দেশের প্রথম প্রতিরোধ যুদ্ধ এবং ভাস্কর্য

কোন দেশ স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতিকে ধরে রাখতে নানা ধরনের কাজ করে থাকে। এর মধ্যে সবার উপরে থাকে ভাস্কর্য তৈরি। জার্মানী ও রাশিয়ার রাস্তায় এ ধরনের ভাস্কর্য অনেক বেশি করেই চোঁখে পড়ে। রাস্তায় রাস্তায় বীরদের বীরত্ব আর দেশের ইতিহাসের কাহিনী। সেদিক থেকে বাংলাদেশ কিছুটা হলেও পিছিয়ে ছিল। সে সময় অনেকের চোঁখে দেশকে নতুন করে গড়ার চিন্তা থাকলেও কিছু ব্যতিক্রমী
মানুষ ছিলেন। যাদের চিন্তা ভাবনায় থাকত কিভাবে স্মৃতিকে সমুজ্জল করা যায়। জাগ্রত চৌরঙ্গী মুক্তিযুদ্ধের মহান শহীদদের অসামান্য আত্মত্যাগের স্মরণে নির্মিত তেমনি একটি ভাস্কর্য।মতিঝিলের শাপলা চত্বরের ভাস্কর আবদুর রাজ্জাক জাগ্রত চৌরঙ্গীর ভাস্কর। এ স্মৃতিসৌধটি ১৯৭৩ সালে নির্মাণ করা হয়। মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণায় নির্মিত এটিই প্রথম ভাস্কর্য।

অবস্থান

ডান হাতে গ্রেনেড, বাঁ হাতে রাইফেল। লুঙ্গি পরা, খালি গা, খালি পা আর পেশিবহুল এ ভাস্কর্যটি গাজীপুর জেলার জয়দেবপুর চৌরাস্তার ঠিক মাঝখানে সড়কদ্বীপে অবস্থিত।

আকার

ভিত বা বেদিসহ জাগ্রত চৌরঙ্গীর উচ্চতা ৪২ ফুট ২ ইঞ্চি। ২৪ ফুট ৫ ইঞ্চি ভিত বা বেদির ওপর মূল ভাস্কর্যের ডান হাতে গ্রেনেড ও বাঁ হাতে রাইফেল। কংক্রিট, গ্রে সিমেন্ট, হোয়াইট সিমেন্ট ইত্যাদি দিয়ে ঢালাই করে নির্মিত এ ভাস্কর্যটিতে ১৬ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ৩ নম্বর সেক্টরের ১০০ জন ও ১১ নম্বর সেক্টরের ১০৭ জন শহীদ সৈনিক ও মুক্তিযোদ্ধাদের নাম উৎকীর্ণ করা আছে।

স্থাপত্য তাৎপর্য

১৯৭১ সালের মার্চ মাস। বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের পর পরই পাকিস্তান সরকার তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে তাদের সামরিক শক্তি বৃদ্ধিতে তৎপর হয়। পাশাপাশি ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বাঙালি সৈন্যদের নিরস্ত্র করা শুরু হয়। এরই অংশ হিসেবে ১৯ মার্চ, শুক্রবার দুপুরে ঢাকা থেকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর একদল সৈন্য পাঁচটি ভ্যানে জয়দেবপুরে অবস্থিত সেনাবাহিনীর ছাউনিতে পৌঁছে। তারা ছাউনিতে পৌঁছার পর পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলস বাহিনীর একটি দলকে নিরস্ত্র করার চেষ্টা করে। ফলে পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলস বাহিনীর সঙ্গে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। এই সেনাবিদ্রোহের সংবাদ আশপাশে ছড়িয়ে পড়ে। মুহূর্তেই স্থানীয় জনগণ জয়দেবপুর শহরে জমায়েত হয় ও তাৎক্ষণিক প্রতিরোধ গড়ে তোলে। বড় বড় গাছের গুঁড়ি ফেলে জনগণ জয়দেবপুর শহরে ঢোকার বা বের হওয়ার একমাত্র রাস্তাটি বন্ধ করে দেয়। এতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সঙ্গে স্থানীয় জনগণের সংঘর্ষ বেধে যায়। একদিকে ভারী অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত পাকিস্তানি সেনাবাহিনী, অন্যদিকে মাত্র তিনটি বন্দুক নিয়ে স্থানীয় জয়দেবপুরবাসী। বাধাপ্রাপ্ত হয়ে পাকিস্তানি সৈন্যরা নির্বিচারে গুলিবর্ষণ করে। এতে হুরমত উল্যাসহ কমপক্ষে ২০ জন নিহত হন ও ১৬ জন আহত হন। কিন্তু পাকিস্তান সরকার তা অস্বীকার করে। সরকারি হিসাব মতে, তিনজনকে নিহত ও পাঁচজনকে আহত দেখানো হয়। বিকেল পৌনে ৪টা থেকে ৫টা পর্যন্ত এ প্রতিরোধ-গুলিবর্ষণ চলে। এরপর সন্ধ্যা ৬টা থেকে জয়দেবপুরে অনির্দিষ্টকালের জন্য সান্ধ্য আইন জারি করা হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে সারা দেশে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়। অসহযোগ আন্দোলন শুরু হওয়ার পর দেশের বিভিন্ন স্থানে পাকিস্তানি সৈন্যদের হাতে বাঙালি হতাহতের ঘটনা ঘটলেও এটিই ছিল মুক্তিযুদ্ধের সূচনাপর্বে প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধযুদ্ধ। আর এই প্রতিরোধযুদ্ধে শহীদ হুরমত উল্যা ও অন্য শহীদদের অবদান এবং আত্মত্যাগকে জাতির চেতনায় সমুন্নত রাখতে জয়দেবপুর চৌরাস্তার সড়কদ্বীপে স্থাপন করা হয় দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্যকর্ম জাগ্রত চৌরঙ্গী।

** গাজীপুরের বাসিন্দা হিসেবে আমি গর্বিত যে আমার জেলাতেই স্বাধিনতা যুদ্ধের প্রথম প্রতিরোধ গড়ে ওঠে **

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৪ thoughts on “দেশের প্রথম প্রতিরোধ যুদ্ধ এবং ভাস্কর্য

  1. ইতিহাস নির্ভর পোস্টের জন্য
    ইতিহাস নির্ভর পোস্টের জন্য ধন্যবাদ। অনেক কিছু জানা গেলো। জাগ্রত চৌরঙ্গীর একটা ছবি দিয়ে দিতেন পোস্টে, ভালো হতো।

  2. অধিকাংশ ইতিহাস জানতাম না। এই
    অধিকাংশ ইতিহাস জানতাম না। এই পোস্ট টা পড়ে ইতিহাস টা জানলাম সঠিক ভাবে , । ধন্যবাদ আপনাকে :ফুল:

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

56 + = 61