কোরান শরীফে ফিঙ্গারপ্রিন্ট এবং আরিফ আজাদের নানাবিধ অজ্ঞতা

অনেকসময় আমাদের বলা হয়, কোরান শরীফ সহ নানাবিধ ধর্মগ্রন্থে এমন অনেক কিছু আছে, যা বিজ্ঞান কিছুবছর আগে আবিষ্কার করেছে। এরই ধারাবাহিকতায় বলা হয় ১৪০০ বছর আগে কোরান শরীফে ফিঙ্গারপ্রিন্ট টেকনলোজির কথা বলা হয়েছে, যেখানে মাত্র দুইশ বছর আগে বিজ্ঞানীরা এর সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হয়েছেন। কিন্তু সত্যিই কী তাই? চলুন জানি, এটা কেন এক ভ্রান্ত ধারণা।

আরিফ আজাদ নামক এক ভদ্রলোক, এক মজার লেখা লিখেছেন(পড়ুন কপি পেস্ট করেছেন)। ভদ্রলোক যে আয়াত উল্লেখ করেছেন, তার অর্থ হচ্ছে, ‘আমি(আল্লাহ) অবিশ্বাসীদের আঙুলের ডগা পর্যন্ত তৈরী করতে সক্ষম’। যা থেকে তিনি এ স্থির সিদ্ধান্তে উপনীত হলেন যে এখানে মানুষের হাতের ফিঙ্গারপ্রিন্টের কথা বলা হয়েছে। যেহেতু ফিঙ্গার প্রিন্ট টেকনলোজির ইতিহাস দুইশ বছর আগের। আর কোরান শরীফ এসেছে ১৪০০ বছর আগে, তার মানে কোরান শরীফ একটি ঐশ্বরিক গ্রন্থ। বড়ই মনোহর যুক্তি। প্রথম কথা হল এ লেখা তার নিজেরই নয়। বাংলা এবং ইংরেজি, উভয় ভার্সনে আমি এ লেখা বহুকাল থেকে দেখে আসছি। কিন্তু প্রথমবারের মত একটি নতুন তথ্য দেখা গেল(বাঃ অন্তত আমি দেখলাম)। এতকাল ধরে এ আয়াতের অর্থ ছিল, ‘বস্তুত আমি অবিশ্বাসীদের আঙুল পর্যন্ত তৈরী করতে সক্ষম’। এই কথাটাই এখন আঙুলের ডগাতে গিয়ে রুপান্তরিত হয়েছে। নিজের বিশ্বাসের সাথে বিজ্ঞানকে গোলানোর জন্য মানুষ কী নির্জলা মিথ্যাচার টাই না করতে পারে!
আপনার মনে হতে পারে, যাই হোক ফিঙ্গারপ্রিন্টের সাথে সম্পৃক্ত আঙুলের কথা তো ধর্মগ্রন্থে এসেছে। সেটাই বা কম কী? এটা হল গিয়ে চুজ এণ্ড পিক ফ্যালাসি। বিজ্ঞানের হাজারো আবিষ্কারের মাঝে ধর্মগ্রন্থের গার্বেজের সাথে কোনোকিছুর সিকি পরিমাণ মিলে যাওয়ার সাথে সাথেই সেই গ্রন্থ যদি হয়ে যায় বিজ্ঞানময় কিতাব, তাহলে আর কীই বা বলার থাকে? তো সেই কিতাবে ‘কাজে নিষ্ঠুর’ নামে ‘দয়াময় আল্লাহ’ যদি এভাবে বলতেন, “শাস্তির উদ্দেশ্যে আমি অবিশ্বাসীদের প্রতিটি চুলের কণা সমেত পুনরায় তৈরী করব।” বিশ্বাসীরা বলত, খোদা এর মাধ্যমে বুঝিয়েছেন ডিএনএ শনাক্তকরণের কথা।
যদি বলা হত, “আমি অবিশ্বাসীদের নাপাক মুখটিকে নিখুত ভাবে তৈরী করব এবং তাকে সিলগালা করে দিব রোজ হাশরের ময়দানে”। বিশ্বাসীরা বলত খোদা এর মাধ্যমে ফেইস রিকগনিশন টেকনোলজিকে বুঝিয়েছেন।
যদি বলা হত-“কাফেররা তার চোখ দিয়ে বেগানা নারী দেখে, তারা ভাবে তাদের দেখা শেষ হয়ে গেছে, কিন্তু তারা জানে না তাদের প্রত্যেকের চোখকে আমি পুনরায় স্থাপন করব স্বতন্ত্রভাবে শেষ দিনে।” তাহলে বলা হত এর মাধ্যমে তিনি বুঝিয়েছেন রেটিনা স্ক্যানিং কে।
বিশ্বাসীদের ধর্মের সাথে বিজ্ঞানকে মিলানোর এটাই হল পদ্ধতি। আপনি কী বিরক্ত হচ্ছেন? ভাবছেন এ কথাগুলো তো আর যাইহোক ধর্মগ্রন্থে নেই। কিতাবে আছে ফিঙ্গারের কথা, সেটা নিয়েই কেন কথা নয়? আচ্ছা বেশ, তবে সেই ফিঙ্গারপ্রিন্টেই ফিরে আসি। তবে এবিষয়ে বলার আগে ভদ্রলোকের লাস্ট প্যারাটা আরেকটু অধ্যয়ন করি, এই ক্রিমিনালদের চিহ্নিত করার জন্য আল্লাহ উপমা দিয়ে ঠিক কিসের উদাহরণ টানলেন? আল্লাহ বললেন, – তারা মনে করছে আমি তাদের মিশে যাওয়া হাঁড়গুলো একত্র করতে পারবো না? বস্তুত, আমি তাদের আঙুলের ডগা (জনে জনে চিহিত করার জন্য) পর্যন্ত তৈরি করতে সক্ষম।’ অর্থাৎ, ফাঁকি দেওয়ার কোন চান্সই নেই। দুনিয়াতে ক্রিমিনাল ধরার সর্বোৎকৃষ্ট পদ্ধতির উপমাটি ব্যবহার করেই আল্লাহ বুঝালেন যে অপরাধ করে ফাঁকি দিয়ে পার পেয়ে যাওয়ার কোন সুযোগ নাই। কথা হলো, ১৮৭০ সালে দিকে আবিষ্কৃত ফরেনসিক সাইন্সের এই জিনিস ১৪০০ বছর আগে মুহাম্মদ (সাঃ) মরুভূমির বালুতে ঠিক কোথা থেকে পেলেন? এখান থেকে আমরা কী দেখতে পাচ্ছি? দেখতে পাচ্ছি খোদা অপরাধীকে শনাক্ত করবেন সেই ফিঙ্গারপ্রিন্ট দিয়েই। ভালো কথা, আল্লাহ ভালো পদ্ধতিই বাছাই করেছেন। কিন্তু আমার একটা কনফিউশন আছে, সেটা হল গিয়ে যদি কোনো নাস্তিক, অবিশ্বাসীর adermatoglyphia থাকে, তাহলে তার ফিঙ্গারপ্রিন্ট খোদা কই থেকা তৈরী করবে? তার আঙুলই বা কেমনে শনাক্ত করবে? এটা এমনই এক রোগ যেখানে MARCAD1 DNA বিকৃতির কারণে ফিঙ্গারপ্রিন্ট তৈরী হয় না। ম্যাজিক দেখানো ফিঙারপ্রিন্টের এ হাল কেন হল? আমার মনে হয় যাদের এরোগ হয়, তাদের উপর শয়তানের কারসাজি আছে। আপনারা তো আবার বলেন, বিবর্তনের কোনো বাস্তব প্রমাণ নাই, তাই ইহা মানবেন না। এটার কিন্তু ম্যাক্রো প্রমাণ আছে। ২০০৭ সালে সুইডিস নারী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা পায় নি, কারণ তার ফিঙ্গারপ্রিন্ট তৈরী করা যায় নি, যেহেতু তার এ রোগ ছিল।
আপনি কী এখনো গো ধরে আছেন, ভাবছেন ১৪০০ বছর আগে যেভাবেই হোক ফিঙারপ্রিন্টের সাথে সম্পৃক্ত আঙুলের কথা তো এসেছে, যে বিষয় ১২০০ বছর পরে আসার কথা, সেটা কিভাবে ১৪০০ বছর আগে ধর্মগ্রন্থে রুপক অর্থে হলেও এল? বেশ। এবার আমরা একটু দেখি ফিঙারপ্রিন্টের ইতিহাস। প্রাচীন ব্যবলিনীয় সমাজে খ্রিষ্ঠের জন্মের দুই হাজার বছর পুর্বে ফিঙ্গারপ্রিন্ট ব্যবহার করা হত। ৮৫১ খ্রিষ্ঠাব্দের পুর্বে আরবীয় বণিক আবু জায়েদ হাসান নিজে সাক্ষী ছিলেন, যে চাইনীজরা আর্থিক অর্থ লেনদেনের সময় হাতের ছাপ সংরক্ষণ করে থাকে, ৭০২ খ্রিষ্ঠাব্দে জাপানিজরা একটা পদ্ধতি চালু করে, যেসব ব্যক্তি অশিক্ষিত অর্থাৎ পড়াশুনা করতে জানে না, তারা সিগনেচার হিসেবে হাতের ছাপ ব্যবহার করতে থাকে(বাংলাদেশে কী একদা এটারই প্রচলন ছিল না?)
ব্যবলনীয় রাজা (১৭৯২-১৭৫০ খ্রিষ্ঠপুর্ব) Hammurabi এর আইন অনুসারে যাদেরকে কোনো অভিযোগে গ্রেফতার করা হবে, তাদের ফিঙ্গারপ্রিন্ট সংরক্ষণ করে রাখা হবে। কল্পনা করুন পনেরশ বছর আগে কোরানে ফিঙ্গারপ্রিন্ট নয় আঙুলের কথা(মতান্তরে আঙুলের ডগার কথা এসেছে) আর সেখানে আজ থেকে চার হাজার বছর আগে সরাসরি ফিঙার প্রিন্ট নেওয়ার কাজ হয়েছে। যদি কোরানে আঙুলের ডগার কথা বলায় সেটা অলৌকিক গ্রন্থ হয়ে যায়, তাহলে চারহাজ্জার বছর আগে সরাসরি ফিঙ্গারপ্রিন্ট নিয়ে কাজ করায় ব্যবিলনের রাজারা প্রত্যেকেই তো আল্লাহ হয়ে গেল, তাই না? কাহিনীর শেষ নয় এখানেও। চায়নার qin dynasty র সময়ে অফিসিয়ালি হাতের ছাপ, পায়ের ছাপ এবং আঙুলের ছাপ নেওয়া হত। ৩০০ খ্রিষ্টাব্দে চায়নায় (কোরান আসার ৩০০ বছর আগে) হাতের ছাপ থেকে চোর শনাক্ত করা হত।(চক্ষু চড়কগাছ হল কী?)চাইনীজ ইতিহাসবেত্তারা 650 খ্রিষ্ঠাব্দে এসম্বন্ধে লিখে যান। পারসিয়ান শারীরতত্ত্ববিদ রাশেদ আল দ্বীন হামাদানি (১২৪৭-১৩১৮) এবিষয়গুলো দেখে বলেন, “চায়নীজরা অভিজ্ঞতা থেকে জানে যে, দুইজন মানুষের আঙুল কখনো একই হতে পারে না”। তো বন্ধুগণ আমরা কী দেখছি, কোরানে সুস্পষ্টভাবে আঙুলের ছাপের কথা বলা হয়নি, অন্যদিকে কোরান অবতীর্ণ হওয়ার বহু আগে থেকেই হাতের ছাপ নিয়ে রাষ্ট্রপ্রধানরা দেশ পরিচালনা করেছে। ভাবুন যদি রাষ্ট্রপ্রধানের রাজ্য পরিচালনায় হাতের ছাপের প্রত্যক্ষ প্রভাব থাকে, তাহলে ওখানকার সাহিত্য গুলোতে এই বিষয়ে কী কোনো লেখা থাকবে না? আপনার কমনসেন্স কী বলে? তাহলে আপনার কী মনে হয়, কোরানই প্রথম গ্রন্থ, যেখানে এত ঘুরাইয়া হাতের ছাপের কথা এসেছে? যদি কোরান শরীফ আসার আগেই হাতের ছাপ সংক্রান্ত বিষয় মোটামুটি স্বীকৃত হয়, তাহলে কোরান শরীফের মৌলিকত্ব কোথায়? এমন কী হওয়াটা খুবই অসম্ভব, যে ইসলাম ধর্মের নবী একথাগুলো জেনে তারপর ফিঙারপ্রিন্টের খুবই কাছাকাছি একটা আয়াত উল্লেখ করে নি। মহানবী তার সময়ে ব্যবসা-বাণিজ্য ঠিকই করতেন। ইতিহাসে আরবীয় বণিক, পার্সি শারিরতত্ববিদদের উপস্থিত থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়। তাহলে এটা কী খুবই কঠিন কিছু, মহানবী এ সম্পর্কে কোনোকিছুই জানতেন না? Well, আপনি এতকিছু থেকে কী বুঝলেন, তা আপনিই ঠিক করবেন। Decision is yours.
#জানার_আছে_অনেক_কিছুর_চেয়েও_বেশি_কিছু
তথ্যসুত্র
1) Reinaud, Joseph Toussaint (1845). “Relation des
voyages faits par les Arabes et les Persans dans l’Inde et
a la Chine dans le IX Siecle.”. I . Paris: Imprimerie royale:
42. quoted in: Laufer (1912)
2) David R. Ashbaugh, Quantitative-Qualitative Friction
Ridge Analysis: An introduction to basic and advanced
ridgeology (Boca Raton, Florida: CRC Press LLC, 1999), https://books.google.com/books?id=YTnypDxtJ14C&pg=PA19#v=onepage&q&f=false
3) https://books.google.com/books?id=h8srAQAAIAAJ&pg=PA642#v=onepage&q&f=false
ভদ্রলোকের অমুল্য পোস্টের স্ক্রিনশট

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

29 − = 20