শুরু হোক ষড়যন্ত্র নিয়ে বাঙ্গালির গেসিং গেম

কাশিম বিন আবু বাকার থামি থামি করেও থামছে না। তাবৎ বড় বড় সাহিত্যিক ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। চলছে চুলচুরে বিশ্লেষণ। তিনি কোন মানের সাহিত্যিক, তা নিয়েও যেমন বিতর্ক চলছে তেমনি চলছে উদাহরণের পালা, জনপ্রিয় হল তো কি হল? উপন্যাস তো অখাদ্য। এই প্রসঙ্গে বেশ কিছু ব্লকাব্লকিও হয়ে গেছে। কেউই হারতে রাজি না। কমবেশি সবাই সাহিত্য বোদ্ধা হয়ে বসে আছেন। একাত্তর টিভি বকর সাহেবকে লাইভ এনেছেন। মোদ্দা কথা, ডেইলি মেইল যা করতে চেয়েছিল, তা হল, তাঁকে লাইমে লাইটে নিয়ে আসল। যারা তাঁকে পছন্দ করছেন না, তাঁরাও নিজের অজান্তে তাঁকে লাইম লাইটে আসতে সাহায্য করলেন।

কেউ কেউ এর মধ্যে একটা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব খুজে পাচ্ছেন। বোঝাতে চাইছেন, ডেইলি মেইল ইচ্ছে করেই এমন আর্টিকেল ছেপেছে। তাদের আসল উদ্দেশ্য দুনিয়াকে দেখানো যে এদেশে ধর্মভিত্তিক উপন্যাস সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়। যুক্তিটা বেশ মজার। একটি ঘটনা ঘটেছে, সেটা সমস্যা না, সেটা প্রকাশ করাই সমস্যা। গ্রেট। আচ্ছা মধ্যবিত্ত যে ‘খাদ্য’ টাইপ সাহিত্য পড়ছে না, তা নিয়ে কোন দুশ্চিন্তা হয় না? কেন পড়ছে না? কি তাদের চাহিদা? আপনি ‘খাদ্য’ টাইপ সাহিত্য লেখেন, সমস্যা নাই, বাট মধ্যবিত্ত যেমন লেখা পড়তে চাইছেন, তেমন লেখার সাপ্লাই না পেলে তাঁরা করবে কি?

এনিওয়ে, কাশিম বিতর্ক আরেকটা কাজ করেছে, হাওর আর মূর্তি বিতর্ককে সাইড লাইন করে দিয়েছে। মূর্তি নিয়ে আপাততঃ তেমন কোন হুঙ্কার নেই। প্রগতিশীল বাহিনীও তেমন কোন উচ্চবাচ্য করছেন না। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট একটু বিবেক সাজবার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু সেটা হওয়ার যে তাদের মুরোদ নেই তা তাঁরা বোঝেনি। ওবায়েদুল কাদের সাহেবের সাথে আলোচনা শেষে তাই বেশ একটা আবোল তাবোল টাইপ স্টেটমেন্ট আসল। ঠিক বোঝা গেল না, উনারা কোনদিকে, মূর্তি সরানোর পক্ষে? না বিপক্ষে?

আসলে মূর্তি প্রশ্নে বাজারে বেশ অনেক পক্ষের আগমন ঘটেছে। এক হচ্ছে হেফাজত, মূর্তি সরাতে হবে। অন্য পক্ষে আছে প্রগতিশীল বাহিনী, সরানো যাবে না, আর হেফাজতের হুমকির প্রেক্ষিতে তো আরোই যাবে না। তৃতীয় পক্ষে হচ্ছে, মূর্তিটা দেখতে ভাল হয়নি। ভাস্কর্যের নামে বদখত একটা জিনিস তৈরি হয়েছে, এটা না থাকাই ভাল। টিপিক্যাল ধান্ধাবাজ স্ট্যান্ড। মূর্তির পক্ষেও না, বিপক্ষেও না। এই বিতর্কের নবতম অবস্থান হচ্ছে আওয়ামী নেত্রীর। ‘এটা কি বানিয়েছে? আমার পছন্দ হয়নি।‘ এটাও পাশ কাটানো ফর্মুলা। পছন্দ হলে কি হত? তখন রাখতে বলতেন?

মূর্তি প্রশ্নে আরও একটা তত্ত্ব বাজারে এসেছে। ষড়যন্ত্র তত্ত্ব। নো নিউ অ্যাডিশান। প্রতিটি ঘটনার পরে এই তত্ত্ব আসেই। বিএনপি ঘটালে আওয়ামীরা বলে আর আওয়ামীরা ঘটালে বিএনপি। এবার অবশ্য কোন দল এই দাবী তোলেনি, এসেছে বেশ কিছু ফেসবুকারের তরফ থেকে। তত্ত্বের ব্যাখ্যা অনেকটা একই। ইচ্ছে করেই মূর্তি বসানো হয়েছে। যেন বিতর্ক হয়। এরপরে সেটা সরিয়ে হেফজত বাহিনীর কাছে প্রিয়পাত্র হওয়ার চেষ্টা। এই তত্ত্বের আবিষ্কর্তারা কওমি সনদকে মাস্টার্স সমমান দেয়ার কারণের ব্যাখ্যাও প্রকাশ করেছেন। ঐ একই, হেফাজতি ভোটকে নিজের দিকে টানা।

সো সারাংশ দাঁড়াচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী হেফাজতকে লাই দিচ্ছেন, কারণ তিনি হেফাজতি ভোট চাইছেন। আর হেফাজতও এই সুযোগে যা পারে আদায় করে নিচ্ছে। আপাত দৃষ্টিতে এই তত্ত্ব বেশ অনেকেই বিশ্বাস করতে শুরু করেছেন। প্রগতিশীল বাহিনী বেশ কিছুদিন মাতমও করল এনিয়ে। উপদেশের পর উপদেশ দিয়ে বলার চেষ্টা করল, ‘লাভ নাই ম্যাডাম। হেফাজতি ভোট আপনারা পাবেন না। বরং আমাদের ভোটটা হারালেন।‘ অ্যাজ ইফ, ম্যাডামের সেই হ্যাডম নেই।
ঠিক এই জায়গাটা আমারও কেমন খটমট লাগছিল। হেফাজতি ভোট যে আওয়ামীরা পাবে না, তা না জানবার মত গবেট আওয়ামীনেত্রী নন। তিনি ভালমতই জানেন, হেফয়াজতকে কতোটা বিশ্বাস করা যায় আর হেফাজতকে কি দিয়ে বাগে আনা যায়। রেলের জমি দিয়ে যেখানে তাঁদের বশে আনা যায়, সেখানে তাঁদের গণভবনে ডেকে আনা তো জরুরী না। সো, খেলা সম্ভবতঃ অন্য। অ্যানাদার ষড়যন্ত্র তত্ত্ব।

এই তত্ত্বমতে, আসল প্ল্যানিং হচ্ছে ২০১৯ কে ঘিরে। তখন যে নির্বাচন হবে, সেখানে বিএনপি সম্ভবতঃ আসবে। এখন যদিও গাইগুই করছে, তবে ২০১৯ আসতে আসতে তাঁদের ভাষা পাল্টে যাবে। আওয়ামী নেতৃত্বেই নির্বাচন করবে এবং কারচুপি হবে জেনেই নির্বাচন করবে। বিএনপি দুটো ব্যাপার বুঝে গেছে, আরেকটা ৫ই জানুয়ারী করলেও আওয়ামীরা পার পেয়ে যাবে। ছিয়ানব্বইয়ের নির্বাচনের পরে আওয়ামীরা যা করতে পেরেছিল, তা করবার মত মুরোদ তাঁদের নেই। সো তাঁদের অপশান দুটো, এক নির্বাচন না করা আর ‘দুর্বার আন্দলনের’ হুমকি দিয়ে নিজেদের হাস্যস্পদ করা, আর নয়তো নির্বাচনে যোগ দিয়ে সত্তর আশিটা সিট নিয়ে সংসদে প্রবেশ করা।

গুজব যা শোনা যাচ্ছে, তাতে মনে হচ্ছে নিজেদের সারভাইভালের জন্যই তাঁরা নির্বাচনে যাবে এবং আওয়ামীদের সাথে হওয়া ডিল অনুযায়ী সত্তর কিংবা আশিটা সিট নিয়েই সন্তুষ্ট থাকবে। স্বাধীনতার পঞ্চাশবর্ষ পূর্তি আওয়ামীরা নিজেরা ক্ষমতায় থেকে করতে চাইছে, সেই খায়েশে বিএনপি বাঁধা দেবে না। সমস্যা কিছুটা হয়তো হবে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে। আওয়ামীরা এতো ভোট পেল কিভাবে, বিশেষ করে মোল্লাবাহিনীর ভোট। তো সেই উত্তর দেয়ার প্রক্রিয়া হচ্ছে, হেফাজতি সখ্য। সবাইকে তখন বোঝানো হবে, আওয়ামীদের কার্যকলাপে খুশি হয়ে ধর্মীয় ভোট আওয়ামী পাতে আসতে শুরু করেছে।

এনিওয়ে, ২০১৯ আসতে এখনও দেরি আছে। এর মধ্যে আর কি কি হবে, এখনও বোঝা যাচ্ছে না। হেফাজত রাজনৈতিক দল গঠন করবে কি না, বিএনপি থেকে নতুন কোন ইঙ্গিত পাবে কি না, বোঝার উপায় নেই। ভারত কি করবে, চীন কি চাইছে কিংবা আমেরিকা এই অঞ্চল নিয়ে কি ভাবছে, এমন হাজারো ব্যাপারে আছে, যার ওপর নির্ভর করছে, আগামী দিনের বাংলাদেশের রাজনৈতিক চিত্র। আপাততঃ আমাদের কাজ, ষড়যন্ত্র খোঁজা, আর হাতের কাছে রয়েছে দুটো টপিক, কাশিম আর হেফাজত। সো, লেটস স্টার্ট আওয়ার গেসিং গেম। বেস্ট অফ লাক

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “শুরু হোক ষড়যন্ত্র নিয়ে বাঙ্গালির গেসিং গেম

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

78 + = 85