শুধু নোয়াখালীই নয়



বাংলাদেশে বর্তমানে বিভাগ এর সংখ্যা কতো? সর্বশেষ ময়মনসিংহ বিভাগ সহ মোট বিভাগ রয়েছে ৮ টি। ঢাকা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিভাগ, রাজশাহী বিভাগ, খুলনা বিভাগ, বরিশাল বিভাগ, সিলেট বিভাগ, রংপুর বিভাগ ও সর্বশেষ ময়মনসিংহ বিভাগ। বর্তমানে হবে হবে করছে কুমিল্লা বিভাগ যা ময়নামতি নামে প্রস্তাব করা হয়েছে ৬ টি জেলা নিয়ে। এতে দেশে বিভাগের মোট সংখ্যা দাঁড়াবে ৯টি। এছাড়াও ফরিদপুর নামে আরেকটি বিভাগ হবার সমূহ সম্ভাবনাও রয়েছে।
আসলে কোন জেলা বিভাগ হবে বা কোন জেলার নামে বিভাগ এর নামকরণ করা হবে এগুলো কোনো আলোচনার বিষয়ই হওয়ার কথা না। মূল কথা আমরা বিভাগ এবং জেলা থেকে কি সুবিধা পাচ্ছি।

নতুন দুটি বিভাগ রংপুর এবং ময়মনসিংহ বিভাগ হিসেবে স্বীকৃত পেলেও অন্যান্য বিভাগের মতো তাদের অবস্থান বা কার্যকলাপ কোনোটাই এখনো হয় নি। আর দুটি বিভাগেরই জেলা সমূহ এমনিই দেশের সবচেয়ে দারিদ্রতায় পরিপূর্ণ। একটিতো মঙ্গা এলাকা হিসেবে পরিচিত আর আরেকটি পানিতে ভাসা অঞ্চল নিয়ে গঠিত বিভাগ। মানে হাওড় অঞ্চল। অন্যান্য বিভাগও যে ঢাকা আর চট্টগ্রাম বিভাগের ধারেকাছে যেতে পারছে তাও বলা যাবে না।

বর্তমানে বাংলাদেশে ৮ টি বিভাগের অধীনে রয়েছে মোট ৬৪টি জেলা। ১৯৭১-এ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠাকালে জেলার সংখ্যা ছিল ১৮। রাষ্ট্রপতি এরশাদ মহুকুমাগুলোকে জেলায় উন্নীতকরণের প্রক্রিয়া চালু করেন। মহকুমা বাংলাদেশ এবং ভারতের পুর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর প্রশাসনিক একক। ১৯৮২ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে ‘মহকুমা’ নামের প্রশাসনিক ইউনিট চালু ছিল। ঐ বছরই সরকার প্রতিটি মহকুমাকে জেলায় উন্নীত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। পশ্চিম বাংলায় এখনো ৬২টি মহকুমা আছে। ১৮৪২ সালে সর্বপ্রথম কয়েকটি থানা সমন্বয়ে প্রশাসনিক একক হিসেবে মহকুমা সৃষ্টি করা হয়। সে যাই হোক আপাতত আমাদের কোনো মহকুমা নাই, সব জেলা হয়ে গেছে। ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠালগ্নে পূর্ব পাকিস্তান তথা বর্তমান বাংলাদেশের জেলার সংখ্যা ছিল ১৭ টি। ১৯৬৯-এ ময়মনসিংহ জেলার টাঙ্গাইল মহুকুমাকে একটি জেলায় উন্নীত করা হয়। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে সর্বপ্রথম পটুয়াখালী মহুকুমাকে একটি জেলায় উন্নীত করা হয়। প্রবীণ অনেকের মুখে এখনো যে বৃহত্তর শব্দটি শুনা যায় তা এই ১৯টি জেলাই। অর্থাৎ এ কথা বলাই যায় যে বাংলাদেশের প্রাচীন জেলার সংখ্যা সর্বমোট ১৭টি।

এখন আসা যাক আবারো বিভাগ নিয়ে, ১০ টি বিভাগ তো দেশে হচ্ছেই। বাকি যে সমস্ত প্রাচীন জেলা রয়েছে(১৯৪৭ সালের আগে গঠিত হওয়া জেলা) সেগুলোকেও বিভাগ হিসেবে তৈরি করা যেতে পারে। এতে প্রশাসনিক কাজে সুবিধাই হবে বলে আমার মনে হয়। প্রাচীন জেলাগুলোর মধ্যে কুমিল্লা আর ফরিদপুর তো বিভাগ হচ্ছে বলেই ধরে নেয়া ধরে নেয়া যায়, বাকী থাকে ৭টা। এর মধ্যে নোয়াখালীর নামটাই শুধু আসছে, বাকি ৬টি জেলাও বিভাগ করা উচিত। অন্তত উপবিভাগ নামে নতুন কিছু সৃষ্টি করে হলেও সেগুলোকে বিভাগ করে ফেলা উচিত। সেই ৬ টি জেলাগুলো হচ্ছে যশোর, কুষ্টিয়া, পাবনা, দিনাজপুর, বগুড়া ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অথবা রাঙামাটি। দেশে ১৭টি বিভাগ হলে অনেক সুবিধা হবে বলে আশা করি।

বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি। দেশের আয়তনের হিসেবে এই পরিমাণ অনেকটাই বেশি। রাজধানী ঢাকায় বাস করা মানুষের পরিমানই প্রায় দুই কোটি বা তারও বেশি এবং এ সংখ্যা শুধু বাড়তির দিকেই। এর প্রধান এবং অন্যতম কারন ঢাকা কেন্দ্রীকতা। দেশের জরূরী সকল কাজ ঢাকা কেন্দ্রীক হয়ে থাকে। সবকিছু রাজধানী কেন্দ্রিক হওয়ায় মানুষ সাধারণ সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। চৌকিদার-দফাদার নিয়োগ থেকে শুরু করে প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক পর্যন্ত সবকিছু ঢাকা থেকে নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় প্রশাসনে কোনো উন্নতি সাধন হচ্ছে না। দিন দিন বাড়ছে রাজধানীর ওপর চাপ। নগরীর ওপর যে হারে মানুষের চাপ বাড়ছে, সে অনুপাতে নাগরিক সুবিধা না বাড়ায় এক সময়ের প্রাচ্যের রানীখ্যাত ঢাকা তার সব ঐশ্বর্য ও সৌন্দর্য হারিয়ে বসবাসের অযোগ্য হতে চলেছে। এ মহানগরটি বাঁচাতে হলে সরকারের এখনই পরিকল্পিত উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। ক্ষমতার বিকেন্দ্রিকরণের মাধ্যমেই এই চাপ অনেকটা কমানো যেতে পারে। বাংলাদেশের সবকিছুই ঢাকা কেন্দ্রিক। সারা দেশে কোনো কাজ নেই বললেও ভুল হবে না। দেশ সুন্দর ওও সুশৃঙ্খলভাবে পরিচলানা করার জন্য বিকেন্দ্রীকরণ এর বিকল্প নেই। রাজধানী শহরটি বসবাসের উপযোগী বিশ্বমানের শহর হিসেবে গড়ে তুলতে এবং সারা দেশের সুষম উন্নয়নের স্বার্থে বিকেন্দ্রিকরণ একমাত্র পথ। উন্নত দেশগুলোর মতো প্রাদেশিক সরকার ব্যবস্থা চালু করা উচিত। তাদের নিয়ন্ত্রণ করবে কেন্দ্রীয় সরকার। এতে প্রশাসনিক কর্মক্ষমতাও বাড়বে, মানুষের ভোগান্তি কমবে, আদালতে মামলা জট কমবে, এবং সমগ্র দেশে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নও হবে। শুধুমাত্র ঢাকাকেন্দ্রীক দেশ থাকবে না। অর্থাৎ দেশের সবাইকেই বাধ্যতামূলকভাবে ঢাকায় আসতে হবে না। যার যার প্রদেশের রাজধানী থাকবে।

পূর্ব বাংলা বা বর্তমান বাংলাদেশের প্রথম বিভাগ ছিলো তিনটি। ঢাকা, রাজশাহী ও চট্টগ্রাম। তাই সে দিক বিবেচনা প্রাথমিকভাবে বাংলাদেশকে এই তিনটি প্রদেশে ভাগ করা যেতে পারে। নাম দেয়া যেতে পারে
১। মহাস্থানগড়
২। জাহাঙ্গীরনগর
৩। ময়নামতি

এছাড়াও সিলেট ও খুলনা অঞ্চলকেও আলাদা প্রদেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে। প্রাদেশিক সরকার গঠন অনেক সমস্যারই সমাধান করে দিবে।

তাই শুধুমাত্র নোয়াখালীকে বিভাগ বানানোর দাবি বা ইন্টারনেট ফেসবুকে ট্রল এর পরে ট্রল না করে দেশের প্রশাসনিক ব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণ বিষয়ে সকলের যথাযোগ্য মতামত ও আলোচনা করা উচিত। সামাজিক অর্থনৈতিক রাজনৈতিক পরিবেশগত সব দিক দিয়েই এতে দেশ লাভবান হবে।

কৃতজ্ঞতাঃ উইকিপিডিয়া, কর্ণেল অলি আহমদ(অবঃ), ফেসবুক এবং হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

85 − 83 =