অদ্ভুত চাইল্ড সাইকোলজি এবং নতুন প্রজন্মের শিশু

?oh=93b71e23d0bb558f9ac1d1f57e4e80c0&oe=594D8EDC” width=”500″ />
প্রতি প্রজন্মের কাছে তাদের পরবর্তী প্রজন্ম বেয়াদব, দুর্ভাগা কিংবা পরবর্তী বা নতুন প্রজন্ম ধরেই পারলে অযোগ্য ঘোষণা করেন দেন অনেকে। আমার নানা দাদারা আমার মামা চাচাকে এভাবেই বলে আসছেন, আমার বাপ চাচারা আমাদের অনেককেই এভাবেই বলে আসছেন। কিন্তু আমার মনে হয় প্রতিটা প্রজন্মই তার সময়ের জন্য পারফেক্ট। সাবার আজকের অনেকটা দুর্বোধ্য অক্ষরে, আনমনে লিখে যাওয়া ঘটণাপ্রবাহ আমার কাছে সেই বিশ্বাসের স্বপক্ষে অকাট্য প্রমাণ…

আমার কলিগ প্লাস বন্ধুর মেয়ে সাবা (নকল নাম)। আজকে ১২টায় স্কুল ছুটির পরপরই ওর মাকে মনে করিয়ে দিলো, “মা, কাঁচা আমের দাওয়াত আছে কিন্তু!” দুইদিন আগে ওর মাকে বলেছিলাম আমার অফিসে দাওয়াত। কাঁচা আমের মৌসুমে এটা রেগুলার ব্যাপার। কিসের দাওয়াত সেটা বলিনি, আমার অফিসে কোন সময় কি থাকে সেটা ওদের জানাই…

আসার সময় দেখি দঙ্গল নিয়ে ঢুকছে। একত্রে চাকরীতে ঢুকা কলিগ প্লাস বন্ধু এখন ঢাকায় অনেকজন, দুইজন বিশেষ কাজে ব্যস্ত, একজন অসুস্থ্য হয়ে হাসপাতালে, বাকীসব হাজির! ওই পিসও অবশ্য বাদ পরেনি আড্ডা থেকে, লাউড স্পীকারে অংশ নিয়েছে। দীর্ঘদিনের পরিচিতদের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বয়স আসলে বাড়ে না, একই জায়গায় স্থির থেকে যায়।

যাইহোক, আসার আগে আমার ধারণা ছিল ২-৩ জন আসবে, কে কোথায় থাকবে ঠিক থাকে না ওয়ার্কিং ডেতে। কিন্তু আমাকে হতাশ করে সাড়ে সাতজন আসলো। সাবাকে হাফ ধরে। হতাস এই কারণে যে, আমি মাত্র ৩ জন হিসেব করে কাঁচা আম কেটে শুকনামরিচ ভাজা, বীটলবন, হালকা দুধ আর চিনি সাইডে রেখে দিয়েছিলাম। কিন্তু ওদের ওইসবে সমস্যা নাই। আম তো গাছে আরও আছেই। পিয়নকে ডাক দিয়ে গাছে উঠিয়ে দিলো, ছুরি জোগাড় হয়ে গেলো, অতিরিক্ত শুকনা মরিচের গুড়া, লবন আর চিনিও এসে গেল আর ৩ জন মহিলা থাকলে আম কুচিকুচি হতে বেশি সময় লাগে না। একজন না একজন এক্সপার্ট থাকেই।

যাইহোক, কিছুক্ষণ পর দেখলাম সাবা চুপচাপ বসে আছে, আমাদের আবজাব কথা শুনছে একমনে। আমি বললাম, “কীরে, বোর হইতেছিস নাকি?” সে হালকা করে বললো, “আই এম হ্যাভিং ফান!”

ওর মা বললো, “ওরে কাগজ পেন্সিল দে, ছবি আঁকুক। দেখিস কী করে!”। দিলাম তিনখানা এফোর পেপার, সাইনপেন, কলম…

তিনটা পেজই একটা আরেকটার নীচে রেখে একসাথে কী কী যেন করছিলো। আমি বললাম, “এইদিকে তাকা, তোর ছবি তুলি।” ও তাকালো, এরপর আবার একই কাজে ব্যস্ত।

ওই সময়েই ছবিতে লিখে দেয়, “প্লিজ, নো ফটো!”

এরপর আমরা দুই গ্রুপে ভাগ হয়ে তর্ক করছিলাম। সে মন দিয়ে শুনছিলো আর আঁকিবুঁকি করছিলো, কিছু ব্যাপার লিখেও যাচ্ছিলো। খেয়াল করছিলাম। একটায় দেখলাম লেখা, “Mnira”! আমি বললাম, আন্টির নামের স্পেলিং এমন করছিস ক্যান?” আমাকে বলে, “দ্যাটস মাই স্টাইল!”
?oh=1f7cab579b7d56a6fc949d83f7ef0eba&oe=59885BBC” width=”500″ />
এরপর একসময় দেখি মনিরার নামের স্পেলিং ঠিকঠাক দিচ্ছে প্রায়, আবার আমার নামের স্পেলিং এ দুইটা “e”! জিজ্ঞেস করলাম, আমার নামে তো “e” নাই, আর দিলেও দুইটা দিছিস ক্যান?” উত্তর দিলো, “তোমাকে বেশি পছন্দ তাই বেশি দিচ্ছি।”

যাইহোক, সবকিছুর মত আড্ডাও একসময় শেষ হয়, সময় তো বহমান। যাওয়ার সময় আমাকে তিনখানা কাগজ ধরিয়ে দিয়ে গেলো। বললো, “তোমার জন্য।”

যারা আমাদের আড্ডায় ছিল, তাঁরা কিঞ্চিত বুঝবে কী কী বুঝিয়ে গেছে, গ্রুপিং কীসের, কখন কে এবং কেন উইনার। আজকালকার বাচ্চাদের দেখে আমার নতুন জীবনের লোভ হয়। ওরা আমাদের চেয়ে বোঝে বেশি, একই বয়সে জানে অনেক বেশি। আমরা আমাদের সময়ে খেলার মাঠে খেলেছি, ওইসব নিয়ে হাহুতাশ করতে পারি, বলতে পারি এরা তো জীবনের কিছুই দেখলো না। কিন্তু এরাও দেখছে অনেককিছু। যে বয়সে ওদের হাতে ট্যাব, গুগল সার্চ করে তথ্য বের করা শিখে যায়, আমাদের সময়ের অনেকেই এসব ব্যাপারে অজ্ঞ। দুইটা সময় আলাদা, ওরা যা পাচ্ছে তা আমরা কল্পনাও করিনি। ওদের সময়ের নাগালের জিনিসেই ওদের আগ্রহ, আর এটা যৌক্তিকই। আমাদের সময়ের জীবনযাপন, নানা অনুসঙ্গ দিয়ে ওদের সময়ের তুলনা অবান্তর।

প্রতি প্রজন্মের কাছে তাদের পরবর্তী প্রজন্ম বেয়াদব, দুর্ভাগা কিংবা পরবর্তী বা নতুন প্রজন্ম ধরেই পারলে অযোগ্য ঘোষণা করেন দেন অনেকে। আমার নানা দাদারা আমার মামা চাচাকে এভাবেই বলে আসছেন, আমার বাপ চাচারা আমাদের অনেককেই এভাবেই বলে আসছেন। কিন্তু আমার মনে হয় প্রতিটা প্রজন্মই তার সময়ের জন্য পারফেক্ট। সাবার আজকের অনেকটা দুর্বোধ্য অক্ষরে, আনমনে লিখে যাওয়া ঘটণাপ্রবাহ আমার কাছে সেই বিশ্বাসের স্বপক্ষে অকাট্য প্রমাণ…

(কিছুদিন আগে লেখা নিজের জন্য নোট থেকে)

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

56 − = 49