প্রাচীন কাল থেকেই লিঙ্গবৈষম্য একটি সামাজিক ব্যাধি(!)


প্রাচীন কাল থেকেই লিঙ্গ বৈষম্য অনেক বড় একটা সামাজিক ব্যাধি। ব্যাপারটা অনেকটা এমন ছিলো, কন্যা সন্তান জন্ম নিলে পাড়ায় মুখ দেখানো যাবে না, শ্বশুর বাড়ির লোকজন দূর-ছাই করবে, আর কন্যা সন্তান দিয়া কি এমন হয়! বরংচ, কাড়ি কাড়ি টাকা পয়সা খরচ করতে হয়, তারওপর কালো-খাটো হইলে তো যৌতুকও দিতে হয়। আমার জন্মটাও ওরকম একটা সময়ে হয়েছিলো। বাবা-মায়ের দাম্পত্যজীবনের পাঁচ বছরের মাথায়, মায়ের কোল আলো এবং মুখ অন্ধকার করে আমি এসেছিলাম।

প্রাচীন কাল থেকেই লিঙ্গ বৈষম্য অনেক বড় একটা সামাজিক ব্যাধি। ব্যাপারটা অনেকটা এমন ছিলো, কন্যা সন্তান জন্ম নিলে পাড়ায় মুখ দেখানো যাবে না, শ্বশুর বাড়ির লোকজন দূর-ছাই করবে, আর কন্যা সন্তান দিয়া কি এমন হয়! বরংচ, কাড়ি কাড়ি টাকা পয়সা খরচ করতে হয়, তারওপর কালো-খাটো হইলে তো যৌতুকও দিতে হয়। আমার জন্মটাও ওরকম একটা সময়ে হয়েছিলো। বাবা-মায়ের দাম্পত্যজীবনের পাঁচ বছরের মাথায়, মায়ের কোল আলো এবং মুখ অন্ধকার করে আমি এসেছিলাম।


.
সুস্থ অবস্থায় জন্মাইনি। আমাকে দেখে কেউ অতোটা খুশি হতে পারেন নি। আমার ফ্যাকাশে, লিকলিকে শরীরটা যখন আমার আম্মুর কাছে নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো, আম্মু নাকি তাচ্ছিল্য ভরা কন্ঠ নিয়ে বলেছিলেন, “নিয়ে যান তো আমার সামনে থেকে”। বাবা পাশে ছিলেন না। যেখানে চাকরী করতেন, সেখান থেকে আসতে তার দুই-তিনদিন দেরী হচ্ছিলো। এভাবেই তিন চারদিন কেটে গেলো। আচমকা একদিন আমায় কেউ পরম আদরে কোলে নিয়েছিলো। আমি চোখ পিটপিট করে তাকিয়ে দেখছিলাম তাকে। নাকের নিচে হাল্কা গোফ ওয়ালা, চশমা পরিহিত মানুষটা এর আগে যে কখনো বাচ্চা কোলে নেয় নি, তা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিলো। আমার অসুবিধে হচ্ছিলো, তাও কাঁদছিলাম না। খালা-মামা-নানু হাত মুখ নেড়ে আমাকে বোঝাতে চাচ্ছিলো, ইনি আমার বাবা হন। আমি সেই থেকে জেনেছি আমার একটা বাবা আছে। আমার বাবা।
.
আম্মু এখনো মাঝে মাঝেই বলেন আমার জন্মের সময় নাকি কোনোকিছুই ঠিক ছিলো না। বাবার আয়-রোজগার অতোটা ভালো ছিলো না। আমি প্রায় সময় অসুস্থ থাকতাম। তাতে আয়ের চাইতে ব্যয় বেশি হতো। ছোটবোন হওয়ার পর পরিবারে সচ্ছলতা এসেছিলো। বাবা সবসময় এই কথাটার প্রতিবাদ করতেন। উনি যুক্তি দিয়ে বলতেন, “শোনো দোলনের আম্মু, উলটাপালটা কথা বলবা না একদম। দোলন যখন জন্মেছে সেই সময় আমি গরুর মাংস কিনতাম দশ টাকা কিলো। আর, আরেফীন হলো, মাংসের দাম বেড়ে হয়ে গেলো পঞ্চাশ টাকা!” আমার আম্মুর মুখটা শুকিয়ে আমসত্ত্ব হয়ে যেতো। আমি মনে মনে খুব খুশি হতাম তখন। আল্হাদে আমার বাবার গলা জড়িয়ে ধরতাম। আমার বাবা।
.
জুতোর ফিতে বাঁধতে পারতাম না। সকালে না খেয়ে স্কুলে দৌড়াতাম। অনেক বড় হয়ে যাওয়ার পরেও আমার জুতোর ফিতে বেধে দিতেন বাবা। আমি ঘুম থেকে ওঠার আগেই নাস্তা বানিয়ে সোফার ওপর বসে থাকতো বাবা। যেনো না খেয়ে বের হতে না পারি। বাসায় কড়া নিষেধ ছিলো আমরা তিন বোনের সঙ্গে আম্মু কোনো খারাপ আচরণ করতে পারবেন না। তারপরেও যখন করতো, তখন বাবা আমাদের বলতো, “তোর মা কে বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দিলে তোরা আমাকে রান্না করে খাওয়াতে পারবি না?” আমি আর আরেফীন বলতাম, “পারবো বাবা। পাঠিয়ে দাও।” আম্মু কথায় কথায় দু:খ প্রকাশ করতো, ওনার কোনো ছেলে নাই। কিন্তু, বাবাকে কখনো দেখিনি দু:খ করতে।
.
আমি জানি না, কোনো বাবা কখনো কোনো আঠারো বছর বয়সী মেয়ের কাপড় ধুয়েছে কিনা। আমার বাবা ধুয়েছেন। আমার ১০৫ ডিগ্রী জ্বরে আমায় কোলে করে রাত দেড়টায় হসপিটালে নিয়ে গেছেন। সারারাত এমারজেন্সির দরজায় দাঁড়িয়ে থেকেছেন। আমি আমার সব কথা নির্দিধায় বলতে পারি আমার বাবাকে। আমার বাবাকে।
.
সেসব সন্তানদের জন্য আমার আফসোস হয়, যারা বাবাদের আশ্রয় দেয় বৃদ্ধাশ্রমে। তাদের জন্য কষ্ট হয়, যাদের বাবা থাকা সত্বেও তারা এর মর্ম বোঝে না। আর সেসব বাবাদের জন্য লজ্জা হয়, যারা সন্তান থাকা সত্বেও তাদের স্বীকার করে না। পৃথিবীর সব বাবারা ভালো থাকুক।
(কাহীনিঃএক অাপুর কাছ থেকে শোনা)

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

5 + 4 =