধ্যমে শুধুমাত্র তেল কোম্পানি সমূহই নয়, বরং বিশ্বের সর্ব বৃহৎ অস্ত্র সরবরাহকারী যুক্তরাষ্ট্রের সমরাস্ত্র শিল্প বিশাল অংকের মুনাফা অর্জন করে। মূলত, যুক্তরাষ্ট্রের কর্পোরেট ঠিকাদারদের স্থায়ী আর্থিক মুনাফা অর্জনে পেন্টাগনের নিকট যুদ্ধাস্ত্র সামগ্রী বিক্রয় করার জন্য অনির্দিষ্টকালব্যপী “কল্পিত সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ” ঘোষণার প্রয়োজন, যে সকল অস্ত্র যুক্তরাষ্ট্র অপছন্দনিয় রাষ্ট্র সমূহের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক অভিযান পরিচালনা কালে ব্যবহার করবে। এমন কি, অস্ত্র কোম্পানি সমুহের মুনাফা নিশ্চিত করতে “নিরাপত্তা হুমকি” প্রসূত একটি চিরস্থায়ী যুদ্ধাবস্থাও বজায় রাখা প্রয়োজন।

৯/১১ গ্রন্থকারগণ, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক আধিপত্য এবং বানিজ্যিক মুনাফার সাথে কল্পিত সন্ত্রাস বিরোধী যুদ্ধের সম্পর্ক অকাট্য যুক্তি দিয়ে প্রতিষ্ঠিত করেন। প্যাক্স আমেরিকানা তত্ত্ব অনুসারে, বিশ্বব্যাপী মার্কিন আধিপত্য প্রতিষ্ঠার স্থির লক্ষ্য সামনে রেখে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি চালিত হয়। গ্রিফিন, জোন্স, রুপেল্ট এবং সিকার যুক্তি দেখান যে, বুশ প্রশাসনের “দুর্বৃত্ত রাষ্ট্র সমূহ সন্ত্রাস লালন করছে এবং তাঁদেরকে প্রদান করার জন্য গনবিধ্বংসী অস্ত্র তৈরি করা হচ্ছে”, এরূপ দাবীর পিছনে বুশ প্রশাসনের উদ্দেশ্য হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য বিরোধী রাষ্ট্র সমুহের বিরুদ্ধে স্বতপ্রণোদিত যুদ্ধ ঘোষণা করে তাঁদের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা।২৩

শুধু তাই নয়, অসংখ্য নমুনা, নিদর্শন, সরকারি নথিপত্র এবং দলিলাদি প্রমাণ করে যে, ৯/১১ সংগঠিত হওয়ার সাথে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের বিভিন্ন অঙ্গের যোগসাজশ এবং সম্পৃক্ততা ছিল। ৯/১১ কে স্বতপ্রণোদিত যুদ্ধ, সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন, নিপীড়ন, নাগরিক অধিকার হরণ এবং ভিন্নমত পোষণকারীকে দুষ্কৃতিকারী হিসেবে (চিহ্নিত) করতে তথা বিশ্ব ব্যবস্থাকে আশঙ্কাজনক ভাবে রূপান্তরিত করতে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।

অনেক অনুসন্ধিৎসু ব্যক্তিত্ব এবং বিশেষজ্ঞ ৯/১১ পর্যবেক্ষণ করে কিছু বিষয়ের উপর আলোকপাত করেছেন, যেমনঃ

১) আক্রমণ চলাকালে, মালটি-ট্রিলিয়ন ডলার প্রতিরক্ষা অবকাঠামো সম্পন্ন “নর্থ অ্যামেরিকান এরোস্পেস ডিফেন্স কমান্ড” বা “নোরাদ” এয়ার ডিফেন্স প্রায় দেড় ঘন্টা সময়ের মধ্যেও, ফ্লাইট ৯৩ পেনসিলভানিয়ায় বিধ্বংস হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত, কোন একটি বিমানকেও রোধ করতে সক্ষম হয়নি, যদিও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি বিমান ঘাটিতে নিয়মিত “পাঁচ মিনিটে সতর্কাবস্থা”র মাধ্যমে তৈরি হওয়ার প্রশিক্ষণ এবং অভ্যন্তরীণ আকাশ সীমায় জরুরী অবস্থা মোকাবেলার জন্য অসংখ্য জঙ্গি বিমান নিয়োজিত রয়েছে।

এছাড়াও, ঐ দিন সকাল থেকেই “ভিজিলান্ট গার্ডিয়ান”, নর্দার্ন ভিগিলান্স”, এবং “গ্লোবাল গার্ডিয়ান” নামক বিবিধ সামরিক মহড়া চলছিল, যেখানে বিশেষ করে “বিমান ছিনতাই” ও “বিমান দুর্ঘটনা” যেমন, কোন সরকারী ভবনে বিমান বিধ্বংস হওয়া সহ বিবিধ বিষয়ের অনুশীলন চলছিল। এদের কারো বিরুদ্ধেই কোন অভিযোগ আনা হয় নি। একই সময়ে, একই ধরণের মহড়ার আয়োজন সন্দেহজনক বৈ কি! এছাড়াও, দৈবক্রমে ঐ দিন ডিক চেনিই ছিল সকল মহড়া, প্রশিক্ষণ এবং প্রকৃত “টুইন টাওয়ার” আক্রমণ প্রতিরোধে পাল্টা সামরিক পদক্ষেপ নেয়ার সর্বোচ্চ কম্যান্ড কর্তৃপক্ষ।

২) সান ফ্রানসিসকো মেয়র উইলি ব্রাউন এবং উচ্চপদস্থ পেন্টাগন কর্মকর্তাদের বার বার ৯/১১তে আকাশ পথে ভ্রমন করতে নিষেধ করা হয়। প্রশ্ন হচ্ছে, কারা নিষেধ করেছিল এবং কেন?

৩) ৯/১১ এর পূর্ব পর্যন্ত আগুনের কারণে কখনোই লৌহ নির্মিত ফ্রেমে তৈরি ভবন ধ্বসে পরেনি। শুধুমাত্র সামান্য আগুন এবং ছোটখাট কাঠামোগত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া ৭ নং ভবনটি বিকাল ৫ টায় ধ্বংসস্তুপের একটি পরিপাটি স্তূপে ঢুকে পরে। এই ভবনটি এমন কি টুইন টাওয়ারের মূল ভবন দুটি ধ্বসে পরার সকল বৈশিষ্ট “নিয়ন্ত্রিত ধ্বংস”এর (CONTROLLED DEMOLITION) সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বিবিধ ‘এফ বি আই’ তদন্ত কর্ম যেসব দিয়ে ৯/১১ রহস্যের স্বরূপ উদ্ঘাটন করা যেত, উচ্চপদস্থ এফবিআই কর্মকর্তাগণ সেসব সম্পূর্ণরূপে বিনষ্ট করে দেয়।

৪) সেপ্টেম্বর ২০০০, নিউ-কন থিঙ্ক ট্যাঙ্ক, “প্রোজেক্ট ফর দ্য নিউ অ্যামেরিকান সেঞ্চুরি, (PNAC)” তাঁদের সাম্রাজ্যবাদী স্বপ্ন সম্বন্ধে আলোকপাত করতে বলেন, “পার্ল হারবর”* এর মত নতুন কোন সর্বনাশা এবং অনুঘটক ঘটনা না ঘটা পর্যন্ত, “রূপান্তরের প্রক্রিয়া”, এমন কি তা যদি বৈপ্লবিক পরিবর্তনও আনে, তা হবে সময় সাপেক্ষ। পিএনএসি (PNAC) এর সদস্যদের মধ্যে রয়েছে বুশ প্রশাসনের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ যেমন, ডিক চেনি, ডোনাল্ড রামসফেল্ড, ওলফোভিতস, লিবি এবং পেরল প্রমূখ।

অর্থাৎ, ৯/১১ হয়ে আছে “ফলস ফ্ল্যাগ সন্ত্রাস” এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

বাংলাদেশে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের প্রকৃতি

নিরাপত্তা বিশ্লেষক, দেশি-বিদেশী গোয়েন্দা সংস্থা, সন্ত্রাসবাদ বিষয়ের সাংবাদিক, নিরাপত্তা নীতিমালা তৈরির সঙ্গে যাঁরা যুক্ত, তাঁদের কাছে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের বিষয়টি প্রায় দুই দশকের পুরোনো। বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ সূলভ সহিংসতার সূচনা নব্বই দশকে। বাংলাদেশে সন্ত্রাসী বা জঙ্গি কর্মকাণ্ডের কার্যত প্রকাশ ঘটেছিল ১৯৯২ সালের ৩০ এপ্রিল জাতীয় প্রেসক্লাব, ঢাকায় ।

বিগত কয়েক বৎসর যাবত, বাংলাদেশে এক শ্রেণির মানুষ বাংলাদেশকে বিশ্ব দরবারে একটি জঙ্গি রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত করাতে উঠেপড়ে লেগেছে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করার পর থেকেই। ধর্ম নিয়ে একের পর এক ব্যাঙ্গাত্মক মন্তব্য করে আলোচিত হওয়া রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বিভিন্ন সময়ে মুসলমান সাংবাদিকদের উদ্দেশ্য করে উস্কানিমূলক মন্তব্য করেছেন। প্রেস কনফারেন্সের সময় প্রথম আলোর এক সাংবাদিক তাকে ধর্ম অবমাননাকর মন্তব্য করতে নিষেধ করলে তার জবাবে রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেন, “দেশ কি আপনার বাবার? আপনার বাবা কি হাজি সাব? তাহলে আপনি সৌদি যান। এই দেশে কোনো ধার্মিকের জায়গা নেই।”

সবচেয়ে দুঃখজনক মন্তব্যটি করেছেন বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি। ভারতে গিয়ে তিনি বলে এসেছেন, বাংলাদেশে আইএস আস্তানা গেড়েছে। একজন প্রধান বিচারপতির মুখ থেকে এমন কথা বের হওয়াতে দেশবাসী চমকে উঠেছিল।
বিদেশে বসবাসরত একজন কলাম লেখক একটি বহুল প্রচারিত দৈনিকে লিখেছেন, বাংলাদেশে আইএস না থাকলেও জঙ্গি আছে।

বিগত দুই দশক যাবতই আমরা শিকার হচ্ছি সন্ত্রাসী বা জঙ্গি সূলভ নাশকতার। সরকারিভাবেও দেশে আইএস এবং ভারতীয় উপমহাদেশে আল-কায়দার শাখার লোকজন রয়েছে বলে আমরা প্রচারণা শুনি।

২০১৪ সালের জুলাই থেকে ২০১৫ সালের জুন পর্যন্ত এক বছরের সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবরগুলো আমাদের এ বিষয়ে পরিস্থিতি বুঝতে সাহায্য করতে পারে। কিন্তু এক দেড় বছর যাবত কথিত আইএসের সম্ভাব্য উপস্থিতির কথা বলার পাশাপাশি ক্ষমতাসীন দল ও সরকার এর কারণ অনুসন্ধান, কারা এ ধরনের সংগঠনে যুক্ত হতে পারে, তা চিহ্নিত করায় এবং তা মোকাবিলায় কী ব্যবস্থা বিবেচনা করেছে তা সাধারণের কাছে ঘোলাটে রয়ে গেছে।

বাংলাদেশে ব্লগার, বিদেশী হত্যার ঘটনা এবং সেসব হত্যার দায়িত্ব স্বীকারসূচক বিবৃতির প্রেক্ষাপটে এই বিবৃতিকেও কেউ কেউ গ্রহণযোগ্য মনে করেছেন, কারও কারও মনে সংশয় তৈরি হয়েছে। তারপর সরকারের পক্ষ থেকে সুস্পষ্টভাবেই বলা হয় যে দেশে আইএসের অস্তিত্ব নেই।

ধরে নেয়া যায় যে বাংলাদেশে প্রায় সকল জঙ্গিবাদ সূলভ সহিংসতার সঙ্গেই জড়িয়ে আছে বিদেশি সংশ্লিষ্টতা। তবে এই বিদেশী সংশ্লিষ্টতার বিষয়টির প্রকৃত রূপ নির্ণয় করা সম্ভব তখনই হবে, যখন জানা যাবে, এসব ঘটনায় কোন দেশের স্বার্থ চরিতার্থ হচ্ছে! কোন দেশ আমাদের দেশে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চাচ্ছে।

রাজনৈতিক সন্ত্রাসের সমূহ কারণ বিদ্যমান থাকা স্বত্বেও, এসব পাশ কাটিয়ে বাংলাদেশে সংগঠিত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড সমূহকে স্পষ্টতই ধর্মীয় রূপে প্রচারিত এবং প্রতিষ্ঠিত করা হচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার সিংহ ভাগ যেখানে মুসলমান, যেখানে তাদের রয়েছে নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির মাধ্যমে দাবি আদায়ের সুযোগ, এই সিংহ ভাগ মুসলমানই অধিকাংশ রাজনৈতিক দলের অংশ, তারা কেন বিচ্ছিন্নভাবে “মুসলমান সম্প্রদায়” এর ব্যানারে একত্রিত হয়ে সন্ত্রাসী পন্থার আশ্রয় নিবে? এরূপ ভাবা হাস্যকর নয় কি? কেউ যদি দাবি করে শুধু নির্দিষ্ট কোন দলের মুসলমানগণ এই সব সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছেন বা সমর্থন করছেন, তাহলে সকল মুসলমানদের পরিচয় নিয়েই প্রশ্ন উঠে, এরা কোন মুসলমান এবং ওরা কোন মুসলমান? মুসলমানদের মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টি করে কে লাভবান হবে?

তারপর প্রশ্ন থাকে, কোন দল বা সংগঠনের আন্দোলন করার মাধ্যমে দাবি আদায়ের সম্ভাবনা থাকলে, তারা কেন সন্ত্রাসী পন্থার আশ্রয় নিবে? যে সকল দলের নেতা কর্মীদের জন্ম এই মাটিতে, যাদের পরিবার, সমাজ এই মাটিরই অংশ, তারা কেন নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের পথ পরিহার করে, গুপ্ত পন্থার আশ্রয় নিবে? ২০ কোটি মানুষ রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে বিভক্ত হলেও প্রতিটি দলেই থাকবে অন্ততপক্ষে কয়েক কোটি মানুষ। একটি দেশের কয়েক কোটি মানুষ যদি সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সমর্থক হয়, তাহলে দেশে যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করবে। তাদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডেও থাকবে ধারাবাহিকতা এবং সুনির্দিষ্ট বৈশিষ্ট। সবচাইতে বড় কথা হচ্ছে যে, কয়েক কোটি সন্ত্রাসী বা সন্ত্রাস সমর্থকদের বিদেশী সংশ্লিষ্টতার বিশেষ প্রয়োজন আছে কি?

বাংলাদেশের সকল বিরোধী রাজনৈতিক দল সমূহের সরকার বিরোধী অবস্থান সাপে- নেউলের মত হলেও, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের কোন প্রয়োজন নেই কারণ যুগপৎ অসহযোগ আন্দোলনই তাদের লক্ষ্য অর্জনে যথেষ্ট। সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে কেউই রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জন করতে পারবে না, তা তারা ভালভাবেই উপলব্ধি করতে পারেন। তাছাড়া, বিরোধী দল অতীতে সরকারও গঠন করেছিলেন, তাদের রয়েছে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এবং অভ্যন্তরীণ সমর্থক শক্তি। তাই, তাদের দ্বারা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের দাবীর কোন ভিত্তি থাকতে পারে না।

তদুপরি, বাংলাদেশে সংগঠিত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড সমূহ সংগঠিত হওয়ার পূর্বে তাদের কি দাবি দাওয়া ছিল বা সরকারের কাছ থেকে কি আদায়ে ব্যর্থ হয়ে সন্ত্রাসী পন্থার আশ্রয় তারা নিয়েছে? এ সকল প্রশ্ন থেকে যায় উত্তর বিহীন।
বিদেশি সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি যদি ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হয়, তাহলে কোন বিদেশি রাষ্ট্র এ সবের সাথে সংশ্লিষ্ট তা নির্ধারণ করা দুরূহ হলেও, বিদেশি সংশ্লিষ্টতার পক্ষে যুক্তি খুঁজে পাওয়া যায়। যেমন, অনুষ্ঠিত ঘটনা সমূহের আয়োজন, প্রস্তুতি, প্রচার কৌশল, সকল সন্ত্রাসীরই সামঞ্জস্যহীন মৃত্যু বা ধৃত সন্ত্রাসীদের পরিচয় নিয়ে অস্বচ্ছতা, তাদের কোন আত্নপক্ষ সমর্থনের সুযোগের অভাব, সংশ্লিষ্ট সন্ত্রাসীদের অত্যাধুনিক সামরিক প্রশিক্ষণ, সন্ত্রাস কর্ম সম্পাদনে নৈপুণ্য, নিরাপদে প্রস্থান সব কিছুর বিচারে বিদেশি বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত বাহিনীর সংশ্লিষ্টতা প্রমাণ করে। অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সন্ত্রাসের রূপ এমন সুসংগঠিত হতে পারে না।

তাই, কোন বিদেশি শক্তির পক্ষে, সাফল্যজনক ভাবে একের পর এক “ফলস ফ্ল্যাগ” সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড সম্পন্ন করে, দেশের জনগণকে বিভ্রান্তি ও আতঙ্কের মধ্যে নিক্ষেপ করে স্বীয় লক্ষ্য বাস্তবায়নে একের পর এক সাফল্য অর্জন করা সম্ভব হচ্ছে সে বিদেশি শক্তিকেই দেশবাসীর চিহ্নিত করতে হবে।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 5 = 1