ইউরোপে ইহুদী বিদ্বেষের ঐতিহাসিক কারণ

তাছাড়া, আডলফ হিটলার বা জার্মান জনগণই প্রথম ইওরোপীয় জনগোষ্ঠী ছিলনা, যারা ইহুদী বিদ্বেষী ছিল বরং তারা ছিল সর্বশেষ।

জার্মানগন বিশেষ করে আডলফ হিটলার কি কারনে ইহুদী বিদ্বেষী ছিল?

ইতিহাস সাক্ষীদেয়, শুধুমাত্র আডলফ হিটলার বা জার্মান জনগণই ইহুদী বিদ্বেষী ছিলনা বরং খৃষ্টীয় ইওরোপের সকল সমাজই বিভিন্ন ধর্মীয়, অর্থনৈতিক, বিশেষতঃ ইহুদীদের কিছু ধর্মীয় কৃষ্টির কারনে তাদের প্রতি বিদ্বেষ ভাবাপন্ন ছিল।

তাছাড়া, আডলফ হিটলার বা জার্মান জনগণই প্রথম ইওরোপীয় জনগোষ্ঠী ছিলনা, যারা ইহুদী বিদ্বেষী ছিল বরং তারা ছিল সর্বশেষ।

উদাহরনস্বরূপ বলা যায়, সমস্ত ইওরোপ জুড়েই নিরবচ্ছিন্ন ভাবে অসঙ্খ ইহুদী অত্যাচার ও হত্যার শিকার হতো। যেমন, ১২৯০ খৃষ্টাব্দে ইংল্যান্ড থেকে, ১৩০৬ এবং ১৩৯৪খৃষ্টাব্দে ফ্রান্স থেকে, ১৩৪৯ এবং ১৩৬০ খৃষ্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে হাঙ্গেরি থেকে, ১৪২১ খৃষ্টাব্দে অস্ট্রিয়া থেকে, ১৪০০ থেকে ১৬০০খৃষ্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে জার্মেনী থেকে, ১৪৪৫ ও ১৪৯৫ এর মধ্যবর্তী সময়ে লিথুয়ানিয়া থেকে, ১৪৯২ খৃষ্টাব্দে স্পেন থেকে, ১৪৯৭ খৃষ্টাব্দে পর্তুগাল থেকে, ১৭৪৪-৪৫ খৃষ্টাব্দে বহেমিয়া এবং মরাভিয়া থেকে বিতাড়িত হয়। ১৫০০ এবং ১৭৭২ খৃষ্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে তাদেরকে রাশিয়াতে প্রবেশ করতে দেয়া হয় নাই। এক সময় প্রবেশ করতে দেয়া হলেও, তাদেরকে “পেল অব সেটেলমেন্ট” এর মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট এলাকায় বসবাস করার অনুমতি দেয়া হয়। যে সব সমাজে তাদের বসবাসের অনুমতি দেয়া হয়, সে সকল সমাজের বেশীর ভাগেই প্রায়শই বিভিন্ন রকমের অত্যাচারের শিকার হতে হয়, তবে তারা শুধু বহিরাগত ছিল বলে নয়, বরং বিশেষতঃ আশ্রয় দাতা সমাজের জনগন বিশ্বাস করত যে, ইহুদিরা তাদের ধর্মীয় কৃষ্টি, সামাজিক রীতি কলুষিত, জাতীয় আনুগত্যের অপব্যাবহার এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের অনিষ্ঠ সাধন করবে।

যেহেতু, প্রাচীনকাল থেকেই ইহুদীরা বিশ্বের অন্যান্য অ-ইহুদী ধর্মীয় যেমন খৃস্ট ধর্মীয় বা ধর্মনিরপেক্ষ দেশ বা সমাজকে পরিবর্তন করাকে তাদের বিশেষ দায়িত্ব মনে করে এমনকি, প্রতিদিনের প্রার্থনায় তারা এ বিষয়ে সাফল্য কামনা করে। এরূপ মনোভাব এবং চেষ্টার মাধ্যমে তারা আশ্রয়দাতা সমাজ সমূহের জনগনের মনে প্রচন্ড উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার সৃষ্টি করে।

তাছাড়া, নিউ টেস্টামেন্ট অনুসারে, যিশুখৃষ্টের ইহুদী অনূসারী জুদাস ইস্কারিয়ট (মার্ক১৪ঃ৪৩-৪৬), রোমান গভারণর পন্টিয়াস পিলেট (জন ১৯ঃ১১, এক্টস ৪ঃ২৭), ইহুদী ধর্মীয় নেতাগন এবং জেরুজালেমের অধিবাসীরা যিশুর হত্যাকারী ছিল বিধায় খৃষ্টান গন ইহুদীদের প্রতি বিরুপ ভাবাপন্ন ছিলেন। যিশুর মৃত্যুর পর, ইহুদী ধর্মযাজকগন জেরুজালেমে যিশুর অনুসারীদের প্রতি নিষ্ঠুর আচরন করতেন, তাদের অনেককেই জেলে পূরে, এমনকি পাথর নিক্ষেপ করে হত্যাও করে।
প্রকৃতপক্ষে, ৭০খৃষ্টাব্দে রোমানদের দ্বারা ইহুদীদের রাষ্ট্র ধ্বংসপ্রাপ্ত হলে, তার পর থেকে ক্রমান্বয়ে ইহুদী বিদ্বেষ বৃদ্ধি পেতে থাকে। ঐ সময়ে জেরুজালেমের ইহুদীগন রোমান সম্রাটের বিপক্ষে বিদ্রোহ করলে, রোমান সেনাগণ জেরুজালেম বিধ্বংস করে এবং ইহুদীদেরকে হত্যা এবং অনেককেই বিতাড়িত করে। ঐসময়ের পর থেকে সুদীর্ঘ আঠারশ আটাত্তর বৎসর (১৮৭৮ বৎসর) পর্যন্ত অর্থাৎ ১৪ই মে ১৯৪৮ সনের পূর্ব পর্যন্ত ইহুদীদের নিজস্ব কোন রাষ্ট্র ছিলনা।

সিনাগগের গ্রন্থাগারের “এন্সাইক্লপেডিয়া জুডাইকা” এবং তাদের মধ্যে সবচেয়ে তথ্যবহুল “জুইশ এন্সাইক্লপেডিয়ার” পাতা তন্ন তন্ন করে ঘেটে ধর্মযাজক টেড পাইক তার সুবিখ্যাত প্রামান্য চিত্র “দ্য আদার ইসরায়েল” এর জন্য তথ্য সংগ্রহ করেন, তার ভাষায়ঃ

আনুমানিক ১১ খৃষ্টাব্দে ব্যাবীলনের অধিবাসীগন স্বীয় সমাজকে কলুষতা মুক্ত রাখার নিমিত্তে প্রতারণাপূর্ণ এবং অসাধু ইহুদীদেরকে বিতাড়িত করে।
যে ইহুদী সমাজ প্রায় ষোল শ বৎসর ব্যাবীলনে বসবাস করত, তাদেরই অধিকাংশ উত্তর আফ্রিকা এবং মধ্য ইউরোপ হয়ে, পশ্চিম ইউরোপের বৃহৎ বৃহৎ শহর সমূহের আশেপাশে তাদের নতুন আবাস স্থানের সন্ধান করে।

পরবর্তী শতাব্দীর মধ্যে বিতাড়িত ইহুদীরা আশ্রয়দাতা দেশ সমূহের সমাজে মিশে যেতে সচেষ্ট হয়। তাদের অনেকেই সমগ্র রোম সাম্রাজ্য জুড়ে ছড়িয়ে থাকা ইহুদী বিদ্রোহীদের সন্ধান করতে থাকেন এবং রোম সাম্রাজ্যের সীমান্ত এলাকা জুড়ে বিশেষতঃ ওরমস (Worms), স্পেয়ার (Speyer), মাইনস (Mainz), কোলন (Cologne) এবং অনেক রাইনল্যন্ড শহর সমূহে বসবাস করতে শুরু করেন।
পরবর্তী কয়েক শতাব্দীর মধ্যে অনেক বিতাড়িত ইহুদীই আশ্রয়দাতা দেশ সমূহের সমাজ জীবনে মিশে যেতে সক্ষম হলেও, অনেকেই তাদের পূর্ব-পুরুষদের ধর্মীয় কৃষ্টি, আচার-অনুশঠান দৃঢ় ভাবে আগলে রাখে। এভাবে তারা নিজেদেরকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অদ্যাবধি ধর্মীয় এবং জাতিগতভাবে সংখ্যালঘু হিসাবে পরিগনিত করে।

সমযের সাথে তারা শুধু ইউরোপেই নয় বরং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও বিভিন্ন উপায়ে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। শুধু তাইনয়, বিভিন্ন কূট কৌশল, প্রতারণা, উচু হারে সূদের ব্যাবসার মাধ্যমে তারা প্রচুর অর্থ- সম্পদের মালিক এমনকি প্রভাবশালীও হয়ে উঠে। তারা পর্যায় ক্রমে বড় বড় ব্যাঙ্ক, বিমা, শিপিং, ইন্ডাস্ট্রির মালিক হতে সক্ষম হয়। উপরন্তু, ইউরোপের বিভিন্ন রাষ্ট্রে রাষ্ট্রীয় নীতি- নির্ধারণেও অংশ গ্রহন করতে সক্ষম হয়।

তবে, ইহুদিগন জার্মানিতে যে সুযোগ সুবিধা পেত, পৃথিবীর অন্য কোন দেশেই তারা সে ধরনের সুযোগ সুবিধা পায় নাই।

জায়নিস্টগন দাবী করে যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে জার্মান সেনাবাহিনী বিভিন্ন অঞ্চলে ষাট লক্ষ ইহুদীদের হত্যাকরে। ঐতিহাসিকগণ এই ইহুদী হত্যার বিষয়টি নিয়ে অনেক গবেষণা করেন এবং প্রমানাদির ভিত্তিতে এরূপ ধারনায় উপনীত হন যে, যেহেতু সমস্ত ইউরোপ জুরেও ষাট লক্ষ ইহুদী ছিলনা, তাই এই সংখ্যা সঠিক হতে পারেনা। অনেকেই, সন্দেহ করেন যে রাজনৈতিক উদ্দ্যেশ্য যেমন, প্যালেস্টাইন হাতিয়ে নেয়ার ষড়যন্ত্র চরিতার্থ করার জন্য তারা নিজেরাই ইহুদী নিধনে অংশগ্রহন করে, কারন বেশীর ভাগ ইহুদী বিশেষ করে রাব্বাই গন জায়নিস্টদের প্যালেস্টাইন পরিকল্পনার বিরুদ্ধাচরন করেন এবং দীর্ঘ দিন ইউরোপের জীবনে অভ্যস্ত ইহুদীগণও তাদের উন্নত ইউরোপীয় জীবন ত্যাগ করতেও তৈরি ছিলেন না।


প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইহুদীদের ভুমিকা

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মানদের শোচনীয় পরাজয়ের জন্য কেন জার্মানগণ ইহুদিদেরকে দায়ী করেন, সে সম্মন্ধে ইহুদী পরিবারে জন্মগ্রহণকারী বেঞ্জামিন এইচ, ফ্রিডমেন, তৎকালীন পত্রিকা “কমনসেন্স” এর পক্ষে ওয়াশিংটন ডি. সি.র উইলার্ড হোটেলে ১৯৬১ সালে অনুষ্ঠিত একসভায় বক্তৃতায়, বিশদ ব্যাখ্যা দেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তিনি ইহুদী সংগঠন পরিত্যাগ করেন। বেঞ্জামিন এইচ, ফ্রিডমেন ইহুদী সংগঠনের সরবচ্চ পদের একজন নেতা ছিলেন এবং ব্যারনারড বারুখ, সেমুএল উন্টারমাইয়ার, উড্র উইলসন, ফ্রাঙ্কলিন রুসভেল্ট, জসেফ কেনেডি, এবং জন এফ.কেনেডি সহ তৎকালীন অনেক প্রভাবশালী নেতাদের সাথে ব্যাক্তিগত ভাবে পরিচিত ছিলেন।

তিনি বলেনঃ
১৯১৪ সনের গ্রীষ্মে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়, যার এক পক্ষে ছিল যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া এবং অন্যপক্ষে জার্মেনি, অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি এবং তুরস্ক।

দুই বৎসরের মধ্যে জার্মেনি যুদ্ধে বিজয়ী হয়। শুধুমাত্র নামমাত্রেই নয়, প্রকৃত অর্থেও। তৎকালীন বিশ্বের চমক জার্মান সাবমেরিন সমূহ আটলান্টিক মহাসাগর থেকে সকল শত্রুপক্ষিয় যুদ্ধ জাহাজ সমূহকে ঝেটিএ বিদায় করে। যুক্তরাজ্যের সেনাবাহিনী গোলাবারুদের স্বল্পতা এবং মাত্র এক সপ্তাহের খাদ্যের যোগান নিয়ে (তারপর উপবাস এরূপ পরিস্থিতে) দিন গুনছিল। ঐ একই সময়ে ফরাসী বাহিনী আদেশ পালনে অস্বীকার করে, কারন ঐ গ্রীষ্মে ভেরদুন রক্ষা করতে ৬০০,০০০ ফরাসী তরুণের প্রান ঢলে। অন্যদিকে, রাশিয়ান বাহিনীর সেনারা যুদ্ধ ত্যাগ করে অস্ত্র হাতে নিয়ে স্বীয় গৃহের পথে পা বাড়ায়। ইটালীর সেনা বাহিনী সম্পূর্ণ ভাবেই বিধ্বস্ত হয়।

অন্যদিকে, জার্মানির মাটিতে একটি গুলিও আঘাত হানতে পারেনি, কোন শত্রু সেনা জার্মানির সীমানা অতিক্রম করতে সক্ষম হয়নি, তা স্বত্বেও জার্মানি যুক্তরাজ্যকে শান্তি চুক্তির প্রস্তাব দেয়। যুক্তরাজ্য ঐ প্রস্তাব গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করছিল, কারন এ ছাড়া তাদের কাছে কোন উপায়ও ছিলনা। হয়ত জার্মানদের উদার “শান্তি প্রস্তাব” মেনে নিতে হবে অথবা যুদ্ধ চালিয়ে রেখে সম্পূর্ণ পরাস্ত হতে হবে।

এমনই এক পরিস্থিতিতে, জার্মানিতে বসবাসরত ইহুদী জায়নিস্ট গন যারা পূর্ব ইউরোপের জায়নিস্টদের প্রতিনিধিত্ব করত, যুক্তরাজ্যের সামরিক মন্ত্রিসভায় গমন করে এবং সামরিক নেতাদের আশ্বস্ত করেন যে, তাদের আত্নসমর্পণের বা শান্তিচুক্তি গ্রহনের আদৌ কোন প্রয়োজন নেই বরং তাদের পক্ষে এখনও যুদ্ধে বিজয় লাভ করা সম্ভব। যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের পক্ষে যুদ্ধে অংশ নেয়, তাহলে তারা অবশ্যই যুদ্ধে জয় লাভ করতে সক্ষম হবে।

এমনকি তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের পাশে দাঁড়ানোর এবং তাদের পক্ষে যুদ্ধ করতে সম্মত করার অঙ্গীকারও করে, যদি যুক্তরাজ্য যুদ্ধে জয়ের পর প্যালেস্টাইন অঞ্চল জায়নিস্টদের প্রদানের প্রতিশ্রুতি দেয়। অন্য ভাবে বলতে গেলে, বলা যায় যে তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে, যুক্তরাজ্যের পক্ষে যুদ্ধে নামানোর বিষয়ে একটি রফাদফা করে নেয়। ১৯১৬ সালের অক্টোবর মাসে যুক্তরাজ্য জায়নিস্টদের প্রতিশ্রুতি প্রদান করে। অনতিকাল পরই, এতদকাল পর্যন্ত প্রায় সম্পূর্ণ ভাবেই জার্মানির পক্ষে থাকা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানির বিপক্ষে যুদ্ধে অবতীর্ণ হল।

যুক্তরাষ্ট্রের জার্মানদের পক্ষে থাকার কিছু কারনও ছিল। যেমন, যুক্তরাষ্ট্রের পত্র-পত্রিকা ইহুদীদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হতো, ব্যাঙ্ক সমূহ ইহুদীরা নিয়ন্ত্রণ করত, সকল মিডিয়া এবং গণ যোগাযোগ মাধ্যম সমূহ ইহুদীরাই নিয়ন্ত্রন করত, এই সকল ইহুদীরাই এযাবৎ কাল পর্যন্ত জার্মানদের পক্ষে ছিল। তাদের জার্মানদের পক্ষে থাকারও কিছু কারন ছিল। তারমধ্যে একটি কারন ছিল যে তাদের বেশীর ভাগই জার্মানি থেকেই যুক্তরাষ্ট্রে আগমন করে ছিল, এবং তারা চাইত জার্মানরা যেন রাশিয়ার জারকে চাপের মধ্যেরাখে। ইহুদীরা রাশিয়ার জারকে পছন্দ করত না এবং তারা চাইত রাশিয়া যেন যুদ্ধে পরাজিত হয়। যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থিত জার্মান-ইহুদী ব্যাংকার যেমন কূ’ন ল’ব (Kuhn Loeb) এবং আরও অনেক বড় ব্যাঙ্কিং কম্পানি ফ্রান্স এবং যুক্তরাজ্যের জন্য এক ডলারও খরচ করতে অস্বীকার করে। তাদের ভাষায়, “যতক্ষণ ফ্রান্স এবং যুক্তরাজ্য” রাশিয়ার সাথে একজোট থাকবে, এক সেন্টও নয়”। অথচ, তারা জার্মানিতেই প্রচুর অর্থ বিনিয়োগ করত, রাশিয়ার জারের বিপক্ষে জার্মানিকে যুদ্ধে সমর্থন করার জন্য।

অথচ ঐ ইহুদীগণই, যখন তারা প্যালেস্টাইন পাওয়ার সম্ভাবনা দেখতে পেল, যুক্তরাজ্যের সাথে দফারফা করে জার্মানির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করল। মুহূর্তের মধ্যে যেন ট্রাফিক লাইট সবুজ থেকে লাল হয়ে গেল। যেখানে সকল সংবাদ মাধ্যম এতকাল জার্মানদের সমর্থন করত, হঠাৎ করেই তারা জার্মানদের বিপক্ষে প্রচার শুরু করতে লাগল যে জার্মানরাই দুষ্ট, এবং অত্যাচারী “হান”। কিছু কাল পরই যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে।

লন্ডনে অবস্থিত জায়নিস্ট গন যুক্তরাষ্ট্রের জাস্টিস ব্রান্ডিসের নিকট বার্তা প্রেরণ করে, “প্রেসিডেন্ট উইলসনকে পটাতে কাজে লেগে যাও, আমরা যুক্তরাজ্যের কাছ থেকে প্যালেস্টাইন পেতে যাচ্ছি।”
এই ভাবেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জার্মানির বিপক্ষে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়।

অথচ প্রথম বিশ্বযুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণের পক্ষে কোন যুক্তিযুক্ত কারণই ছিলনা। জিয়নিস্টদের প্যালেস্টাইন পাওয়ার সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপদান করার উপায় হিসাবে যুক্তরাষ্ট্রকে ইউরোপের যুদ্ধে বিশেষভাবে জড়িয়ে দেয়া হয়েছে।

এই অন্তর্নিহিত কারন আমেরিকা বাসী কখনোই জানতে পারেনি। তারা কখনোই জানতে পারেনি কি কারনে তাদের দেশ ইউরোপীয় যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে।

আমেরিকা যুদ্ধ অংশ গ্রহনের পর, জিয়নিস্টরা ব্রিটেন গমন করে এবং ব্রিটিশ নেতাদের বলে, “ঠিক আছে, প্রতিশ্রুতি মোতাবেক আমাদের যা করণীয়, আমরা তা করেছি, এবার, তোমাদের প্রতিশ্রুতি মোতাবেক, যুদ্ধে বিজয়ের পর আমাদেরকে প্যালেস্টাইন প্রদান করবে তার প্রমাণ স্বরূপ কোন লিখিত দলিল দাও। যেহেতু কেউই জানতোনা, এই যুদ্ধ কতদিন স্থায়ী হবে, তাই তারা এক ধরনের “প্রাপ্তি রসিদের” দাবী করে। বিশ্ববাসী যাতে অনুধাবন করতে না পারে সে কারণে রহস্যপূর্ণ ভাষায় একরকম পত্রের আকারে এই রসিদ লেখা হয়, যা পরবর্তীতে “বালফুর ডিক্লারেশন” (Balfour Declaration) নামে পরিচিত হয়।

এই সময় থেকেই পরিস্থিতি সম্পূর্ণরূপে পালটে যায়। যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে যোগ দেয় এবং জার্মানিকে নিষ্পিষ্ট করে। যুদ্ধের পর জার্মানগণ ১৯১৯ সনের “প্যারিস পিস কনফারেন্স”এ যোগদানের উদ্দেশ্যে প্যারিস গমন করেন, যেখানে বেরনারড বারুখের নেতৃত্বে ইহুদীদের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য ১১৭ জন ইহুদী উপস্থিত ছিল।

“প্যারিস পিস কনফারেন্স”এ যোগদানকারী ইহুদীরা, যারা জার্মানিকে বিভিন্ন অংশে খন্ডিত করছিল, ইউরোপের বিভিন্ন দেশে তাদের অধিকার আছে বলে দাবী করছিল, তারাই নির্লজ্জের মত দাবী করে উঠে, “আমাদেরকে প্যালেস্টাইন দেয়া হোক” এবং প্রথমবারের মত তারা “বালফুর ডিক্লারেশন” সম্মন্ধে জার্মানদের নিকট প্রকাশ করল। জার্মানগণও প্রথম বারের মত জানল, “ও, তাহলে এই হল বিশ্বাস ঘাতকতার” পেছনে মূল কারন! এ কারনেই যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে যোগ দিয়েছে! প্রথম বারের মত তারা তাদের পরাজয় উপলব্ধি করতে পারল; এবং তাদের উপর একতরফা ভাবে যুদ্ধের দায়দায়িত্ব এবং ক্ষতিপূরণ চাপিয়ে দেয়া হল, কারন জায়নিস্টরা যে কোন মূল্যেই হোক না কেন প্যালেস্টাইন অধিকার করতে চাইত।

এই নাটকীয় পরিস্থিতি আমেরিকার জন্যও ছিল একটি আকর্ষণীয় সন্ধিক্ষণ। যখন জার্মানগণ এই বিষয়টি বুঝতে পারল, তখন তারা ইহুদীদের বিশ্বাসঘাতকতার জন্য খুব্ধ হয়ে উঠে। এযাবতকাল পর্যন্ত ইহুদিগন জার্মানিতে যে সুযোগ সুবিধা পেত, পৃথিবীর অন্য কোনদেশেই তারা সে ধরনের সুযোগ সুবিধা পায় নাই। যেমন, জার্মানির শিল্প ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানে বেরনারড বারুখের তুলনায় শতগুন গুরুত্বপূর্ণ মিঃ রাথেনাউ, দুইটি বৃহৎ জাহাজ পরিবহণ সংস্থা যেমন, “নর্থ জার্মান লয়েডস” ও “হাম্বুরগ-আমেরিকান লাইন্স” এর মালিক মি. বালিন এবং “হোহেনসলারন” পরিবারের ব্যাঙ্কার মিঃ ব্লাইশ্রডার। আরও ছিল,হামবুর্গের “ওয়ারবুরগ” পরিবার যারা ছিল বিশ্বের বৃহত্তম বাণিজ্যিক ব্যাঙ্কার। ইহুদীরা যে জার্মানিতে অনেক ভাল অবস্থায় ছিল তাতে কোন সন্দেহ নাই। জার্মানরা বুঝতে পারল, যে ইহুদীরা এত সুযোগ সুবিধা ভোগ করল, তারা শুধু জার্মানির সাথে বিশ্বাসঘাতকতাই করে নাই বরং তাদেরকে অর্থনৈতিক ভাবেও ধ্বংস করতে উদ্যত হয়েছে। এ সবই শুধু প্যালেস্টাইন পাওয়ার জন্য।

একটি কল্পিত উদাহরণ এর মাধ্যমে জার্মানদের প্রতি ইহুদীদের বিশ্বাসঘাতকতার বৈশিষ্ট অনুধাবন করা যায়। ধরে নেয়া যাক, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত। যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধে জয়ের সমূহ সম্ভাবনা দেখা দেয়, তবুও যুক্তরাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়নকে শান্তি-চুক্তিতে আহ্বান করে এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন সে প্রস্তাব গুরুত্ব সহকারে বিবেচনাও করতে থাকে। এমনই এক পরিস্থিতিতে কমুনিস্ট চায়না সোভিয়েত রাশিয়ার সাথে যুদ্ধে যোগ দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে পরাজিত করে। শুধু তাই নয়, যুদ্ধে মারাত্নক ভাবে পরাজয়ের পর তাদের উপর মানুষের বোধগম্য হওয়া দুস্কর, মেনে নেয়া অসম্ভব এমনই ক্ষতিপুরনের শর্ত চাপিয়ে দেয়া হয়। মনে করা যাক, যুক্তরাষ্ট্র পরে বুঝতে পারে যে, যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত চৈনিক জনগন যাদেরকে আমেরিকানগণ সমাজে প্রতিষ্ঠিত, যুক্তরাষ্ট্রের অনুগত নাগরিক মনে করত, তারাই চায়নাকে সোভিয়েত রাশিয়ার পক্ষে যুদ্ধে যোগদানের ব্যাবস্থা করে। এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের জনগন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত চৈনিক জনগোষ্ঠীকে কোন দৃষ্টিতে দেখবে?

তাদেরকে কি কেউ আমেরিকানদের রোষানল থেকে রক্ষা করতে পারবে? আমেরিকানদের অনুভুতি তখন কেমন থাকবে? ঠিক এমনই ছিল, ইহুদীদের প্রতি জার্মানদের মনোভাব।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “ইউরোপে ইহুদী বিদ্বেষের ঐতিহাসিক কারণ

  1. ভাল লিখেছেন। জার্মানীদের
    ভাল লিখেছেন। জার্মানীদের ইহুদী বিদ্বেষের কারণ এত বিস্তারিত জানা ছিল না। ইহুদীদের তাদের অঞ্চল থেকে ভূমিচ্যুত করার উপর একটা লেখা আশা করছি আপনার থেকে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

13 − = 3