আজ ২৪ এপ্রিল ঐতিহাসিক খাপড়া ওয়ার্ড শহীদ দিবস


পাকিস্তানের শাসকরা কারাগারে বন্দিদের ওপর চালাত অমানসিক ও পৈশাচিক নির্যাতন, পরিবেশন করত নিন্মমানের খাবার,কারা কর্তৃপক্ষের দুর্ব্যবহার, কারাবিধানের চাহিদা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সুযোগ না দেওয়ার প্রতিবাদে বিক্ষোভ করেছিলেন বিপ্লবী রাজবন্দিরা। এই প্রতিবাদেই জেলের মধ্যেই হতে হয়েছিল পাকিস্তানি কারারক্ষীদের হাতে নৃশংস খুন।

১৯৫০ সাল পাকিস্তান সামরিক জান্তা সরকার তাদের অন্যায়-অবিচার-অত্যাচার এর বিরুদ্ধে যুগে যুগে গড়ে ওঠা বিপ্লবীদের প্রতিবাদ রুখতে কারাগারে বন্দী করে রাখতো।

রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারের খাপড়া ওয়ার্ড। কারাগারের ভেতর ২য় প্রাচীর ঘেরা খাপড়া ওয়ার্ড। কারাগারের ভেতর কারাগার। খাপড়া ওয়ার্ড মানে নির্দিষ্ট চতুষ্কোণাকৃতি একখানা বেশ বড় ঘর। টালির ছাউনি থাকায় রাজশাহীর আঞ্চলিক ভাষায় বলা হত ‘খাপড়া’। এখানেই বন্দী করে রাখতো পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীর অত্যাচার-অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী বিপ্লবীদের। খাপড়া ওয়ার্ডে ওই সময় বন্দির সংখ্যা ছিল ৪১ জন ককমিউনিস্ট বিপ্লবী রাজবন্দী।

বিপ্লবীদের বন্দী রেখেও প্রতিবাদ দমানো যায়। কারা কর্তৃপক্ষ বন্দীদের উপর অমানুষিক নির্যাতন, নিম্নমানের খাবার সরবরাহ এবং কারাবিধান চাহিদা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সুযোগ না দেওয়ার প্রতিবাদে বিক্ষোভ করেছিলেন কারাগারের কমিউনিস্ট এই রাজবন্দিরা।

জেল কর্তৃপক্ষের এই অনাচারের প্রতিবাদে আমরণ অনশন শুরু করেছিলেন কারাবন্দি কমিউনিস্ট নেতারা। ১৯৫০ সালের ২৪ এপ্রিল সোমবার ভোরে জেল কর্তৃপক্ষ আলোচনার কথা বলে অনশনরত বন্দীদের ডেকে পাঠায়। বন্দী কমিউনিস্ট নেতারা জেল কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে দেন, নিন্মমানের খাবার সরবরাহ ও বন্দীদের উপর নির্যাতন বন্ধ না করা পর্যন্ত তারা আলোচনায় বসতে রাজি নন।

সারারাত মিটিংয়ের পর সকাল ৯টায় কমিউনিস্ট এই নেতারা আবার আলোচনায় বসলে জেল সুপার বিল হান্টার সরাসরি ঢুকে পড়েন খাপড়া ওয়ার্ডে। জেল সুপার রাজবন্দিদের ১৪ নম্বর সেলে যেতে চাপ প্রয়োগ করেন। কমরেড আবদুল হক বিলকে এ বিষয় নিয়ে কিছু বলতে গেলেই জেল সুপার চিৎকার করে ‘খাপড়া’র দরজা বন্ধ করে দেওয়ার নির্দেশ দেন। নির্দেশ দেওয়ার পরই বিল দৌড়ে বাইরে বেরিয়ে হুইসিল বাজান। সঙ্গে সঙ্গে চল্লিশজন সশস্ত্র সিপাহী ঘিরে ফেলে খাপড়া ওয়ার্ড।

বাইরে থেকে লাঠিধারী পুলিশ জানালা দিয়ে লাঠি ছুড়ে মারতে থাকে। নিরস্ত্র রাজবন্দিরা থালা-বাটি ছুড়ে আক্রমণ আটকানোর চেষ্টা করতে থাকেন। এরই মধ্যে দরজার ফাঁক দিয়ে নল ঢুকিয়ে গুলি চালাতে থাকে একদল আর্মড পুলিশ। বৃষ্টির মতো গুলি চালাতে চালাতে ‘খাপড়া’য় ঢুকে পড়ে আর্মড পুলিশ অন্য একটি দল।

রাইফেলের গর্জনে ফেটে পড়ে কারাগার। রক্তে ভেসে যায় খাপড়া ওয়ার্ড। সেখানেই ঝরে পড়ে ৭ টি তাজা বিপ্লবী প্রাণ। নিরস্ত্র ৪১ জন রাজবন্দীর ওপর ১৮০টি গুলি বর্ষণ করা হয়। অবিরাম গুলির পর শুরু হয় তিন দফায় লাঠিচার্জ।

নিহতরা কমিউনিস্ট বিদ্রোহী রাজবন্দী বিপ্লবীরা হলেনঃ
♦ কমরেড বিজন সেন (রাজশাহী)
♦ কম্পরাম সিং (দিনাজপুর)
♦ আনোয়ার হোসেন (খুলনা)
♦সুধীন ধর (রংপুর)
♦হানিফ শেখ (কুষ্টিয়া)
♦ সুখেন ভট্টাচার্য (ময়মনসিংহ)
♦ দেলোয়ার হোসেন (কুষ্টিয়া)।

খাপড়া ওয়ার্ডে ওই বর্বর নৃশংস আক্রমণে মারাত্মক আহত হয়েছিলেন ৩৪ জন রাজবন্দী।

যুগে যুগে বহু বিপ্লবীরা জীবন দিয়েছেন শাসক গোষ্ঠীর অত্যাচার অবিচারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের মশাল জ্বালতে গিয়ে। বিপ্লবীদের মৃত্যু নেই, বিপ্লবীরা মরে না বিদ্রোহের মশাল একজনের থেকে অন্যজনে ছড়িয়ে দেয়। ইতিহাসের এই খাপড়া ওয়ার্ডের বিপ্লবীদের জানাই অন্তরের অন্তস্থল থেকে গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি।

আল আমিন হোসেন মৃধা
লেখক ও অনলাইন এক্টিভিস্ট

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

8 + 1 =