‘দ্যা ডেথ অফ শাহবাগ?’

ব্লগারদের ভেতর দুইজন জামিনে মুক্তি পেয়েছে। একটু দেরী হল। ওরা বামপন্থী ঘরানার হওয়ার কারণে বোহধয়। ওদের নিয়ে খুব একটা উচ্চবাচ্চ্যও হয় নি। বাম ঘরানার ব্লগ গুলো একটু আধটু প্রতিবাদ করেছিল। পত্রপত্রিকায় লেখালেখিও খুব একটা হয় নি। তাঁর ওপর রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি। শিরোনামে তখন ‘উদ্ধার কাজ’। তাই ব্লগারদের কথা তেমন ভাবে প্রথম পাতায় স্থানও পায় নি। সরকার তখন আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে হেফাজত কে দলে টানবার। তাই ব্লগারদের ছেড়েও দেয়া যাচ্ছে না। যখন বুঝলো হেফাজত কে দলে ভেড়ানো যাবে না, তখন স্ট্র্যাটেজি পরিবর্তন করতে হল। ‘ক্র্যাক ডাউন’ এর পরে পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল সরকার এখন কাদেরকে বেশী তুষ্ট করতে চাচ্ছে। ব্লগারদের মুক্তি এখন কেবল সময়ের ব্যাপার।
আনুষ্ঠানিক ভাবে গণজাগরণ মঞ্চ সোমবার সকালেই ভেঙ্গে দেয়া হয়। খুব প্রয়োজন ছিল না। এর মৃত্যু অনেক আগেই হয়েছে। সোমবার হয়তো তা আনুষ্ঠানিক রূপ পেল, যখন সকালে পুলিশ মঞ্চ ভেঙ্গে দিল। কাজটা হয়তো করতে হল একটা ব্যালান্স রাখার জন্য, হয়তো সবাইকে দেখানোর জন্য, ‘যে শুধু হেফাজতীদের না, অন্য সব সমাবেশের প্রতিও সরকার কঠোর অবস্থান নিয়েছে।‘ গণজাগরণ মঞ্চ এখন হয়তো ‘রায়ের আগের দিনের সমাবেশ’ এই সীমাবদ্ধ থাকবে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে কোন ধরনের সমাবেশ করতে দেয়ার ঝুঁকি কি সরকার নেবে? ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’র ভোট পকেটে ঢুকে গেছে। সেদিক দিয়ে চিন্তা করলে ‘গণজাগরণ মঞ্চ’ এর আর দরকার নাই। বরং রাস্তা বন্ধের জন্য যে জনভোগান্তি তাঁর খেসারত হিসেবে কিছু ভোট কাটা পরবে। এবার নজর দেয়া দরকার ধর্মীয় ভোটের দিকে। সেজন্য হেফাজতীদের সরাসরি আঘাত করতে চাইছিল না। তবে জ্বালাও পোড়াও শুরু হওয়াতে সব কুল রক্ষার ফর্মুলা থেকে সরকারকে সরতে হল। সব ধর্মীয় ভোট এমনিতেই পাওয়া যাবে না। বরং হেফাজতের তাণ্ডব থামানো গেলে কিছু সাধারণ মানুষের ভোট পাওয়া যেতে পারে। আর কোরআন পোড়ানোর ঘটনা খুব ভালো ভাবে প্রচার করতে পারলে হেফাজতীদের ওপর ‘ক্র্যাক ডাউন’ এর জন্য কোন নেগেটিভ সেন্টিমেন্টও তৈরি হবে না।
তাই যে প্রশ্নটা ব্লগ এবং ফেসবুকে ঘুরছে, গণজাগরণ মঞ্চের কি হবে? এই আন্দোলন কি শেষ? কেবল রায়ের আগের দিনের সমাবেশ আর স্মারক লিপি? মাঝে মাঝে টিভির টক শোতে জ্ঞানগর্ভ বক্তৃতা? এসবের জন্য তো রাজনীতিবিদরা আছেই। ব্লগারদের কাছে প্রত্যাশা তো অন্য। ব্লগাররা কেন কোন রাজনৈতিক দলের শাখা প্রশাখা হবে। ব্লগাররা হবে মুক্ত চিন্তার প্রতীক। ব্লগারদের ভেতর তৈরি হওয়া এই বিভেদের কারণেই ব্লগারদের গ্রেফতারের পরেও সম্মিলিত জোরালো কোন প্রতিবাদ হয় নি।
বিভেদটা নতুন না। একেবারে শুরু থেকেই ছিল। আর শাক দিয়ে মাছ ঢাকবার আপ্রাণ চেষ্টাও তাই প্রথম থেকেই চলছিল। বারবার বোঝানোর চেষ্টা চলছিল আসলে আমরা এক আছি। রাজনৈতিক আদর্শের পার্থক্য থাকতে পারে, তবে আমাদের এবারের দাবী অভিন্ন। আর তাই আমরা নিজেদের ভেদাভেদ ভুলে একসাথে একই দাবী নিয়ে শাহবাগে একত্রিত হয়েছি, ‘মানবতা বিরোধী অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ শাস্তির দাবী নিয়ে’।
ছোট খাট অন্তর্কলহ থাকলেও সামনে আসতে দেয়া হয় নি সেগুলো। একজন স্লোগান স্টার কে আহত করার ব্যাপারটাও লুকিয়ে রাখবার চেষ্টা হল। রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্য দেয়ার ব্যাপারে প্রথম দিকে যেসব বিধি নিষেধ ছিল সেগুলো ও ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল। আওয়ামী লীগের তাবৎ বড় নেতা এসে সংহতি প্রকাশ করলেন। ছাত্র নেতারা ব্লগারদের সরিয়ে মঞ্চে জায়গা দখল করলেন। বিভিন্ন ছাত্র নেতারা বক্তৃতা দিয়ে আন্দোলন গরম করবার চেষ্টা করলেন। সবাইকে সমান সুযোগ দিয়ে ঐক্য বজায় রাখবার আপ্রাণ চেষ্টা হল। কোন কিছুতেই কিছু হল না। অতঃপর মাছ টা সবাই দেখতে পেল।
একটি দৈনিক পত্রিকার মিথ্যে খবর বা বিএনপি এর গালিগালাজ কিংবা হেফাজতে ইসলামের হুমকি যে কাজটা করতে পারে নি সে কাজটা করে দেখাল অন্তর্কলহ। বাম আর আওয়ামী লীগের প্রাধান্য বিস্তারের কলহ। দোষ কার বোঝার উপায় নেই। ব্লগে আর ফেসবুকে এই মুহূর্তে চলছে এক অপরকে দোষী সাব্যস্ত করার যুদ্ধ। দুই ঘরানার তাবৎ ঘাঘু ব্লগার রা শানিত তীক্ষ্ণ সব স্ট্যাটাস আর পোস্ট দিয়ে সাইবার যুদ্ধে নেমে পড়েছেন। একদল শহীদ রুমি স্কোয়াড কে তাচ্ছিল্য করছেন তো আরেক দল ইমরান এর আল্টিমেটাম এর পরে স্মারক লিপি দেয়া কে নখদন্ত হীন পদক্ষেপ বলছে।
আনন্দে বগল বাজাচ্ছে জামায়াত আর বি এন পি। আগে দুটি ফ্রন্টে লড়তে হচ্ছিল। ব্যাখ্যা দিয়ে বেড়াতে হচ্ছিল শাহবাগ সম্পর্কে। এখন আর তা লাগবে না। কেবল তত্ত্ববধায়ক সরকার আর আওয়ামী দুঃশাসন নিয়ে ঘ্যান ঘ্যান করলেই চলবে। সঙ্গে থাকবে সাপ্তাহিক ছুটির দিন ঘেসে কিছু হরতাল। আর সেই হরতালে লাশ পড়লে কিংবা গ্রেফতার হলে আবার হরতাল। মনের কোনে ছোট একটা ইচ্ছে, যদি ১/১১ এর মত আবার সেনা শাসন আসে, আগের বারের মত হয়তে এবারও বিরোধী দলের পোয়া বারো অবস্থা হবে।
আওয়ামী লীগের চাল এখনও বোঝা যাচ্ছে না। হরতাল আর জ্বালাও পোড়াও ব্যাপারটায় বিএনপি জনপ্রিয়তা হারাচ্ছে বলেই তাঁদের ধারণা। আর জামায়াত প্রশ্নে আরও আক্রমনাত্মক হওয়াতে তাঁদের আরও ভোট কমেছে বলেই ভাবছে সরকারী দল। এর সঙ্গে যদি এই আন্দোলনকে টেনে হিঁচড়ে নির্বাচন পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া, তবে আর তাঁদের পায় কে। পুরো দেশবাসীর সেন্টিমেন্ট যুদ্ধাপরাধী প্রশ্নে বিভোর থাকলে কেমন নির্বাচন হলো তা নিয়ে হয়তো কেউ মাথা ঘামাবে না।
জামায়াত নিষিদ্ধ কিংবা বিচারের রায় কার্যকর করা পুরো ব্যাপারটাই আগামী নির্বাচনের ইস্যু বানানোর মতলব করেছে বলেই মনে হচ্ছে। তবে তত্ত্ববধায়ক সরকার ইস্যু নিয়ে তাঁদের চিন্তা ভাবনা এখনও পরিষ্কার না। এর মাঝে আবার রাস্ট্রপতির মৃত্যু। নতুন রাষ্ট্রপতির প্রতি বিএনপির মতামত স্পষ্ট না। তাঁর কোন রকম মধ্যস্থতার চেষ্টা বিরোধী দল মেনে নেবে কি না, সে প্রশ্নের উত্তর অচিরেই পাওয়া যাবে।
গণজাগরণ মঞ্চে দ্বিধা বিভক্ত আগে থেকেই ছিল। ২৬শে মার্চের আল্টিমেটাম পার হওয়ার পরে করণীয় কি তা নিয়ে বোধ হয় টানা পোড়ন আরও বেড়েছে। শক্ত কিছুর পক্ষে বাম দল গুলো আর ধীরে চল নীতি কিংবা সরকারের বলে দেয়া নীতি তে চলতে আগ্রহী সরকারী দলের ছাত্র নেতারা। অন্ততঃ ব্লগ গুলো পড়ে সেই ধারণাই হচ্ছে সবার। তাই বাম দলের উদ্যোগে শুরু হয়েছে শহীদ রুমী স্কোয়াডের আমরণ অনশন। এবং ধারণা করা হচ্ছে সরকার পন্থী টিভি এবং পত্রিকা এই নিউজ কে খুব একটা কাভারেজ দিবে না।
উল্টো চেষ্টাও হচ্ছে। ‘বিভেদ হয় নি’ এমন কথা বলার চেষ্টাও হচ্ছে। বোঝানোর চেষ্টা হচ্ছে এটিও আন্দোলনের একটি অংশ। ডাঃ ইমরান সহ লীগ পন্থী অনেক ব্লগার যেয়ে সংহতি প্রকাশ করে এসেছে অনশনের সঙ্গে। বাইরে থেকে বোঝানোর চেষ্টা হচ্ছে একতা। আবার ব্লগ আর ফেসবুকে ব্যাঙ্গ করে লেখালেখির ও বিরাম দেখা যাচ্ছে না।
‘একতাই বল’, ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ এসব গল্প আসলে পরীক্ষায় পাশ করার জন্যই পড়া হয়। ‘লোভে পাপ পাপে মৃত্যু’ কিংবা ‘রাজহাঁসের সব ডিম একদিনে পাওয়ার লোভ’ এই গল্প গুলো পড়ে আদৌ কেউ কিছু শিখে বলে মনে হচ্ছে না। দেশের লাখ লাখ মানুষ যারা এই আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা জানিয়েছিল কিংবা এই আন্দোলনের মাঝে একটা আলোর ঝলকানি দেখেছিল তাঁদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করতে এই নেতাদের একটুও দ্বিধা হল না।
কোন দল নেতৃত্ব দিবে কিংবা আন্দোলনের পথ কে বাতলে দিবে এইসব দ্বন্দে এই মহান আন্দোলনকে গলা টিপে মাতে উদ্যত হয়েছে দুই অংশ। নিজেদের ভুল বুঝতে না পারার খেসারত হবে এই আন্দোলনের অকাল মৃত্যু। রচিত হবে আরও একটি উপদেশমূলক গল্প—‘দ্যা ডেথ অফ শাহবাগ’।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১০ thoughts on “‘দ্যা ডেথ অফ শাহবাগ?’

  1. নেতৃত্বের ধখল নিয়ে দলাদলির
    নেতৃত্বের ধখল নিয়ে দলাদলির ফলে শাহবাগ তথা গণজাগরণ মঞ্চের হয়তো মৃত্যু হবে ! কিন্তু গণজাগরণ মঞ্চ জাতিকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হওয়ার যে প্রেরণা দিয়ে গেল, তা কি মানুষের হৃদয় থেকে ছিনিয়ে নিতে পারবে?

    1. চেতনার মৃত্যু হয় নি। সেই
      চেতনার মৃত্যু হয় নি। সেই চেতনা থাকবে। তবে তা সম্মিলিত হওয়ার প্রচেষ্টা এর পরে আর এতো স্বতঃস্ফূর্ত হবে না। মনে সংশয় তৈরি হবে। যার কারণ এই দলাদলি।

  2. গণজাগরণ মঞ্ছের মৃত্যু ঘটে নি।
    গণজাগরণ মঞ্ছের মৃত্যু ঘটে নি। যে চেতনার বিকাশ ঘটিয়েছে গণজাগরণ মঞ্চ তা অকল্পনীয় ছিল।
    কিছু ভুল সিদ্ধান্ত ছিল,সহিংস কার্যকলাপের দিকে আমরা যাই নি, কিন্তু সহিংস কার্যকলাপের আগ্রাসনই সরকারকে চুপ থাকতে বাধ্য করেছে। দু পক্ষকে সামাল দেওয়ার অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত আমাদের পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
    তবে আমরা হার মানি নি। মানবোও না।
    আর “রায়ের আগের দিনের সমাবেশ বলছেন” ? দিনের পর দিন টানা আন্দোলন চললে আপনিও নিশ্চয়ই আপনার পড়ালেখা স্কুল কলেজ অফিস চাকরি ছেড়ে দিয়ে শাহবাগে বসে থাকতে পারবেন না?! নিজের পেটের কথাও তো চিন্তা করতে হবে, রেজাল্টের কথাও ভাবতে হবে। কিন্তু আজ আরেকটা রায় আসুক কাদের মোল্লার মতো, ঠিকই তখন আবার দিন রাত এক করে শাহবাগে ধরণী কাঁপানো স্লোগানের অগ্নি মশাল জ্বলবে।
    আবার বলছি , গণজাগরণ মরে নি, এর চেতনা মরে নি। যা জ্বালিয়ে দিয়ে গেছে প্রত্যেক দেশপ্রেমী মানুষের হৃদয়ে তা নিভবে না।
    সমালোচনা করুণ, কিন্তু কোন উপসংহারে পৌছবেন না।

    1. চেতনা আমাদের অনেকের মাঝেই
      চেতনা আমাদের অনেকের মাঝেই ছিল। তা সম্মিলিত হতে পারে সেই বিশ্বাস এনে দিয়েছিল এই মঞ্চ। এই দলাদলি আর নেতৃত্বের কোন্দল সেই বিশ্বাসে আঘাত হেনেছে। এর পরে আবার কোন ইস্যুতে আবার এমন ডাক আসলে সবার প্রথমে মাথায় আসবে একটা প্রশ্ন– আবার ঝগড়া লাগবে না তো? এই কথাটাই বলতে চেয়েছি।

      1. প্রশ্ন ছাড়া তো কিছু নেই। ভালো
        প্রশ্ন ছাড়া তো কিছু নেই। ভালো হোক খারাপ হোক কোন কিছুই সমালোচনার ঊর্দ্ধে নয়।
        আর আমাদের বিশ্বাসে আঘাত হানে নি, আন্দোলনে আঘাত হেনেছে। এতো সহজেই যদি বিশ্বাস ভেঙে যায় তবে সেই বিশ্বাস তো ঠুনকো…

        1. চেতনার মৃত্যু হয়েছে এমন আমি
          চেতনার মৃত্যু হয়েছে এমন আমি বলিনি। আর চেতনা তো ৫ তারিখে তৈরি হয় নি। চেতনা আমাদের ভেতর ছিলই। যা ছিল না তা হচ্ছে সম্মিলিত হওয়া, যা সম্ভব হয়েছিল এই ব্লগারদের ডাকে। যারা ব্লগারদের ওপর বিশ্বাস রেখে এই ডাকে সাড়া দিয়ে এসেছিল তাঁরা যখন দেখবে এদের নিজেদের মধ্যেই দলাদলি- তাঁদের মনের অবস্থা কি হবে? আমি এই প্রশ্নই তুলতে চেয়েছি। ে থেকে উত্তরন না হলে ব্লগারদের অবস্থা ছাত্র রাজনীতিরর মতই হবে, এক্সময়ে যা ছিল নৈতিকতার প্রতীক আর এখন ?

  3. “মানুষ মরে। কিন্তু, চেতনা
    “মানুষ মরে। কিন্তু, চেতনা কখনও মরে না। চেতনা অমর। একজন চেতনার মঞ্চের মৃত্যু হলে হাজার বজ্রমুষ্টি তাকে আঁকড়ে ধরে। চেতনা পতাকার মত করে উড়তে থাকে; সক্রোধে।”

  4. বাস্তব-সঙ্গত কথা
    বাস্তব-সঙ্গত কথা বলেছেন……
    অরাজনৈতিক আন্দোলন কখনো রাজনীতির ধোপে টিকতে পারে না… কেউ না কেউ ফায়দা লুটবেই।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 22 = 25