আজ বিভীষিকাময় ভয়াল ২৪ এপ্রিল শ্রমিক হত্যার ৪ বছর

রানা প্লাজার ভবনকে ঝুকিপূর্ণ ভবন হিসেবে ঘোষণা করা হলেও ঘটনার দিন জোর পূর্বক শ্রমিকদের কাজে বাধ্য করা হয়েছিলো কাজ না করলে ভয় দেখানো হয়েছিলো চাকুরিচ্যুতের।

আজ ২৪ এপ্রিল আজ থেকে মাত্র ছয় দিন পরেই আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস, আজ বাংলাদেশের ইতিহাসে, বিশ্ব গার্মেন্টস শ্রমিক ইতিহাসে এক বিভীষিকাময় ভয়াল দিন। চার বছর আগে ২০১৩ সালের আজকের এই দিনে ঢাকার অদূরে সাভার বাসস্ট্যান্ডের পাশে রানা প্লাজা নামের একটি বহুতল ভবন ধসে পড়ে। ভবনের কয়েকটি তলা নিচে দেবে যায়। কিছু অংশ পাশের একটি ভবনের ওপর পড়ে। এ দূর্ঘটনায় এক হাজার ১৭৫ জন শ্রমিক নিহত এবং দুই হাজারেরও বেশি শ্রমিক আহত হয ও পঙ্গুত্ব বরণ করে কয়েক শত শ্রমিক যা বিশ্বের ইতিহাসে ৩য় বৃহত্তম শিল্প দুর্ঘটনা ও বাংলাদেশের শিল্প ইতিহাসের সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনা হিসেবে পরিচিত।

রানা প্লাজার ভবনকে ঝুকিপূর্ণ ভবন হিসেবে ঘোষণা করা হলেও ঘটনার দিন জোর পূর্বক শ্রমিকদের কাজে বাধ্য করা হয়েছিলো কাজ না করলে ভয় দেখানো হয়েছিলো চাকুরিচ্যুতের।

রানা প্লাজা ট্রাজেডির আজ চার বছর পেরিয়ে যাচ্ছে কিন্তু এখনো শুরু হয়নি শ্রমিক হত্যার এই বিচার। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে করা মামলার মোট ৪১ আসামির মধ্যে কারাগারে আছেন ভবন মালিক যুবলীগ নেতা সোহেল রানাসহ মাত্র তিন জন। বাকিরা কেউ জামিনে কেউ ধরাছোয়ার বাহিরে। শুরু হয়নি এখনো বিচার প্রক্রিয়া।

শারীরিক ও মানসিক পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় রানা প্লাজা দুর্ঘটনায় আহত শ্রমিকদের প্রায় ৪২ দশমিক ২ শতাংশ এখনও বেকার রয়ে গেছে বলে এক গবেষণায় উঠে এসেছে। গত (২২ এপ্রিল ২০১৭) শনিবার রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা একশনএইড গবেষণায় উঠে এসেছে এ তথ্য।

গবেষণার প্রতিবেদন সম্পর্কে একশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির বলেন, “চার বছর পরও এত বিশাল সংখ্যক শ্রমিকদের এই অবস্থা অত্যন্ত দুঃখজনক। আহত ও নিহত শ্রমিকদের পরিবারের সদস্যদের চুইয়ে চুইয়ে সহযোগিতা দেওয়া হয়েছে। তাদেরকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়নি, যা দেওয়া হয়েছে তা আর্থিক সহযোগিতা।”

রানা প্লাজায় আহত শ্রমিকেরা পেয়েছে অনুদান, পাইনি ক্ষতিপূরণ। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) গঠিত ‘ডোনার ট্রাস্ট ফান্ডে’ এক কোটি ৭০ লাখ ডলার অনুদান দেয় বিশ্বের বিভিন্ন ক্রেতা প্রতিষ্ঠান, যার কিছু অংশ বিতরণও করা হয়েছিলো বাঁকি টাকার আর কোন হদিস মেলেনি । নিহত ও পঙ্গু শ্রমিককে তার জীবদ্দশার আয়ের সমমান ক্ষতিপূরণ না দিলে ঐ শ্রমিকের উপর নির্ভরশীল পরিবার সারা জিবন মানবেতর জীবন কাঁটাতে হবে একথা জেনেও শাসক গোষ্ঠী নীরব।

মালিকের অবহেলায় মৃত্যুর ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান এবং কর্মস্হলে নিরাপত্তা ও নিরাপদ কর্ম-পরিবেশ নিশ্চিত না করার করাণে শ্রমিক হত্যার এই ধারাবাহিকতা চলমান।

২০১২ সালের ২৪ নভেম্বর রাতে আশুলিয়ার নরসিংহপুরে তাজরিন ডিজাইন লিমিটেড নামের কারখানার অগ্নিকাণ্ডে ১২৪ জনেরও বেশি শ্রমিক আগুনে পুড়ে নিহত হন এবং আহত ও দগ্ধ হন দুই শতাধিক শ্রমিক।

এর কয়েক মাসের মাথায় রানা প্লাজার ধস নিহত হয় হাজার অধিক শ্রমিক।

১০ সেপ্ট ১৬ সালে গাজিপুরের ট্যাম্পাকো কারখানার ভয়াবহ বয়লার বিস্ফোরণে অগ্নিকাণ্ডে ৩১ জন শ্রমিক নিহত হয় ও আহত হয়েছে আরও অর্ধশতাধিক।

গত বুধবার (২৬ এপ্রিল ১৭) দিনাজপুরের গোপালগঞ্জ এলাকার যমুনা অটোরাইস মিলে বয়লার বিস্ফোরণে অগ্নিকান্ডে নিহত হন ১০ শ্রমিক ও দগ্ধ হন ২০ শ্রমিক।
মালিকদের অবহেলা, শ্রমিকের নিরাপত্তা ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ না থাকায় (নিশ্চিত না করায়) শ্রমিক হত্যার এই ধারাবাহিকতা বিদ্যমান।

মালিকের অবহেলায় মৃত্যুর ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান, কর্মস্হলে মৃত্যুতে বা স্হায়ি পঙ্গুত্বে আজীবন আয়ের সমান ক্ষতিপূরণ,কর্মস্হলে নিরাপত্তা ও নিরাপদ কর্ম-পরিবেশ নিশ্চিত না করা হলে শ্রমিক হতাহত আদৌ বন্ধ হবে না।

রানা প্লাজা শ্রমিক হত্যার চার বছর পূর্তিতে সরকারের কাছে অনুরোধ মালিক শ্রেণীর স্বার্থ ছেড়ে শ্রমিকের স্বার্থে নিম্নোক্ত দাবী গুলো পূরন করুনঃ

♦ ২৪ এপ্রিল কে রাষ্ট্রীয়ভাবে শোক দিবস ঘোষনা।
♦ মালিকের অবহেলায় মৃত্যুর ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান।
♦কর্মস্হলে মৃত্যুতে বা স্হায়ি পঙ্গুত্বে আজীবন আয়ের সমান ক্ষতিপূরণ।
♦কর্মস্হলে নিরাপত্তা ও নিরাপদ কর্ম-পরিবেশ নিশ্চিত।
♦ রানাপ্লাজার মালিকের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে শ্রমিক কলোনি নির্মান।
♦জুরাইনে শ্রমিক স্মৃতিস্তম্ভ।
♦রানা প্লাজার স্হানে ২৪এপ্রিল স্মরণে শ্রমিক স্মৃতিস্তম্ভ নির্মান।

মালিক শ্রেণির স্বার্থ রক্ষাকারী সরকার জানি শ্রমিকদের দাবী কখনই মেনে নেবে। তার চেয়ে আসেন গল্প করি,
পুরোনো গল্প ক্লাস থ্রির একটা ছেলে আমাদের গ্রাম রচনা লিখেছিলো, “আমাদের গ্রামের নাম মেহের আটি। গ্রামের পাশে মেঘনা নদী। মেঘনার চরে অনেক গরু ঘাস খাই, গরু হাটার জন্য চারটি পা ও গুতা দেবার জন্য দুইটা শিং আছে। একটি লেজ, দুইটা কান ও বত্রিশটা দাঁতও আছে। গরুর দুধ দিয়ে আমাদের অনেক উপকার হয় এবং গরুর গোস্ত মানুষ কমাতে সাহায্য করে কারণ গরুর গোস্ত খেয়ে হার্ট এটাক করে মানুষ মারা যায়। আল্লাহ গরুকে কবুল করুন। আমাদের গ্রাম দেখতে অনেক সুন্দর তাই আমি আমার গ্রামকে অনেক ভালোবাসি।”

আমাদের শাসক গোষ্ঠীদের ঠিক একই অবস্থা। তাদের শাসনামলের তাজরীন গার্মেন্টস অগ্নিকান্ড, রানা প্লাজা ধসে হাজারের অধিক শ্রমিকের মৃত্যু, ট্রাম্পাকো ফয়েলস লিমিটেডের অগ্নিকান্ড, উত্তরবঙ্গে তিস্তায় পানি না থাকায় কৃষকের আহাজারি, সুনামগঞ্জে হাওর পারের শত শত মানুষের ক্রন্দন এ কথা গুলো তুলে ধরলেই তারা পদ্মা সেতু, বিদ্যুৎ রাস্তাঘাট দেখিয়ে উন্নয়নের মহাসড়কের বুলি শোনাবে একমাত্র তাদের আমলেই উন্নয়ন সম্ভব এরাই একমাত্র মুক্তিযুদ্ধের ধারক বাহক।

সুনামগঞ্জ হাওর অঞ্চলে ভারী বৃষ্টিপাত, পাহাড়ি আকস্মিক ঢল ও বাঁধ ভেঙ্গে অকালে কয়েক শত কৃষকের কষ্টার্জিত বোরো ফসল পেকে আসার আগেই কাঁচা অবস্থায় তলিয়ে গেছে শত শত কোটির ধান।

সারা দেশের সচেতন মানুষ যখন হাওরাঞ্চলকে দুর্গত অঞ্চল ঘোষণা ও ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকদের ক্ষতিপূরণের দাবী তুলছে এরই মাঝে গত ১৮ এপ্রিল সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের (মন্ত্রীর উপস্থিতিতে) সচিব শাহ কামাল বলেন, ‘সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলি, দেশে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নামে একটা আইন আছে। এই আইনের ২২ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো এলাকার অর্ধেকের উপরে জনসংখ্যা মরে যাওয়ার পর ওই এলাকাকে দুর্গত ঘোষণা করতে হয়। না জেনে যারা এমন সস্তা দাবি জানায়, তাদের কোনো প্রকার জ্ঞানই নেই।’

সভায় অবজ্ঞার সুরে সচিব শাহ কামাল আরও বলেন, কিসের দুর্গত এলাকা। সুনামগঞ্জে একটি ছাগলও তো মারা যায়নি। তাহলে কেন সুনামগঞ্জকে দুর্গত এলাকা ঘোষণা করতে হবে?

মাননীয় সচিব-মন্ত্রী মহোদয় রানা প্লাজায় প্রায় অর্ধেক শ্রমিক মারা গেছে ২৪ এপ্রিল কে অন্তত রাষ্ট্রীয় ভাবে গার্মেন্টস শ্রমিক শোক দিবস ঘোষণা করুন, আহত-নিহতদেরকে অনুদান নয় ক্ষতিপূরণ দিন।
আল আমিন হোসেন মৃধা
লেখক ও অনলাইন এক্টিভিস্ট

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

94 − = 84