আম্মু

২০০৯ সাল, তখন সবেমাত্র কলেজে উঠেছি । স্কুল শেষ হওয়ার পরেই প্রত্যেকটা উঠতি বয়সের ছেলেরা যেমন নিজেকে খুব বড় এবং জ্ঞানী মনে করে, আমিও তাদের দলে ছিলাম, অথবা তাদের চেয়ে এক ডিগ্রী উপরে । দুষ্টামির সীমা থেকে একটু বেশি আর বেয়াদবির সীমা থেকে অনেক বেশি । বয়সটাই তখন বেপরোয়া, বাধাহীন । যাই হোক, মূল কথায় আসি । কিছু ঘটনা বলবো আমার, মনোযোগ দিয়ে পড়বেন আশা করিঃ

ঘটনা-একঃ
আম্মুঃ উফফ !! এত্ত রোগী আসে, দেখতে দেখতে পাগল হয়ে যাচ্ছি । ঘর থেকে বের হতেই আর ভাল্লাগে না ।
আমিঃ তাইলে এক কাজ কর, বাসার নিচে একটা চেম্বার খুলে দেই, ওইখানে প্র্যাকটিস কর ।
আম্মুঃ ওইখানে তো সবাই চিনে, সবাই আসে । এখানে রোগী পাবো কই ? তুই এনে দিবি ?
আমিঃ হে হে হে ! আম্মু কাহিনী হইলো তুমি তো গাইনি ডাক্তার, আমি ক্যামনে তোমাকে রোগী আইনা দিবো ? (তারপর, মিনমিনিয়ে……) আর বিয়েও তো করি নাই, বিয়ে করলে নাহয় রো…………
আম্মুঃ কী !!!!
আমিঃ না বললাম, তুমি যদি হাড্ডি-গুড্ডির ডাক্তার হইতা, তাইলে নাহয় রোগী আনতে পারতাম আমি ।
আম্মুঃ ভাগ । বের হ ঘর থেকে………।।

ঘটনা-দুইঃ
আম্মুঃ জিহান, আমি তোর ভাষার ব্যবহার নিয়ে অনেক চিন্তায় আছি ।
আমিঃ ক্যান ?? আমি কী করলাম আবার ?
আম্মুঃ তোর কথা-বার্তা কেমন জানি, এভাবে কথা বলিস কেন ?
আমিঃ কই ? আমি তো ঠিক মতন কথা বলি !!!!
আম্মুঃ কে বলসে ? এই যে রাস্তা-ঘাটে চিৎকার করিস, রিকশাওয়ালা থেকে শুরু করে দোকানদার, দারোয়ান- সবাইকে “মামা” বলে ডাকিস, এগুলার মানে কি ?
আমিঃ আরে মামা, থুক্কু আম্মু, আসলে হইসে কি, রিকশাওয়ালা থেকে শুরু করে দোকানদার, দারোয়ান- সবাই তোমাকে “আপা” বইলা ডাকে । তো, ওই সেন্সে তো ওরা আমার মামাই লাগে । আর চিৎকার তো করি নাই কোনদিন, ওইটা তো আমার নরমাল ভয়েস ।
আম্মুঃ এগুলা তো এই বাসায় চলবে না । এখনো সময় আছে, ঠিক হয়ে যা ।
আমিঃ আরে, এত্ত প্যারা নাও কেন আম্মা ? ঠিক ই তো আসি ।
আম্মুঃ “প্যারা” মানে ?
আমিঃ না কিছুই না । আমি যাই ?
আম্মুঃ তুই আমার চোখের সামনে থেকে যা এখনি (জোরে ধমক) ।

ঘটনা-তিনঃ
আম্মুঃ তুই খাওয়া কমা । যেভাবে মোটা হচ্ছিস, কোন মেয়ে তো তোকে বিয়ে করবে না ! (চিন্তিত ভাব এবং আমাকে পচায়া দেয়ার খুশি)
আমিঃ হেহ !! কে বলসে তোমাকে যে মোটা হইলে বিয়ে করবে না কেউ ?
আম্মুঃ কে বলসে মানে ??
আমিঃ আসলে আম্মা, ব্যাপারটা কি জানো, ছোট মামা যদি এই চেহারা আর এই সাইজ নিয়া বউ পাইতে পারে, তাইলে তো আমি অনেক সুন্দর বউ পাবো । হেহেহেহে !!
আম্মুঃ (মুচকি হেসে) কিন্তু বউ আসলে তো তোকে প্রতিদিন পিটাবে !!
আব্বুঃ (কাবাব মে হাড্ডি হয়ে) তুই সারা জীবন যে পরিমাণ জ্বালাইসস, তোরে আমি ঢাকাইয়া কুট্টির সাথে বিয়া দিবো, তখন মজা বুঝিস ।
আমিঃ পিটাবে কেন ? (বরাবরের মত আব্বুকে পাত্তা না দিয়ে)
আম্মুঃ এই যে তুই ঘুম থেকে দেরি করে উঠিস, তোর শার্ট পাওয়া যায় ফ্যানের উপর, বই থাকে বিছানার নিচে, ঘর অগোছালো, বালিশের পাশে জুতা- এগুলা কি তোর বউ সহ্য করবে, আমরা করি, কিন্তু তোর বউ তো পিটাবে ।
আমিঃ আরে ধুর ! এগুলা কিছুই করবে না ।
আম্মুঃ তোরে বলসে !!
আমিঃ আম্মু শুনো, এই স্টার প্লাস দেখা বন্ধ করো, এগুলা দেইখাই তোমার মাথাটা গেসে ।
আম্মুঃ ওই তুই বাইর হ আমার ঘর থেকে, এখনি ভাগ ।

আম্মু, তুমি প্রতিদিন আমাকে দুই-তিন বার ঘর থেকে বের করে দাও । কিন্তু, তোমাকে অনেক ধন্যবাদ যে কোনদিন আমাকে তোমার নিজের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দাওনি । তুমি না থাকলে আমার কোন অস্তিত্ব থাকতো না । আমি জানি, আমি অনেক বেশি ভুল করি, প্রতি পদে পদে ভুল করি- কিন্তু প্রত্যেকবার তুমি আমাকে মাফ করে দাও । যখন কেউ পাশে থাকে না, সবাই চলে যায়- শুধু তুমিই পাশে থাকো; কেন থাকো জানিনা । ছোটবেলায় ইচ্ছাকৃত ভাবে আর এখন অনিচ্ছাকৃত ভাবে তোমাকে জ্বালাই আমি । জানিনা কেন খুব ভালো লাগে তোমাকে জ্বালাতে । তোমার বকা খাওয়ার মধ্যেও কেমন জানি একটা আনন্দ খুঁজে পাই । আম্মু, সবসময় পাশে থেকো । একদিন তোমার সব স্বপ্ন আমি পূরণ করবই ।
তোমার দীর্ঘায়ু কামনা করি । অনেক ভালবাসি তোমাকে আম্মু, অনেক অনেক বেশি ।

আম্মু, মা দিবসের শুভেচ্ছা ।। <3

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২ thoughts on “আম্মু

  1. খুব মজা পেলাম এবং ভালো লাগল
    খুব মজা পেলাম এবং ভালো লাগল লেখাটা পড়ে। আপনার আম্মু দীর্ঘজীবি হোন। উনাকে আমার শ্রদ্ধা জানাবেন, আর সাথে আপনি যে উনাকে নিয়ে এতো সুন্দর একটা লেখা লিখেছেন সেটা জানাতেও ভুলবেন না। আপনার আম্মু দেখবেন অনেক খুশী হবেন। কোটি টাকা দিয়েও সেই খুশী আপনি দিতে পারবেন না।

  2. ছোট্ট ছোট্ট ঠাট্টার মধ্যে
    ছোট্ট ছোট্ট ঠাট্টার মধ্যে হাসির উত্তরণ ঘটিয়ে মায়ের প্রতি অসাধারণ যে ভালোবাসা প্রকাশ করলেন তার জন্য :তালিয়া: :তালিয়া: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

40 − = 39