একজন শ্রোতার একটি দিনের লিপি

কথা শুনতে ভালোবাসি আমি…সবাই যখন কথা বলে চুপ করে শুনি আমি। বলার চেয়ে শুনি আমি। তাই তো রোজ রাতে এদের কাছে আসি আমি। সবাই আমাকে খারাপ ভাবে। আমার বৌ ও ভাবে, ভাবুক। তবু এদের কাছে আমি আসি। এদের আপনারা সবাই চেনেন মাঝরাতে আলোকিত ঢাকা যখন ঘুমিয়ে পরে তখন যারা রাতের রানি হয়ে ঘুরে বেড়ায় এরা তারা। এদের কাছে আমি আসি গল্প শুনতে। কখনও রত্না, কখনো শম্পা…কখন কুসুম এক এক দিন এদের এক এক জনের এক এক নাম। এক এক জনের এক এক গল্প।

এই যে কুসুম মেয়েটা, অনায়াসে তাকে বাবার আদুরে মেয়ে হিসেবে মানা যায় কিন্তু সে তা নয়, অসুস্থ বাবার চিকিৎসার জন্য আজ সে এখানে। কতই বা বয়স হবে তার!!! ১৬ বা ১৭। যে বয়সে কল্পনার সাগরে ভেসে সপ্ন বুনার কথা সেই বয়সে সে সম্মুখীন চরম বাস্তবতার। আমি তার গল্প শুনি, গল্প শুনি তার বাবার…তার পালিয়ে যাওয়া মায়ের…তার স্বপ্নের…বাবাকে সুস্থ করে তোলার স্বপ্ন।তার সেই সপ্নীল চোখে চেয়ে আমি তাকে বলতে পারিনি যে ক্যান্সারের কোন চিকিৎসা নাই…তার বাবা কোন দিন সুস্থ হবে না…নাই বা বল্লাম…মেয়েটা থাকুক না এই একটি আশা নিয়ে…এই একটি স্বপ্ন নিয়ে।

লাইলী, বরিশালের টান যার কথা থেকে এখনো মুছেনি…ঢাকায় সে এসেছিল ভালো একটা কাজের আশায়…এক দালালের মাধ্যমে…মায়া মায়া মুখের এতিম এই মেয়েটা কি বুঝেছিল…মানুষ কতটা নীচ??? এই দালাল যে তাকে কোথায় নিয়ে যাবে টা কী সে জানত??? আমি এর ও গল্প শুনি…গ্রামের গল্প,বৃষ্টির গল্প,পাড়ার সেই ছেলেটার গল্প…..

এই যে রত্না…রাঙ্গা হাতে চোখে নতুন সংসারের স্বপ্ন নিয়ে সে যখন ঢাকা এল তখন সেও কি জানত তার স্বামীর আসল রুপ??? সেকি জানত এভাবে বিয়ে করে মেয়েদের বিক্রি করা তার স্বামীর পেশা??? পরিবার কে ছেড়ে যখন বাড়ি থেকে পালিয়ে এই লোক টার হাত ধরলো সে…জানত কি কত বড় ভুল করেছে সে??? তার কাছে আমি গল্প শুনি তার বাবা মা এর…তার স্কুলের…তার সিনেমা প্রীতির……

শম্পা মেয়েটা কথা বলতে বড় ভালোবাসে…খুব খুশি হয় যখন আমি চুপ করে তার গল্প শুনি…আমি ছাড়া আর কেই বা শুনবে তার কথা??? ২ সন্তান আর তাকে রেখে তার স্বামী যখন তাদের রেখে পালালো…তখন থেকে তার গল্প শোনার কেউ নেই…সবাই তার কাছে শরীরের জন্য আসে…গল্প শুনতে নয়…কিন্তু আমি আসি তার গল্প শুনতে…তার দেড় বছরের বাচ্চাটার ফোকলা হাসির গল্প…৭ বছরের ছেলেটার নতুন ঘুড়ি পেয়ে খুশি হয়ে উঠার গল্প,পাড়ার গুন্ডা টাইপ সেই ছেলেটার গল্প……তার হুমকির গল্প…সেই লোকটার গল্প যার বাড়িতে কাজ করতে গিয়ে সে সব কিছু হারিয়ে ছিল…চুপ করে শুনি আমি…কথার মাঝে বাঁধা দেওয়া শম্পা একদম পছন্দ করে না…কথা বলতে বলতে যখন তার দুই চোখ দিয়ে অঝর ধারায় পানি পরে…তখন ও আমি বাধা দিই না…

আরো কত জনের গল্প শুনি আমি……এখন তো এই গল্প আমার কাছে নেশার মত হয়ে গেছে…আমার বৌ এসব দেখে কাঁদে…কিন্তু কী করব…আমার বৌ তো গল্প জানে না..সারাদিন টাকার জন্য ছূটে ছুটে যখন ক্লান্ত হইয়ে পরি তখন এদের এক এক জনের কাছে আমি গল্প শুনতে আসি রোজ…রোজ রাতে আমি খুজে ফিরি নতুন কাওকে নতুন গল্পের সন্ধানে……চুপ করে শুনি আমি এদের গল্প…এদের অতিতের গল্প…রাস্তার গল্প…বাড়ির গল্প…মায়ের গল্প…প্রথম রান্নার গল্প……বৃষ্টি ভেজার গল্প…রাতের গল্প……আর কান্নার গল্প…

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 65 = 67