শুভ জন্মদিন, মা

শারমিন আজ ভার্সিটিতে যাবে না। আজকে একটি বিশেষ দিন তার জন্য। সকাল থেকে প্রস্তুতি নিচ্ছে। আজকে যদি কোন গোলমাল হয়ে যায় তাহলে কিন্তু হবে না। একেবারে ক্রিস্টাল ক্লিয়ার হতে হবে। প্রতি বছরই শারমিন এই দিনটির জন্য অপেক্ষা করে। এই দিনেই সে তার প্রিয় মানুষটিকে দেখতে যায়। সবচেয়ে প্রিয় মানুষ।

শারমিন যখন ছোট ছিল তখন তার প্রিয় মানুষটির সাথে অনেক মজা করত। সকালে উঠেই সারাদিন পিছে পিছে ঘুরবে আর নানা ধরনের প্রশ্ন করবে। “এইটা কি? ঐটা কি?”। আর সারা দিন বিরক্ত করে রাতে একসাথে ঘুমাতে যাবে। আহা এর চেয়ে ভাল সময় কি আর হতে পারে?

বিকাল হয়ে এসেছে। শারমিন নীল রঙের একটা শাড়ী পড়ল। তার মায়ের শাড়ী। অনেক সুন্দর। হালকা নীল শাড়ী আর পাড়টা গাড় নীল। শারমিনকে অনেক সুন্দর দেখাচ্ছে। অনেক গাড় করে কাজল দিল। অনেক সুন্দর করে সেজে যেতে হবে। আজ তার প্রিয় মানুষের জন্ম দিন। বাবা এলেই সে যাবে তার প্রিয় মানুষকে দেখতে। কিন্তু তার টেনশন বেড়েই চলেছে। যার ফলে সে দাত দিয়ে নিজের হাতের নখ কামড়ান শুরু করল। সে জানে এইটা খারাপ। তার প্রিয় মানুষটিই তাকে বলেছে। এইটা একটা রোগ যার নাম Onychophagia । কাটখোট্টা নাম।

শারমিনের বাব অর্থাৎ রাইজুল ইসলাম এলেন বিকাল পাঁচটার দিকে। এসে দেখলেন তার মেয়ে সেজে গুজে প্রস্তুত। অনেক সুন্দর লাগছে তার মেয়েকে। একেবারে তার স্ত্রীর মত। অনেক সুন্দর। তিনি ফ্রেশ হয়ে একটু খেয়ে নিলেন। তারপর মেয়েকে নিয়ে বের হলেন। আজ তার মেয়ের প্রিয় মানুষের জন্মদিন।
বের হয়েই খেয়াল করলেন বাইরে মেঘ করেছে। বেশী না। চারিদিকে শুধু রোদ নেই। ঠান্ডা একটা আবহ। একটা রিকশা নিলেন। যেখানে যাবেন সেখানে হেটেই যাওয়া যায়, কিন্তু মেয়ে রাগ করবে। অনেক কস্ট করে সেজেছে, নস্ট হয়ে গেলে? তাই নিলেন আর কোন কারন নেই।

রিকশা এসে থামল কারবালা কবরস্থানের সামনে। মেয়েকে নিয়ে ঢুকে গেলেন একদম পশ্চিম দিকে। একেবারে কোনার কবরের সামনে গিয়ে দারালেন। নামটা পড়লেন। পারভিন ইসলাম। চোখ ঝাপ্সা হয়ে আসল তার।

শারমিন কবরের সামনে গিয়ে দাড়াল। বাবার দিকে তার আর কোন খেয়াল নেই। সব কিছু একত্র করে একাগ্রে তাকিয়ে আছে তার মায়ের কবরের দিকে। ঝুকে পড়ে কবরের মাটিতে হাত বুলাল। গুন গুন করে একটা গান গেল, “ঘুমের ঘোরে আছে শুয়ে, লক্ষিটি আমার/ ঘুম ভাঙলেই বলবে উঠে, ঐ চাদটা কার?” । এই গানটা শারমিনের মা শারমিনকে শুনাতেন। যখন শারমিন ঘুমিয়ে থাকার ভান করে পড়ে থাকত তখন। শারমিন খুব গাড় করে বলল, “ শুভ জন্মদিন মা! হ্যাপি বার্থ-ডে ” ।

আরো অনেক্ষন শারমিন হাত বুলাল। চুপ চাপ বসে ছিল। ততক্ষনে তার কাজলের গাড় একটা রেখা চোখ থেকে নিচের দিকে চলে গেছে। সে খেয়ালই করেনি। মনে পড়ে গিয়েছিল সেদিনের কথা যেদিন তার মা তার হাত ধরে শেষ কথাটি বলেছিলেন, “ ভাল থাকিস পাগলী ”। আর কিছুই মনে নাই। বাকী প্রায় সবই ঝাপসা তার কাছে। স্মৃতি নাকি মানুষের পিছু ছাড়ে না। কিন্তু শারমিন কে ঠিকই ছেড়ে গিয়েছে।

প্রায় ঘন্টা খানেক পর তারা ফিরে চলল। রিকশায় শারমিন শক্ত করে তার বাবার হাত ধরে রেখেছে। তার হাত মৃদু মৃদু কাঁপছে। প্রতি বারই এমন হয়। এরপর রাতে শারমিনের জ্বর আসবে। এই কারনে প্রতিবারই রাইজুল ভাবেন পরের বার আর তার মেয়েকে নিয়ে আসবেন না। কিন্তু নিজেকে আটকাতে পারেন না।
গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি পড়া শুরু করল। শারমিন তার বাবার দিয়ে তাকিয়ে বলল, “দেখ বাবা, আম্মু কাঁদছে” । রাইজুল তার মেয়ের দিকে তাকালেন। মেয়ের চোখ টকটকে লাল হয়ে এসেছে। আর চোখের কোণে জমে আছে হালকা পানি। তিনি আরো শক্ত করে মেয়ের হাত ধরলেন। এখনি মেয়েটা অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাবে।

মা, মা, মা, ভালবাসি তোমায়

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৪ thoughts on “শুভ জন্মদিন, মা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

60 − = 55