পার্বত্য চট্টগ্রামে যাদের সেটেলার বলা হয়

”বরিশাল থেকে আমাদের চট্টগ্রামে আনা হয়েছে লঞ্চ দিয়ে। চট্টগ্রাম থেকে আমাদের নিয়ে গিয়েছিল ট্রাকে করে কাপ্তাই পর্যন্ত। ট্রাকে করে যাওয়ার সময় আমাদের সামনে পেছনে দুইটা আর্মির জীপ ছিল। কাপ্তাই থেকে আমাদের সোজা নিয়ে যাওয়া হয়েছিল লংগদু আর্মি ক্যাম্পে। সেখানে আমরা কয়েক সপ্তাহ আর্মিদের দেয়া চিড়া-গুড় খেয়ে থেকেছিলাম। তারপর আমাদের জন্য জায়গা ঠিক করে দেয়া হয়।”



”বরিশাল থেকে আমাদের চট্টগ্রামে আনা হয়েছে লঞ্চ দিয়ে। চট্টগ্রাম থেকে আমাদের নিয়ে গিয়েছিল ট্রাকে করে কাপ্তাই পর্যন্ত। ট্রাকে করে যাওয়ার সময় আমাদের সামনে পেছনে দুইটা আর্মির জীপ ছিল। কাপ্তাই থেকে আমাদের সোজা নিয়ে যাওয়া হয়েছিল লংগদু আর্মি ক্যাম্পে। সেখানে আমরা কয়েক সপ্তাহ আর্মিদের দেয়া চিড়া-গুড় খেয়ে থেকেছিলাম। তারপর আমাদের জন্য জায়গা ঠিক করে দেয়া হয়।”

“এখন আমাদের লংগদুতেও বাড়ি আছে, বরিশালেও বাড়ি আছে।”

কথাগুলো চট্টগ্রাম শহরে কর্মরত এক নির্মাণ শ্রমিকের।

আশির দশকে এভাবে সেটেলার বসিয়ে দেয়া হয়েছিল পাহাড়ের বিভিন্ন আনাচে কানাচে। এখন নেয়া হচ্ছে বিভিন্ন শ্রমিক সাজিয়ে। পাহাড়ে সেটেলার পুনর্বাসন এখন যেকোন দলীয় সরকারের একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া।

পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয় এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী ১৯৭৯ থেকে ১৯৮২ সালে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় সমতল এলাকা থেকে বাঙালিদের নিয়ে গিয়ে রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান জেলার ৮৮টি গ্রামে ৩১ হাজার ৬২০ পরিবারের প্রায় এক লাখ ৩৬ হাজার ২৫৭ জন সেটেলার বাঙালিকে পাহাড়ে অভিবাসন দেয়া হয়। তাছাড়া ১৯৮০ থেকে ১৯৮৩ সালের সময়েও সমতল থেকে লক্ষের কাছাকাছি বাঙালিকে সরকারি উদ্যোগে পার্বত্য এলাকার বিভিন্ন এলাকায় অভিবাসন দেয়া হয়। ১৯৮৬ সালের সময় সরকারের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী অভিবাসিত সেটেলারদের খাস জমি হিসেবে পাহাড় ও টিলা বণ্টন করে দেয়া হয়। এদের মধ্যে বেশিরভাগই বিভিন্ন নদীভাঙন কবলিত বাঙালি।

এইসব নদীভাঙন কবলিত এলাকার মানুষের পাশাপাশি বিভিন্ন মেয়াদে সাজাপ্রাপ্ত অনেক জেলখানার কয়েদিও ছিল। এদেরকেই পার্বত্য চট্টগ্রামে সেটেলার বলে ডাকা হয়।

মোটকথা, জিয়াউর রহমান ও এরশাদের সময়ে ১৯৮০ থেকে ১৯৮৪ সালের মধ্যে প্রায় ৩ লক্ষাধিক বাঙালিকে পার্বত্য চট্টগ্রামে নিয়ে আসা হয় বিভিন্ন সুযোগ সুবিধার লোভ দেখিয়ে একপ্রকার দাওয়াত দিয়ে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের যেসব এলাকায় সেটেলারদের বসিয়ে দেয়া হয়, সেই সব এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করে আসা পাহাড়ি আদিবাসীরা প্রথমত খুব সরল এবং নিরীহ প্রকৃতির মানুষ। দ্বিতীয়ত তারা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে খেটে খাওয়া জুমচাষী। কথার ছলচাতুরী দিয়ে যাদের কাছ থেকে এক কেজির দাম দিয়ে কোন জিনিস কিনলে দেড় কেজি পাওয়া যায়। এমনই সহজ-সরল পাহাড়ের সেসব মানুষ।

সমতল থেকে সেই খেটেখাওয়া, ভিটেবাড়ি হারা সেটেলাররা সরকারের বা সেনাবাহিনীর ভাগবাটোয়ারা করে দেয়া সেই জমি ছাড়াও তারা একসময় পাশের এলাকার কয়েক পুরুষ ধরে বসবাস করা সহজ-সরল, নিরীহ-নিপাত, জুমচাষী আদিবাসীদের জমিতে রাতের অন্ধকারে গিয়ে ঘর তুলে আসে বা কোন ক্ষেত নষ্ট করে দিয়ে আসে!

এমন মানুষের সাথে কীভাবে এক এলাকায় সহবাস করা যায়? পাহাড়ের মহিলা, কিশোরীরা যে কুয়োতে প্রতিদিন সকাল সন্ধ্যা গোসল-স্নান করতে যায়, দিনে দু-তিন বেলা পানি আনতে যায়। সেই রাস্তা এবং কুয়োর আশেপাশে যারা ওঁত পেতে থাকে, তাদের সাথে পাহাড়ের দিলখোলা মানুষ কীভাবে সামাজিক সম্পর্ক বজায় রাখবে?

যেহেতু বেশিরভাগ সেটেলারই সমতলের বিভিন্ন নদীভাঙন কবলিত এলাকা থেকে আসা। নদীভাঙনসহ বিভিন্ন দুর্যোগ কবলিত মানুষদের সাহায্য-সহায়তা করা সরকারের রাষ্ট্রীয় কর্তব্য। দেশের উপকূলীয় অনেক এলাকা প্রতিবছরই ভাঙনের ফলে নদীর গর্ভে বিলীন হয়ে যায়। দেশের সরকারের নদীভাঙন রোধ করার পদক্ষেপ নেই বা থাকলেও ফলপ্রসূ কোন বাস্তবায়ন নেই, কিন্তু সেই নদীভাঙন কবলিত বাস্তুহারা মানুষদের প্রতিবছর পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের ক্ষেতখামার, জুম,ভিটেমাটি দখল করে পুনর্বাসন দেয়ার প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করে। যা আজও চলমান।

রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র বাস্তবায়ন করার ফলে যদি সুন্দরবন এলাকার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, এলাকা যদি মানুষের বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়ে, সেইসব ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদেরও কি পাহড়ে এনে পুনর্বাসন দেবে সরকার? এমন আশঙ্কা কি আপনি উড়িয়ে দিতে পারবেন?

মানুষে মানুষে সম্পর্ক, সহবাস গড়ে ওঠে। মনে মন মিললে, প্রাণে প্রাণ মিললে সম্পর্ক, সহবাস, প্রতিবেশ, সমাজ গড়ে ওঠে। লেলিয়ে দেয়া অমানুষের সাথে এসবের কোনটাই সম্ভব নয়।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

29 − = 28