মানুষের খাব্লায়া খাব্লায়া পড়া বা প্যারাডক্সিকাল সাজিদের পাঠপ্রতিক্রিয়া

মানুষের খাব্লায়া খাব্লায়া পড়া দেখতে দেখতে আমি ক্লান্ত। এইরকম খণ্ডিত পাঠে মানুষ অভ্যস্ত হয়ে পরছে। দ্রুত সময় বাঁচাতে গিয়ে মানুষ এইভাবে পড়ে বা যতটুকু পড়ে তারচেয়ে বেশি বলতে গিয়ে লেজে গোবর মাখিয়ে ফেলে। কখনো না পড়েই এর কাছে ওর কাছে শুনে নিজে বিরাট জ্ঞানী এইটা প্রমাণ করতে গিয়ে, অল্প বিদ্যা ভয়ঙ্কর এই প্রবাদের প্রমাণ হয়ে দাঁড়ায়।

সম্প্রতি আমি এইরকম একটি নমুনার খোঁজ পেয়েছি। নমুনাটির নাম আরিফ আজাদ। তিনি প্যারাডক্সিকাল সাজিদ নামে একটি বিখ্যাত বইয়ের লেখক। এই গ্রন্থে তিনি মার্ক্স, ডারউইন ইত্যাদি মহান দার্শনিকদের নাস্তানাবুদ করেছেন। হালের হকিংস, রিচার্ড ডকিন্সরাতো দুধের শিশু। এই লেখাটিকে পরবর্তীতে প্যারাডক্সিকাল সাজিদের পাঠপ্রতিক্রিয়াও বলা যেতে পারে। বা বলা যেতে পারে, জ্ঞানী হইবার সহজতম উপায়।

জ্ঞানী হবার সহজ উপায়টি একদম রান্নার মতো। প্রথমে আপনাকে একটু বিজ্ঞান পড়তে হবে। তারপর একটু ধর্ম পড়তে হবে। তারপর আপনার মধ্যে যে মিশেলটি তৈরী হবে সেখানে মিশাতে হবে কিছুটা যুক্তিবিদ্যা। তারপর পরিমান মতো জেনে নিতে হবে কয়েকটা টার্ম, যথা-বস্তুবাদ, অভিজ্ঞতাবাদ, সাম্যবাদ ইত্যাদি। তারপর জেনে নিতে হবে কয়েকটা নাম, যেমন- মার্ক্স, ডারউইন, ডকিন্স, মিচিও কাকু ইত্যাদি (এগুলো পড়ারও দরকার নেই)। ব্যাস রান্না তৈরী। আপনি নিজে নিজে বিরাট জ্ঞানী হয়ে গেলেন।

এইবার রান্না পরিবেশন। যা হলো তাই পরিবেশন করবেন। যা জানেন, তার সাথে মিশাবেন পাশের বাসার ভাবী কি জানে তা, আপনার মামা কি জানে তা, আপনার আপন খালাতো ভাইয়ের শালার বেয়াইয়ের ফুফাতো ভাই যা জানে তা। প্রচুর কথা বলতে হবে। দুই লাইন পড়েছেন। কুছ পরোয়া নেহি। কল্পনাশক্তি ব্যবহার করবেন। আইন্সটাইন কি বলেছেন? কল্পনাশক্তি বিজ্ঞান হইতে উত্তম। আপন কল্পনাশক্তিতে যতটুকু কুলায় বলবেন। বা আরিফ আজাদ সাহেবের মতো লিখতে পারেন। ভাবছেন গদ্য দুর্বল! তাতে কি? আপনার আশপাশের লোকেদের আপনার চেয়েও দুর্বল গদ্য। তারা মুরাদ টাকলিয় বাংলায় লিখে- ইম্রান ছারখারার পুসি ছাই।

খাব্লায়া খাব্লায়া যারা পরেন এবং ধর্ম এবং বিজ্ঞানের সমন্বয় সাধনের চেষ্টা করেন, তারা কয়েকটা কমন ভুল করেন। এই ভুলগুলো করার মাধ্যমেই বোঝা যায় তারা মূল বইগুলো পড়েন নি। খালাতো ভাইয়ের কাছ থেকে গল্প শুনেছেন। ভুলগুলো নিয়ে একটু আলোচনা করতে চাই।

প্রথম ভুলঃ ‘ডারউইন বলেছেন- বানর থেকে মানুষ এসেছে।’ এর সাথে তারা যোগ করে বিবর্তনবাদ কোনো বিজ্ঞান নয়, এটা তত্ত্ব। তারপর তারা ডারউইন কতোটা অজ্ঞ এইটা প্রমাণ করে ফেলেন। তারপর তারা গল্পের মই গাছে তোলেন। মই নিজেই ডাল থেকে ডালে বয়ে বেড়ায়। এইরকম যারা করবে বুঝতে হবে তারা ডারউইন পরেন নাই। তারা শুধু দুইটা শব্দ জানেন। এক ডারউইন, দুই, অরিজিন অব স্পিসিস। জ্ঞাতার্থে বলছি, ডারউইন কখনো কোথাও এই রকম বলেন নাই। সুতরাং যারা বলবে আমি এইটা পড়েছি; বুঝতে হবে তারা বিষয়টা পড়েন নাই। তারা ওয়াজপার্টি।

কথা হলো, তাহলে ডারউইন কি বলেছেন? ডারউইনের দোষটা কোথায়? অরিজিন অব স্পিসিস গ্রন্থে তিনি এই বিষয়ে কিছু বলেন নাই। তবে ডিসেন্ট অব ম্যান নামে তার আর একটা বই আছে। সেখানে তিনি একটু আভাস দিয়েছেন। তাও তৎকালীন ল্যাটেস্ট জীবাশ্মবিদ্যার উপর নির্ভর করে। তিনি বলেছেন- ‘সম্ভবত মানুষ আর বানর একই পূর্বসূরী থেকে আসতে পারে।’ এর মানে মানুষ আর বানর একে অপরের খালাতো ভাইবোন হতে পারে। এর পর আধুনিক বিজ্ঞান, জীবাশ্মবিদ্যা আর বিবর্তনবিদ্যায় অনেকদূর এগিয়েছে। সামনে আরো এগুবে।

দ্বিতীয় ভুলঃ ‘মার্ক্স বলেছেন- ধর্ম হলো আফিমের মতো।’ যেহেতু আফিম নেশাদ্রব্য, তাই ধর্মকে মার্ক্স নেশা করা বলেছেন। তিনি ধর্মকে হেয় করেছেন। দুইপাতা পড়াশোনা করে তিনি লাখো নাস্তিকের নয়নের মণি হয়ে গেছেন। এই রকম যারা বলবে তারাও দুইটা শব্দ জানেন। এক, কার্ল মার্ক্স আর দুই, ডাস কাপিটাল।

তার মানে কি মার্ক্স এইটা বলেন নাই যে ধর্ম হলো আফিমের মতো? হ্যা মার্ক্স এইটা বলছেন। তবে এর আগে পরে কিছু লাইনও বলেছেন। তিনি যে মার্ক্স পড়েন নাই এইটার প্রমাণ এই বাক্যটার নেগেটিভ উপস্থাপন। মার্ক্স কি বলেছিলেন? বলেছিলেন- ‘মেহনতি মানুষ যেমন দিনশেষে নিজের প্রাপ্যটুকু থেকে বঞ্চিত হয়ে, বঞ্চনা ভুলে থাকতে আফিমের শরণাপন্ন হয়, তেমনি ধর্ম হলো মেহনতি মানুষের আফিম। ধর্ম মানুষকে জাগতিক অপ্রাপ্তি থেকে ভুলিয়ে রাখে। পরজন্মে তার প্রাপ্যটুকু সে বুঝে পাবে কারণ সেখানে আছে ন্যায়বিচার।’

এখন বলেন, এইখানে কোন কথাটা নেগেটিভ? আফিম যেমন সবকিছু ভুলিয়ে রাখে, ধর্মও তেমন সবকিছু ভুলিয়ে রাখে। পরকালে মানুষ সমতা পাবে, অধিকার পাবে, ন্যায়বিচার পাবে, বঞ্চনা থাকবে না, দোষীদের সাজা হবে, এইখানে নেগেটিভ কোন কথাটা? ধরেন আপনার বন্ধু আপনাকে একটা থাপ্পর দিলো। তার সামাজিক স্ট্যাটাস আর আপনার সামাজিক স্ট্যাটাস একরকম হলে, আপনি সাথে সাথে তার থাপ্পর ফেরত দিবেন। কিন্তু যদি আপনার বন্ধুটি এলাকার চেয়ারম্যানের ছেলে হয়, আর আপনি যদি রিক্সাচালকের ছেলে হন, তাহলে আপনি কি করবেন? আপনি কাঁদতে কাঁদতে চিৎকার করে বলবেন- আল্লায় তর বিচার করবো। আবার যদি আপনার বন্ধুটি কোনো এম্পির ছেলে হয়, আর আপনি এম্পির ড্রাইভারের ছেলে হন, তাহলে আপনি কি করবেন? আপনি কাঁদতে কাঁদতে মনে মনে বলবেন- আল্লায় তর বিচার করবো। কিন্তু যতক্ষণ আপনার আর তার স্ট্যাটাস এবং শক্তি-সক্ষমতা এক থাকবে, আপনি পরকালের জন্য বিচার চাইবেন না। আপনি পালটা প্রতিরোধ গড়ে তুলবেন। এইখানে মার্ক্সের ধর্ম হচ্ছে সেই পজিটিভ নেশা যা বঞ্চিত মানুষদের আশা-আকাঙ্খার প্রতিনিধিত্ব করে।

[ধারাবাহিকভাবে চলবে…]

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 1 = 2